বিশিষ্ট ইরানি কবি, গবেষক, পর্যটক ও দার্শনিক নাসের খসরু কাব’দিয়’নির গদ ও পদ্য সাহিত্যসহ তার লেখনীর নানা দিক নিয়ে গত কয়েক পর্বে আলোচনা করা হয়েছে। ইসমাইলি মতবাদে বিশ্বাসী দার্শনিক ও কবি নাসের খসরু দরবারি কবি না হয়েও শক্তিশালী কাব্য-প্রতিভার স্বাক্ষর তুলে ধরেছেন তার পদ্য-সাহিত্যে। দর্শনকে কাব্য সাহিত্যে চমৎকার শৈল্পিক আঙ্গিকে তুলে ধরেছেন বলেই নাসের খসরুর কাব্য ও কবিতা ফার্সি সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ।

তিনি কবিতার মধ্যে খোদা-পরিচিতি ও ধার্মিকতার প্রকাশ ঘটাতে অসম্ভব দৃঢ়চেতা ছিলেন। তাই তার কাব্য ও কবিতায় দেখা যায় স্পষ্ট-ভাষণ, দৃঢ়তা, আন্তরিকতা ও গভীর আত্মবিশ্বাস।  কবিতা মানুষের মনের ভাব ও বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে। নাসের খসরুর কবিতায় একদিকে যেমন রয়েছে গভীর আত্ম-বিশ্বাস ও আত্ম-সম্মানবোধ তেমনি রয়েছে আনন্দ, সন্তুষ্টি ও বিনয়। জীবনে নানা ধরনের কঠোর প্রতিকূলতার মধ্যে ধৈর্য ধরে নিজ আদর্শের পথে অবিচল অগ্রযাত্রা বজায় রেখেছেন এই দার্শনিক কবি। তিনি চেয়েছিলেন সমাজকে পবিত্র করতে এবং সমাজকে সব ধরনের অনৈতিকতা, দুর্নীতি ও কপটতা থেকে মুক্ত করা ছিল তার স্বপ্ন। কেবল ধর্ম ও প্রজ্ঞার ছায়াতলেই এ ধরনের সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব বলে নাসের খসরু মনে করতেন।

নাসের খসরু কবিতায় কুরআনের আয়াত-নির্ভর যুক্তি তুলে ধরতেন। তার বক্তব্য প্রকাশের ধারা ছিল খাঁটি খোরাসানি ধারা।  বিখ্যাত এই ধারাতেই কবিতা লিখেছেন কবি রুদাকি, ফেরদৌসি, আনসারি ও আরও কেউ কেউ। তবে পার্থক্য হল নাসের খসরুর বক্তব্য ছিল প্রচলিত ধারার বাইরের ও সমসাময়িক রুচি বা স্বাদের চেয়ে ভিন্ন ধরনের। এর কারণ তিনি তার কবিতাকে করেছিলেন ধর্মীয় মতবাদ ও দর্শন প্রচারের মাধ্যম। তার কবিতায় উপদেশ ও সতর্কবাণীর বৈশিষ্ট্য ছিল লক্ষণীয়। নাসের খসরু তার কবিতায় ‘বসন্ত’ ও ‘নীল আকাশ’-এর মত প্রকৃতির নানা উপমা ব্যবহার করলেও সেসবের উদ্দেশ্য ছিল মূলত উপদেশ দেয়া এবং জ্ঞান ও প্রজ্ঞার প্রশংসা তুলে ধরার মত ভিন্ন কোনো লক্ষ্যে পৌঁছা।

নাসের খসরু ছিলেন একজন স্বাধীনচেতা ও আদর্শবাদী চিন্তাবিদ। একইসঙ্গে তার মধ্যে ছিল কল্পনা-শক্তি ও কাব্যিক প্রেরণা। তার কবিতার বিষয় সাধারণত কারো প্রশংসা নয়। কিন্তু কখনও কখনও তিনি ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের প্রশংসা করেছেন। কারণ, তার দৃষ্টিতে তাঁরা হচ্ছেন মহান আল্লাহর মনোনীত ব্যক্তিত্ব। নাসের খসরুর কবিতার সুর পৌরুষত্ব, গাম্ভীর্য , বিনয় ও  গৌরবোজ্জ্বলতায় ভাস্বর।

নাসের খসরু নানা ধরনের কবিতার জন্য নানা ধরনের সুর বা স্টাইল ব্যবহার করেছেন। এক্ষেত্রে তিনি ছিলেন বেশ বাছ-বিচার-প্রবণ। অসাধারণ কাসিদার জন্য কখনও প্রকৃতির মনোহর বর্ণনার চিত্রকল্প ব্যবহার করেছেন সূচনায়, আর শেষ করেছেন উপদেশ বা ধর্মীয় কিংবা দার্শনিক বক্তব্য দিয়ে। ফলে তার কবিতার সুর হয়েছে খুবই হৃদয়-স্পর্শী এবং ঊর্ধ্ব-জাগতিক।

নাসের খসরুর কবিতার শব্দগুলো খুবই বিশুদ্ধ, সাবলীল এবং তার কবিতার ভাষা খাঁটি দারি ফার্সিতে ভরপুর। নানা ধরনের যৌগিক শব্দ ব্যবহারে তার দক্ষতাও ছিল বিস্ময়কর। তার কবিতাগুলোয় দেখা যায় গভীর জ্ঞান ও অর্থবোধক সুশৃঙ্খল চিন্তার প্রকাশ। যথাযথ ও সমৃদ্ধ শব্দ ব্যবহারে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। কৃত্রিম বর্ণনার ভঙ্গি ও বাগধারা এবং শব্দমালার রোগাক্রান্ত গাঁথুনি দেখা যায়নি তার ভাষায়।  আর এইসব বিষয়ই ফার্সি পদ্য সাহিত্যে নাসের খসরুকে দিয়েছে এক বিশিষ্ট অবস্থান।

নাসের খসরুর কবিতা প্রজ্ঞা ও জ্ঞানের জয়গানে সমৃদ্ধ হলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্ব-বিরোধী বক্তব্য থেকেও মুক্ত নয়। ফাতেমিয় সুলতানদের প্রশংসার ক্ষেত্রে তার বক্তব্য যেন অন্ধ-ভক্তের বক্তব্য। অথচ তিনি নিজেই অন্ধ-ভক্তি থেকে দূরে থাকতে অন্যদের উপদেশ দিয়েছেন। এটা তার সরলতা থেকেই উদ্ভূত হয়েছে।

নাসের খসরুর কবিতায় মাত্রারিক্ত দৈর্ঘ্য ও পুনরাবৃত্তির দোষও দেখা যায়। একই বক্তব্য পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে তিনি তার ঈপ্সিত বার্তা পাঠকের হৃদয়ে বদ্ধমূল করতে চেয়েছেন। আর তার কবিতাগুলো বেশি লম্বা হয়েছে নানা যুক্তি ও ব্যাখ্যা তুলে ধরার কারণে।

যাই হোক গবেষক ও সমালোচকদের মতে নাসের খসরুর কবিতায় দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া নেই অতিরঞ্জন ও কৃত্রিম প্রশংসা। যে কোনো দার্শনিক বিতর্ক, ধর্মীয় উপদেশ ও সমালোচনাসহ নানা বিষয়ের অবতারণা করতে গিয়ে তিনি সেইসব বিষয়ের আসল রূপটাই তুলে ধরেছেন তার বর্ণনায়। স্বপ্নিল কাব্যিকতা ও রোমান্টিকতা তিনি পরিহার করেছেন তার কবিতার বিষয়বস্তু ধর্ম এবং দর্শন হওয়ার কারণেই। ইসমাইলি মতাদর্শে দীক্ষিত নাসের খসরু ছিলেন খোরাসান অঞ্চলের জন্য এই মাজহাবের প্রধান মুরশিদ বা ধর্মগুরু। কবিতায় শরাব ও মাশুক বা প্রেমাস্পদের মত উপমাগুলোও তিনি ব্যবহার করতেন না। এমনকি হাস্য-রসকেও অশালীন মনে করতেন নাসের খসরু। এভাবে ফার্সি পদ্য সাহিত্যে তিনি সৃষ্টি করেছেন এক নিজস্ব ধারা।

সাহিত্য গবেষকরা মনে করেন নাসের খসরু তার কবিতায় প্রশংসার আবেগ-অনুভূতি পরিহার করায় তার কবিতাগুলো হয়েছে উচ্চ মানের। খসরু গুণগানকে ঘৃণা করতেন এবং তিনি রাজা-বাদশাহদের প্রতি বীতশ্রদ্ধ ছিলেন। তার কাসিদাগুলোয় রাজা-বাদশাহ ও আমির-ওমরাহ’র তীব্র নিন্দা এবং তাদের প্রতি পরিহাস দেখা যায়। ফার্সি পদ্য সাহিত্যে এক্ষেত্রে তার মত এমন প্রতিবাদী ও বিদ্রোহী আর দেখা যায়নি। তার সমসাময়িক যুগে এ ধরনের বৈশিষ্ট্য খুব কম কবির মধ্যেই দেখা গেছে। তাই এ বিষয়টি নাসের খসরুকে দিয়েছে অনন্য বিপ্লবী কবির মর্যাদা।

নাসের খসরুর কবিতার বেশিরভাগ বিষয়বস্তুই উপদেশ। এসব উপদেশের কোনো কোনোটি প্রগতিশীল বিশ্ব-দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে ইতিবাচক ও কোনো কোনোটি নেতিবাচক। ইতিবাচক এ দিক থেকে যে তিনি জ্ঞান ও বিবেকের জয়গান গেয়েছেন। অন্যদিকে নেতিবাচক এ দিক থেকে যে তিনি দেহ ও বিশ্বজগত সম্পর্কে বৈরাগ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতেন। নাসের খসরু জ্ঞান ও বিবেককে পার্থিব জগতে দেহ ও আত্মাকে সুশোভন করার কাজে লাগাতে চাননি। তিনি এ দুই বিষয়কে কেবল পরকালীন মুক্তির পাথেয় বলে মনে করতেন।#

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/২৭

২০১৮-০৭-২৭ ১৯:০৩ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য