ভার্চুয়াল জগত: সম্ভাবনা ও শঙ্কা শীর্ষক ধারাবাহিকের আজকের আসরে আপনাদের। গত আসরে আমরা ইন্টারনেট তথা ভার্চুয়াল জগতকে সঠিক পন্থায় ব্যবহারের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেছি।

আমরা বলেছি, ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে সচেতনতা ও সতর্কতা জরুরি। এই সচেতনতা সৃষ্টিতে সমাজ ও রাষ্ট্র ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে।

শিশুরা ঠিক মতো বুঝতে শেখার আগেই মোবাইল ফোন ও কম্পিউটারের সঙ্গে পরিচিত হয়। এই পরিচয় ক্রমেই ঘনিষ্ঠ হয়। স্মার্ট মোবাইল ফোন তথা কম্পিউটারের মাধ্যমে তারা নতুন এক জগতে প্রবেশ করে। এই জগতের নামই হচ্ছে ভার্চুয়াল জগত। তারা বিশ্বকে মোবাইল ফোনের স্ক্রিন এবং কম্পিউটারের মনিটরের মাধ্যমে বিশ্বের সঙ্গে পরিচিত হয়। ১৯৯০'র দশক ও এর পরবর্তী সময়ে জন্মগ্রহণকারীরা পৃথিবীর অনেক কিছুকেই চিনেছে ও জেনেছে এই স্ক্রিন ও মনিটরের মাধ্যমে। সোস্যাল মিডিয়ার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ও যোগাযোগ সবচেয়ে বেশি। এ কারণে এই প্রজন্মকে নেটওয়ার্ক প্রজন্ম নামেও অভিহিত করা হয়।

বিশ্বের সঙ্গে তাদের পরিচয়ের মাধ্যমটা এমন যে,স্টার্ট অপশনে চাপ দিলেই তা সচল হয়ে উঠে এবং 'ক্লোজ'অপশনে চাপ দিলে তা বন্ধ হয়ে যায়। এই প্রজন্ম অর্থনীতি,ধর্ম,সংস্কৃতি,সমাজ ও ইতিহাসকে মোবাইলের স্ক্রিন ও কম্পিউটারের মনিটরের মাধ্যমে দেখতে শিখেছে।  

মানব জীবনে ভার্চুয়াল জগতের প্রভাব অনস্বীকার্য। কারণ এর ফলে স্থান ও কালের পার্থক্য বলতে গেলে উঠেই গেছে। আমরা এই জগতের কল্যাণে এমন সব মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে সক্ষম হচ্ছি যাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন ছিল অকল্পনীয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর কল্যাণে নানা সংস্কৃতির মধ্যে আদান-প্রদান বাড়ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্থানীয় সংস্কৃতির ওপর পাশ্চাত্যের সংস্কৃতির প্রভাব পড়ছে। ভার্চুয়াল জগতে যে কোনো বয়সের,যেকোনো লিঙ্গের, যেকোনো বিশ্বাসের মানুষ প্রবেশ করতে পারছে বিনা বাধায়। এ জগতে প্রবেশের জন্য একটি স্মার্ট মোবাইল অথবা যেকোনো সাইজের কম্পিউটার ও একটি ইন্টারনেট সংযোগ থাকাই যথেষ্ট। ভার্চুয়াল জগতের নানা ইতিবাচক প্রভাবের পাশাপাশি রয়েছে ক্ষতিকর প্রভাব। বিশেষকরে শিশুদের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব সবচেয়ে বেশি।

বর্তমানে তরুণ ও শিশুদের মধ্যে মোবাইল ফোন,ট্যাব,কম্পিউটার,ল্যাপটপ আর ইন্টারনেটের লাগামহীন ব্যবহারের প্রবণতা ব্যাপকভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই প্রবণতা এখন এতটাই প্রবল যে, নিয়মিত এসব ব্যবহারে অভ্যস্ত শিশু-কিশোররা কিছুক্ষণের জন্য এগুলো থেকে দূরে থাকলেই অস্থির হয়ে পড়ে। আর যাদের কাছে এই প্রযুক্তি-পণ্যগুলো নেই,তারাও অন্যদের কাছে সেগুলো দেখে হাহাকার আর অপূর্ণতার অনুভূতিতে ভোগে। প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে নৈতিক জ্ঞানহীন কিছু মানুষ ভার্চুয়াল জগতকে অপরাধের হাতিয়ারে পরিণত করেছে। শিশুদেরকে নানা অপরাধে জড়িয়ে ফেলার ঘটনাও ঘটছে অহরহ। বা-মা, শিক্ষক ও অভিভাবকদের সঠিক তদারকির অভাবে শিশু-কিশোররা অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। বাংলাদেশের নাটোরে একটি ঘটনা এ ক্ষেত্রে উল্লেখ করা যেতে পারে।   

গত ৫ মে বাংলাদেশের মিডিয়ায় এসেছে,কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে এক স্কুল ছাত্রীর আপত্তিকর ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশের অভিযোগ উঠেছে। স্কুলছাত্রীর স্বজনরা জানিয়েছেন, গত ফেব্রুয়ারি মাসে দৌলতপুর উপজেলার একটি স্কুল থেকে মেহেরপুরের মুজিবনগরে শিক্ষা সফরের আয়োজন করা হয়। এ সময় কৌশলে ওই ছাত্রীর সঙ্গে আপত্তিকর ছবি তোলেন অভিযুক্ত ব্যক্তি। পরে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। এ ঘটনার বিচার চেয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে দৌলতপুর থানায় অভিযোগ দায়ের করেন স্বজনরা। নিরাপত্তা বাহিনীও আপত্তিকর ছবিটি ভাইরাল হওয়ার প্রমাণ পেয়েছে। আইনের আশ্রয় নেওয়ায় স্কুলছাত্রীর স্বজনরা প্রশংসিত হয়েছেন। কারণ এর ফলে সমাজে অপরাধের প্রবণতা কিছুটা হলেও কমবে। কারণ অনেক সময় দেখা যায়, এ ধরনের অপরাধের ঘটনা ঘটার পরও ঝামেলা এড়াতে অনেকেই আইনের আশ্রয় নেন না।

বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেই ভার্চুয়াল জগতের নানা প্রভাব নিয়ে চিন্তা-গবেষণা হচ্ছে। সমাজ ও দেশের ভিন্নতায় এর প্রভাবও ভিন্ন ভিন্ন। বাংলাদেশ ও ভারতের শিশু-কিশোরদের মধ্যে এখন যে প্রবণতাটি বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় তা হলো বাস্তব জগতের সঙ্গে তাদের দূরত্ব সৃষ্টি হচ্ছে। শিশু-কিশোররা মাঠের চাইতে ফোন-কম্পিউটারের গেমসেই বেশি আসক্ত থাকছে। ফেইসবুক ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভার্চুয়াল বন্ধুরাই যেন তাদের সবকিছু। তাদের কাছে মানসিক বন্ধনের তুলনায় ডিজিটাল বন্ধনের প্রাধান্য বেশি। সুখ-দুঃখের ভাগাভাগি করতেও তাদেরকে এখন ফেসবুকের সাহায্য নিতে হয়। সরাসরি কথা না বলে ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে পোস্ট দিয়ে তারা ভাব আদান-প্রদান করে।

ভার্চুয়াল জগতের  কারণে বাবা-মা এবং শিশুদের মধ্যে দূরত্ব বাড়ার ধরণটা এতটাই ভয়াবহ যে, ছুটির দিনে কোথাও বেড়াতে গিয়েও শিশু-কিশোররা মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত থাকে। আনন্দের মুহূর্তগুলো সঠিকভাবে উপভোগ করার অনুভূতিই যেন মরে যাচ্ছে ভেতর থেকে। এ অবস্থায় বাবা-মা,শিক্ষক ও অভিভাবকদের উচিত শিশুদেরকে সময় দেয়া এবং ভার্চুয়াল জগতের নেতিবাচক প্রভাব থেকে সন্তানদের দূরে রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো। # 

পার্সটুডে/সোহেল আহম্মেদ/মো: আবুসাঈদ/  ২৬

২০১৮-০৭-২৬ ১৭:৫৭ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য