ইরানের জলে-স্থলে, ক্ষেত-খামারে, বাগ-বাগিচায়, কল-কারখানায় উৎপাদিত হয় বিচিত্র সামগ্রী। এর পাশাপাশি খনি থেকে উৎপন্ন বিভিন্ন সামগ্রী এবং ইরানি নরনারীদের মেধা ও মনন খাটিয়ে তৈরি করা হয় বিভিন্ন শিল্পপণ্য।

তো এগুলোর সঙ্গে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য " ইরানি পণ্য সামগ্রী" শীর্ষক সাপ্তাহিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছি আমরা। গত আসরে আমরা ইরানের গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পণ্য নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করেছি। আজকের আসরেও তারই ধারাবাহিকতায় কথা বলার চেষ্টা করবো।

গত আসরে আমরা বলেছিলাম যে ইরানি সভ্যতা মিশরিয় সভ্যতার চেয়েও প্রাচীন এবং উন্নত ছিল। মার্কিন ইতিহাসবিদ উইল ডুরান্ট ইরানে আর্যদের বিভিন্ন গোত্রে ভ্রমণ করেছেন। খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দের কথা। সে সময় তিনি ইরান ভ্রমণ করে একটি বই লেখেন। তাঁর ওই বইতে তিনি লিখেছেন: ঘুরে বেড়ানো ভ্রামণিক জাতি মানে আর্যরা বিচিত্র ধাতুর সঙ্গে পরিচিত ছিল। তারা ইরানে এসে পৌঁছানোর পর বসবাসের চিন্তা করেছে এবং পাহাড়গুলোকে বেছে নিয়েছে বসবাসের জন্য। এর কারণ হলো ওইসব পাহাড়ে বিচিত্র খনিজ ধাতু ছিল। যেমন সোনা, রৌপ্য, তামা, জিংক, লোহা, মর্মর পাথরসহ আরও বহু মূল্যবান ধাতু। প্রাচীন অনেক টিলা বা পাহাড়ে গবেষণামূলক খনন কাজ চালিয়ে ইরানিদের প্রাচীন সভ্যতার অনেক নিদর্শন পাওয়া গেছে। এসব নিয়ে কথা বলার মধ্য দিয়ে আজকের আসর শুরু করা যাক।

 

যেসব নিদর্শন পাওয়া গেছে তার মধ্যে কোনো কোনোটি পাওয়া গেছে কাশানের প্রাচীন সিয়াল্ক্ টিলায়, তুরাঙ টিলায় এবং মারলিক টিলায়। এইসব নিদর্শন খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দের শুরুর দিকের বলে সুমেরি, ব্যাবিলন এবং ইলামি শাসনামলের বলে গবেষকগণ মনে করেন। তার মানে সহজেই উপলব্ধি করা যায় যে ইরানি সভ্যতা সেই প্রাচীনকাল থেকেই অনেক উন্নত ছিল। খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দের প্রথমার্ধে যেসব এলাকা শিল্প ও বাণিজ্যের দিক থেকে উন্নত ছিল সেসব এলাকার মধ্যে ঐতিহাসিক শাহদাদ শহরটি অন্যতম। এই শহরটি কেরমান প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত। শহরটিকে ৬ হাজার বছরের পুরনো বলে মনে করা হয়। এই শহরে মৃৎ শিল্প, পাথর কাটা এবং স্টিলের কাজকর্ম পরিচালিত হতো।

 

মজার ব্যাপার হলো কেরমান প্রদেশের এই শাহদাদ এলাকাটি ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত পুরাতাত্ত্বিক গবেষকদের নজরে আসে নি। এর কারণ হলো লুত মরুভূমিতে প্রাচীন সভ্যতার অস্তিত্ব কেউ কল্পনাই করতে পারে নি। ১৯৬৭ সালে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ইন্সটিটিউটের পক্ষ থেকে গবেষকদের একটি টিম লুত মরুভূমি ও তার আশেপাশের এলাকার ভৌগোলিক অবস্থান পর্যালোচনা করতে গিয়ে এই শাহদাদ অঞ্চলে যায়। এই তদন্ত টিম বিভিন্ন রকমের গবেষণা করতে গিয়ে বেশ কিছু মৃৎ পাত্রের সন্ধান পায়। এগুলোর কিছু অংশ মাটির ভেতরে আর কিছু অংশ উপরে মানে মাটি থেকে বাইরে বেরিয়ে ছিল। পরে পুরাতত্ত্ব গবেষকগণ সেগুলো নিয়ে গবেষণা করে নিশ্চিত হন যে এই শাহদাদ এলাকাটি ছিল অরতা প্রদেশের কেন্দ্রীয় শহর। আর অরতা ছিল প্রাচীন ইলাম রাজবংশের  স্বায়ত্তশাসিত একটি প্রদেশ।

প্রাচীন ইলাম রাজবংশের স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশ অরতা নিয়ে কথা বলছিলাম। পুরাতত্ত্ব গবেষকরা খনন কাজ চালিয়ে বেশ কিছু নিদর্শনের সন্ধান পান এখানে। এসবের মধ্যে ছিল মূল্যবান আকিক পাথর, ফিরোজা পাথর এবং নীলা পাথর। গবেষকরা নিশ্চিত হয়েছেন যে এগুলো এই শহরের কারখানাতেই তৈরি করা হয়েছে। সমগ্র বিশ্বের মধ্যে ব্রোঞ্জের তৈরি প্রাচীনতম যে ধাতব পতাকা আবিষ্কৃত হয়েছে সেটি এই এলাকাতেই পাওয়া গেছে। এর নাম হলো "দারাফ্‌শে শাহদাদ"। পতাকাটি এখন ইরানের জাতীয় যাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। একইভাবে এই এলাকায় আবিষ্কৃত হয়েছে বেশ কয়েকটি অগ্নিকুণ্ড যেখানে ধাতু গলানো হত। ধাতু গলানোর কারখানায় ওইসব অগ্নিকুণ্ড তৈরি করা হয়েছে বলে গবেষকদের ধারণা। এ থেকে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন শাহদাদ এলাকাটি ছিল প্রাচীন শিল্প নগরী।

 

এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা যেতে পারে যে ইরানের ভৌগোলিক এই অঞ্চলের বিভিন্ন নাম থেকে বোঝা যায় হাজার হাজার বছর আগে থেকে ইরানিরা খনিজ সম্পদের দিক থেকে সমৃদ্ধ এই এলাকাটি শনাক্ত করতে পেরেছিলেন এবং সেগুলোকে কাজে লাগাতে পেরেছিলেন। ইরানের সেমনান প্রদেশে অবস্থিত দমগন শহরের সোনার পাহাড় কিংবা পশ্চিমাঞ্চলীয় কুর্দিস্তান প্রদেশের মারিভন শহরের অসানাবাদের নামও উল্লেখ করা যায়। এসব অবস্থানে সোনা আবিষ্কারের জন্য গবেষণামূলক খননকাজ এখনও চলছে। অসানাবাদ শব্দটি 'অহানাবাদের' কুর্দি অপভ্রংশ অর্থাৎ এটি আসলে অহানা'বাদ। অহান শব্দের অর্থ হলো লোহা। কুর্দি উচ্চারণে এটি অসানাবাদ হয়ে গেছে। যাই হোক,ওই যে বললাম ইরানিরা সেই প্রাচীনকালেই খনিজ সম্পদ কাজে লাগিয়েছিলেন, সেটা যে কীভাবে কাজে লাগিয়েছিলেন তারা, সে সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায় না।

 

বলছিলাম প্রাচীনকালে খনিজ সম্পদকে কাজে লাগানোর উপায় সম্পর্কে তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। তবে ইরানের প্রাচীন খনিতে যেসব টানেল বা কুপ দেখতে পাওয়া গেছে সেগুলো থেকে বোঝা যায় সেই প্রাচীনকালেও অত্যন্ত নিপুণভাবে এবং সুশৃঙ্খলভাবে বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করেই খনিজ সম্পদ উত্তোলন করা হয়েছিল। ইরানে বৈজ্ঞানিক উপায়ে খনিজ সম্পদ উত্তোলনের কাজ শুরু হয়েছে ১৯৩৯ সাল থেকে। বর্তমানে ইরান হাজার হাজার খনি থেকে অসংখ্য ধরনের খনিজ সম্পদ উত্তোলন করছে। এদিক থেকে ইরান বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ একটি দেশ। ইরানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় কেরমান প্রদেশের খনিজ তামা, কেন্দ্রীয় ইরানের ইয়াজদ প্রদেশে অবস্থিত চদোরমালু আকরিক লোহা পৃথিবীব্যাপী বিখ্যাত। ইরানে তেলের বাইরেও কমপক্ষে ষাট প্রকারের খনিজ সম্পদ রয়েছে যার মূল্য ৭০ হাজার কোটি ডলারের বেশি।

 

তেল সম্পদের বাইরে আরও যেসব খনিজ শিল্প ইরানের অর্থনীতির ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে সেগুলোর মধ্যে স্টিল শিল্প, সিমেন্ট, আকরিক লোহা, তামা, জিংক ইত্যাদির কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। মাটির নীচে লুকিয়ে থাকা ইরানের এইসব মূল্যবান সম্পদ আহরণে পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে যাচ্ছে দেশের সুদক্ষ গবেষকগণ। প্রযুক্তি ও কারিগরি দিক থেকেও অগ্রসর হচ্ছে এইসব প্রকল্প। এই খাতে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতেও রয়েছে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/ মো:আবু সাঈদ/ ০৭

২০১৮-০৮-০৭ ১৮:৪৯ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য