রংধনু আসরের কাছের ও দূরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, আসরের শুরুতেই তোমাদের একটা প্রশ্ন করি। আচ্ছা, তোমরা পড়াশোনা করছ কিসের জন্য? কী ব্যাপার! এ প্রশ্ন শুনে একে অপরের দিকে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছো কেন? ও বুঝতে পেরেছি, তোমরা আসলে দ্বিধায় পড়ে গেছো- কী উত্তর দেবে তা ভেবে। আসলে প্রশ্নটি সহজ হলেও উত্তরটি একেবারে সহজ নয়। কারণ, কেউ পড়াশোনা করে চাকরি করার জন্য, কেউবা করে জ্ঞানার্জনের জন্য। তবে ঠিকমত জ্ঞানার্জন করে নিজেকে যোগ্য করে তৈরি করতে পারলে ভালো চাকরি-বাকরিও পাওয়া সম্ভব।

বন্ধুরা, জ্ঞানার্জনের কথা উঠলেই সবার আগে চলে আসে আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর কথা। তারপর আসে আমিরুল মোমেনীন হযরত আলী (আ.) এর কথা। নবী করিম (সা.) বলেছেন, আমার পরে আমার উম্মতের মধ্যে সবচে বড় জ্ঞানী হলেন আলী ইবনে আবি তালিব।

হাদিসে এসেছে, একদিন নবীজী উচ্চস্বরে বললেন, 'আমি হলাম জ্ঞান ও বিজ্ঞানের শহর আর আলী হলেন সেই শহরের দরোজা। তাই যে-ই জ্ঞান অর্জন করতে ইচ্ছুক সে যেন এই শহরের দরোজার কাছে যায়।'

সত্যি বলতে কী-হযরত আলী (আ.) এর জ্ঞান এবং প্রজ্ঞার তুলনা মেলা ভার। তিনি ছিলেন আরবি ব্যাকরণের জনক। তাঁর মেধা, তাঁর জ্ঞানের কথা প্রবাদতুল্য। হযরত আলী ছিলেন রাজস্ব প্রথার উদ্ভাবক। তিনিই সর্বপ্রথম ভূমিরাজস্ব প্রথা প্রবর্তন করে ভূমির ওপর চাষীদের অধিকার নিশ্চিত করেন।

ইবনে মাসউদ বলেন : মহানবী (সা.) আলীকে ডাকলেন এবং তাঁর সাথে একান্তে বসলেন। যখন আলী ফিরে আসলেন, তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম কী আলোচনা করছিলেন? তিনি বললেন : মহানবী (সা.) জ্ঞানের সহস্রটি দ্বার আমার জন্য উন্মুক্ত করলেন, প্রত্যেকটি দ্বার থেকে আবার সহস্র দ্বার উন্মুক্ত হয়!

বন্ধুরা, হযরত আলী (আ.) কেমন জ্ঞানী ছিলেন- তোমরা তা উপলব্ধি করতে পারবে এই ঘটনাটি থেকে। একদিন হযরত আলী (আ.) মসজিদের মিম্বারে দাঁড়িয়ে বললেন: হে লোক সকল! আমাকে হারানোর পূর্বেই, আমার কাছে জিজ্ঞাসা কর। আমার নিকট থেকে জেনে নাও, কেননা পূর্ববর্তী ও উত্তরবর্তীদের জ্ঞান আমার নিকট বিদ্যমান। আল্লাহর শপথ, যদি বিচারের দায়িত্ব আমাকে দেয়া হয়, ইহুদীদের জন্য তাদের কিতাব থেকে, ইঞ্জিলের অনুসারীদের জন্য সে কিতাব থেকে, যবূরের অনুসারীদের জন্য তাদের কিতাব থেকে, আর কুরআনের অনুসারীদের জন্য কুরআন থেকে তবে সেভাবেই বিচার করব... আল্লাহর শপথ, আমি কুরআন ও তার ব্যাখ্যায় সকলের চেয়ে জ্ঞানী।

এরপর তিনি বললেন: আমাকে হারানোর পূর্বেই আমাকে জিজ্ঞাসা কর। কুরআনের যেকোনো আয়াত সম্পর্কে আমাকে জিজ্ঞাসা কর, আমি তার জবাব দিব; বলতে পারব তার অবতীর্ণ হওয়ার সময় সম্পর্কে, কার উদ্দেশ্যে অবতীর্ণ হয়েছে, নাসেখ ও মানসূখ সম্পর্কে, আর বলতে পারব সাধারণ ও বিশেষ আয়াত সম্পর্কে, মোহকাম ও মোতাশাবিহ আয়াত সম্পর্কে, মাক্কী ও মাদানী আয়াতসমূহ সম্পর্কে...।

বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছো যে, ইমাম আলী (আ.) কেমন জ্ঞানী ও বিচক্ষণ ছিলেন। রংধনুর আজকের আসরে আমরা এ সম্পর্কেই দুটি ঐতিহাসিক ঘটনা শোনাব। এছাড়া থাকবে একটা গান। আমাদের আজকের অনুষ্ঠানটিও তৈরি করেছেন আশরাফুর রহমান।

একবার দুই পথিক পথ চলতে চলতে ক্লান্ত হয়ে পড়ল। তাদের ক্ষুধাও লেগেছিল ভীষণ। খাওয়া-দাওয়া করার জন্য দু’জন মিলে একটা সুবিধাজনক জায়গায় গিয়ে বসে পড়ল। এরপর পুটলি থেকে বের করে নিল যার যার খাবার। একজনের রয়েছে পাঁচটি রুটি। অন্য জনের তিনটি।

তারা যখন খাবার খাওয়ার জন্য তৈরি হলো তখন সেখানে এসে হাজির হলো এক মুসাফির। তার বেশভূষা একদম সাদাসিধে।  সে বলল, ভাই আমি অভুক্ত। খুব ক্ষুধা লেগেছে। আমার কাছে কোনো খাবার নেই। তোমরা আমাকে কিছু খাবার দাও।

পথিক দু’জন মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। মনে মনে ভাবল, তারা দু’জন খাবে আর একজন মুসাফির না খেয়ে থাকবে, এ কেমন কথা? তারা মুসাফিরকে তাদের সঙ্গে খেতে বসার অনুরোধ করল।

তিনজন একসঙ্গে খেতে বসল। একজনের পাঁচ রুটি। অন্যজনের তিন রুটি। মুসাফিরের শূন্য হাত। তবু তারা রুটি বণ্টনে কোনো তারতম্য করল না। তারা ভাবল, কারো সঙ্গে খাবার না থাকতে পারে, কিন্তু ক্ষুধা তো আর কম লাগেনি। তাছাড়া এক সঙ্গে খেতে বসে একজন বেশি খাবে আর একজন কম খাবে, তাই বা কেমন করে হয়? তিনজন সমান সমান রুটি খেলো।

খাওয়া-দাওয়া শেষ, এবার বিদায়ের পালা। মুসাফির চলে যাবার সময় পথিক দু’জনকে আটটি দিরহাম বখশিস দিল। বলল, ভাই, আমি শুধু তোমাদেরটাই খেলাম। তোমাদের কিছুই খাওয়াতে পারলাম না। এই নাও আটটি দিরহাম। তোমরা দু’জনে ভাগাভাগি করে নাও।

মুসাফির চলে গেল। কিন্তু সমস্যা বাঁধল দিরহাম ভাগ করা নিয়ে। যার পাঁচটি রুটি সে বলল, আমার পাঁচটি রুটি ছিল। সুতরাং আমি পাবো পাঁচ দিরহাম। আর তোমার তিনটি রুটির জন্য পাবে তিন দিরহাম। কিন্তু তিন রুটিওয়ালা এ হিসাব মানতে রাজি হলো না। সে বলল, না, আমি তোমার হিসাবে রাজি নই। আমরা দু’জন খেয়েছি সমান সমান। সুতরাং তুমি পাবে চার দিরহাম।

প্রথমজন বলল, তা কি করে হয়? তুমি তিন রুটির জন্য চার দিরহাম পাবে। আর আমি পাঁচ রুটির জন্য চার দিরহাম পাব? এটা কি কোনো আইনের কথা হলো?

এ নিয়ে দু’জনের মধ্যে বেঁধে গেল তর্ক। কারো কথায় কেউ রাজি নয়। কিছুতেই তারা মীমাংসায় আসতে পারছে না। অবশেষে একজন বলল, শোনো এভাবে বিবাদ করে তো কোনো লাভ নেই। চলো, আমরা আমিরুল মোমেনীন হযরত আলী (আ.)-এর কাছে যাই। তিনি যে বিচার করেন, তাই আমরা মেনে নেব।

এরপর দু'জন মিলে গেল হযরত আলীর কাছে। তারা সব কথা খুলে বলে ন্যায় বিচারের জন্য ফরিয়াদ জানাল। হযরত আলী মনোযোগ দিয়ে তাদের কথা শুনলেন। কিছুক্ষণ তিনি মনে মনে কি যেন ভাবলেন। এরপর বললেন, তিনজনে সমান খেয়েছো তো?

উভয়ে ঘাড় নেড়ে বলল, হ্যাঁ।

হযরত আলী বললেন, তাহলে এ নিয়ে এত বিবাদ কিসের? হিসাব তো একেবারে পানির মতো সোজা। যার পাঁচটি রুটি সে পাবে সাত দিরহাম। যার তিনটি রুটি সে পাবে এক দিরহাম।

এমন হিসাবের কথা শুনে দুজনেই অবাক হয়ে গেল! সাত দিরহাম আর এক দিরহাম ভাগ হলো কোন্‌ হিসাবে তারা কিছুতেই বুঝতে পারল না। হিসাব বুঝতে না পেরে দু’জনই হা করে তাকিয়ে রইল হযরত আলীর দিকে।

ইমাম আলী মুসাফিরদের মনের কথা বুঝতে পেরে বললেন, তোমরা ছিলে তিনজন। রুটি আটটি। খেয়েছ সমান সমান। একেকটি রুটিকে তিন টুকরো করলে আটটি রুটি চব্বিশ টুকরো হয়। সুতরাং তোমরা একেক জন খেয়েছ আটটি করে টুকরা। মুসাফির লোকটা আট টুকরোর জন্য আট দিরহাম দিয়েছে।

হযরত আলী বললেন, এবার আসা যাক, কে কতটুকু পাবে সে হিসাবে। দ্বিতীয় জনের তিনটি রুটিতে নয় টুকরো হয়েছে। নয় টুকরোর আট টুকরো সে নিজে খেয়েছে। মাত্র এক টুকরো পড়েছে মুসাফিরের ভাগে। সুতরাং সে এক দিরহামের বেশি কিছুতেই পেতে পারে না। আর একজনের পাঁচ রুটিতে হয়েছে পনেরোটি টুকরো। তার মধ্যে সে নিজে খেয়েছে আট টুকরো। বাকি সাত টুকরো খেয়েছে মুসাফির। সুতরাং সে পাবে সাত দিরহাম।

হযরত আলীর হিসাবের কথা শুনে পথিক দু’জন বিস্মিত হলো। তাঁর বিচার বুদ্ধির পরিচয় পেয়ে দারুণভাবে মুগ্ধ হলো। তারা আর কোনো ওজর আপত্তি না করে নীরবে মেনে নিল বিচারের রায়।

বন্ধুরা, অনুষ্ঠানের এ পর্যায়ের রয়েছে ইমাম আলীকে নিয়ে ইরানি শিশুদের কণ্ঠে একটি ফার্সি গান। এ গানে বলা হয়েছে-  

সব আকাশ ও জমিনে ঝরছে তারার বৃষ্টি

কাবা ঘরও অপেক্ষায় কখন আসবেন সেই বন্ধু- খোদার অপূর্ব-সৃষ্টি!

কেবল মানুষেরাই নয় মহান আল্লাহও যেন মেলেছেন দৃষ্টি-

কখন আসবেন আলী হায়দার

তালি-দেয়া জামা পরা সেই মানুষটি!

বাহঃ গানের কথাগুলো সত্যিই চমৎকার। তো বন্ধুরা, এবার আমরা হযরত আলীর বিচক্ষণতা ও ন্যায় বিচার সম্পর্কে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা শোনাব।

হযরত আলীর বিচক্ষণতা ও ন্যায় বিচার

আল কাফি গ্রন্থে হযরত ইমাম সাদেক (আ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত আলী (আ.)-এর খেলাফতকালে এক ব্যক্তি জাবাল থেকে আল্লাহর ঘর জিয়ারাতের উদ্দেশে তার গোলামকে সঙ্গে নিয়ে রওনা দিলেন পথিমধ্যে গোলামটি ভুল করায় মালিক তাকে মারধর করলেন। মার খেয়ে গোলামটি ক্ষেপে গেল এবং মালিককে বলল, আমি তোমার গোলাম নই বরং তুমি আমার গোলাম।

তর্কাতর্কি এমন পর্যায়ে পৌঁছাল যে তারা পরস্পরকে হুমকি পর্যন্ত দিলএভাবে তারা কুফায় পৌঁছার পর সুষ্ঠু বিচারের আশায় হযরত আলী (আ.) এর কাছে গেলহযরত আলী তখন মুসলিম জাহানের খলিফা। মালিকটি  হযরত আলীকে বললেন: হে আমীরুল মুমেনিন! এই গোলামটি আমার, সে অন্যায় করায় আমি তাকে শাস্তি দিয়েছি। এখন সে বলে আমি নাকি তার মালিক না, সে-ই আমার মালিক।

মালিকের অভিযোগ শুনে গোলাম কসম খেয়ে বলল: বিশ্বাস করুন- সে আমার গোলাম, আমার বাবা হজ সম্পর্কে জ্ঞান দেয়ার জন্য তার সাথে আমাকে পাঠিয়েছেন, এখন সে অন্যায়ভাবে বলছে আমি নাকি তার গোলাম। তার উদ্দেশ্য হলো আমার ধন-সম্পদ আত্মসাৎ করা।

মালিকও কসম খেয়ে বলল, সে যা বলছে মিথ্যা বলছে, সে-ই আমার গোলাম।

হযরত আমীরুল মুমেনিন তাদেরকে বললেন, এখন তোমরা যাও। আগামীকাল এসো বিচার করে দেবোতবে, শর্ত হচ্ছে তোমরা সত্য কথা বলবে।

লোকজন বলাবলি করছিল বিষয়টা বেশ জটিল এ রকম সমস্যা কখনো দেখিনি দেখা যাক হযরত আলী কেমন করে সমাধান করেন।

ওই দুই ব্যক্তি চলে যাওয়ার পর হযরত আলী (আ.) তার গোলাম কাম্বারকে নির্দেশ দিলেন নিকটবর্তী একটি দেয়ালের গায়ে মাথা পরিমাণ মাপের দুটি ছিদ্র করতে। সকাল হলে হযরত আলী কাম্বারকে বললেন, আমার তরবারিটা তোল- যখন বলব গোলামের মাথাটা কেটে ফেল মারার জন্য উদ্যত হবে  কিন্তু  মারবে না; শুধু ভয় দেখাবে।

অদ্ভুত এ ঘটনার বিচার দেখার জন্য লোকজনও ধীরে ধীরে খলিফার দরবারে জড়ো হতে লাগলএরপর ওই দুই ব্যক্তি উপস্থিত হলে আলী (আ.) তাদের সাথে কথা বলে বুঝতে পারলেন তারা দুজনই নিজ নিজ কথার উপর অটল রয়েছেতাই তিনি বললেন, আমি দেখতে পাচ্ছি তোমরা দুজনই মিথ্যা বলছোঅতএব তোমরা দুজনই দেওয়ালের ওই ছিদ্রের মধ্যে মাথা ঢুকাও।

উভয়েই যখন তাদের মাথা দেয়ালের ছিদ্রে ঢুকিয়ে দিল তখন হযরত আলী (আ.) কাম্বারকে নির্দেশ দিলেন:  কাম্বার! গোলামের মাথাটা কেটে দুভাগ করে দাও।

একথা শোনার সাথে সাথেই আসল গোলাম ভয় পেয়ে দ্রুত তার মাথাটি ছিদ্র থেকে বের করে নিলএসময় হযরত আলী (আ.) গোলামকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি বলোনি যে, তুমি গোলাম নও?

গোলাম আমতা আমতা করে বলল : জ্বি, হে আমিরুল মুমেনিন, বলেছিলাম। আসলে মালিক আমাকে প্রচুর প্রহার করেছিল, তাই আমি রাগে-ক্ষোভে তাকে মালিক হিসেবে অস্বীকার করেছিলাম

এরপর হযরত আলী (আ.) গোলামকে মালিকের হাতে তুলে দিতে নির্দেশ দিলেন। এমন বিচার দেখে দরবারের সবাই বিস্মিত হয়ে গেল।#

পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/২৬

ট্যাগ

২০১৮-০৭-২৭ ১৫:৩৫ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য