জীবনযাপনের ইসলামি পদ্ধতি ও দিক নির্দেশনা বিষয়ক ধারাবাহিক অনুষ্ঠান “আদর্শ জীবনযাপনের" আজকের আসরে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। আমরা গত দুটি আসরে একটু ভিন্নরকম বিষয় নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করেছি।

বিষয়টি হলো আত্মকেন্দ্রিক মনোভাব পরিহার করে অন্যদের সঙ্গে পরামর্শ ভিত্তিক কাজ করা। যে-কোনো সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে বিভিন্ন রকমের মতামত, চিন্তা বা পরামর্শ পাওয়া গেলে সমাধানের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে ভালো সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়।

সুতরাং সমস্যা সমাধানে সাফল্যে পৌঁছার সম্ভাবনাও বেড়ে যায়। শুধু তাই নয় পরামর্শ করার ফলে অভিজ্ঞ ও চিন্তাশীলদের চিন্তাকেও কাজে লাগানোর একটা সুযোগ সৃষ্টি হয়। আর অভিজ্ঞদের চিন্তার প্রভাবে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি এবং চিন্তাও গভীর হয়, সমৃদ্ধ হয়। যাই হোক আজকের আসরে আমরা মানুষের চিন্তাশক্তি, সৃজনশীলতা এবং নতুন নতুন মতবাদ ও দর্শন সৃষ্টিতে মেধা ও সৃষ্টিশীলতার বিষয় নিয়ে কিছু কথা বলার চেষ্টা করবো।

আমেরিকার মিনিসোটা অঙ্গরাজ্যের এক নি:সঙ্গ বৃদ্ধের গল্প দিয়ে শুরু করা যাক আজকের আলোচনা। ওই বৃদ্ধ চেয়েছিল তার আলু খামার চাষ করতে। কিন্তু কাজটা বৃদ্ধের জন্য কিছুটা কঠিনই ছিল। তার একমাত্র ছেলেটি যে এ কাজে তাকে সাহায্য করতে পারতো সে ছিল তখন কারাবন্দি। বৃদ্ধ তার ছেলেকে একটা চিঠি লিখলো: "প্রিয় সন্তান আমার! মনটা খুব ভালো বলা যাবে না। কেননা এ বছর আমি আমার আলু ক্ষেত চাষ করতে পারছি না। আবার চাচ্ছিও না ক্ষেতটা হাতছাড়া করি। কারণ তোমার মা এই ক্ষেতটিতে চাষ করাটা পছন্দ করতো। কিন্তু দু:খজনক বিষয়টি হলো এই ক্ষেতে এখন চাষ করার মতো সেই শক্তিমত্তা আমার নেই, বার্ধক্য জেঁকে বসেছে আমাকে। তুমি থাকলে তো জমিটা চাষ করার মতো করে তৈরি করতে পারতে। আমার সমস্যাটাও সমাধান হয়ে যেত"। ইতি: তোমারই প্রিয় পিতা।

 

এই চিঠির জবাবে ছেলে তার বৃদ্ধ পিতাকে একটি টেলিগ্রাফ পাঠিয়েছিল। টেলিগ্রাফে লেখা ছিল অবাক করা একটি বাক্য: "প্রিয় পিতা আমার! আল্লাহর ওয়াস্তে তুমি ওই জমিতে চাষ করো না। আমি ওখানে একটা মৃতদেহ মাটিচাপা দিয়ে রেখেছি"। পরদিন সকালেই এফবিআই'য়ের বারোজন বিশেষ কর্মকর্তা বেশ কিছু পুলিশ অফিসার সঙ্গে নিয়ে হাজির হয়ে গেল ওই কৃষিক্ষেতে। পুরো ক্ষেতটাকে তন্ন তন্ন করে কুপিয়ে কুপিয়ে দেখা হলো। কিন্তু কোনো মৃতদেহই সেখানে খুঁজে পাওয়া গেল না। বৃদ্ধ বিস্ময়ের সঙ্গে আবারও একটি চিঠি লিখলো তার ছেলেকে। চিঠিতে বললো যা যা ঘটেছে, সব। ছেলেও আবার জবাবে লিখলো: বাবা! এবার যাও! জমি তো আবাদ করা হয়ে গেছে। তুমি এখন চাষ করো! আলু লাগাও। তোমার কাছ থেকে দূরে অবস্থান করে আমার পক্ষে এরচেয়ে ভালো কিছু করার ছিল না।

এই গল্পে 'সৃজনশীল চিন্তা'র বিষয়ে ইঙ্গিত রয়েছে। এই সৃজনশীলতাই মানুষকে পৃথিবীর অপরাপর সৃষ্টি থেকে স্বতন্ত্র মহিমা ও মর্যাদা দিয়েছে। চিন্তার শক্তি,নতুন যন্ত্র আবিষ্কার ও আবিষ্কারের ক্ষমতা, নতুন নতুন উদ্ভাবনী ইত্যাদি মানুষের এই চিন্তা ও সৃজনশীল শক্তি ও ক্ষমতারই অবদান। সকল মানুষই কমবেশি সৃজনশীল। আমাদের বুদ্ধিমত্তার মতোই এই সৃজনশীলতার মাত্রা একেকজনের একেক পর্যায়ের। তবে সবার ভেতরেই এই সৃজনশীলতা রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো সেই সৃজনশীলতাকে নিজের মাঝে আবিষ্কার করা এবং তার বিকাশ ঘটানোর মাধ্যমে তাকে কাজে লাগানো। চিন্তাশীলদের অভিমত হলো উন্নয়ন ও অগ্রগতি বাজেট নিশ্চিত করা কিংবা প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও অর্থের ওপর নির্ভর করে না। বরং সৃজনশীল ব্যক্তির মেধা ও বুদ্ধিমত্তা এবং তার সুদূরপ্রসারী ভাবনাতেই উন্নয়ন ও অগ্রগতির সিঁড়ি খুঁজে দেখাটা গুরুত্বপূর্ণ।

 

সমস্যার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার সবচেয়ে উত্তম হাতিয়ার হলো সৃজনশীল চিন্তা। যে তার মাঝে নিজস্ব মেধা ও প্রতিভার বিকাশ না ঘটাবে, সে নিজেকেই হারালো। সৃজনশীল ব্যক্তিরা এই নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিকে যুদ্ধের আগেই আত্মসমর্পণ বলে মনে করেন। কেননা সমস্যা যে কেবল ঝামেলা তা কিন্তু নয় বরং সমাধানের উপায় খুঁজে বের করার জন্য একটা সংগ্রামও বটে। সুতরাং মানবীয় পূর্ণতার মূল উপাদান তার চিন্তা চেতনার মধ্যেই নিহিত। এই চিন্তাশক্তির কারণেই মানুষ সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি বা আশরাফুল মাখলুকাত শিরোপা লাভ করেছে। এ কারণেই ইসলামে মানুষকে চিন্তা-ভাবনা করতে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে।

মহাবিশ্বের স্রষ্টা কুরআনের ভাষ্য অনুযায়ী মহান প্রজ্ঞাময়। সূরা হিজরের ৮৬ নম্বর আয়াতে যেমনটি বলা হয়েছে: 'নিশ্চিতভাবে তোমার রব সবার স্রষ্টা এবং সবকিছু জানেন'।

তিনি তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষকে তার সৃজনশীলতার ব্যাপারে সচেতন হবার পরামর্শ দিয়েছেন। সূরা আনআমের ১০৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: দেখো,তোমাদের কাছে তোমাদের রবের পক্ষ থেকে অন্তরদৃষ্টির আলো এসে গেছে৷ এখন যে ব্যক্তি নিজের দৃষ্টিশক্তিকে কাজে লাগাবে,সে নিজেরই কল্যাণ সাধন করবে৷ আর যে অন্ধ সাজবে,সে নিজেই নিজের ক্ষতি করবে৷ আমি তো তোমাদের পাহারাদার নই।(এবং তোমাদেরকে ঈমান আনার জন্য কোনোরকম বাধ্য করবো না)।

বলা যেতে পারে কুরআনের সংস্কৃতিতে সৃজনশীল চিন্তাধারার প্রয়োজনীয়তার ওপর ব্যাপক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ওই সৃজনশীল চিন্তাধারা হতে হবে জ্ঞান ও বিশ্বাসের উপর নির্ভরশীল এবং গতিময়। যাই হোক শ্রোতাবন্ধুরা! হাতে আজ আর সময় নেই। যারা দীর্ঘ সময় ধরে আমাদের সঙ্গ দিলেন সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো:আবুসাঈদ/  ১৮

খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন 

২০১৮-০৮-১৮ ১৮:৩৬ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য