গত আসরে আমরা মানব সভ্যতা বিনির্মাণে ইসলামের অবদান সম্পর্কে আলোচনা করেছি। আজকের আসরে আমরা কথা বলব মহাগ্রন্থ আল-কুরআন নিয়ে।

মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনকে হেদায়েত বা সঠিক পথ প্রদর্শনকারী গ্রন্থ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আর এটি হচ্ছে কুরআনুল কারিমের সবচেয়ে বড় পরিচয়।  রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নবুওয়াতের সুস্পষ্ট প্রমাণ এই মহাগ্রন্থ আল-কুরআন। আজকের আসরে আমরা নিজ উম্মতের জন্য বিশ্বনবী (সা.)-এর রেখে যাওয়া এই মহাগ্রন্থ সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করব।

কিয়ামত পর্যন্ত মানব জাতিকে সঠিক পথ প্রদর্শনের জন্য আল্লাহ তায়ালা সর্বশেষ নবী ও রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর প্রতি কুরআন নাজিল করেছেন। দীর্ঘ ২৩ বছরে ধীরে ধীরে তাঁর প্রতি এই কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে। মহানবী মানুষের সামনে এই কুরআনের আয়াত পড়ে শোনাতেন এবং তারা মন্ত্রমুগ্ধের মতো তা শুনে ইসলাম গ্রহণ করত।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কুরআনের যেমন বাহ্যিক একটি অবয়ব রয়েছে তেমনি এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য অনেক গভীর। কুরআনের আয়াতগুলোর গভীর মর্মার্থ দেখে মক্কার কাফের ও মুশরিকরা হতবাক হয়ে যেত। এদের মধ্যে যাদের গোঁড়ামি ও অহংকার ছিল না তারা কুরআনের বাণী শোনার সঙ্গে সঙ্গে মুসলমান হয়ে যেত। আর যারা ইসলাম গ্রহণ করেনি তারা গোঁয়ার্তুমি পরিত্যাগ না করার কারণে দুর্ভাগা হয়ে ইহকাল ত্যাগ করেছে।

কুরআনের মর্মার্থের পাশাপাশি এটি তেলাওয়াতের সুমধুর সুর শুনেও বহু মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে। সাবিদ বিন সামিত ছিল মক্কার একজন বিগদ্ধ কবি। কুরাইশের মুশরিকরা এই কবির কাছে ধর্ণা দিয়েছিল কুরআনের বিপরীতে কিছু কাব্য রচনা করতে। জবাবে অনেক প্রচেষ্টার পর ব্যর্থ হয়ে বিন সামিত বলেছিল, “মুহাম্মাদ কোনো কবি বা যাদুকর নন। মহান সৃষ্টিকর্তার শপথ, তার মুখ থেকে উচ্চারিত বাক্যগুলোর আলাদা মাধুর্য রয়েছে এবং এর চেয়ে উচ্চমানের কাব্য আর হতে পারে না।”

কুরআনুল কারিমের এতটা আকর্ষণ শক্তি ছিল যে, আবু সুফিয়ান ও আবু জেহেলসহ এ ধরনের নেতৃস্থানীয় কাফেররা রাতের বেলায় বিশ্বনবীর ঘরের চারপাশে ভিড় করত তাঁর মুখে কুরআনের বাণী শোনার জন্য।

তারা রাসূলের কণ্ঠে কুরআন তেলাওয়াত শুনে অভিভূত হয়ে যেত। কিন্তু তারা পূর্বপুরুষদের ভ্রান্ত পথে অটল থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বলে এই বাণী কবুল করেনি। তারা বরং অন্যরা যাতে কুরআন তেলাওয়াত শুনতে না পারে সেজন্য সবাইকে রাসূলের ঘরের দিকে যেতে নিষেধ করত। কুরাইশ নেতারা সাধারণ মানুষের জন্য কুরআনের আয়াত শোনা নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু তাদের এই নিষেধাজ্ঞায় অনেকের কৌতুহল বেড়ে যায় এবং তারা গোপনে কুরআনের বাণী শুনে ইসলাম গ্রহণ করে।

পবিত্র কুরআন মানুষকে আরো বেশি চিন্তাভাবনা করতে এবং আরো বেশি জ্ঞান অর্জন করতে উৎসাহিত করেছে। কুরআন জ্ঞানী ও বুৎপত্তিসম্পন্ন মানুষের প্রশংসা করার পাশাপাশি যারা চিন্তাভাবনা করে না তাদেরকে অন্ধ, বোবা ও বধির বলে ভর্ৎসনা করেছে। এ ধরনের মানুষকে পশুর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।

 

মহান আল্লাহ মানুষকে তার বুদ্ধি ও প্রজ্ঞার সর্বোচ্চ ব্যবহার করার এবং অন্ধভাবে কোনো কিছু অনুসরণ না করার আহ্বান জানিয়েছেন। যারা কুরআনের আয়াত তেলাওয়াত করে কিন্তু এর অর্থ গভীরভাবে উপলব্ধি করে না তাদেরকে ভর্ৎসনা করে সূরা মুহাম্মাদের ২৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: “তারা কেন কোরআনের বিষয়বস্তু সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করে না? তাদের অন্তর কি তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে?” ইসলামের প্রাথমিক যুগে চিন্তা ও জ্ঞানের প্রসার ঘটেছিল বলে মুসলিম সমাজ দ্রুত গতিতে জ্ঞান বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় উন্নতি করেছিল। সবাই তখন এ কথা উপলব্ধি করেছিল যে, এই কুরআন শুধু একটি পবিত্র ধর্মগ্রন্থ নয় বরং এতে মানুষের জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপের জন্য দিকনির্দেশনা রয়েছে।

পৃথিবীতে মানবসৃষ্ট আইনগুলোতে প্রতি মুহূর্তে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। মানুষের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা হচ্ছে এর প্রধান কারণ। যখন প্রথম আইন তৈরি করা হয় তখন এর পরিণতি সম্পর্কে মানুষের সঠিক ধারণা থাকে না। এ ছাড়া, এসব আইন সব মানুষের সব প্রয়োজন মেটাতেও অক্ষম। কিন্তু অপার জ্ঞানের অধিকারী ও মহাপ্রজ্ঞাময় আল্লাহ মানুষের জন্য যেসব আইন ও বিধান দিয়েছেন তা চিরস্থায়ী। কিয়ামত পর্যন্ত যত মানুষ পৃথিবীতে আসবে তাদের সবার ক্ষেত্রে এই বিধান প্রযোজ্য এবং এতে কোনো খুঁত নেই। কুরআনের একটি সূরা বা একটি আয়াতের সমান কোনো আয়াত আজ পর্যন্ত কোনো মানুষের পক্ষে তৈরি করা সম্ভব হয়নি। সূরা বাকারার ২৩ নম্বর আয়াতে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে, “যা আমি আমার বান্দার প্রতি অবতীর্ণ করেছি,তা সম্পর্কে যদি তোমাদের কোন সন্দেহ থাকে তাহলে এর মত একটি সূরা রচনা করে নিয়ে এস। (এই কাজে সাহায্য করার জন্য) তোমাদের সেসব সাহায্যকারী আছে তাদেরকে সঙ্গে নাও-এক আল্লাহকে ছাড়া,যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাকো।”

গত প্রায় ১৫শ বছর ধরে আল্লাহ তায়ালার এই চ্যালেঞ্জ কেউ গ্রহণ করতে পারেনি। এখান থেকে সুস্পষ্টভাবে উপলব্ধি করা যায়, মহাগ্রন্থ আল-কুরআন মানুষের সৃষ্ট কোনো কিতাব নয়। সূরা নাজমের ৪ নম্বর আয়াতে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে, “কোরআন হচ্ছে ওহী,যা (আল্লাহর পক্ষ থেকে) প্রত্যাদেশ হয়।” এ ছাড়া, পবিত্র কুরআনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- এতে কোনো প্রকার পরিবর্তন বা পরিবর্ধন করা সম্ভব হয়নি। কারণ, আল্লাহ তায়ালা নিজে কুরআনকে সংরক্ষণ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “আমি কুরআন অবতীর্ণ করেছি এবং নিঃসন্দেহে আমি তা সংরক্ষণ করব।”

মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনকে মানুষের জন্য সৎপথ প্রদর্শনকারী গ্রন্থ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি যুগে যুগে পৃথিবীর মানুষকে সঠিক পথ প্রদর্শন করার জন্য যেসব নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন তাদের অনেকে মুজিযা বা অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন এবং কেউ কেউ মুজিযার পাশাপাশি আল্লাহর কাছ থেকে কিতাবও পেয়েছিলেন।

 

আমাদের প্রিয়নবী (সা.)-এর কাছে নাজিল হওয়া কুরআনের শুরুতেই বলা হয়েছে: “নিঃসন্দেহে এই কুরআন তাদের জন্য হেদায়েতের বাণী নিয়ে এসেছে যারা মুত্তাকি বা পরহেজগার।” এ ছাড়া, এই কুরআনের একটি অলৌকিক ক্ষমতা হচ্ছে এতে সব যুগের সব মানুষের জন্য সঠিক পথের দিশা রয়েছে। কুরআনের অমরত্ব এ বিষয়টি থেকেই উপলব্ধি করা যায় যে, এটির বাণী কোনো স্থান বা কালের জন্য সীমাবদ্ধ নয় এবং গত দেড় হাজার বছরে কেউ এই মহাগ্রন্থের কোনো দিকনির্দেশনাকে ব্যর্থ প্রমাণ করতে পারেনি। মহান আল্লাহ এই অলৌকিক গ্রন্থকে অজ্ঞতা, জুলুম ও অন্যায়ের অন্ধকার থেকে মুক্তি পেয়ে নূরের আলোয় উদ্ভাসিত হওয়ার গ্রন্থ বলে উল্লেখ করেছেন।  সূরা ইব্রাহিমের এক নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “...এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি-যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনেন...।”#

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ/ ২৫

খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন

ট্যাগ

২০১৮-০৮-২৫ ১৭:৩৬ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য