বাংলাদেশের রাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনায় দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর শিশু-কিশোরদের সড়কে আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে যে খসড়া সড়ক পরিবহন আইন মন্ত্রিসভায় অনুমোদন দেয়া হয়েছে তা গ্রহণযোগ্য নয় বলে জানিয়েছেন নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন। রেডিও তেহরানকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি একথা বলেন।

সিনিয়র সাংবাদিক ও জিটিভির  প্রধান সম্পাদক সৈয়দ ইশতিয়াক রেজাও বলেন প্রস্তাবিত আইনে সত্যিকারার্থে জনমতের প্রতিফলন ঘটেনি। 

তবে সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী ও হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ বা এইচআরপিবির প্রেসিডেন্ট অ্যাডভোকেট মনজিল মোরশেদ বলেছেন প্রস্তাবিত আইনটিতে শিশুদের আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্যের প্রতিফলন না ঘটলেও বেশ কিছু ভালো দিক রয়েছে।

আর সিনিয়র সাংবাদিক ও বাংলা ভিশন এর হেড অব নিউজ মোস্তফা ফিরোজ বললেন, শিক্ষার্থীদের মূল আন্দোলনের চেতনাকে নষ্ট করা হয়েছে গুজবের মাধ্যমে। তারপর প্রস্তাবিত আইনটিও হয়েছে হতাশাজনক।

  • অনুমোদিত খসড়া 'সড়ক পরিবহন' আইন গ্রহণযোগ্য না-ইলিয়াস কাঞ্চন
  • প্রস্তাবিত সড়ক পরিবহন আইনে সত্যিকারার্থে জনমতের প্রতিফলন ঘটেনি, তবে আইন হতে যাচ্ছে এটি ইতিবাচক-সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
  • শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের উদ্দেশ্য এই খসড়া আইনে নিশ্চিত করা হয় নি-মনজিল মোরশেদ
  • শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ভালো কাজটিকে ধারণ করতে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ব্যর্থ হয়েছে-মোস্তফা ফিরোজ

রেডিও তেহরান: জনাব  ইলিয়াস কাঞ্চন, মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত খসড়া সড়ক পরিবহন আইন গ্রহণযোগ্য কীনা?

নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন

ইলিয়াস কাঞ্চন: বাংলাদেশের মন্ত্রিসভায় চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত খসড়া 'সড়ক পরিবহন' আইন গ্রহণযোগ্য না। আমরা একটা সংবাদ সম্মেলনে একথাটি স্পষ্ট করে বলেছি। নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেছে। আর নিরাপদ সড়কের বিষয়টি আমাদের দাবি। আর আমাদের দাবির প্রতি আপনারা জানেন সারাদেশের মানুষ একাত্মতা পোষণ করেছে। আর নিরাপদ সড়কের দাবি পূরণের জন্য  আইনে যে ধরনের সংস্কারের দরকার ছিল তা এখানে নেই। আমরা এজন্য বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছিলাম সরকারকে। সরকার আমাদের সেসব পরামর্শ নেয় নি। দেখুন প্রতিটি আইনের একটি উদ্দেশ্য থাকে একটি ইনটেনশন থাকে। আর সড়ক দুর্ঘটনা রোধ ও সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ইনটেনশানটা এই আইনে নেই।

আপনারা সবাই জানেন যে বাংলাদেশে প্রায় ৩৫ লক্ষ নিবন্ধিত গাড়ি আছে। আর এর বিপরীতে চালক আছে ১৮ লাখ। এখানে চালকের ঘাটতি রয়েছে প্রায় ১৬ লাখ। এই ১৬ লাখ চালকের ঘাটতি রেখেই সড়কে ৩৫ লক্ষ গাড়ি চলছে। ফলে কিভাবে সড়কে দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব হবে!

অথচ তড়িঘড়ি করে কিছু গাড়ির ফিটনেস দেয়া হচ্ছে। চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স দেয়া হচ্ছে। তাছাড়া যেভাবে পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে এসব দেয়ার দরকার ছিল এর আগেও সেভাবে করা হয় নি এখনও করা হচ্ছে না। চালকদের প্রশিক্ষিত করার জন্য যে ইনস্টিটিউশন থাকা দরকার তারও কোনো ব্যবস্থা বাংলাদেশে নেই।

বাংলাদেশে ভারী যানবহান রয়েছে ২ লাখ ২৫ হাজার। ভারী যানবাহন চালানোর প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্য কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। এরকম অসংখ্য অসংগতি প্রস্তাবিত আইনের মধ্যে আছে। সে কারণে আমরা বলেছি অসংগতিগুলো দূর করে যেন আইনটি সংসদে পাঠানো হয়। আর আইনের উদ্দেশ্যে হতে হবে সড়ক দুর্ঘটনারোধ এবং সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। এই ইনটেনশনটা অবশ্যই থাকতে হবে আইনে।

অ্যাডভোকেট মনজিল মোরশেদ

রেডিও তেহরান: জনাব অ্যাডভোকেট মনজিল মোরশেদ- ইলিয়াস কাঞ্চন বললেন-খসড়া সড়ক পরিবহন আইন গ্রহণযোগ্য হয় নি। আপনার কাছে এ আইন কেমন হলো? শিক্ষার্থীদের চাওয়ার প্রতিফল ঘটেছে?

মনজিল মোরশেদ: সড়ক পরিবহন আইনের যে খসড়া মন্ত্রিপরিষদে অনুমোদিত হয়েছে সেখানে সাজার দিক থেকে যে প্রবিশনগুলো রাখা হয়েছে সেটা আমাদের প্রত্যাশিত হয় নি এবং শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের যে উদ্দেশ্য ছিল- সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণের জন্য কঠিন সাজার ব্যবস্থা করা। সেই সাজার পরিমাণটা এই আইনে নিশ্চিত করা হয় নি।

রেডিও তেহরান: মনজিল মোরশেদ এ খসড়া আইনের ভালো দিক কী আছে..

মনজিল মোরশেদ: এখানে ভালো কিছু দিক সংযোজন করা হয়েছে। সড়ক ব্যবস্থাপনার জন্য আদালত ২২ দফা নীতিমালা দিয়েছি। সেখানে একটি বিষয় ছিল- মহাসড়কের অন্তত ১০ মিটার দূরে যে-কোনো স্থাপনা গড়তে হবে। আদালতের এ নির্দেশনটাটি এখানে অন্তর্ভুক্ত  করা হয়েছে। চালকের শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে- এটি আগে ছিল না। এছাড়া চালক ও তার সহযোগীর কর্মঘন্টা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে এটিও আগে ছিল না। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কারণ একজন চালক যদি ১২/১৪ বা ১৬ ঘন্টা গাড়ি চালায় সেক্ষেত্রে একজন মানুষ হিসেবে তার কাছ থেকে দুর্ঘটনা ছাড়া ভালো কিছু তো প্রত্যাশা করতে পারি না। 

রেডিও তেহরান: জনাব সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা, কেমন হলো সড়ক পরিবহন আইন। ছাত্রদের দাবির প্রতিফলন কী ঘটেছে এ আইনে?

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা: সড়ক পরিবহন আইনটির যেভাবে প্রস্তাবনা করা হয়েছে তাতে সত্যিকারার্থে জনমতের প্রতিফল ঘটে নি। শিক্ষার্থীদের দাবির সাথেও সঙ্গতিপূর্ণ হয় নি। আমাদের দীর্ঘদিনের একটি দাবি ছিল যে, এই আইনটির নাম হবে'সড়ক নিরাপত্তা' আইন। সেটা উপেক্ষিত হয়েছে। তবে হ্যাঁ আইন একটি করতে যাচ্ছে সেটি অবশ্যই ইতিবাচক দিক।

রেডিও তেহরান: নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময় তাদের ওপর এবং সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। মিডিয়ার ফুটেছে দেখা গেছে- পুলিশের সাথে থাকা কিছু লোক যাদের মাথায় হেলমেট হাতে লাঠি ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে আছে। তো এরা কারা. নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যরা তাদেরকে গ্রেফতার করেছে এমন কোনো খবর এখনও পাওয়া যায় নি। এ বিষয়ে আপনি কী বলবেন ?

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা: দেখুন এরা কারা সেকথা তো আমরা বলতে পারব না। তাদেরকে তো আমরাও চিনি না। কিন্তু এদেরকে আমরা টিভিতে দেখেছি এবং পত্রিকায় ছবি এসেছে। আমি তথ্য মন্ত্রণালয়ের একটি সভায় গিয়েছিলাম সেখানে তথ্যমন্ত্রী-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে জানিয়েছেন যত দ্রুত সম্ভব এদের পরিচয় বের করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। আমরা মনে করি এটাই যৌক্তিক। এরা পুলিশের পাশাপাশি ছিল। পুলিশের, সরকারের এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব এদের পরিচয় প্রকাশ করে বিচারের আওতায় নিয়ে আসা।  

রেডিও তেহরান: জনাব মোস্তফা ফিরোজ, নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময় তাদের ওপর এবং সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। মিডিয়ার ফুটেছে দেখা গেছে- পুলিশের সাথে থাকা কিছু লোক যাদের মাথায় হেলমেট হাতে লাঠি ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে আছে। তো এরা কারা. এ বিষয়ে আপনি কী বলবেন?

মোস্তফা ফিরোজ

মোস্তফা ফিরোজ: আমি খুবই মর্মাহত এবং বেদনার সাথে বলতে চাই যে বিষয় নিয়ে আমাদের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা রাস্তায় আন্দোলনে নেমেছিল- তাদের সেই আন্দোলনের বিষয়টি সকল স্তরের মানুষকে জাগ্রত করেছে। চালক, যাত্রী, পথচারীসহ সকল অংশকে তাদের ওই আন্দোলন জাগ্রত করেছিল। কিন্তু সেই ভালো কাজটিকে ধারণ করতে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ব্যর্থ হয়েছে। সরকার যদি শুরুতেই শিক্ষার্থীদের এবং মানুষের ক্ষোভ প্রশমনের জন্য উদ্যোগ নেয়া দরকার ছিল। 

নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থী আন্দোলন

সবাই বলছিল সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা মাফিয়াদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। কারণ এখানে চালক, মালিকসহ কারো বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছিল না কারণ হচ্ছে তাদের মূল নেতা হচ্ছেন সরকারের প্রভাবশালী একজন মন্ত্রী। তার কারণেই পুরো সড়ক পরিবহন ব্যবস্থায় নৈরাজ্য তৈরি হয়েছিল। সুতরাং অভিযুক্ত ব্যক্তিকে যদি মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে দিয়ে যদি বলা হতো যে আপনি যেহেতু পরিবহন শ্রমিকদের নেতা সুতরাং আপনি ওই কাজটিই করুন। সেটি করা হলো না। ফলে সরকার যখন ওরকম একটা অবস্থান নেয় তখন সড়ক পরিবহন ব্যবস্থাকে সুশৃঙ্খল অবস্থায় আনার জন্য যে সব অর্গান থাকে তারা অকেজো হয়ে যায়। ফলে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনের প্রথম পর্যায়েই সরকার ব্যর্থ হয়েছে বা ভুল করেছে। সরকার মূল সমস্যাটার সমাধানে প্রাথমিক কর্মপর্যায় গ্রহণ করলেই কিন্তু আন্দোলনটা প্রশমিত হয়ে যেত।

পরবর্তী পর্যায়ে সেই মন্ত্রীকে রক্ষা করতে গিয়ে আন্দোলনের দিন যত গড়াতে থাকল ততই রাজনৈতিক সুযোগ-সন্ধানীরা সক্রিয় হয়ে উঠল। যারপরিণতিতে সংঘাত বাড়ল। ফলে মূল লক্ষ্য থেকে সরকার-রাজনৈতিক নেতৃত্ব সবাই বিচ্যুত হয়ে গেল।এটি কিন্তু খুবই দুঃখজনক একটি অধ্যায়।

রেডিও তেহরান: জনাব সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা- শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলন চলাকালে বেশকিছু গুজব ছড়িয়ে পড়ে। এ সম্পর্কে আপনি কী বলবেন?

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা: দেখুন শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় দেশের ভেতরে বা বাইরে যেখান থেকেই গুজব ছড়ানো হয়েছে তাদের একটা স্পষ্ট রাজনৈতিক পরিচয় আছে। তবে দেশের বাইরে থেকে গুজব ছড়ানো হয়েছে বেশি। তারা শিশু-কিশোরদের আন্দোলনকে হাইজ্যাক করার একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চেয়েছিল। অন্যদিকে আমাদের মতো কিছু তরুণ সোশ্যাল অ্যাক্টিভিস্ট আছে যারা গুজব নিয়ে বিভিন্ন ধরনের আচরণ করেছে। এটি কোনোভাবেই প্রত্যাশিত ছিল না।

আসলে তথ্যপ্রবাহের জায়গাটাতে মূলধারার গণমাধ্যমকেই বিশ্বাস করতে হবে। কারণ ফেসবুক বা সামাজিক মাধ্যম মানুষকে সেই নির্ভরযোগ্য তথ্য দিতে পারছে না।

রেডিও তেহরান: জনাব মোস্তফা ফিরোজ এ বিষয়ে আপনি কী বলবেন?

সাংবাদিকের ওপর নির্যাতন

মোস্তফা ফিরোজ: দেখুন, পুরো আন্দোলনকে নষ্ট করার জন্য ব্যাপক গুজব ছড়ানো হলো। বলা হলো হত্যা করা হয়েছে, ধর্ষণ করা হয়েছে ও আওয়ামী লীগের পার্টি অফিসে হামলাও করা হয়েছে। এভাবে পুরো বিষয়টাই একটা ক্যামোফ্লেক্স তৈরি করে মূল আন্দোলনের চেতনাকে নষ্ট করা হলো গুজবের মাধ্যমে। পাশাপাশি আপনারা দেখেছেন মিডিয়া কর্মীদের ওপর হামলা চালানো হলো। যারা মিডিয়া কর্মীদের ওপর আঘাত করল তাদের ছবি ইলেকট্রনিক মিডিয়ার ফুটেজে এবং পত্রিকার ছবিতে প্রকাশ করা হলো। কিন্তু তাদের ব্যাপারে আমরা কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখলাম না। অথচ যারা এই চেতনাকে সংগঠিত করার জন্য কাজ করল, সড়কে আন্দোলন করল তাদের ওপর নির্যাতন ও হামলা হলো, তারা এক পর্যায়ে গ্রেফতারও হলো। ওই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় মন্ত্রিসভায় যে খসড়া আইননের অনুমোদন দেয়া হলো যদিও সেটি এখনও সংসদে যায় নি এবং চূড়ান্ত হয় নি তারপরও বলব সেই আইনটি আরো হতাশাজনক।#

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/১৪

 

 

২০১৮-০৮-১৪ ১৬:৩৯ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য