জীবনযাপনের ইসলামি পদ্ধতি ও দিক নির্দেশনা বিষয়ক ধারাবাহিক অনুষ্ঠান “আদর্শ জীবনযাপনের" আজকের আসরে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। আমরা গত আসরে মানুষের চিন্তাশক্তি, সৃজনশীলতা এবং নতুন নতুন মতবাদ ও দর্শন সৃষ্টিতে মেধা ও সৃষ্টিশীলতার বিষয় নিয়ে কিছু কথা বলার চেষ্টা করেছি। সৃজনশীলতার উদাহরণ প্রসঙ্গে আমরা আমেরিকার মিনিসোটা অঙ্গরাজ্যের এক বৃদ্ধ ও তার ছেলের গল্প বলেছিলাম।

সবার ভেতরেই এই সৃজনশীলতা রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো সেই সৃজনশীলতাকে নিজের মাঝে আবিষ্কার করা এবং তার বিকাশ ঘটানোর মাধ্যমে তাকে কাজে লাগানো। চিন্তাশীলদের অভিমত হলো উন্নয়ন ও অগ্রগতি বাজেট নিশ্চিত করা কিংবা প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও অর্থের ওপর নির্ভর করে না। বরং সৃজনশীল ব্যক্তির মেধা ও বুদ্ধিমত্তা এবং তার সুদূরপ্রসারী ভাবনাতেই উন্নয়ন ও অগ্রগতির সিঁড়ি খুঁজে দেখাটা গুরুত্বপূর্ণ। সমস্যার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার সবচেয়ে উত্তম হাতিয়ার হলো সৃজনশীল চিন্তা। মনে রাখতে হবে সমস্যা কেবল ঝামেলাই নয় বরং সমাধানের উপায় খুঁজে বের করার একটা সুযোগও বটে।

মানুষ তার চিন্তা শক্তি, উপলব্ধি এবং ইন্দ্রিয়শক্তিকে কাজে লাগিয়ে নতুন নতুন মতবাদ ও উদ্ভাবনীতে অবদান রাখতে পারে বা রাখে। সৃষ্টিশীল চিন্তায় প্রভাবশালী এবং গুরুত্বপূর্ণ যে শক্তিগুলো কাজ করে তাদের মধ্যে রয়েছে আত্মশুদ্ধি, দৃষ্টির প্রখরতা বা দূরদৃষ্টি, আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগি ও তাঁর স্মরণ, তাঁকে চেনা, জ্ঞান ও সচেতনতা ইত্যাদি। আল্লাহর ইবাদতের পাশাপাশি গভীর চিন্তা-ভাবনা করার ফলে অন্তরাত্মা প্রশান্ত হয়, কল্পনা ও আইডিয়ার নতুন নতুন দ্বার উন্মুক্ত হয়। ইসলামের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যুগে যুগে মুসলিম মনীষীগণ তাঁদের জীবনব্যাপী এ কাজগুলো করেছেন এবং সৃজনশীলতা ও নতুন নতুন উদ্ভাবনীর ক্ষেত্রে সফলতা লাভ করেছেন।

এই চিন্তা-ভাবনা আর জ্ঞানচর্চার গুরুত্ব ইসলামে অপরিসীম। বলা হয়েছে এক ঘণ্টা গবেষণা করা বছরের পর বছর ইবাদত করার চেয়ে বেশি মূল্যবান। পবিত্র কুরআনে এক শ বারেরও বেশি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে তারা যেন চিন্তাভাবনা করে, শোনে,মনোযোগ দেয়,তুলনা করে বা পরিমাপ করে,ভাবে,বুদ্ধি ও বিবেকের চর্চা করে,বিচার বিবেচনা করে সর্বোপরি মেধাকে যেন কাজে লাগায়। বহু আয়াতের শেষাংশে এভাবে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে: তোমরা কি চিন্তা করে দেখছো না? তোমরা কি তোমাদের জ্ঞান বুদ্ধি একটুও কাজে লাগাও না ? তারা কি কুরআন সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করে না ?

কুরআনে আল্লাহ তার বান্দাদেরকে তাদের চিন্তাশক্তি কাজে লাগাচ্ছে না কেন সে ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করার কথা বলছিলাম আমরা। তবে এভাবে প্রশ্ন করার পাশাপাশি বহু জায়গায় আল্লাহর এই সৃষ্টি মানুষকে বিশ্বের বিচিত্র অজানা রহস্য নিয়ে ভাবতে, গবেষণা করতে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। পাশাপাশি যারা চিন্তাশক্তি, মেধা ও মননকে কাজে লাগায় না তাদেরকে অন্ধ, বধির এমনকি চতুষ্পদ জন্তু কিংবা তাদের চেয়েও নিকৃষ্ট বলে তিরস্কার করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনের সূরা আরাফের ১৭৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: " আর এটি একটি অকাট্য সত্য যে,বহু জিন ও মানুষ এমন আছে যাদেরকে আমি জাহান্নামের জন্যই সৃষ্টি করেছি। তাদের হৃদয় আছে কিন্তু তা দিয়ে তারা উপলব্ধি করে না। তাদের চোখ আছে কিন্তু তা দিয়ে তারা দেখে না। তাদের কান আছে কিন্তু তা দিয়ে তারা শোনে না। তারা পশুর মত বরং তাদের চাইতেও অধম। তারা চরম গাফলতির মধ্যে হারিয়ে গেছে"।

কুরআন এমনকি যারা তাদের বিবেক-বুদ্ধি,মেধা ও প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে কোনো বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করে না,তাদেরকে অকর্মণ্য, উপলব্ধিহীন, অসচেতন প্রাণী বলে তিরস্কার করা হয়েছে। সূরা আনফালে বলা হয়েছে: "আর তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না,যারা বলে যে, আমরা শুনেছি,অথচ তারা শোনেনা। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তা’আলার নিকট সমস্ত প্রাণীর তুলনায় তারাই মূক ও বধির,যারা উপলব্ধি করে না"। সুতরাং এটা সুস্পষ্ট যে পবিত্র কুরআন "লা ইয়াকিলুন" বলে তাদেরকেই বুঝিয়েছে যারা নিজেদের বিবেক বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে সৃষ্টি ও স্রষ্টার হাকিকত উপলব্ধি করার চেষ্টা করে না। এই সৃজনশীল শক্তি ও মেধাকে কাজে না লাগানোর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে কুরআন বলেছে: অন্ধ বিশ্বাস, অন্ধ অনুকরণ-অনুসরণ, নিষ্ক্রিয়তা, উদ্যমহীনতা, ধর্মান্ধতা, কু-সংস্কার, গোঁড়ামি, মূর্খতা, প্রবৃত্তিগতভাবে চিন্তাশক্তির অভাব এবং কথাকে বাস্তবে কাজে না লাগানো ইত্যাদি।                   

সৃজনশীল শক্তি ও মেধাকে কাজে না লাগানোর গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলো নিয়ে কথা বলছিলাম। পবিত্র কুরআনের বহু আয়াতে মানুষকে পূর্বসূরিদের অন্ধ অনুসরণ না করতে উপদেশ দেওয়া হয়েছে। সেইসঙ্গে নতুন ও উত্তম আদর্শ গ্রহণ করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। সূরা যুমারের ১৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: "যারা মনোযোগ দিয়ে কথা শোনে এবং তার ভাল দিকটি অনুসরণ করে, এরাই সেসব মানুষ যাদের আল্লাহ হিদায়াত দান করেছেন এবং এরাই বুদ্ধিমান"। বর্ণনায় এসেছে রাসূলে আকরাম (সা) চেষ্টা করতেন পথ চলার ক্ষেত্রে যে রাস্তা দিয়ে একবার গেছেন বিকল্প থাকলে সেই রাস্তায় না যেতে। এর মানে হলো মানুষের উচিত প্রতিদিনই নতুন নতুন পথের সন্ধান করা। একই পথ নিয়ে পড়ে না থাকা। দুটি পথ থাকলে তৃতীয় পথ  কী করে তৈরি করা যায় তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা। ধর্মীয় নেতাদের বক্তব্যে তাই শুনতে পাওয়া যায়: মুসলমানদের আজ যদি গতকালের সঙ্গে মিলে যায় মানে উন্নয়নহীন একইরকম হয় তাহলে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হলো।

 

মানুষ জ্ঞান-গবেষণা, চিন্তা-ভাবনা, নতুন নতুন উদ্ভাবনী শক্তি ছাড়া একঘেঁয়ে হয়ে যায়। জীবনে তাদের কোনোরকম উন্নতি কিংবা পরিবর্তন আসে না। আর এই পরিস্থিতিতে অপরাপর সৃষ্টির সঙ্গে মানুষকে আলাদা ভাববার সুযোগ থাকে না।  মানুষের সঙ্গে অন্যান্য সৃষ্টির পার্থক্য হলো বৈজ্ঞানিক চিন্তা-ভাবনা এবং উদ্ভাবনী শক্তির মধ্যে। মানুষ নতুন নতুন সৃষ্টি করতে পারঙ্গম। সেজন্যই তাদেরকে কেউ বলেন বোধ-বুদ্ধি ও বিবেক সম্পন্ন প্রাণী বলে মনে করেন, কেউ মনে করেন সৃজনশীল প্রাণী।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো:আবুসাঈদ/  ২৫

খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন 

২০১৮-০৮-২৫ ১৭:০০ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য