সুরা হাশরের কয়েকটি আয়াতের ব্যাখ্যা। গত পর্বের আলোচনায় আমরা চুক্তি লঙ্ঘনকারী মদিনার ইহুদিদের সঙ্গে মুসলমানদের সংঘাতের কাহিনী শুনেছি।

আজ আমরা প্রথমেই ইহুদিদের সঙ্গে মদিনার মুনাফিক গোষ্ঠীর সহযোগিতা নিয়ে কথা বলব। বিশ্বনবী (সা.)'র প্রতিষ্ঠিত ইসলামী সমাজের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তি লঙ্ঘনে ইহুদিদের প্রভাবিত করার ব্যাপারে মুনাফিকদের ভূমিকা সম্পর্কে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে সুরা হাশরের ১১ নম্বর আয়াতের পর থেকে। মুনাফিকরা ইহুদিদের এ বার্তা পাঠায় যে আমরা মুসলমানদের মুকাবেলায় তোমাদের সঙ্গে রয়েছি এবং এ বিষয়ে তোমাদের সহায়তা দেব।  কিন্তু মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে মুনাফিকদের মিথ্যাবাদী বলে অভিহিত করেছেন। কারণ তারা যুদ্ধে অংশ নিতে ও ইহুদিদেরকে সহায়তা দিতে প্রস্তুত নয়। এমনকি তারা যদি প্রথম দিকে যুদ্ধে অংশও নেয় সেক্ষেত্রে তারা সামান্য প্রতিরোধের মুখেই যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে যাবে। আল্লাহর প্রতি মুনাফিকদের ঈমান না থাকায় তারা আল্লাহর শক্তি সম্পর্কে অজ্ঞ। আর তাই তারা মুসলমানদেরকে আল্লাহর চেয়েও বেশি ভয় পায়।

সুরা হাশরের ১৪ নম্বর আয়াতে মুনাফিকদের কোনো কোনো বৈশিষ্ট তুলে ধরা হয়েছে। ভীরুতা এদের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। তাই যুদ্ধ লাগলে এরা থাকবে নিরাপদ এলাকায় এবং দেয়ালগুলোর আড়ালে থেকে তারা যুদ্ধ করবে। মুনাফিকদেরকে বাহির থেকে দেখতে ঐক্যবদ্ধ মনে হলেও আসলে তাদের  ভেতরে রয়েছে ব্যাপক মতভেদ ও দ্বন্দ্ব।

অন্য কথায় এ আয়াতে মুসলমানদেরকে সতর্ক করে দিয়ে বলা হচ্ছে যে কাফির-বেইমানদের বাহ্যিক ঐক্য ও সংহতি দেখে মুসলমানরা যেন প্রতারিত না হয়। কারণ তাদের ওই কৃত্রিম বা বাহ্যিক ঐক্যের পেছনে রয়েছে মুনাফিক গোষ্ঠীর শতধা-বিভক্ত চিন্তা-চেতনা ও মন। মুনাফিকদের প্রত্যেকেই পার্থিব স্বার্থ হাসিলের জন্য সক্রিয় থাকে। অন্যদিকে মুমিনদের ঐক্যের ভিত্তি হচ্ছে ঈমান ও খোদায়ী নানা মূল্যবোধ।

সুরা হাশরের ১৬ নম্বর আয়াতে মুনাফিকদের শয়তানের সমতুল্য বলে উল্লেখ করেছেন মহান আল্লাহ। শয়তান যেমন মানুষকে নানা প্রলোভন দেখিয়ে ও মিথ্যা ওয়াদা দিয়ে মানুষকে ধোঁকা দেয় তেমনি মুনাফিকরাও করছে একই কাজ। মুনাফিকরা শয়তানের মতই মানুষকে নানা ধরনের সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু তারা বিপদের সময় মানুষকে একাকি ফেলে রেখে পালিয়ে যায়।

সুরা হাশরের ১৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ মুনাফিকদের সম্পর্কে বলছেন:  

'তারা শয়তানের মত,যে মানুষকে কাফের হতে বলে। এরপর যখন সে কাফের হয়,তখন শয়তান বলেঃ তোমার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। আমি বিশ্বপালনকর্তা আল্লাহ তা’আলাকে ভয় করি।'

সুরা হাশরের ২১ নম্বর আয়াতে পবিত্র কুরআনের মহত্ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলছেন:

'যদি আমি এই কুরআন পাহাড়ের উপর নাজিল করতাম,তবে তুমি দেখতে যে,পাহাড় বিনীত হয়ে আল্লাহ তা’আলার ভয়ে বিদীর্ণ হয়ে গেছে। আমি এসব দৃষ্টান্ত মানুষের জন্যে বর্ণনা করি, যাতে তারা চিন্তা-ভাবনা করে।'

 

-অর্থাৎ এটা খুবই দুঃখজনক বিষয় যে পাহাড়-পর্বতগুলো এত বিশাল ও উঁচু হওয়া সত্ত্বেও পবিত্র কুরআনের মহত্ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের কাছে নতজানু হয়। অথচ কোনো কোনো মানুষের হৃদয় পাথরের চেয়েও কঠিন হয়ে আছে।

 

মহান আল্লাহর মূল সত্তার বাস্তবতা ও পরিচিতি উপলব্ধি করা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু মহান আল্লাহর অন্য নানা গুণ এবং তার নানা নাম মহান আল্লাহ সম্পর্কে আমাদের কিছুটা ধারণা দেয়। মহান আল্লার সত্তা পবিত্র এবং তুলনাবিহীন। সুরা হাশরের শেষ তিন বাক্যে মহান আল্লাহর কয়েকটি নাম এবং গু তুলে ধরা হয়েছেএ তিন বাক্য মানুষকে নিয়ে যায় মহান আল্লাহর আলোকোজ্জ্বল কয়েকটি নাম  ও গুণের পরিচিতি সম্পর্কিত ভাবনার দিকে। মহান আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে হলে তাঁর এসব সুন্দর নামের অর্থ ও গভীরতা নিয়ে মানুষের উচিত চিন্তা-ভাবনা করা।

 

 সুরা হাশরের ২২ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহর পরিচয় তুলে ধরে বলা হয়েছে:

'তিনিই আল্লাহ তা’আলা, তিনি ছাড়া কোন উপাস্য নেই; তিনি দৃশ্য ও অদৃশ্যকে জানেন তিনি পরম দয়ালু ও অসীম দাতা।'

  • এখানে অন্য যে কোনো বিষয়ের আগে একত্ববাদকে মহান আল্লাহর সৌন্দর্য, মহত্ত্ব ও তাঁর পরিচিতির মূল শেকড় বা ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এরপর দৃশ্য ও অদৃশ্য বিষয়সহ সব কিছুর জ্ঞানই যে মহান আল্লাহর রয়েছে তা উল্লেখ করা হয়েছে। মহান আল্লাহর জ্ঞানের ক্ষেত্রে দৃশ্য ও অদৃশ্যের কোনো প্রশ্ন নেই। তিনি সবই দেখেন ও জানেন। তাই এমন কোনো স্থান নেই যা মহান আল্লাহর জ্ঞানের সীমানার বাইরে থাকতে পারে।

এরপর সুরা হাশরে বলা হয়েছে:

 

তিনিই আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোন উপাস্য নেই। তিনিই একমাত্র মালিক বা অধিপতি, পবিত্র তথা সব ধরনের ত্রুটি থেকে মুক্ত,শান্তি ও নিরাপত্তাদাতা,আশ্রয়দাতা, পরাক্রান্ত তথা সব কিছুর ওপর কর্তৃত্বশীল তথা সব কিছুর সংরক্ষক, অপরাজেয়, প্রতাপান্বিত, মহিমান্বিত । তারা যাকে অংশীদার করে আল্লাহ তা’ আলা তা থেকে পবিত্র।

সুরা হাশরের সর্বশেষ আয়াতে মহান আল্লাহর এ জাতীয় পরিচয় বর্ণনাকে পরিপূর্ণ করে বলা হয়েছে:

তিনিই আল্লাহ তা’আলা, স্রষ্টা, উদ্ভাবক, রূপদাতা, উত্তম নামগুলো তাঁরই। নভোমন্ডলে ও ভূমন্ডলে যা কিছু আছে,সবই তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করে। তিনি পরাক্রান্ত প্রজ্ঞাময়।

 

-হ্যাঁ, মহান আল্লাহ সব সৃষ্টিকে নিখুঁতভাবে সৃষ্টি করেছেন। তাঁর সৃষ্টির কোথাও কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি খুঁজে পাওয়া যাবে না। অথচ এসব সৃষ্টি করার বিষয়ে তিনি অন্য কারো কাছ থেকে শিক্ষা বা অভিজ্ঞতা অর্জন করেননি। মহান আল্লাহই সব কিছুর রূপ বা মডেল ঠিক করেন। #

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/মো: আবু সাঈদ/  ২৯

২০১৮-০৭-২৯ ২০:২৫ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য