ইসলামে কর্মকে ইবাদাতের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। তবে কাজের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ যে দিকটি রয়েছে তা হলো এমন কাজ করতে হবে যার মাধ্যমে অর্জিত আয় হবে পবিত্র ও হালাল। আর এই হালাল রুজির সন্ধান করাটাই ইবাদাতের সমতুল্য।

যাই হোক আজকের আসরে আমরা অন্য একটি বিষয় নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করবো। বিষয়টি হলো আত্মকেন্দ্রিক মনোভাব পরিহার করে অন্যদের সঙ্গে পরামর্শ ভিত্তিক কাজ করা। জীবনযাপনের গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক এই আত্মকেন্দ্রিকতা থেকে বেরিয়ে আসা। অনেকে হয়তো ভাবতে পারেন যে পরামর্শ না করেও তো উন্নতি অগ্রগতি লাভ করা যায় কিংবা উন্নতির পথে পরামর্শের খুব বেশি গুরুত্ব নেই। আপাত দৃষ্টিতে এটাকে পুরোপুরি অস্বীকার হয়তো করা যাবে না। তবে এও সত্য যে, জীবনযাপনের ক্ষেত্রে পরামর্শভিত্তিক পথ চলার যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে।

এমন কোনো মানুষ কি পৃথিবীতে আছে যে জীবনে কোনো সমস্যার সম্মুখিন হয় নি? মনে হয় না। প্রত্যেকেই সমস্যায় পড়ে এবং সেই সমস্যা কাটিয়ে উঠতে চেষ্টাও করে। কিন্তু আমাদের একটা অভ্যাস বা প্রবণতা হলো সমস্যা সমাধানের জন্য আমরা সময় দিতে চাই না। তাই সমাধানের বহু পথ ও উপায় থাকা সত্ত্বেও সেগুলো আমাদের চোখে পড়ে না। দ্রুত সমাধানের পথে অগ্রসর হই আমরা। অথচ তাড়াহুড়া করে নেয়া কোনো সিদ্ধান্ত বা চিন্তা সমস্যা সমাধানে খুব বেশি সাহায্য করে না। কারণটা হলো দ্রুততার সঙ্গে গৃহীত সিদ্ধান্তে সমস্যার গভীরে দৃষ্টি দেয়ার সুযোগ থাকে না। তাই সমাধানটাও সুদূরপ্রসারী হয় না। আমরা সমস্যার গভীরে দৃষ্টি দেয়ার উপায় এবং তা নিরসনের উপায় নিয়ে এমন কিছু আলোচনা করার চেষ্টা করবো যাতে অন্তত কম নেতিবাচকতা এবং বেশি ইতিবাচকতা প্রত্যাশা করা যায়।

জীবনযাপনের গুরুত্বপূর্ণ একটা দিক হলো আত্মম্ভরিতা কিংবা আত্মকেন্দ্রিকতা পরিহার করে অন্যদের সঙ্গে পরামর্শ করা। আজকের পৃথিবীতে একাকি বসবাসের সুযোগ নেই। অপরের সঙ্গে মানে অভিন্ন চিন্তার লোকজনের সঙ্গে মিলেমিশে থাকার কোনো বিকল্প নেই। চীনা একটি প্রবাদ আছে: 'যদি কোনো কাজ সঠিকভাবে করতে চাও তাহলে অন্তত তিনজন বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তির সঙ্গে পরামর্শ করো'। ফার্সি সাহিত্য ও সংস্কৃতিতেও লক্ষ্য করা যায় একটি প্রবাদ: 'যে বেশি বেশি পরামর্শ করে সে তুলনামূলকভাবে কম ভুল করে'।

পরামর্শ করার ইতিবাচক দিক নিয়ে কথা বলছিলাম আমরা। বলা হয়ে থাকে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় মহাকাশ সংস্থা 'নাসা' যখন মহাকাশে মানুষ পাঠানোর পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিল তখন ছোট্ট একটা সমস্যায় পড়েছিল। তারা বুঝতে পেরেছিল যে বলপয়েন্ট কলম অভিকর্ষ ছাড়া কাজ করবে না। সুতরাং ওই কলম দিয়ে কাগজে লেখা যাবে না। বিষয়টা একটু খুলে বলি। মাধ্যাকর্ষণ শক্তির বলে ওজন আছে-এরকম জিনিস পৃথিবীর বুকে নীচের দিকে নেমে আসে। কিন্তু মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ভেদ করে যখন উপরের দিকে যাবে মহাকাশ যান তখন তো কলমের কালি আর নীচের দিকে নামবে না, উপরের দিকে যাবে। সেরকম অবস্থায় কাগজে ওই বলপয়েন্ট কলম দিয়ে লেখা সম্ভব হবে না। এই সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে নাসা অ্যাণ্ডারসন কনসালটেন্সি ফার্মকে বেছে নেয় পরামর্শ করার জন্য।

প্রায় এক দশক ধরে গবেষণা চলে। বারো মিলিয়ন ডলার খরচ হয়। শেষ পর্যন্ত তারা এমন একটি কলম তৈরি করে যেটা যে কোনো পৃষ্ঠে,যে কোনো কোণে,শূন্যের নিচে ৩০০ ডিগ্রী সেণ্টিগ্রেড তাপমাত্রা পর্যন্ত কাজ করবে। পানির নীচে এমনকি ক্রিস্টালের ওপরও কাজ করবে। রাশিয়ান বিজ্ঞানীরা এবং তাদের সমমনা অন্যান্য বিজ্ঞানীরা এরচেয়েও সহজ সমাধানের পথ বেছে নিলো। তারা পেন্সিল ব্যবহার করলো। কিন্তু পেন্সিলের নিব গ্রাফাইট দিয়ে তৈরি,যেটা তাপ ও বিদ্যুতের অত্যন্ত ভালো মানের পরিবাহক। ওই নিব ভেঙ্গে বাতাসের ভেন্টিলেশন সিস্টেমে বা ইলেকট্রিক্যাল যন্ত্রপাতির মধ্যে ঢুকে যেতে পারে। তখন শর্ট সার্কিট হতে পারে,ক্যাপসুলের বিশুদ্ধ অক্সিজেনযুক্ত পরিবেশে আগুন ধরে যেতে পারে। হয়েছেও তাই। অ্যাপোলো-১ এর সকল মহাকাশচারী আগুনে পুড়ে মারা যাওয়ার পর রাশিয়ানরাও পেন্সিল বাদ দিয়ে ওই বিশেষ কলম ব্যবহার করতে শুরু করলো।                        

এইমাত্র যে উদাহরণটি আমরা দিলাম তা প্রমাণ করছে যে সকল মানুষ অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে চিন্তাভাবনা করে, প্রতিক্রিয়া দেখায় এবং সমস্যা কাটিয়ে ওঠার পথ খুঁজে বেড়ায়। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা হলো ওই প্রতিক্রিয়া যথার্থ এবং বিবেক-বুদ্ধিসম্পন্ন হওয়া উচিত। এই গল্পটা সমস্যা সমাধানের দুটি পন্থা বা উপায়ের মধ্যে তুলনা দেওয়ার একটা মানদণ্ড মাত্র। সমস্যার ওপর ফোকাস করা আর সমাধানের উপায় শনাক্ত করা-দুটি আলাদা আলাদা বিষয়। এ কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় জীবন সমস্যার সম্মুখিন হলে সবাই সমস্যার ওপরই গুরুত্ব দেয়। ফলে সমস্যার সঠিক সমাধানের উপায় নিয়ে ভাবে না। তাড়াহুড়া করে সাময়িক একটা সমাধান খোঁজে, সুদূরপ্রসারী ও স্থায়ী সমাধান নিয়ে ভাবতে উদাসীনতা দেখায়। এসব ক্ষেত্রে বরং বিভিন্ন রকমের চিন্তা বা পরামর্শের কারণে তুলনামূলকভাবে ভালো সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। সুতরাং সমস্যা সমাধানের শক্তি এবং সাফল্যে পৌঁছার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

পরামর্শ করার ফলে অভিজ্ঞ ও চিন্তাশীলদের চিন্তাকে কাজে লাগানোর একটা সুযোগ সৃষ্টি হয়। আর অভিজ্ঞদের চিন্তার প্রভাবে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তাও গভীর হয়, সমৃদ্ধ হয়। #

 

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো:আবুসাঈদ/  ২৮

২০১৮-০৭-২৮ ১৯:৩২ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য