ইরানের জলে-স্থলে, ক্ষেত-খামারে, বাগ-বাগিচায়, কল-কারখানায় উৎপাদিত হয় বিচিত্র সামগ্রী। এর পাশাপাশি খনি থেকে উৎপন্ন বিভিন্ন সামগ্রী এবং ইরানি নরনারীদের মেধা ও মনন খাটিয়ে তৈরি করা হয় বিভিন্ন শিল্পপণ্য।

তো এগুলোর সঙ্গে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য " ইরানি পণ্য সামগ্রী" শীর্ষক সাপ্তাহিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছি আমরা। গত আসরে আমরা ইরানের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পপণ্য "খাদ্য শিল্প" নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করেছি। আজকের আসরে আমরা খনিজ পণ্য নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করবো।  

ইরান বিশ্বের প্রধান পার্বত্য বেল্টগুলোর একটির ওপর অবস্থিত। সুতরাং ভূতাত্ত্বিক গবেষকরা ভৌগোলিক এই অঞ্চলে ব্যাপক গবেষণা চালিয়েছেন এবং তাদের গবেষণায় উঠে এসেছে যে ইরানে মহামূল্যবান খনিজ সম্পদের ব্যাপক মজুদ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের গবেষণা থেকে জানা যায় যে বিশ্বের মোট খনিজ সম্পদের শতকরা সাত ভাগই রয়েছে ইরান ভূখণ্ডে। বিশাল এই খনিজ সম্পদ ইরানের উত্তরাঞ্চলীয় পূর্ব আজারবাইজান থেকে শুরু করে দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলীয় সিস্তান ও বেলুচিস্তান পর্যন্ত সর্বত্র বিরাজ করছে।

 

ইরানে তেল এবং গ্যাসের বিশাল মজুদের পাশাপাশি তামা, লোহা, জিংক, লিড, ক্রোমাইট, কয়লা, ইউরেনিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, টিটানিয়াম, চুন, লবণসহ স্বর্ণ, রৌপ্য, ফিরোজা পাথরসহ বিচিত্রসব মূল্যবান পাথরও রয়েছে। বিভিন্ন পূর্বাভাস এবং গবেষণা অনুযায়ী ইরান লোহা, জিংক, লিড,তামা, স্বর্ণ এবং মার্বেলের উপর অবস্থান করছে। বলা যায় বিশ্বের প্রায় সকল খনিজ পদার্থই ইরানের খনিগুলোতে পাওয়া যায়। ইরানের কেরমান প্রদেশ,ইয়াযদ প্রদেশ,ইস্পাহান,পূর্ব আজারবাইজান,খোরাসানে রাজাভি এবং কেন্দ্রীয় প্রদেশের বিভিন্ন খনিতে এগুলো পাওয়া যায়।

 

 

 

খনি কিংবা খনিজ সম্পদ বিভিন্ন শিল্প কল-কারখানার প্রাথমিক চাহিদাগুলো নিশ্চিত করে। শিল্প কারখানাগুলোকে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার ক্ষেত্রে কিংবা শিল্পের উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য,কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে,জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধিতে এবং মাথাপিছু গড় আয় বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মানব জীবনে মৌলিক পরিবর্তন ও উন্নয়ন অগ্রগতি সৃষ্টির পেছনে খনি বা খনিজ সম্পদ যে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী ভূমিকা রাখে তা কেবল সমকালের জন্যই নয়। যুগে যুগে খনিজ সম্পদ মানুষের জীবনে যে প্রভাবশালী ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে সেই ইতিহাস যুগের নামকরণের মধ্যেও ফুটে ওঠে। যেমন ইতিহাসের বিভিন্ন যুগের নাম রয়েছে তাম্র যুগ, ব্রোঞ্জ যুগ, লৌহ যুগ ইত্যাদি।

 

 

পুরাতত্ত্ব গবেষকগণ খনিজ সম্পদ উত্তোলন করাসহ খনিজ সম্পদ আবিষ্কারের যুগকে সময়ের দিক থেকে প্রাচীন যুগ বলে মনে করেন। কোনো কোনো গবেষকের মতে প্রথমবারের মতো মিশর, ব্যাবিলনের, সিন্ধ্ ও জেইহুনের প্রাথমিক সভ্যতার যুগের মানুষেরা প্রথমবারের মতো ধাতুকে গলানোর কাজে সফল হয়েছিলেন। সিন্ধ্ হলো সিন্ধু এবং জেইহুন হলো অক্সাস যাকে অঙ্কু বা বংফুও বলা হয়। প্রাচীনকালে এটা একটা নদী ছিল-জেইহুন নদী। এই নদীপথেই আর্যরা ইউরোপে গিয়েছিল। বর্তমানে এটি ইরান-আফগানিস্তান সীমান্তে পড়েছে। নদীর অস্তিত্ব যেমন এখন আর নেই, তেমনি নেই এর আগের নামও। এটি এখন হিরমান্দ নামে পরিচিত। হিরমান্দ নদীতে আফগানিস্তান বাঁধ দেওয়ায় ইরানে এ নদীর পানি প্রবাহ মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। দুটি দেশের মধ্যে অভিন্ন এ নদীটির পানি সম্পদের উৎস থেকে ইরান বঞ্চিত হচ্ছে এবং দেশটিতে বিশাল জলাভূমি মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে।

 

যাই হোক খনিজ সম্পদ নিয়ে কথা বলছিলাম। প্রাচীন অনেক যুগের ধ্বংসাবশেষ বিশ্লেষণ করে কোনো কোনো গবেষক মনে করেন ইরানিরাই হলো সর্বপ্রথম কোনো গোত্র বা জাতি যারা খনিজ সম্পদ উত্তোলনসহ ধাতুকে গলানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজটিতে সফল হয়েছিলেন। বিচিত্র ধাতু গলানো প্রাচীন অগ্নিকুণ্ড এবং অগ্নিকুণ্ডের অবশিষ্ট মিশ্রণ ইরানের বিভিন্ন অঞ্চলে যেমন দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত জাগরোস পর্বত, ইরানের উত্তরে অবস্থিত আলবোর্জ পর্বতমালা এবং কাশান, কোম, কেরমান, ইয়াযদের মতো শহরগুলোতে পাওয়া গেছে। একইভাবে বেলুচিস্তান পর্বতমালার পাদদেশে চেহেলকুরে তামার খনি এবং সিস্তান-বেলুচিস্তান প্রদেশে অবস্থিত বিদেস্তারে তাফতন আর খারেস্তানের মধ্যবর্তী উপকণ্ঠে  জিংক ও লিডের খনিতেও ওই ধরনের মিশ্রণ পাওয়া গেছে। এগুলো প্রমাণ করে খনিজ পদার্থ থেকে পাওয়া বিচিত্র ধাতুর মিশ্রণ তৈরিতে প্রাচীন ইরানের পণ্ডিতেরা ব্যাপক দক্ষ ও অভিজ্ঞ ছিল।

 

ইরানের কেরমান প্রদেশের তেলিবলিসে খনিজ পাথরের বিচিত্র নমুনা পাওয়া গেছে। এগুলো ৬ হাজার বছরের পুরোনো বলে মনে করা হচ্ছে। কাশানের সিয়াল্ক নামক এলাকায় আবিষ্কৃত হয়েছে তামা গলিয়ে বানানো বিচিত্র বস্তুর বহু নিদর্শন। এইসব আবিষ্কার প্রমাণ করছে খ্রিষ্টপূর্ব হাজার হাজার বছর আগে থেকেই ইরানিরা তাম্র ধাতুর মতো আরও অনেক ধাতব মিশ্রণের সঙ্গে পরিচিত ছিল। মার্কিন লেখক উইল ডুরান্ট তার সভ্যতার ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থে লিখেছেন, ইরানের সভ্যতার ইতিহাস অনেক প্রাচীন এবং উন্নত ছিল। বলা যায় মিশর সভ্যতার চেয়েও প্রাচীন ও উন্নত ছিল ইরানি সভ্যতা। মার্কিন এই ইতিহাসবিদ ইরানে আর্যদের বিভিন্ন গোত্রে ভ্রমণ করেছেন। এটা খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দের কথা। ইরান ভ্রমণ শেষে তিনি তাঁর বইতে লিখেছেন:

 

ঘুরে বেড়ানো এই ভ্রামণিক জাতি মানে আর্যরা বিচিত্র ধাতুর সঙ্গে পরিচিত ছিল। তবে তারা ইরানে এসে পৌঁছানোর পর বসবাসের চিন্তা করেছে। তারা পাহাড়গুলোকে বেছে নিয়েছে বসবাসের জন্য। এর কারণ হলো ওইসব পাহাড়ে বিচিত্র খনিজ ধাতু ছিল। যেমন সোনা, রৌপ্য, তামা, জিংক, লোহা, মর্মর পাথরসহ আরও বহু মূল্যবান ধাতু।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/ মো:আবু সাঈদ/  ৩১

ট্যাগ

২০১৮-০৭-৩১ ১৭:৪৮ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য