• গোলাম মোর্তজা
    গোলাম মোর্তজা

বাংলাদেশের নৌমন্ত্রী শাজাহান খান একইসঙ্গে মন্ত্রী এবং শ্রমিক সংগঠনের নেতা। এই জায়গাটি নীতিগত এবং আইনগত দিক থেকেও সম্ভবত বৈধ না। সে কারণেই তার পদত্যাগ করা উচিত। রেডিও তেহরানকে দেয়া সাক্ষাৎকারে এমন মন্তব্য করলেন সিনিয়র সাংবাদিক, রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও সাপ্তাহিকের সম্পাদক গোলাম মোর্তজা।

তিনি আরো বলেন, সেই জায়গাটার সমাধান যদি সরকার না করে তাহলে রাস্তার নৈরাজ্য নিয়ে কথা হবে অনেক কিন্তু বাস্তবে রাস্তার নৈরাজ্য দূর হবে না। গোলাম মোর্তজা বলেন, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে যদি বিবেক জাগ্রত হতো, চোখ খুলে যেত তাহলে সেই শিক্ষার্থীরা জেলে যেত না আর অপরাধীরা বাইরে থাকত না!

সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ, উপস্থাপনা ও তৈরি করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

  • হেলমেটবাহিনী শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের ওপর হামলা করেছে অথচ পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে নি, গ্রেফতার হয়েছে শিক্ষার্থী- কেন?
  • শিক্ষার্থী গ্রেফতার আর অপরাধীরা বাইরে- বিষয়টি নিয়ে জনমনে প্রশ্ন এবং শিক্ষার্থীদের মাঝে আছে তীব্র অসন্তোষ
  • সরকারি  পরিবহন সেক্টর বিআরটিসিকে মোটামুটিভাবে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে
  • সামগ্রিকভাবে সমাজের সব জায়গাতেই অনিয়ম, দুর্নীতি এবং অনৈতিকতা আছে

রেডিও তেহরান: জনাব গোলাম মোর্তজা, সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনের পর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীসহ অনেকেই বলেছেন ছাত্র-ছাত্রীরা আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে; বিবেককে জাগ্রত করেছে। আসলে কতটা জাগ্রত হলো বিবেক?

গোলাম মোর্তজা: স্কুলের শিক্ষার্থীরা যে আন্দোলন করেছে সেই আন্দোলনকে সবাই প্রশংসা করেছেন। একজন মানুষও নেই যিনি বলছেন না যে এই আন্দোলন ঠিক ছিল না বা এই আন্দোলনটি যৌক্তিক নয়। প্রধানমন্ত্রী যেমন বলেছেন চোখ খুলে দিয়েছে একইরকম কথা আরো অনেকে বলেছেন। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে তাদের বিবেককে জাগ্রত করা হয়েছে। এগুলো খুব ভালো কথা। আর সেই অনুযায়ী কাজ হবে আমরা এমনটি প্রত্যাশা করি।

শিক্ষার্থীদের ওপর আক্রমণ

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে স্কুলের শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেছিল এবং সেই শিক্ষার্থীদের ওপর যখন আক্রমণ করা হয়েছিল তখন সেই আক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিবাদস্বরূপ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ওই আন্দোলনের সাথে সহমর্মিতা প্রকাশ করে তাদের পক্ষে কথা বলার চেষ্টা করেছেন; কেউ কেউ মিছিলও করেছেন।

তবে আমরা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনকভাবে দেখেছি আন্দোলনের সময় পুলিশের সঙ্গে থেকে হেলমেটবাহিনী বা হেলমেটধারীরা শিক্ষার্থীদের ওপর আক্রমণ চালিয়েছে। পুলিশ সঙ্গে নিয়ে তাদেরকে আক্রমণ করতে দিয়েছে। তারা শিক্ষার্থীদের পিটিয়েছে, সাংবাদিকদেরকেও পিটিয়েছে কিন্তু পুলিশ তাদের কাউকে গ্রেফতার করে নি। অথচ দুঃখজনকভাবে দেখছি যে হেলমেটবাহিনীর কাউকে পুলিশ ধরল না পুলিশ ধরল শিক্ষার্থীদের। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে কমপক্ষে ২২ জন এখন কারাগারে আছে। তাদেরকে গ্রেফতার করে ছিনতাইকারীদের মতো করে হ্যান্ডকাপ পরিয়ে আদালতে নেয়া হয়েছে। পরে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। তারা জামিন চেয়েছে জামিন দেয়া হয় নি- এরকম একটা অবস্থার মধ্যে রয়েছে বিষয়টি।

শিক্ষার্থীদের হ্যাান্ডকাপ লাগিয়ে দড়ি দিয়ে বেঁধে আদালতে নেয়া 

সেক্ষেত্রে প্রশ্ন আসছে যে তাহলে বোধোদয় বা বিবেক জাগ্রত হলো কিসে; চোখ খুলে দিল কিসে? যারা অপরাধী তাদের ধরা হলো না আর ধরা হলো ভালো আন্দোলনকারীদের। কেন এত ভালো আন্দোলনকারীরা জেলে কেন? তাদেরকে কেন গ্রেফতার করা হলো, কেন রিমান্ডে নেয়া হলো? তাদের জামিন হচ্ছে না কেন? তাহলে কেমন বিবেক জাগ্রত হলো! কেমন চোখ খুলে দিল!  আর এ বিষয়টি নিয়ে জনমানুষের মধ্যে একটা প্রশ্ন আছে এবং শিক্ষার্থীদের মাঝে তীব্র রকমের অসন্তোষ আছে।

রেডিও তেহরান যে ঘটনা ও সংকট নিয়ে সাম্প্রতিক আন্দোলন হলো -আপনার কী মনে হয় এই আন্দোলনের পর তার সমাধান হবে? অর্থাৎ সড়ক-পরিবহন খাতে যে নৈরাজ্য বিরাজ করছিল তার নিরসন হবে?

গোলাম মোর্তজা: সড়ক পরিবহন খাতের নৈরাজ্য তো হুট করে সমাধান করা সম্ভব না। কারণ সমস্যাটি গত চল্লিশ বছরের সমস্যা। আর সেই সমস্যাটি গতকয়েক দিনের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে ঠিক হয়ে যাবে সেটা ভাবাটা কোনোমতেই ঠিক হবে না। যদি সুষ্ঠু পরিকল্পনা নেয়া হয় তাহলে হয়তো একটা লম্বা সময় পর সমস্যার সমাধান হতে পারে। তবে দেখার বিষয় আমরা সেই উদ্যোগ নিচ্ছি কিনা এবং বিষয়টিকে আন্তরিকভাবে দেখছি কি না! আমার কাছে মনে হচ্ছে আমরা মুখে কথা বলছি ঠিকই কিন্তু বাস্তবে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেয়ার জায়গা ও ধরনটা খুব একটা সুখকর নয়। যার ওপর নির্ভর করে বলা যাবে যে কাজ হচ্ছে।

এখানে অনেকগুলো বিষয়ের মধ্যে খুব বড় দুটি বিষয় রয়েছে

নৌমন্ত্রী শাজাহান খান

প্রথমত, শ্রমিকদের যিনি প্রতিনিধিত্ব করছেন সেইরকম একজন মানুষ সরকারের একজন খুব গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী। আবার বাস মালিকদের যিনি প্রতিনিধিত্ব করছেন সেই রকম একজন মানুষ সরকারে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। আর এই দুইজন মানুষ সরকারের ভেতর খুব প্রভাবশালী ও গুরুত্বপূর্ণ। যেকারণে এখানে একটি সুষ্ঠু পরিকল্পনা যদি নিতে হয় তাহলে সেই সুষ্ঠু পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাধা হচ্ছে সরকারের এই দুইজন মন্ত্রী। সরকার যে নীতিগ্রহণ করেন সরকারের ভেতরে থেকে সেই নীতির বিরোধীতা করেন এই দুইজন মন্ত্রী তাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে। সুতরাং সরকারের পক্ষে কোনো সুষ্ঠুনীতি বা পরিকল্পনা নিয়ে বাস্তবায়ন সম্ভব না যতক্ষণ পর্যন্ত এই কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্টের ব্যাপারটা কাজ করবে। আর সেই জায়গাটার যদি সমাধান সরকার না করে তাহলে রাস্তার নৈরাজ্য নিয়ে কথা হবে অনেক কিন্তু বাস্তবে রাস্তার নৈরাজ্য দূর হবে না।

বিআরটিসি

দ্বিতীয়ত, যে বিষয়টি সেটি হচ্ছে –নগর পরিবহনের নৈরাজ্য বন্ধ করতে হলে সরকারের হাতে একটা টুলস থাকতে হয়। পৃথিবীর বহু দেশে বা অধিকাংশ দেশে সেটি আছে। সরকারের নিজস্ব একটা নগর পরিবহন ব্যবস্থা থকতে হয়। বাংলাদেশেও একসময় ছিল এখনও নামে আছে বিআরটিসি। বিআরটিসির বাসগুলো সব লিজে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রায় ৩০০ বিআরটিসির বাস ঢাকা শহরে বসে থাকে। যাদের কাছে লিজ দিয়েছে সরকার সেইসব অফিসের কর্মীদের সকালে নিয়ে আসে তারপর সারাদিন বসে থেকে সন্ধ্যার সময় আবার তাদের নিয়ে যায়। অর্থাৎ সরকারের হাতে যে টুলস ছিল সেটি ব্যবহার করে না। আর ব্যবহার না করতে করতে এখন আর সরকারের হাতে সেই টুলসটি আর নেই। বিআরটিসিকে মোটামুটিভাবে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে।

রেডিও তেহরান:  এবারে যে প্রশ্নটি করতে চাই তা হলো- আন্দোলনের একটা পর্যায়ে নৌমন্ত্রী শাজাহান খানের পদত্যাগের দাবি উঠেছিল। জবাবে তিনি বলেছিলেন- পদত্যাগ কোনো সমাধান নয়। উন্নত বিশ্বে দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বা মন্ত্রীদের পদত্যাগের অহরহ নজির থাকলেও বাংলাদেশে পদত্যাগের নজির খুব কম। বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখেন?

গোলাম মোর্তজা: দেখুন, উন্নত বিশ্বে পদত্যাগ আর আমাদের প্রতিবেশী উন্নত দেশ না হলেও ভারতেও এরকম পদত্যাগের  ব্যাপার আছে। হ্যাঁ নিশ্চয়ই বলা যায় পদত্যাগ সমাধান নয়। এটি একটি যুক্তি কিন্তু বিষয়টি এত সহজ ও সরল নয়। একটি দুর্ঘটনা ঘটলে পদত্যাগের প্রশ্ন ওঠে আর তখন বলা হয় আমি পদত্যাগ করলেই দুর্ঘটনা বন্ধ হবে কী না। সেই জায়গা থেকে বিষয়টিকে দেখা হয়।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলন

এইখানে কিন্তু কোনো একটি দুর্ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পদত্যাগ চাওয়া হয়। যার পদত্যাগ চাওয়া হয়েছে তিনি একইসঙ্গে মন্ত্রী এবং  শ্রমিক সংগঠনের নেতা। এখানে এক স্বার্থের সাথে আরেক স্বার্থ মিলে মিশে একাকার হয়ে যায়। এই জায়গাটি নীতিগত এবং আইনগত দিক থেকেও সম্ভবত বৈধ না। সেই কারণেই তার পদত্যাগ করা উচিত। অর্থাৎ যেকোনো একজায়গায় থাকা উচিত। আসলে দায়দায়িত্ব না নিয়ে যদি পার পেয়ে যাওয়া যায় তাহলে তিনি দায়-দায়িত্ব নেবেন কেন? বাংলাদেশে দায়-দায়িত্ব না নিয়ে পার পাওয়া যায়। সেই কারণে তারা দায়-দায়িত্বও নেন না পদত্যাগও করেন না।

রেডিও তেহরান: আন্দোলনের সময় সড়ক-পরিবহন খাতে নানা অনিয়ম দুর্নীতির চিত্র বেরিয়ে এসেছে। সেসময় অনেকে বলেছেন, এটা সমাজের খণ্ডিত চিত্র; অনুসন্ধান করলে সমাজের আরো ভয়াবহ চিত্র বেরিয়ে আসবে। এ কথার মাঝ দিয়ে তারা মূলত অর্থনৈতিক দুর্নীতির ইঙ্গিত দিয়েছেন। আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

গোলাম মোর্তজা: আমিও ওই অভিমতের সাথে পুরোপুরি একমত। এটি একটি খণ্ডিত চিত্র। আসলে বিচ্ছিন্নভাবে কোনো একটি জায়গায় উন্নতি করা যায় না। উন্নতি করতে হয় আস্তে আস্তে এবং সমাজের সবকটি জায়গাতেই। 

সবজায়গাতেই যদি অনিয়ম দুর্নীতি থাকে তাহলে শুধুমাত্র গণপরিবহন পরিবহন সেক্টরে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হলেই সর্বত্র সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে বিষয়টি এরকম না। সুশাসন প্রতিষ্ঠার সাথে অনেক কিছুই সম্পর্কিত। পৃথিবীর সব দেশের মানুষ আইন মানে মূলত ভয় থেকে। কারণ আইন অমান্য করলে তার জেল-জরিমানা হবে। সেই ভয় থেকেই তারা আইন মান্য করে। আর এই ভয় দেখানোর কর্তৃপক্ষ হচ্ছে পুলিশবাহিনী বা আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী। তাদের মধ্যে যদি সততা ও নৈতিকতার ঘাটতি থাকে, তারা যদি অর্থের বিনিময়ে রাস্তায় চাঁদাবাজি করতে দেন অথবা তাদের অন্যতম প্রধান কাজ হয়ে যায় রাস্তায় ট্রাক দাঁড় করিয়ে সেখান থেকে অর্থ নেয়া।তাহলে কিভাবে হবে। অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে সমাজের সব জায়গায়তেই অনিয়ম, দুর্নীতি এবং অনৈতিকতা আছে। আর যদি সত্যি সত্যিই আমরা কোনো উন্নতি ঘটাতে চাই তাহলে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় আস্তে আস্তে কাজ শুরু করতে হবে।

রেডিও তেহরান:  সাম্প্রতিক আন্দোলনের পর সড়ক পরিবহন খাতের উন্নয়নে সরকার যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে তাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

গোলাম মোর্তজা: খসড় সড়ক পরিবহন আইন যে-ভাষায় লেখা হয়েছে এবং যেসব ধারা আছে তাতে ভালো ভালো অনেক কথা আছে। তবে সামগ্রিকভাবে সরকারের রাজনৈতিকভাবে নীতিগত সিদ্ধান্তের জায়গায় যদি পরিবর্তন না আসে তাহলে কিছু হবে না। শাজাহান খানদেরকে  সরকারের অংশীদার করে এই নীতি ও আইন বাস্তবায়ন করা সম্ভব না। মালিকদের কাছে জিম্মি থেকে সরকারের পক্ষে এই নীতি বাস্তবায়ন করা সম্ভব না।#

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/১৮

ট্যাগ

২০১৮-০৮-১৮ ১২:০৪ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য