বাংলাদেশের বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি থেকে উত্তোলিত কয়লা চুরির ব্যাপারে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে বিচারের আওতায় আনার কথা বললেন বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল বা বাসদ সাধারণ সম্পাদক কমরেড খালেকুজ্জামান। রেডিও তেহরানকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি একথা বলেন।

তিনি আরো বলেন বহুদিন ধরে সেখানে দুর্নীতি, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা চলছে। শুধু কয়লাখনিতে নয় গ্যাসসহ অন্যান্য ক্ষেত্রেও এমনটি চলছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ

  • কয়লা চুরির ঘটনায় জ্বালানী প্রতিমন্ত্রী বিচারের বা মামলার আওতার বাইরে থাকবেন কেন?
  • বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে বহুদিন ধরে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, জবাবদিহিতাহীনতা ও অদক্ষতা চলছে
  • শুধু কয়লা নয়; গ্যাসসহ অন্যান্য বিষয়ের ক্ষেত্রেও এমনই অবস্থা চলছে
  • সিস্টেম লসের যে কথা বলা হচ্ছে তা ধোপে টেকে না কারণ সিস্টেম লস সম্পর্কিত কোনো রেকর্ড তাদের কাছে নেই
  • কয়লা চুরির ঘটনায় এখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত সচিবসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে বিচারের আওতায় আনা প্রয়োজন
  • আনুষ্ঠানিকভাবে যারা সর্বোচ্চ জায়গায় অবস্থান করে তারাই নাটের গুরু হিসেবে অনিয়মগুলো করে থাকে। আর যখন জবাবদিহিতার প্রশ্ন ওঠে তখন তারা এর বাইরে থেকে যায়

রেডিও তেহরান: জনাব খালেকুজ্জামান, সম্প্রতি বাংলাদেশের বড় পুকুরিয়া কয়লা খনি থেকে আনুমানিক আড়াই হাজার কোটি টাকার উত্তোলন করা কয়লা চুরি হয়ে গেছে। ঘটনাটিকে কীভাবে দেখছেন আপনি?

বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি

কমরেড খালেকুজ্জামান: দেখুন, বড়পুকরিয়া খনি থেকে কয়লা তোলার পর যে পরিমাণ কয়লা চুরি গেছে বলে ধরা পড়ল সেই পরিমাণ কয়লা একদিনে, একসপ্তায় সরিয়ে নেয়া সম্ভব না। এই চুরির প্রক্রিয়াটা দীর্ঘদিন ধরে চলেছে। কারণ প্রায় দেড়লাখ টন কয়লা নিতে যে পরিমাণ ট্রাক বা পরিবহনের ব্যবস্থা লাগবে সেটাও অল্প সময়ে কোনোভাবেই নেয়া সম্ভব নয়। ফলে বহুদিন ধরে সেখানে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, জবাবদিহিতাহীনতা ও অদক্ষতা চলে এসেছে। আর এসব বিষয় শুধু কয়লার ক্ষেত্রে নয় অন্যত্রও রয়েছে। তবে বর্তমানে শুধু কয়লার ক্ষেত্রে ধরা পড়েছে বলে বিষয়টি সামনে এসেছে।

দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লা চুরি যাওয়া সম্পর্কে তারা বলছে এটা চুরি যায় নি সিস্টেম লসের কারণে এমনটি হয়েছে। তো যদি সিস্টেম লসের কারণে এমনটি হয়ে থাকে সেক্ষেত্রে রেকর্ড তো থাকার কথা কিন্তু এ সম্পর্কে তাদের কাছে কোনো রেকর্ড নেই। এ সম্পর্কে গত কয়েক বছরের কোনো নথিপত্রও নেই। ফলে কোনো রেকর্ড না রাখার দায়িত্বহীনতার কী জবাব হতে পারে! বিষয়টি ধরা পড়ত না যদি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রটি বন্ধ হওয়ার উপক্রম না হতো। ফলে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অনিয়ম এবং চুরির বিষয়টি এখন এসে ধরা পড়ল।

আবারও আমি বলব কয়লার ক্ষেত্রে অনিয়ম এবং চুরির বিষয়টি ধরা পড়ল বলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে তবে গ্যাসসহ অন্যান্য বিষয়ের ক্ষেত্রেও কিন্তু এমনই অবস্থা চলছে। আর যদি বিষয়টির ভালোভাবে তদন্ত হয় তাহলে দেখা যাবে কেঁচো খুড়তে গিয়ে সাপ বেরিয়ে পড়বে।

রেডিও তেহরান:  আচ্ছা আপনি যে সিস্টেম লসের প্রসঙ্গটি আনলেন, সে প্রসঙ্গে ধরেই জানতে চাইব কয়লা চুরির নাটের গুরু কোম্পানি সচিব আবুল কাশেম প্রধানিয়া বলেছেন, বিশ্বের প্রতিটি কয়লা খনিতে ২ থেকে ৫ শতাংশ সিস্টেম লস থাকে এবং এই সিস্টেম লসের কারণে এমনটি হয়েছে। বাস্তবতা কী?

বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎ প্লান্ট

কমরেড খালেকুজ্জামান: দেখুন, আমি আগের প্রশ্নেও বলেছি আসলে সিস্টেম লসের মধ্য দিয়ে এত বিশাল পরিমাণ কয়লা হাওয়া হয়ে যেতে পারে না। আর সিস্টেম লস নিয়ে প্রতিবছর তাদেরকে একটা হিসাব রাখতে হয় এবং তা দিতে হয়। কী পরিমাণ কয়লা উত্তোলিত হলো খনি থেকে, কী পরিমাণ কয়লা ব্যবহৃত হয়েছে এবং কতটুকু সিস্টেম লস হয়েছে। এসব কিছুর একটা রেকর্ড থাকতে হয় কিন্তু এর কোনো রেকর্ড বা কাগজপত্র তাদের কাছে নেই। ফলে আমি আবারও বলছি এতবিশাল পরিমাণ কয়লা উধাও হতে পারে না এবং একদিন বা একসপ্তায়ও হতে পারে না। আমি বলব লাগাতারভাবে দীর্ঘদিন ধরে সেখানে অনিয়ম চলছে। হয়তো তারা কিছু কয়লা বিক্রি করে দেয়। সেক্ষেত্রে হয়তো কাগজে কলমে ১ টন বিক্রি করে বস্তুত হয়তো দেখা যাবে ৩ টন বিক্রি করল। এসব হয়েছিল বলেই এখন এসে এই বড় চুরির বিষয়টি সামনে এলো।

রেডিও তেহরান:  জনাব খালেকুজ্জামান, আপনি জবাবদিহিতার কথা বললেন, এ প্রসঙ্গে জানতে চাইব বাংলাদেশের গণমাধ্যমে খবর বের হয়েছে যে,  কোম্পানি সচিব আবুল কাশেম প্রধানিয়া ২৫ বছরের বেশি সময় ধরে এ প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেছেন এবং নিজের ইচ্ছা মতো চালিয়েছেন কোম্পানিটি। প্রশ্ন এটা কী দেখার কেউ ছিল না?

কমরেড খালেকুজ্জামান: দেখুন, এই ধরনের কোম্পানি দেখভালের জন্য সচিবদের বসিয়ে দেয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। তারা কারিগরী ব্যাপারে অদক্ষ তারচেয়ে বড় কথা হচ্ছে জবাবদিহিতার উর্ধ্বে থেকে যায়। ফলে এখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত সচিবসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে বিচারের আওতায় আনা প্রয়োজন। কারণটা হচ্ছে আমরা প্রায় সবসময় দেখি আনুষ্ঠানিকভাবে যারা সর্বোচ্চ জায়গায় যারা অবস্থান করে তারাই নাটের গুরু হিসেবে অনিয়মগুলো করে থাকে। আর যখন জবাবদিহিতার প্রশ্ন ওঠে তখন তারা এর বাইরে থেকে যায়।

আমরা দেখেছি ব্যাংক থেকে যখন টাকা উধাও হয়ে গেল তখন ওই ঘটনায় কিছু কর্মকর্তাদের জেলে পাঠানো হলো। অথচ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদসহ অন্যান্যরা দিব্যি নির্বিঘ্নে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের কোনো সমস্যা হচ্ছে না। ঠিক একইভাবে গ্যাস সেক্টর নিয়ে তদন্ত করলে দেখা যাবে মানুষ হয়তো ২০ ইউনিট গ্যাস খরচ করে অথচ তাদের কাছ থেকে হয়তো ৯০ ইউনিটের দাম নেয়া হয়। তাহলে প্রশ্ন আসতে পারে বাকি গ্যাস যায় কোথাঁ ? অবৈধভাবে যারা গ্যাস সংযোগ দেয় সেটাও কিভাবে সম্ভব হয়! 

রেডিও তেহরান: আপনি জবাবদিহিতার কথা বললেন। তো এ প্রসঙ্গে জানতে চাইব কয়লা চুরির ঘটনায় ১৯ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। মামলার ভাগ্য কী হতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ

কমরেড খালেকুজ্জামান: দেখুন, এ মামলায় আসলে কিছুই হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। হয়তো নিচের দিকের চুনোপুটি পর্যায়ে কিছু শাস্তি হতে পারে। জ্বালানী প্রতিমন্ত্রী বিচারের বা মামলার আওতার বাইরে থাকবেন কেন? প্রতিমন্ত্রীর কাজ কী? এ ঘটনা তো একদিনে ঘটেনি। দীর্ঘদিন ধরে এ চুরির কাজ চলছে। ফলে এখানে প্রত্যেকেরই জবাবদিহিতার প্রশ্ন রয়েছে। যিনি এর দায়-দায়িত্বে থাকেন কেন তার নজরে এ বিষয়গুলো থাকল না। এত বিশাল চুরি হয়ে গেল তার কিছুই তিনি টের পেলেন না এর কারণ কী? এখান থেকে সবাই লাভ পেয়েছেন। অনেক বেশি অর্থনৈতিক সুবিধা পেয়েছেন। অথচ আজ যখন কয়লা দুর্নীতির বিষয়টি ধরা পড়ল তখন তারা এর বাইরে থাকবেন এমনটি হতে পারে না।

রেডিও তেহরান: কয়লা উধাওয়ের কারণে বন্ধ হয়ে গেছে বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র। ৫২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উত্তরের আট জেলায় বিদ্যুৎ সংকট দেখা দিয়েছে। লোডশেডিং চলছে। সরকার কীভাবে মোকাবেলা করবে এ সংকট?

কমরেড খালেকুজ্জামান: দেখুন, বিদ্যুৎ নিয়ে সরকারের অনেক বেশি বাগাড়াম্বর সত্ত্বেও গ্রামঞ্চলে এমনিতেই লোড শেডিং চলত। ঢাকা শহরসহ বিভিন্ন জায়গায় যে পরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহ থাকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সেই পরিমাণ সরবরাহ থাকে না। সেখানে প্রায়ই লোডশেডিং দেখা দেয়। তারপরও সেখানে বিদ্যুৎ আছে সেটাই শান্তনা। 

তবে বর্তমান এই ঘটনায় বোঝার ওপর শাকের আটি পড়ল। ওই অঞ্চলের মানুষের দুর্গতির কোনো সীমা থাকবে না। কারণ মানুষ একবার বিদ্যুৎ নির্ভর হয়ে পড়লে এরপর যখন সে বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে তখন সেটা তাদের কাছে নরক যন্ত্রণার মতো হয়ে ওঠে। যারা বিদ্যুতের কোনো ব্যবহার করে না তাদের কাছে বিদ্যুৎ থাকা না থাকা সমান কথা। এতে তাদের কিছু যায় আসে না। কিন্তু এখন গ্রামাঞ্চলে অনেকেই ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করে। তারা টেলিভিশন দেখে। ছাত্র-ছাত্রীরা বিদ্যুতের আলোয় পড়াশুনা করে। কৃষকদের চাষাবাদের সঙ্গেও বিদ্যুৎ জড়িত। ফলে একযোগে গোটা দেশের অর্থনীতি এবং মানুষের জীবনযাত্রাসহ অন্যান্য অনেক কিছুর ওপর তার প্রভাব পড়বে। আর বিষয়টি দু-একমাসের মধ্যে সমাধান হবে সেই উপায়ও নেই। ফলে জনগণ যখন বড় কোনো দুর্ভোগের মধ্যে পড়ে তার আগে থেকেই সরকারের অনেক বেশি সতর্ক থাকা দরকার। যাতে যেকোনো পরিস্থিতিতে-তাদের ভুল, অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি এবং অদক্ষতার জন্য মানুষকে যেন দুর্ভোগের মধ্যে পড়তে না হয়।

এমনিতেই দেশে সামগ্রিকভাবে একটা অরাজকতার লীলাভূমি চলছে। তার ওপর জনগণের ওপর একটা বোঝা চেপে বসল।#

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/৩০

ট্যাগ

২০১৮-০৭-৩০ ২১:২৮ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য