কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের আজকের পর্বে সূরা আল আহযাবের ৪৩ থেকে ৪৮ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। এই সূরার ৪৩ ও ৪৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন,

هُوَ الَّذِي يُصَلِّي عَلَيْكُمْ وَمَلَائِكَتُهُ لِيُخْرِجَكُمْ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ وَكَانَ بِالْمُؤْمِنِينَ رَحِيمًا (43) تَحِيَّتُهُمْ يَوْمَ يَلْقَوْنَهُ سَلَامٌ وَأَعَدَّ لَهُمْ أَجْرًا كَرِيمًا (44)

“তিনিই তোমাদের প্রতি রহমত করেন এবং তাঁর ফেরেশতাগণও (রহমতের দোয়া করেন) যাতে তোমাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোয় বের করা যায়। তিনি মুমিনদের প্রতি পরম দয়ালু।” (৩৩:৪৩)    

“যেদিন তারা আল্লাহর সাথে মিলিত হবে; সেদিন তাদের অভিবাদন হবে সালাম। তিনি তাদের জন্যে সম্মানজনক পুরস্কার প্রস্তুত রেখেছেন।” (৩৩:৪৪)

গত আসরে আমরা বলেছি, পবিত্র কুরআন মুমিন ব্যক্তিদেরকে সর্বাবস্থায় আল্লাহর জিকির করার আহ্বান জানায়। আর আজকের প্রথম আয়াতে বলা হচ্ছে, যখনই তোমরা আল্লাহর জিকির বা তাকে স্মরণ করো তখন নিশ্চিত থেকো যে, তিনিও তোমাদের স্মরণ করেন এবং তোমাদের প্রতি রহমত বর্ষণ করতে থাকেন। সূরা বাকারার ১৫২ নম্বর আয়াতে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে, “ফাযকুরুনি আযকুরকুম...” অর্থাৎ “সুতরাং তোমরা আমাকে স্মরণ করো আমিও তোমাদের স্মরণ করব...”

আল্লাহ’র ফেরেশতাগণও যে ঈমানদার ব্যক্তির জন্য রহমত ও ক্ষমা প্রার্থনা করে সে বিষয়ের প্রতি এই আয়াতে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। আর এই রহমত ও ক্ষমা মানুষকে পাপ ও জুলুমের অন্ধকার থেকে পবিত্রতা ও আলোর দিকে নিয়ে যায়। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর স্মরণ যদি অনবরত চলতে থাকে তাহলে বান্দার প্রতি আল্লাহর রহমতও চলতে থাকে অবিরাম এবং এক সময় বান্দা হেদায়েতপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। এই হেদায়েত হচ্ছে এমন নেয়ামত যা মানুষকে জীবনে চলার পথের নানা সংকট থেকে মুক্তি দেয় এবং ভয়ঙ্কর ঝড়-তুফান থেকে তাকে রক্ষা করে। কিয়ামতের ভয়াবহ দিনেও এই ধরনের মানুষ ফেরেশতাদের সাদর সম্ভাষণে ভূষিত হবেন এবং মহাবিপদের মধ্যেও পরম শান্তি ও নিরাপত্তার মধ্যে অবস্থান করবেন।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো-

১. জীবনের অন্ধকার বাঁকগুলো থেকে মুক্তি পেতে মানুষের জ্ঞান ও বিচক্ষণতা যথেষ্ট নয়। এজন্য মানুষ অবশ্যই আল্লাহর সাহায্যের মুখাপেক্ষী। আর আল্লাহর সাহায্য তখনই আসবে যখন মানুষ আল্লাহকে স্মরণ বা তার জিকির ও ইবাদত করবে।

২. আল্লাহর রহমত পাওয়ার পূর্বশর্ত হচ্ছে প্রকৃত ঈমান।

৩. জান্নাতবাসীর একে অপরের প্রতি অভিবাদন হবে সালাম। কাজেই দুনিয়ার জীবনে মুমিন ব্যক্তিদেরকে পরস্পরের সঙ্গে দেখা হলে সম্ভাষণ হিসেবে এই চমৎকার ও অর্থবহ শব্দ অর্থাৎ ‘সালাম’ ব্যবহার করতে বলা হয়েছে।

সূরা আহযাবের ৪৫ ও ৪৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِنَّا أَرْسَلْنَاكَ شَاهِدًا وَمُبَشِّرًا وَنَذِيرًا (45) وَدَاعِيًا إِلَى اللَّهِ بِإِذْنِهِ وَسِرَاجًا مُنِيرًا (46)

“হে নবী! আমি আপনাকে (মানুষের জন্য) সাক্ষী, সুসংবাদ দাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি।” (৩৩:৪৫)

“এবং আল্লাহর আদেশক্রমে তাঁর দিকে আহবায়করূপে এবং উজ্জ্বল প্রদীপরূপে (পাঠিয়েছি)।” (৩৩:৪৬)    

এই দুই আয়াতে বিশ্বনবী (সা.)কে উদ্দেশ করে বলা হচ্ছে, আপনি সাধারণ মানুষের মধ্যে বসবাস করেন বলে আপনাকে সবার জন্য পরিপূর্ণ আদর্শ হিসেবে পাঠানো হয়েছে। তারা আপনার আচার-আচরণ ও কথাবার্তা নিজেদের চোখে দেখছে। আপনার দাওয়াতের কাজ দু’টি ভাগে বিভক্ত- সুসংবাদ দেয়া এবং সতর্ক করা।

যুগে যুগে নবী-রাসূলগণ মানুষকে একথা বলতেই এসেছেন যে, আল্লাহ ছাড়া আর কারো সামনে মাথা নত করা যাবে না। নবীরা কখনো তাদেরকে কুর্নিশ করতে বা তাদের ইবাদত করার আহ্বান জানাননি বরং তারা সব অপশক্তি ও জালেমের দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়ে মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদত করার আহ্বান জানিয়েছেন।

কাজেই মানুষর মধ্যে নবী-রাসূলদের উপস্থিতিকে এমন এক সূর্যের সঙ্গে তুলনা করা যায় যা মানুষকে অজ্ঞতা ও জুলুমের অন্ধকার থেকে মুক্তি দিয়ে আলো ও ন্যায়বিচারের দিকে নিয়ে যায়। এর ফলে জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে মানুষের ঈমান সুদৃঢ় হয় এবং অজ্ঞতা ও কুসংস্কার দূর হয়ে যায়।

এই দুই আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে:

১. নবী-রাসূলগণ শুধু মুখের কথা দিয়ে নয় সেইসঙ্গে কর্মের মাধ্যমে মানুষকে এক আল্লাহর প্রতি দাওয়াত দিয়েছেন। কাজেই তাঁরা হচ্ছেন মানুষের বাস্তব আদর্শ।

২. রাসূলে আকরাম (সা.) আমাদের কাজকর্মের প্রত্যক্ষদর্শী ও সাক্ষ্যদাতা। কাজেই আমাদেরকে প্রতিটি কাজ করার সময় সতর্ক থাকতে হবে।

এবং

৩. মানুষকে আল্লাহর রাস্তায় দাওয়াত দেয়ার ক্ষেত্রে জান্নাতের সুসংবাদ ও জাহান্নামের ব্যাপারে সতর্ক করা জরুরি। কারণ, এর একটি বাদ দিয়ে আরেকটির কথা বললে মানুষের মধ্যে অহংকার কিংবা হতাশা নেমে আসতে পারে।

সূরা আহযাবের ৪৭ ও ৪৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَبَشِّرِ الْمُؤْمِنِينَ بِأَنَّ لَهُمْ مِنَ اللَّهِ فَضْلًا كَبِيرًا (47) وَلَا تُطِعِ الْكَافِرِينَ وَالْمُنَافِقِينَ وَدَعْ أَذَاهُمْ وَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ وَكَفَى بِاللَّهِ وَكِيلًا (48)

“এবং আপনি মুমিনদেরকে সুসংবাদ দিন যে, তাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে বিরাট অনুগ্রহ (ও ক্ষমা) রয়েছে।” (৩৩:৪৭)

“আপনি কাফের ও মুনাফিকদের আনুগত্য করবেন না এবং তাদের উৎপীড়ন উপেক্ষা করুন ও আল্লাহর ওপর ভরসা করুন। কার্যনিবার্হীরূপে আল্লাহই যথেষ্ট।” (৩৩:৪৮)

আগের দুই আয়াতে নবী-রাসূলদের দাওয়াত দেয়ার পদ্ধতি হিসেবে সুসংবাদ দান ও সতর্কীকরণের কথা বলা হয়েছে। এই দুই আয়াতে ওই দু’টি বিষয়ের উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে। সুসংবাদ সেইসব মুমিনের জন্য যারা আল্লাহর প্রতিটি নির্দেশ মনে চলেন এবং নিষিদ্ধ বিষয়গুলো পরিহার করেন। এই ধরনের মানুষ আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ লাভের যোগ্য হয়ে যান এবং তারা তাদের কর্মের চেয়ে অনেক গুণ উত্তম পুরস্কার লাভ করেন।

অন্যদিকে সতর্কবার্তা সেইসব মুনাফিক ও কাফেরের জন্য যারা শুধু নিজেরা কুফরিতে লিপ্ত হয়নি বরং তাদের অনুসারীদেরও কুফরির মধ্যে নিপতিত করেছে।  এ কারণে আল্লাহ তায়ালা রাসূল (সা.)কে উদ্দেশ করে প্রকৃতপক্ষ সব মুমিনের উদ্দেশে বলছেন, কথা ও কাজে কাফেরদের অত্যাচার ও জুলুম সহ্য করুন, কিন্তু কোনো অবস্থাতেই তাদের অনুসরণ করবেন না। তাদের বিরুদ্ধাচরণ করার কারণে আপনাদের যত ক্ষতি ও বিপদই হোক না কেন তার ফয়সালা আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিন। যদি মহান আল্লাহর ওপর পরিপূর্ণ নির্ভর করতে পারেন তাহলে সাহায্যকারী হিসেবে তিনিই আপনাদের জন্য যথেষ্ট হয়ে যাবেন।

এই দুই আয়াতের তিনটি শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে:

১. ইসলামি সমাজের নেতার দায়িত্ব হচ্ছে সমাজের উত্তম ও ঈমানদার মানুষগুলোকে আল্লাহর রহমতের ব্যাপারে আশাবাদী করে তোলা এবং ইসলামের শত্রুদের সঙ্গে আঁতাত করার ব্যাপারে তাদেরকে সতর্ক করা।

২. যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর পরিপূর্ণভাবে নির্ভর করেছে একমাত্র তার পক্ষেই কাফের ও মুনাফিকদের অন্যায় আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধাচরণ করা সম্ভব।

৩. মুনাফিক সাধারণত মুসলিম সমাজে বসবাস করে এবং তাদের সঙ্গে সব কাজে অংশ নেয়। কিন্তু গোপনে তাদের মৈত্রী কাফের ও ইসলামের শত্রুদের সঙ্গে। তাই এই গোষ্ঠীর ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে সব সময় সতর্ক থাকতে হবে। #

ট্যাগ

২০১৮-০৭-৩০ ২১:০৬ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য