সুরা মুমতাহানা পবিত্র কুরআনের ষাটতম সুরা। মদিনায় নাজিল হয়েছিল ১৩ আয়াতের এ সুরা। মুমতাহানা শব্দের অর্থ পরীক্ষিত।

এ সুরার কয়েকটি আলোচ্য বিষয় হল:  কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই  শত্রুতা ও বন্ধুত্ব করা, মুশরিকদের সঙ্গে বন্ধুত্ব না করা ও হযরত ইব্রাহিম (আ)'র আদর্শ থেকে অনুপ্রেরণা নিতে মুসলমানদের প্রতি আহ্বান। এ ছাড়াও মহান আল্লাহর সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ রাসুল হযরত মুহাম্মাদ (সা), শত্রুতা ও বন্ধুত্বের সীমানা, মুহাজির নারী-সমাজ ও তাদের পরীক্ষা এবং এ সম্পর্কিত বিধান ও নারীদের কাছ থেকে আনুগত্যের শপথ আদায়ের পদ্ধতি সম্পর্কে বক্তব্য রয়েছে সুরা মুমতাহানায়।

সুরা মুমতাহানার প্রথম আয়াতে মহান আল্লাহ বলছেন:

' হে মুমিনরা!,তোমরা আমার ও তোমাদের শত্রুদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করো না। তোমরা তো তাদের প্রতি বন্ধুত্বের বার্তা পাঠাও,অথচ তারা যে সত্য তোমাদের কাছে এসেছে,তা অস্বীকার করছে।'

 

ইসলামের ইতিহাসে এসেছে মক্কার কাফির কুরাইশরা হুদাইবিয়ার সন্ধি লঙ্ঘন করতে থাকায় বিশ্বনবী (সা) আকস্মিক অভিযান চালিয়ে বিনা রক্তপাতে মক্কা বিজয়ের জন্য গোপনে সামরিক প্রস্তুতি নিতে সাহাবিদের নির্দেশ দেন। এ অভিযান বাস্তবায়ন করতে পবিত্র মক্কা অভিমুখী সব সড়কপথ ইসলামী হুকুমতের সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সার্বক্ষণিক নযরে রাখা হয়েছিল এবং শক্তভাবে সব যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছিল। ইসলামী সেনাবাহিনী যাত্রা শুরু করার প্রাক মুহূর্তে হযরত জিবরীল (আ.) এসে মহানবী (সা.)-কে জানালেন, মুসলমানদের কাতারে অন্তর্ভুক্ত এক সরলমনা লোক কুরাইশদের কাছে চিঠি লিখেছে এবং‘ সারাহ্ ’নামের এক মহিলার সাথে চুক্তি করেছে যে,কিছু অর্থ নিয়ে সে তার চিঠিটা কুরাইশদের কাছে পৌঁছে দেবে। আর সে ঐ চিঠিতে মক্কা নগরীর ওপর মুসলমানদের অত্যাসন্ন আক্রমণ চালানোর কথাও ফাঁস করে দিয়েছিল।

 

সারাহ্ ছিল মক্কার গায়িকা। সে কখনো কখনো কুরাইশদের শোকানুষ্ঠানগুলোতে শোকগাঁথাও গাইত। কিন্তু বদর যুদ্ধে কতিপয় কুরাইশ নেতা নিহত হওয়ায় মক্কায় গান-বাজনা ও আমোদ-প্রমোদের আসর বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কুরাইশদের ক্রোধ ও শত্রুতার আগুন এবং বদর যুদ্ধে নিহতদের প্রতিশোধ গ্রহণের অনুভূতি জনগণের মধ্যে জাগিয়ে রাখতে শোক-গাঁথা গাওয়া সর্বতোভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এ কারণেই বদর যুদ্ধের দু’বছর পর সে মদীনায় আসে। মহানবী (সা.) তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন :“ তুমি কি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছ?” সে বলেছিল :“ না।” মহানবী তখন বলেছিলেন :“তা হলে তুমি এখানে কেন এসেছ?” সে উত্তরে বলেছিল :“ কুরাইশ আমার গোত্র ও বংশ। তাদের একদল নিহত হয়েছে এবং আরেকদল মদীনায় হিজরত করেছে। বদর যুদ্ধের পরে আমার পেশার পসার ও চাকচিক্য হারিয়ে গেছে। তাই আমি অভাবগ্রস্ত হয়ে ও প্রয়োজনের তাকীদেই এখানে এসেছি।” মহানবী তাকে পর্যাপ্ত পোশাক-পরিচ্ছদ ও খাদ্য-দ্রব্য দেয়ার জন্য তাৎক্ষণিক নির্দেশ দেন।

 

সারাহ্ মহানবীর কাছ থেকে আনুকূল্য পাওয়া সত্বেও হাতিব ইবনে আবী বালতাআর কাছ থেকে মাত্র দশ দীনার নিয়ে ইসলাম ও মুসলমানদের স্বার্থের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তি শুরু করে। মুসলমানরা গোপনে মক্কা বিজয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে-  এ মর্মে বালতাআরের লেখা একটি চিঠি কুরাইশদের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য প্রস্তুত হয় সারাহ্‌।

 

মহানবী (সা.) তাঁর তিন বীরকে ডেকে নিয়ে তাঁদেরকে এ দায়িত্ব দিলেন যে, তাঁরা মক্কার পথে অগ্রসর হয়ে এ গুপ্তচর নারীকে যেখানে পাবেন, সেখানেই গ্রেফতার করে তার থেকে ঐ চিঠিটা উদ্ধার করবেন। মহানবী (সা.) এ অভিযানের দায়িত্ব হযরত আলী,যুবাইর ও মিকদাদকে প্রদান করেন। তাঁরা ‘ রাওযাতু খাখ্’ নামক স্থানে ঐ নারী গুপ্তচরকে গ্রেফতার করে তাকে তল্লাশি চালান। কিন্তু তাঁরা তার কাছে কিছুই পেলেন না। অন্যদিকে ঐ নারী গুপ্তচরটি হাতিবের কাছ থেকে চিঠি নেয়ার কথা জোরালোভাবে অস্বীকার করে।

তখন হযরত আলী (আ) বললেন :“ মহান আল্লাহর শপথ! মহানবী কখনোই মিথ্যা বলেন না। তুমি চিঠিটা দিয়ে দাও। নইলে আমরা যে কোনভাবেই হোক,তোমার কাছ থেকে চিঠিটা উদ্ধার করব।”

সারাহ্ বুঝতে পারল,আলী এমন সৈনিক যিনি মহানবীর আদেশ বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত ক্ষান্ত হবেন না। এ কারণেই সে হযরত আলীকে বলল : “একটু দূরে যান।” এরপর সে তার চুলের দীর্ঘ বেনীর ভাঁজের ভেতর থেকে চিঠি বের করে হযরত আলীর কাছে হস্তান্তর করে।

 

দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন মুসলমান,যে ইসলাম ধর্ম ও মুসলমানদের বিপদে তাদের সাহায্য করতে দ্রুত ছুটে যেত,সে এ ধরনের দুষ্কর্মে হাত দেয়ায় মহানবী ভীষণ অসন্তুষ্ট ও দুঃখিত হয়েছিলেন। তিনি তৎক্ষণাৎ হাতিবকে ডেকে কুরাইশদেরকে এ ধরনের তথ্য দেয়ার ব্যাপারে ব্যাখ্যা চান। হাতিব মহান আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসূলের নামে শপথ করে বলল :“ আমার ঈমানে সামান্য পরিমাণ দ্বিধা-সংশয় প্রবেশ করেনি। তবে মহানবী অবগত আছেন,আমি মদীনায় একাকী বসবাস করছি এবং আমার সন্তান-সন্ততি ও আত্মীয়-স্বজনরা কুরাইশদের চাপ ও নির্যাতনের মধ্যে মক্কায় জীবন-যাপন করছে। আমার এ সংবাদ দেয়ার উদ্দেশ্য এই ছিল যে,কুরাইশরা কিছুটা হলেও যেন তাদের থেকে চাপ ও নির্যাতনের মাত্রা লাঘব করে।”

 

হাতিবের দুঃখ প্রকাশ ও ক্ষমা প্রার্থনা থেকে বোঝা যায়,মুসলমানদের গোপন বিষয়াদি সংক্রান্ত তথ্য অর্জন করার জন্য কুরাইশ নেতারা মক্কায় মুসলমানদের আত্মীয়-স্বজনদের চাপের মুখে রাখত এবং তাদের ওপর নির্যাতনের মাত্রা লাঘব করার ব্যাপারে শর্তারোপ করে বলত যে,তাদেরকে মদীনার মুসলমানদের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত গোপন তথ্যাবলী সংগ্রহ করে তাদের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। তার দুঃখ প্রকাশ,ক্ষমা প্রার্থনা ও কারণ দর্শানো যথার্থ ও যুক্তিসংগত না হওয়া সত্বেও মহানবী (সা) তার অতীত কর্মকাণ্ড ও অবদানগুলোর মতো কতগুলো কল্যাণের কথা বিবেচনা করে তার অজুহাত গ্রহণ করেন এবং তাকে মুক্ত করে দেন। কিন্তু এ ধরনের কাজের পুনরাবৃত্তি না ঘটানোর জন্য সুরা মুমতাহানার প্রথম আয়াত নাজিল হয়।

এ আয়াতের পরের অংশে মহান আল্লাহ বলছেন:

'তারা রসূলকে ও তোমাদেরকে মক্কা থেকে বহিষ্কার করে এই অপরাধে যে,তোমরা তোমাদের পালনকর্তার প্রতি বিশ্বাস রাখ। যদি তোমরা আমার সন্তুষ্টিলাভের জন্যে এবং আমার পথে জিহাদ করার জন্যে স্বদেশ থেকে বের হয়ে থাক,তবে কেন তাদের কাছে গোপনে বন্ধুত্বের পয়গাম পাঠাচ্ছ? তোমরা যা গোপন কর এবং যা প্রকাশ কর,তা আমি খুব জানি। তোমাদের মধ্যে যে এটা করে,সে অবশ্যই সরলপথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে।#

 

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/মো: আবু সাঈদ/  ৫

২০১৮-০৮-০৫ ১৯:৩৫ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য