আমাদের সাপ্তাহিক ধারাবাহিক অনুষ্ঠান- ঐশী দিশারীতে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। মানব ইতিহাসে ইসলামের আবির্ভাব ছিল একটি মহা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

বর্তমানে বিশ্বব্যাপী যে সভ্যতা গড়ে উঠেছে তার গোড়াপত্তনে ইসলামের অবদান ছিল অসামান্য। আল্লাহর ইচ্ছা ও বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় মানব সভ্যতা বিনির্মাণে ইসলাম যে অবদান রেখেছে আজকের আসরে সে সম্পর্কে খানিকটা আলোকপাত করার চেষ্টা করব।

প্রখ্যাত ফরাসি ইতিহাসবিদ ‘গুস্তাভ লু বোন’

ইসলামের আবির্ভাবের পর অল্প সময়ের মধ্যে এই মহান ধর্ম আরব উপত্যকা থেকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। মুসলিম সাম্রাজ্যগুলোতে ইসলাম সঙ্গে করে নিয়ে যায় জ্ঞানের আলো। স্পেন থেকে শুরু করে ইতালি, জার্মানি ও ইংল্যান্ডসহ ইউরোপের অন্যান্য এলাকায় জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেয় ইসলাম। বলা যায়, ইসলামি জ্ঞানের এই স্পর্শ ছাড়া রোম, মিশর ও পারস্য সভ্যতার বিকাশ সম্ভব ছিল না।

প্রখ্যাত ফরাসি ইতিহাসবিদ ‘গুস্তাভ লু বোন’ তার ‘ইসলাম ও আরবের ইতিহাস’ নামক গ্রন্থে লিখেছেন, “নিঃসন্দেহে ইসলামের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব ছিল অপরিসীম ও গুরুত্বপূর্ণ। ...বিশ্বের যে প্রান্তেই ইসলামের বিজয় পতাকা উড্ডীন হয়েছে সেখানেই চোখধাঁধানো সভ্যতা গড়ে উঠেছে।”

বিখ্যাত ফরাসি জ্যোতির্বিদ ও গণিতবিদ ‘পিয়ের সিমোঁ লাপ্লাস’ এ সম্পর্কে বলেন, “ঐশী ধর্মগুলোতে আমার কোনো বিশ্বাস নেই। কিন্তু ইসলামের নবী যে ধর্ম নিয়ে এসেছিলেন এবং তিনি যে শিক্ষা দিয়ে গেছেন তা মানব ইতিহাসে অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তাই আমার মনে হয়, এই শিক্ষা সকলের গ্রহণ করা উচিত।”

অতীতের নবী রাসূলগণ তাদের উম্মতদেরকে শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর আগমনের সুসংবাদ দিয়েছিলেন। পবিত্র কুরআনে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে, অতীতের নবী-রাসূলগণের অনুসারীরা শেষ নবীর আগমনের খবর জানত এবং এজন্য তারা বিশ্বনবীর আগমনের অপেক্ষায় প্রহর গুনছিল। এমনকি হযরত ঈসা (আ.) বলে গিয়েছিলেন যে, শেষ নবীর নাম হবে আহমাদ।

ইসলামের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, অস্ত্রের মাধ্যমে নয় বরং সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের বাণী প্রচার করে এই ধর্মের প্রসার ঘটেছে। মানবসমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং মানুষের সুখ ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা ইসলামের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। বিশ্বনবী (সা.) কখনো কাউকে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করেননি। বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ এই মহামানবের জীবনী লেখকদের কলমে এ বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। আল-হাসানি এ সম্পর্কে লিখেছেন, “ইসলামের নবী কখনো কোনো অবস্থায় কাউকে তার ধর্ম ত্যাগ করতে বাধ্য করেননি।” আল্লামা শেখ মোহাম্মাদ হোসেন কাশেফ আল-আতা লিখেছেন, “যারা চুক্তি ভঙ্গ করত অথবা ইসলাম প্রচারের কাজে বাধা দিতে রাসূলুল্লাহ (সা.) শুধুমাত্র তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছেন। এসব যুদ্ধের সঙ্গে ইসলাম প্রত্যাখ্যানের কোনো সম্পর্ক ছিল না।”

আল্লাহর রাসূল দ্বীনের দাওয়াত দিতে গিয়ে মানুষকে তার মানবীয় মর্যাদা সমুন্নত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বস্তুবাদের মধ্যে ডুবে যাওয়া কিংবা ঋপুর তাড়নার কাছে পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ মানবীয় মর্যাদার পরিপন্থী।  এ ধরনের কাজের ভয়াবহ পরিণতির ব্যাপারে তিনি মানুষকে সতর্ক করে দিয়েছেন।  রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “আল্লাহর কাছে মানুষের চেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন আর কিছু নেই।” এ সময় প্রশ্ন করা হয়, “মানুষের মর্যাদা কি ফেরেশতার চেয়ে বেশি।” তিনি জবাব দেন, “অবশ্যই। কারণ, চন্দ্র ও সূর্যের মতো ফেরেশতারা আল্লাহর নির্দেশ মানতে বাধ্য। কিন্তু একমাত্র মানুষকে কর্মের স্বাধীনতা দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে।”

ইতিহাসে অসংখ্যবার এসেছে, মুসলমানরা যখনই কোনো শহর জয় করতেন তখনই সেখানকার বিধর্মীদেরকে মুসলমানদের মতো সব ধরনের স্বাধীনতা ভোগ করার অনুমতি দিতেন। তাদের কাছ থেকে শুধুমাত্র ‘জিজিয়া’ নামক একটি কর আদায় করা হতো। এই করটিও নেয়া হতো তাদেরই নিরাপত্তা বিধানের জন্য। ইসলামি হুকুমতে বিধর্মীদের জান, মাল ও নারীর সম্মান অক্ষুণ্ণ ছিল এবং তাদেরকে স্বাধীনভাবে তাদের ধর্ম পালন করতে দেয়া হতো। এমনকি একবার মদীনায় রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসা একদল খ্রিস্টানকে বিশ্বনবী মসজিদে নববীর মধ্যে উপাসনা করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন।

ইহুদিদের সঙ্গেও মদীনার মুসলমানদের সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক ছিল। রাসূলুল্লাহ (সা.) বেশিরভাগ সময় ইহুদিদের অন্যায় ও কপট আচরণ নীরবে সহ্য করেছেন এবং তাদেরকে মুসলমানদের সমান অধিকার দিয়েছেন। ইহুদিরা মদীনার ইসলামি হুকুমতে স্বাধীনভাবে তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করত। তারা মুসলমানদের সঙ্গে সন্ধির চুক্তি অনুযায়ী শান্তিতে বসবাস করত এবং কখনো যদি কোনো ইহুদি চুক্তি ভঙ্গ করত তাহলে শুধু তাকেই শাস্তি দেয়া হতো; তার অপরাধের জন্য গোটা ইহুদি সম্প্রদায়কে দায়ী করা হতো না। উদাহরণস্বরূপ, কা’ব ইবনে আশরাফ ও সালাম বিন আবি হাকিক নামের দুজন ইহুদি মুসলমানদের সঙ্গে করা চুক্তি ভঙ্গ করায় শুধুমাত্র তাদেরকে শাস্তি দেয়া হয়েছিল।

 

মানুষকে মানবীয় মর্যাদার চরমে পৌঁছে দিয়ে তার দুঃখ ভুলিয়ে দেয়া ছিল বিশ্বনবী (সা.)-এর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। সূরা তওবার ১২৮ নম্বর আয়াতে যেমনটি বলা হয়েছে, “তোমাদের কাছে এসেছে তোমাদের মধ্য থেকেই একজন রাসূল। তোমাদের দুঃখ-কষ্ট তার পক্ষে দুঃসহ। তিনি তোমাদের মঙ্গলকামী,মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল,দয়াময়।” রাসূলুল্লাহ (সা.) সব পবিত্র বস্তুকে হালাম এবং মানুষের জন্য ক্ষতিকর বিষয়গুলোকে হারাম ঘোষণা করেছেন।  মানুষকে সব ধরনের বিপদ আপদ থেকে রক্ষা করে তাদেরকে  সুখী ও সমৃদ্ধ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে তাঁর চেষ্টার কোনো কমতি ছিল না।

ঠিক এ কারণে মানুষকে আশরাফুল মাখলুকাত বা সৃষ্টির সেরা জীব উল্লেখ করা হয়েছে। ইসলামের দৃষ্টিতে সৃষ্টি সেরা জীব মানুষের পক্ষে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো সামনে মাথা নত করা অবমাননাকর। এই ধর্মে একমাত্র স্রষ্টার সঙ্গে বান্দার সম্পর্ককে প্রভু ও দাসের সম্পর্কের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, একজন মানুষের সঙ্গে আরেকজন মানুষের সম্পর্ক প্রভু ও ক্রীতদাসের সম্পর্ক হতে পারে না।

যে মানুষের অন্তরে আল্লাহর রুহ ফুঁকে দেয়া হয়েছে তার পক্ষে আল্লাহর প্রতিনিধি হওয়ার মতো উচ্চ মর্যাদা অর্জন করে খোদায়ী গুণাবলী ধারণ করা সম্ভব।  এ ধরনের মানুষ আল্লাহ তায়ালাকে নিজের মনিব মনে করে বলে তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো কাজ করেনা। সে স্বেচ্ছাচারী নয় বরং আল্লাহর অনুগত বান্দা। সে এমন সৃষ্টিকর্তার ইবাদত করে যিনি এই বিশ্বজগত সৃষ্টি করার পাশাপাশি একক কর্তৃত্বে তা পরিচালনা করছেন। কিন্তু বান্দেগির দিক থেকে এতটা উন্নত অবস্থানে ওঠার জন্য প্রয়োজন তাকওয়া বা খোদাভীতি অর্জন করা। নবী-রাসূল ও আল্লাহর ওলীগণ তাদের শারীরিক প্রবৃত্তির আবর্তে বন্দি না থেকে তাকওয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ে উন্নীত হতে পেরেছিলেন। #

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ/ ১২

খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন

২০১৮-০৮-১২ ১৮:০৫ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য