রংধনু আসরের বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই হিংসা-বিদ্বেষ শব্দ দু'টির সঙ্গে পরিচিত এবং হিংসুটে লোকদের আচরণ সম্পর্কে কমবেশি জানো। মানুষের মধ্যে এমন কিছু রোগ আছে যেগুলো চিকিৎসার মাধ্যমে দূর করা সম্ভব হয় না তেমনি হিংসা মানুষের অন্তরের এমন একটি দুরারোগ্য ব্যাধি, যা সামাজিক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে, সমাজে নানা ফেতনা ফাসাদ সৃষ্টি করে। হিংসা-বিদ্বেষের ফলে মানুষ কারো বিরুদ্ধে চক্রান্ত, ষড়যন্ত্র এমনকি সম্পর্কচ্ছেদ করতেও দ্বিধা করে না।  

এসব কারণে ইসলাম ধর্মে হিংসার ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা. আ.) বলেছেন, ‘তোমরা পরস্পর হিংসা-বিদ্বেষ কর না, ষড়যন্ত্র কর না এবং সম্পর্ক ছিন্ন কর না। বরং তোমরা আল্লাহতায়ালার বান্দা হিসেবে পরস্পর ভাই ভাই হয়ে যাও।’

হিংসা এক ধরনের বিষ। প্রথমে এই বিষ হিংসুকের নিজের জীবনটাকে তিক্ত, অতিষ্ঠ এবং বেদনাপূর্ণ করে তুলে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়, তারপর ঐ বিষ ছড়িয়ে পড়ে পুরো সমাজ ব্যবস্থায়। হত্যা, খুন, রাহাজানি, বিশ্বাসঘাতকতার মতো বিচিত্র সামাজিক সংকটের মূলে রয়েছে এই হিংসার বিষ। পবিত্র কুরআনে তাই এই হিংসাকে মানুষের জন্যে ভয়ংকর হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সূরা ফালাকের পঞ্চম আয়াতে বলা হয়েছে: “এবং (আশ্রয় চাচ্ছি) হিংসুকের অনিষ্টকারিতা থেকে, যখন সে হিংসা করে।”

বন্ধুরা, হিংসা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা শুনলে। আজকের আসরে আমরা এ সম্পর্কেই একটি গল্প শোনাব।  

সেনাবাহিনীর এক কর্নেলের একটা ছেলে ছিল বেশ চালাক চতুর। জ্ঞানে গুণেও ছিল সমৃদ্ধ। সৃজনশীলতা আর শৈল্পিক নৈপুণ্যও ছিল উল্লেখ করার মতো। বাদশাহ ওই কর্নেল পুত্রের গুণবৈশিষ্ট্যের ব্যাপারে জানতেন এবং সে কারণে তাকে দেশের একটা গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দিলেন। যেহেতু সে ছিল খুবই বুদ্ধিমান সে কারণে বিবেক বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে সকল কাজই নৈপুণ্যের সাথে আঞ্জাম দিত। বাদশাহ এবং তাঁর সভাসদ কর্নেল পুত্রের নৈপুণ্য দেখে বলতেন ‘এই ছেলের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল’।

ছেলেটার সবচেয়ে ভালো একটা গুণ ছিল যা সবাইকে আকৃষ্ট করত। সেটা হলো সে জানত সম্মান পেতে হলে সম্মান দিতে হয়, ভালোবাসা পেতে হলে ভালোবাসতে হয়। সেজন্য সে সবার সাথে ভালো ব্যবহার করত। সবাইকে সম্মান দিয়ে কথা বলত। সবাইকেই সমানভাবে ভালবাসত। স্বাভাবিকভাবেই সবাই তাকেও ভালবাসতো।

বাদশাহ উজির নাজির রাজদরবারের অন্যান্যরা সবার কাছেই সে ছিল প্রিয় এবং সম্মানিত ব্যক্তি। কিন্তু যাদের মন সংকীর্ণ তারা সহজেই তাকে মেনে নিতে পারল না। বিশেষ করে রাজ দরবারে একজন ছিল তাকে ভেতরে ভেতরে ভালোতো বাসতোই না বরং মনে মনে হিংসা করতে লাগল। এই হিংসুকের সাথে আরও যারা ছিল তারা মিলে সারাক্ষণ সুযোগের অপেক্ষা করতে লাগল কীভাবে কর্নেল পুত্রের উন্নতি ও অগ্রগতির পথে বাধা সৃষ্টি করা যায়। হিংসুকের দল খালি এ চিন্তাই করতো কীকরে বাদশার কাছে তাকে দোষী ও নিন্দনীয় করে তোলা যায়। আর বাদশার সামনে যদি একবার তাকে ঘৃণ্য বলে সাব্যস্ত করা যায় তাহলে আর যায় কোথায়! সবার কাছেই সে হয়ে উঠবে গুরুত্বহীন ও উপহাসের পাত্র।

কর্নেলপুত্রকে অপদস্ত করার জন্য সবাই যার যার চিন্তা ও পরিকল্পনা অন্যদের কাছে শেয়ার করত। কিন্তু কারও চিন্তা বা বুদ্ধিই তেমন যুতসই হচ্ছিল না। পেরে না ওঠায় হিংসুকের দল মনে মনে কর্নেল পুত্রের মৃত্যু কামনা করতে লাগল। অবশেষে তারা সবাই মিলে একটা বুদ্ধি করল। তারা কর্নেল পুত্রের বিরুদ্ধে মারাত্মক একটা অপবাদ তুলল। অপবাদটা হলো সে বাদশার সাথে ভয়াবহ খেয়ানত মানে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।

কিন্তু এতবড় অপবাদ বাদশার কানে তুলেও কোনো কাজ হল না। কেননা বাদশাহ তাকে ভালো করেই জানত এবং তাকে ভালোবাসত। তার ওপর বাদশার অগাধ বিশ্বাস ছিল। বাদশাহ তাই তার বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ কানেই তুলল না।

হিংসুকের দল বেশ কয়েকবার বাদশার সামনে গিয়ে কর্নেল-পুত্রের বিরুদ্ধে তাদের ষড়যন্ত্রমূলক অভিযোগগুলো পাড়ল। শুধু অভিযোগই নয় তার বিরুদ্ধে অনেক বদনাম, অনেক কুৎসা বানিয়ে বানিয়ে বলল। কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না। বাদশাকে কিছুতেই বিশ্বাস করাতে পারল না।     

এরপর কেটে গেল বেশ কিছুটা সময়। বাদশাহ দেখল এদের শত্রুতা তো সীমাহীন, শেষ হবার নয়। বাদশাহ ভেবে-চিন্তে শেষ পর্যন্ত ভাবলেন কর্নেল-পুত্রকে একবার ডেকে পাঠাবেন। কেন হিংসুকের দল তার বিরুদ্ধে এরকম অভিযোগ তোলে, তাদের এই শত্রুতার কী কারণ সেটা জানার জন্যই তাকে তলব করবেন। বাদশাহ আরও ভাবলেন তার বিরুদ্ধে তার শত্রুরা যে অভিযোগ করেছে সে ব্যাপারে তার বক্তব্য কী-জানতে চাইবেন।

যেই চিন্তা সেই কাজ। একদিন বাদশাহ ওই তরুণকে ডেকে পাঠালেন। সরাসরি তাকে জিজ্ঞস করলেন: এরা যে তোমার বিরুদ্ধে এতো শত্রুতা করছে- এর কারণ কী?

তরুণ খানিকটা চিন্তা করলেন। তারপর বিরক্তির সাথে বললেন: আমি আমার চারপাশের লোকজনের সঙ্গে এবং যাদের সাথে আমি কাজ করি তাদের সবার সাথে ভালো ব্যবহার করি। সবাইকেই আমি কোনো না কোনোভাবে আমার প্রতি সন্তুষ্ট রাখার চেষ্টা করি। যার মনে বিন্দুমাত্র সততা এবং ন্যায়নীতি বোধ আছে সে আমার বিরুদ্ধে আনা এসব অভিযোগ বিশ্বাস করবে না। সত্যি বলতে কী, আমি আমার বিবেক দিয়ে, বুদ্ধি দিয়ে জ্ঞান এবং সচেতনতা দিয়ে আমার প্রতি তাদের বিশ্বাস এবং ভালোবাসা আদায় করতে সক্ষম হয়েছি। কেবল সেইসব হিংসুক লোক যারা আমার মৃত্যু আর ধ্বংস কামনা করা ছাড়া অন্য কিছুই ভাবে না তাদেরকে তুষ্ট করতে পারি নি। তারা যখন দেখে আমি দিনের পর দিন উন্নতি আর অগ্রগতির সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে যাচ্ছি, অনেক উঁচু পদে অধিষ্ঠিত হচ্ছি, তারা তখন চেষ্টা করে কী করে আমার অগ্রগতি আর উন্নতির পথে বাধার প্রাচীর তুলবে। যেহেতু তারা আমার পদ, আমার অবস্থান ইত্যাদি নিয়ামত থেকে আমাকে দূরে সরাতে পারছে না সেজন্যই তারা হিংসায় জ্বলে পুড়ে মরে। কেউ কেউ তো তাদের হিংসার সীমা ছেড়ে গিয়ে আমার শত্রুতে পরিণত হয়েছে। এরা এখন আমার ধ্বংস ছাড়া আমার মৃত্যু ছাড়া অন্য কিছুই ভাবতে পারছে না। আমার বুঝে আসে না এই হিংসুকের দলের সাথে কী করব? আমার যেটুকু বিবেক বুদ্ধি আছে যেটুকু জ্ঞান গরিমা আছে তা দিয়ে আমি সব কাজই করতে পারব। কিন্তু হিংসুকের দলকে সৎ পথে আনা কিংবা তাদের মন থেকে হিংসার কালো বিষ মুছে ফেলা-এটা পারব না।

কর্নেল-পুত্রের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনলেন বাদশা। তারপর বললেন: তুমি ঠিকই বলেছ, হিংসুকের জন্য করার কিছুই নেই। শোনোনি, মনীষীরা বলে গেছেন: হিংসুক যতোটা না অন্যকে কষ্ট দেয়, তার চেয়ে বেশি কষ্ট সে নিজে ভোগ করে।*

বন্ধুরা, হিংসুকদের চরিত্র সম্পর্কে বাদশা যে কথা বললেন একই ধরনের কথা বলেছেন ইরানের বিশিষ্ট মুফাসসিরে কুরআন আয়াতুল্লাহ মাকারেম শিরাযি তাঁর “কুরআনে নৈতিকতা” শীর্ষক বইতে। হিংসা এবং হিংসার পরিণতি সম্পর্কে তিনি ইমাম আলী (আ) এর বক্তব্য ও দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে:

“হিংসুক স্থায়ী কষ্টে ভোগে। এ কারণে হিংসুক মনোদৈহিক রোগে আক্রান্ত হয়। আল্লাহকে চেনা, সত্যকে উপলব্ধি করা কিংবা মারেফাত তথা আধ্যাত্মিকতার পথে হিংসা কঠিন হিজাব বা পর্দার মতো আড়াল তৈরি করে। হিংসুক ব্যক্তি সবাইকে হিংসা করে এমনকি নিজের আপনজনদেরকেও। এর ফলে হিংসুক লোক বন্ধু হারাতে বাধ্য। হিংসু কখনোই উচ্চ বা মহৎ পর্যায়ে যেতে পারে না, সে সবসময়ই বেদনাক্রান্ত থাকে। গুণাহের সাথে তার সম্পর্ক ক্রমশ বাড়তেই থাকে।#

পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/১৮

ট্যাগ

২০১৮-০৮-১৮ ১৮:৫২ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য