রংধনু আসরের কাছের ও দূরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই জানো যে, গাছ বা বৃক্ষ আমাদের পরম বন্ধু। বৃক্ষ শুধু প্রাকৃতিক শোভা-ই বাড়ায় না, বরং মাটির ক্ষয়রোধ, বন্যা প্রতিরোধ ও ঝড়-তুফানকে বাধা দিয়ে জীব ও সম্পদ রক্ষা করে। আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণেও গাছপালার ভূমিকা অপরিসীম। বৃক্ষ ছাড়া পৃথিবী মরুভূমিতে পরিণত হতো। এছাড়া, বৃক্ষ অক্সিজেন সরবরাহ করে আমাদের বাঁচিয়ে রাখে।

শুধু তাই নয়, গাছের পাতা, ফল ও বীজ আমরা খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করি। গাছ থেকে তন্তু আহরণ করে পোশাক তৈরি করা হয়। বৃক্ষ থেকে প্রাপ্ত কাঠ দিয়ে ঘরবাড়ি ও আসবাব তৈরি করা হয়। লেখার কাগজ ও পেনসিল গাছের কাঠ দিয়েই তৈরি হয়ে থাকে। আমাদের রোগ নিরাময়ের ওষুধও এই বৃক্ষ থেকেই তৈরি করা হয়ে থাকে।

বৃক্ষলতা আল্লাহর সুমহান কুদরতের অপরূপ নিদর্শন। এর মধ্যেই তিনি মানুষ ও অন্য জীবজন্তুর খাবার প্রস্তুত করে রেখেছেন এবং মানুষকে পরিশ্রম করে সেগুলো সংগ্রহ করার নির্দেশ দিয়েছেন। বৃক্ষের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে মহান আল্লাহ সূরা মুমিনুনের ২০ নম্বর আয়াতে বলেছেন,

‘এবং আমি সৃষ্টি করি এক বৃক্ষ যা জন্মায় সিনাই পর্বতে, এতে মানুষের জন্য তেল ও খাদ্য তৈরি হয়।’

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআনে গাছের নামে শপথ করেছেন এবং আত-ত্বীন নামে একটি সূরার নামকরণ করা হয়েছে বৃক্ষের নামে। আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) গাছপালা, বন-জঙ্গল, পশু-পাখী, প্রাণীদের ভালোবাসতেন। তিনি নিজ হাতে অনেক গাছ রোপণ করেছেন। সাহাবায়ে কেরামদেরও গাছ রোপণে উৎসাহ দিয়েছেন।  নবীজী বৃক্ষরোপণকে 'উত্তম সদকা' হিসেবে ঘোষণা করেছেন। পাশাপাশি বিনা কারণে গাছ কাটা ও বন উজাড় করতে বারণ করেছেন।

তো বন্ধুরা, আজকের আসরে আমরা গাছ লাগানোর গুরুত্ব সম্পর্কে একটি গল্প শোনাবে। গল্পটি লিখে পাঠিয়েছেন বাংলাদেশের তরুণ লেখিকা সুমাইয়া বরকতউল্লাহ্। গল্পের পর থাকবে তেহরানপ্রবাসী এক বাংলাদেশি বন্ধুর সাক্ষাৎকার। আমাদের আজকের অনুষ্ঠানটিও তৈরি করেছেন আশরাফুর রহমান। তো প্রথমেই গল্পটি শোনা যাক।

(মৌমাছি ও কাঠুরিয়া)

এক কাঠুরিয়া বনে গেল গাছ কাটতে। কিন্তু সে গাছ না কেটে মন খারাপ করে শুয়ে রইল একটা গাছের ছায়ায়। ওদিক দিয়ে ভনভন করে উড়ে যাচ্ছিল একটা মৌমাছি। কাঠুরিয়াকে মন খারাপ করে শুয়ে থাকতে দেখে কাছে গিয়ে মৌমাছি বলল- এই কাঠুরিয়া, তুমি এভাবে শুয়ে আছো কেন? কী হয়েছে তোমার?

কাঠুরিয়া মোচড় দিয়ে বলে উঠল- ভাই মৌমাছি, আমি খুব গরিব মানুষ। এক খণ্ড জমিও নেই আমার। এই কুঠারটাই আমার সম্বল। এই বন থেকে গাছ কেটে নিয়ে লাকড়ি করি, তারপর এগুলো বাজারে বিক্রি করে সাত মুখের সংসার চালাই। আজও এসেছিলাম গাছ কাটতে। কিন্তু আমি আজ গাছ কাটা শুরু করার আগে বনের গাছের দিকে ভালো করে তাকালাম।

মৌমাছি: কী দেখলে তুমি?

কাঠুরিয়া: দেখলাম, কোনো গাছে ফুল ফুটেছে, কোনোটায় ফল ধরেছে, কোনোটায় পাখিরা বসে মনের সুখে গান করছে। আর ওই গাছটার মোটা ডালাটায় দেখলাম মৌমাছিরা মধুর চাক বেধেছে। ওসব দেখে আমি চিন্তায় পড়ে গেলাম। ভাবছি, কোন্‌ গাছটা কাটব। অনেকক্ষণ ধরে শুয়ে থেকে চিন্তা করছি আমি। কিন্তু কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না। আর গাছ কেটে লাকড়ি না করতে পারলে পরিবারের সবাইকে নিয়ে উপোস থাকতে হবে। কী যে করি!

কাঠুরিয়া

কাঠুরিয়ার কথা শুনে মৌমাছির খুব মায়া হলো। সে কাঠুরিয়াকে বলল:

মৌমাছি: তোমার কষ্টের কথা শুনে আমার খুব খারাপ লাগছে। কিন্তু এই বনে তো নানা প্রজাতির হিংস্র প্রাণি বাস করে। যেকোনো সময় তোমার বিপদ হতে পারে। তোমার ভয় করে না?   

কাঠুরিয়া : ক্ষুধার চেয়ে বড় কষ্ট আর নাই। তাই জীবনের মায়া ছেড়ে দিয়ে এখানে আসি গাছ কাটতে। 

মৌমাছি - আচ্ছা তুমি তো অনেক গাছ কেটেছ, তো লাগিয়েছ কয়টা?

কাঠুরিয়া: অনেক গাছ কেটেছি ঠিকই কিন্তু লাগাইনি একটিও। আর আমার তো জায়গা-জমি নেই, গাছ লাগাব কোথায়?  

মৌমাছি:  নিজের জায়গা নেই বলে গাছ লাগাওনি; তবে গাছ কাটো কার জায়গা থেকে, শুনি?

একথা শুনে কাঠুরিয়া চুপ করে রইল। এবার মৌমাছি খানিকটা ধমকের  সুরে বলল:

মৌমাছি: শোনা কাঠুরিয়া! তুমি আর কক্ষনো গাছ কাটবে না। গাছ কাটলে কত বড় ক্ষতি হয় তা তুমি জানো? দেখ না, বন যে উজাড় হয়ে যাচ্ছে! আমরা চাক বাধবো কোথায়? পশু-পাখিরাইবা কোথায় থাকবে? আর গাছ না থাকলে তোমাদের কী অবস্থা হবে ভেবে দেখেছ কখনো?

কাঠুরিয়া: বারে! আমরা তো আর তোমাদের মতো গাছের ডালে থাকি না। আমাদের আবার কী হবে?

মৌমাছি: কী হবে মানে? মারা যাবে একদম। তুমি কি জানো, গাছ তোমাদের কত বড় বন্ধু? এই গাছই তো জীবন বাঁচিয়ে রাখে।

কাঠুরিয়া: আরে, না না, আমি গরিব বলে এ বনের গাছ আমার জীবন বাঁচায়। গাছ কাটি, লাকড়ি করি। আর লাকড়ি বিক্রি করে জীবন বাঁচাই। কিন্তু সব মানুষ তো আমার মতো গরিব নয় যে, তাদের জীবন বাঁচাবে গাছ। এরা তো গাছের দিকে ফিরেও চায় না। এখন তুমি আমাকে এগুলো কী শোনাচ্ছ, আমার মাথায় তো কিছুই ঢুকছে না। একটু বুঝিয়ে বলো তো শুনি।

মৌমাছি: ঠিকাছে বলছি শোনো। অক্সিজেন নামের এক ধরণের গ্যাস আছে। এই গ্যাস ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে না। শ্বাস নেয়ার সময় প্রতিবারই এই গ্যাস মানুষ গ্রহণ করে। আর এ অক্সিজেন কে দেয় জানো? দেয় এই গাছ। সব গাছ যদি রাগ করে অক্সিজেন দেয়া কিছুক্ষণের জন্য বন্ধ করে দেয় তা হলে ধনী-গরিব বলে কোনো কথা নেই; সবাই মারা পড়বে। এখন বুঝতে পারছ- জীবন বাঁচানোর জন্য গাছের কত প্রয়োজন?

বৃক্ষ অক্সিজেন সরবরাহ করে আমাদের বাঁচিয়ে রাখে

হাত থেকে কুঠারটা ফেলে দিয়ে কাঠুরিয়া রাগ দেখিয়ে বলল,

কাঠুরিয়া: তা বুঝলাম। কিন্তু গাছ না কাটলে আমার এত বড় সংসার চলবে কীভাবে-না খেয়ে?

মৌমাছি: কেউ না খেয়ে মরবে না। এতদিন তো এ বনই তোমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। এর পরেও বাঁচিয়ে রাখবে। সারাজীবন ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্যে তোমাকে একটা ভালো কাজ করতে হবে, কাঠুরিয়া ভাই।

কাঠুরিয়া: কী কাজ করতে হবে আমাকে, ঝটপট বলো।

মৌমাছি: প্রতিদিন তোমাকে দুটি করে গাছের চারা এনে এ বনে লাগিয়ে দিতে হবে।

কাঠুরিয়া: এতে আমার লাভ?

মৌমাছি: শুধু তোমারই না, এতে সবারই লাভ। তুমি বাঁচবে এবং আমরা সবাই বাঁচব। তুমি আমার কথা রাখ, তারপরে দেখা যাবে, কী করা যায়।

বন্ধুরা, এরপর কী হলো জানো? কাঠুরিয়া ঘাড় চুলকাতে চুলকাতে বাড়ি চলে গেল। পরের দিন কাঠুরিয়া মাথায় করে দু’টি কাঠের চারা এনে লাগিয়ে দিল বনে। এতে বনের সবাই খুশি হয়ে গেল। গাছেরা কাঠুরিয়াকে অনেক ধন্যবাদ দিল। এ সময় কোথা থেকে যেন ভন ভন করে চলে এলো মৌমাছি। সে কাঠুরিয়ার হাতে পাতামোড়ানো আধাকেজি পরিমাণ মধু তুলে দিয়ে বলল,

মৌমাছি: এই নাও তোমার পুরস্কার। প্রতিদিন এভাবে তুমি গাছ লাগিয়ে বন বাঁচাবে; আমরা মধু দিয়ে বাঁচাব তোমাকে। আর এ সবুজ বন বাঁচাবে আমাদের সবাইকে। এবার বুঝেছ?

মধু পেয়ে কাঠুরিয়া খুশিতে টগবগ করতে লাগল। এরপর থেকে কাঠুরিয়া প্রতিদিনই কুঠারের পরিবর্তে চারাগাছ নিয়ে আসে বনে আর যাওয়ার সময় নিয়ে যায় মূল্যবান মধু। সে মধু বাজারে বিক্রি করে তার সংসার চালায়। আর বনের গাছপালা, পশু-পাখি ও মৌমাছিদের সাথে বন্ধুত্ব হয়ে গেল কাঠুরিয়ার।

বন্ধুরা, গল্পের মৌমাছি আমাদের শিখিয়ে দিল যে, লাগামহীন বৃক্ষনিধন বন্ধ করা দরকার। পাশাপাশি মাঝেমধ্যে গাছ লাগানোর বিষয়ে আমাদের সচেতন হওয়া উচিত। আর তাহলেই আমাদের বৃক্ষসম্পদ যেমন বৃদ্ধি পাবে এবং তেমনি পরিবেশও হবে সুন্দর ও আকর্ষণীয়।

পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/৮

২০১৮-০৮-০৮ ১৭:৪১ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য