ইসলামের শত্রু তথা মহান আল্লাহ ও মু'মিনদের শত্রুর সঙ্গে বন্ধুত্ব না করা ও তাদের কাছে বন্ধুত্বের বার্তা না পাঠানোর বিষয়ে সুরা মুমতাহানার প্রথম আয়াত নাজিলের পটভূমি তথা শানে নুজুল নিয়ে আমরা কথা বলেছি গত পর্বে।

প্রথম আয়াতের বক্তব্য স্পষ্ট করতে সুরা মুমতাহানার দ্বিতীয় আয়াতে মহান আল্লাহ বলছেন: 

 

'তোমাদের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারলে তারা তোমাদের শত্রু হয়ে যাবে এবং  নানা ধরনের অসৎ উদ্দেশ্যে তোমাদের দিকে বাহু ও রসনার প্রসার ঘটাবে এবং চাইবে যে,কোনোভাবে তোমরাও কাফের হয়ে যাও।'

সুরা মুমতাহানার ৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলছেন: 'তোমাদের স্বজন-পরিজন ও সন্তান-সন্ততি কিয়ামতের দিন কোনো উপকারে আসবে না। তিনি তোমাদের মধ্যে ফয়সালা করবেন। তোমরা যা কর,আল্লাহ তা দেখেন।'

-এখানে আল্লাহ ও মু'মিনদের শত্রুর সঙ্গে বন্ধুত্ব না করা ও তাদের কাছে বন্ধুত্বের বার্তা না পাঠানোর বিষয়ে হাতেব-এর মত অদূরদর্শী ও সরল-মনা মুসলমানদেরকে সতর্ক করা হয়েছে। এ সতর্ক বাণীতে মহান আল্লাহ বলছেন, নিজের পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনদের রক্ষা করতে গিয়ে মুসলমানরা যেন তাদের গোপন বিষয়গুলো শত্রুর কাছে ফাঁস না করেন।  কারণ নিজের ঈমান ও সৎ-কর্ম ছাড়া বিচার-দিবসে অন্য কিছুই কাজে আসবে না এবং এমনকি সেদিন আত্মীয়-স্বজন ও সন্তান-সন্ততিও কোনো কাজেই আসবে না। সেদিন পরিবার পরিজনের সঙ্গে সম্পর্কের সব বন্ধন ছিন্ন হয়ে যাবে। যারা ঈমানদার তারা সেদিন বেহেশতে যাবেন এবং যারা অবিশ্বাসী বা কাফির তারা যাবে দোযখে।

 

সুরা মুমতাহানার চার নম্বর আয়াতের একাংশে মহান আল্লাহ বলছেন:  

'তোমাদের জন্যে ইব্রাহীম ও তাঁর সঙ্গীদের মধ্যে চমৎকার আদর্শ রয়েছে। তাঁরা তাঁদের সম্প্রদায়কে বলেছিলঃ তোমাদের সাথে এবং তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যার ইবাদত কর,তার সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই। আমরা তোমাদের ধর্মকে মানি না। তোমরা এক আল্লাহর প্রতি  ঈমান না আনলে তোমাদের মধ্যে ও আমাদের মধ্যে চিরশত্রুতা থাকবে।'

 

পবিত্র কুরআন মানুষকে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্য নানা ধরনের প্রত্যক্ষ ও ব্যবহারিক আদর্শ উপস্থাপন করে। সুরা মুমতাহানার চার নম্বর আয়াতে এমনই আদর্শের কথা তুলে ধরা হয়েছে। এখানে বলা হচ্ছে মুসলমানরা যেন হযরত ইব্রাহিম (আ)-কে সব জাতির মহান নেতা ও বরেণ্য আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেন। হযরত ইব্রাহিম (আ) ও তাঁর অনুসারীরা চরম দৃঢ়তা নিয়ে ও কোনো ধরনের রাখ-ঢাক না করেই আল্লাহর শত্রুদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ এবং সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা দিয়েছেন। এটা খুবই স্বাভাবিক যে হযরত ইব্রাহিম (আ)'র মত মহান খোদায়ী নেতৃবৃন্দ এমনই প্রভাবশালী ও উদ্দীপনার উৎস যে তাঁদের ভূমিকা কখনও ম্লান হবে না।

 

সুরা মুমতাহানার দশ নম্বর আয়াতে এসেছে 'মুমতাহানা' বা 'পরীক্ষিত' শব্দটি। মুহাজির নারীদের পরীক্ষা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল এই আয়াতে।

 

মক্কার কাফির-মুশরিকদের সঙ্গে মুসলমানদের স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক হুদাইবিয়ার সন্ধির অন্যতম শর্ত ছিল এটা যে মক্কার কোনো ব্যক্তি যদি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে মদিনার মুসলমানদের সঙ্গে যোগ দেয় তাহলে তাকে মক্কায় ফেরত পাঠাতে হবে, কিন্তু মদিনার কোনো মুসলমান যদি ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে মক্কায় ফিরে আসলে তাহলে তাকে মদীনায় ফেরত পাঠানো বাধ্যতামূলক নয়।

 

ওই চুক্তি স্বাক্ষরের পর পরই এক নারী ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং হুদাইবিয়া অঞ্চলে মুসলমানদের সঙ্গে যোগ দেন। এ অবস্থায় তার স্বামী মহানবী (সা)'র কাছে এসে বলেন, হে মুহাম্মাদ! আমার স্ত্রীকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিন। কারণ এ বিষয়টি সদ্য-স্বাক্ষরিত হুদাইবিয়া সন্ধির অন্যতম শর্ত এবং এ চুক্তির কালি এখনও শুকোয়নি।  আর এ সময় নাজিল হয় সুরা মুমতাহানার দশ নম্বর আয়াত। এ আয়াতে মুহাজির নারীদের পরীক্ষা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

মক্কার নারীদের পরীক্ষাটা হবে এরকম যে তারা শপথ করে বলবেন স্বামীর সঙ্গে শত্রুতা বা অন্য কোনো পুরুষের প্রতি ভালবাসার কারণে কিংবা অন্য কোনো বস্তুগত লক্ষ্য বা স্বার্থের কারণে তারা মদিনায় আসছেন না। এ অবস্থায় ওই নারীও শপথ করে বলেন যে তিনি সত্যিই ঈমান এনেছেন। তাই মহানবী (সা) ওই নারীকে তার স্বামী যে মোহরানা দিয়েছিলেন তা তাকে ফেরত দেন। বিশ্বনবী(সা) তাকে বলেন: হুদাইবিয়া সন্ধির ওই শর্তে মদীনায় চলে-আসা মক্কার কেবল নও-মুসলিম পুরুষদেরকেই সেখানে ফেরত পাঠানোর কথা বলা হয়েছে; নও-মুসলিম নারীদের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয়।

 

সুরা মুমতাহানার ১২ নম্বর আয়াতে নারীদের বাইয়াত গ্রহণের বিষয়ে বলা হয়েছে:

'হে নবী,ঈমানদার নারীরা যখন আপনার কাছে এসে আনুগত্যের শপথ করে যে, তারা আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবে না,চুরি করবে না,ব্যভিচার করবে না, তাদের সন্তানদেরকে হত্যা করবে না,জারজ সন্তানকে স্বামীর ঔরসের সন্তান বলে দাবী করবে না ও কোনো ধরনের অপবাদ আরোপ করবে না এবং ভাল কাজে আপনার অবাধ্যতা করবে না,তখন তাদের আনুগত্য গ্রহণ করুন এবং তাদের জন্যে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল অত্যন্ত দয়ালু।'

 

-এ আয়াতে মহানবী (সা)-কে সম্বোধন করে মহান আল্লাহ বলছেন, যেসব নারী সত্যিকার অর্থেই তথা আন্তরিকভাবে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন এবং মহানবীর (সা)  আনুগত্য করছেন আপনি তাদের কাছ থেকে বাইয়াত বা আনুগত্যের শপথ নিন। মক্কার নারীরা ঈমান আনার পর যখন মহানবীর কাছে বাইয়াত করতে এসেছিলেন তখনই নাজিল হয় এই আয়াত। এখানে ওই নারীদের বাইয়াত গ্রহণের শর্তগুলো তুলে ধরা হয়েছে। মহানবী (সা) পানির একটি পাত্রে তাঁর হাত মুবারক রাখার পর ওই নারীদের বলেন যে, আনুগত্যের শপথ নেয়ার জন্য আপনারা নিজ নিজ হাত পাত্রের পানিতে ডুবিয়ে রাখুন।  এর আগে মক্কা বিজয়ের সময় সাফা পর্বতে থাকা অবস্থায় মহানবী (সা) মক্কার পুরুষদের কাছ থেকে আনুগত্যের শপথ আদায় করেন।

 

এ থেকে বোঝা যায় ইসলাম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয়েও নারীর অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দেয়।  নারীদের কাছ থেকে মহানবীর (সা) বাইয়াতের পদ্ধতি থেকেও বোঝা যায় ইসলাম নারীর মানবীয় সত্তাকে দেয় বিশেষ সম্মান। এ ধর্ম নারীকে পুরুষের ভোগের সামগ্রী বলে মনে করে না। নারীদের কাছ থেকে আনুগত্যের শপথ আদায়ের ওই ঘটনা এটাও প্রমাণ করে যে ইসলামের দৃষ্টিতে নারীর রয়েছে পছন্দের স্বাধীনতাসহ সব ধরনে স্বাধীনতা ও একজন মানুষের জন্য নির্ধারিত সব অধিকার। তাই মহানবীর (সা)  যুগে নারীরা স্বাধীনভাবে মহানবীর (সা)  সঙ্গে আলোচনা ও মত-বিনিময় করতেন। #

 

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/মো: আবু সাঈদ/  ১৪

খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন

২০১৮-০৮-১৪ ১৫:০৩ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য