কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের আজকের পর্বে সূরা আল আহযাবের ৪৯ থেকে ৫০ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। এই সূরার ৪৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন,

 يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا إِذَا نَكَحْتُمُ الْمُؤْمِنَاتِ ثُمَّ طَلَّقْتُمُوهُنَّ مِنْ قَبْلِ أَنْ تَمَسُّوهُنَّ فَمَا لَكُمْ عَلَيْهِنَّ مِنْ عِدَّةٍ تَعْتَدُّونَهَا فَمَتِّعُوهُنَّ وَسَرِّحُوهُنَّ سَرَاحًا جَمِيلًا (49)

“হে মুমিনগণ! তোমরা যখন মুমিন নারীদেরকে বিবাহ কর, অতঃপর তাদেরকে স্পর্শ করার পূর্বে তালাক দিয়ে দাও, তখন তাদেরকে ইদ্দত পালনে বাধ্য করার অধিকার তোমাদের নাই। অতঃপর তোমরা তাদেরকে কিছু দেবে এবং উত্তম পন্থায় বিদায় জানাবে।” (৩৩:৪৯)

এই সূরার শুরুতে আমরা বলেছি, সূরা আহযাবের বেশিরভাগ জুড়ে পারিবারিক বিষয়ে দিকনির্দেশনা এসেছে। এই আয়াতে মুমিন ব্যক্তিদেরকে দাম্পত্য জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়ে বলা হচ্ছে: আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার পর মিলনের আগেই যদি স্বামী-স্ত্রী পরস্পর থেকে আলাদা হয়ে যেতে চায় তাহলে স্ত্রীকে ইদ্দত পূরণ করতে হবে না বরং তিনি তালাকের পরপরই অন্য পুরুষের সঙ্গে নতুন করে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবেন।

ইদ্দত হচ্ছে তালাকের পর একজন নারীর তিনটি ঋতু অতিক্রান্ত হওয়ার সময়। তালাকের পর নারীকে এই তিন মাস অপেক্ষা করতে হবে তার গর্ভবতী হওয়া বা না হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য।

আয়াতের পরবর্তী অংশে বলা হচ্ছে: যদি স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে মিলন না ঘটে তাহলে তালাকের সময় স্ত্রীকে উপযুক্ত পুরস্কার দিয়ে বিদায় করতে হবে। কি পরিমাণ উপহার দিতে হবে তা এই আয়াতে উল্লেখ না থাকলেও সূরা বাকারার ২৩৭ নম্বর আয়াতে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। সেখানে বলা আছে, এই ধরনের পরিস্থিতিতে বিয়ের সময় ধার্যকৃত মোহরানার অর্ধেক তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীকে দিতে হবে। এর পাশাপাশি তালাকের মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার সময় পরস্পরের সঙ্গে খারাপ আচরণ ও কথাবার্তা বলা যাবে না। বরং পরস্পরের প্রতি সম্মান ও সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে আলাদা হয়ে যেতে হবে।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. ইসলাম হচ্ছে পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এমনকি মতভেদ ও মতপার্থক্যের মতো বিষয়গুলোর জন্যও ইসলামে গঠনমূলক ও সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে।

২. স্ত্রীর মনস্তত্ত্বের ওপর তালাক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। কাজেই তার সঙ্গে উত্তম আচরণ করার পাশাপাশি অর্ধেক মোহরানা প্রদান করে সেই প্রভাব যতটা সম্ভব কমাতে হবে।

৩. কুরআনের সংস্কৃতিতে বিচ্ছেদের সময়ও স্বামী-স্ত্রীকে পরস্পরের প্রতি খারাপ আচরণ করতে নিষেধ করা হয়েছে। তাহলে বোঝা যাচ্ছে, স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবনে তাদেরকে কতটা হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।

সূরা আহযাবের ৫০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেছেন:

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِنَّا أَحْلَلْنَا لَكَ أَزْوَاجَكَ اللَّاتِي آَتَيْتَ أُجُورَهُنَّ وَمَا مَلَكَتْ يَمِينُكَ مِمَّا أَفَاءَ اللَّهُ عَلَيْكَ وَبَنَاتِ عَمِّكَ وَبَنَاتِ عَمَّاتِكَ وَبَنَاتِ خَالِكَ وَبَنَاتِ خَالَاتِكَ اللَّاتِي هَاجَرْنَ مَعَكَ وَامْرَأَةً مُؤْمِنَةً إِنْ وَهَبَتْ نَفْسَهَا لِلنَّبِيِّ إِنْ أَرَادَ النَّبِيُّ أَنْ يَسْتَنْكِحَهَا خَالِصَةً لَكَ مِنْ دُونِ الْمُؤْمِنِينَ قَدْ عَلِمْنَا مَا فَرَضْنَا عَلَيْهِمْ فِي أَزْوَاجِهِمْ وَمَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُمْ لِكَيْلَا يَكُونَ عَلَيْكَ حَرَجٌ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَحِيمًا (50)

“হে নবী! আপনার জন্য আপনার স্ত্রীগণকে হালাল করেছি, যাদেরকে আপনি মোহরানা প্রদান করেন। আর দাসীদেরকে হালাল করেছি, যাদেরকে আল্লাহ আপনার করায়ত্ব করে দেন এবং বিবাহের জন্য বৈধ করেছি আপনার চাচাতো বোন, ফুফাতো বোন, মামাতো বোন, খালাতো বোনকে যারা আপনার সাথে হিজরত করেছে। কোন মুমিন নারী যদি নিজেকে নবীর কাছে সমর্পন করে (অর্থাৎ নবীর কাছে মোহরানা না চায়), নবী তাকে বিবাহ করতে চাইলে সেও হালাল। এটা বিশেষ করে আপনারই জন্য-অন্য মুমিনদের জন্য নয়; (নবী হিসেবে) আপনার অসুবিধা দূরীকরণের উদ্দেশ্যে। মুমিনগণের স্ত্রী ও দাসীদের ব্যাপারে যা নির্ধারিত করেছি আমার জানা আছে। আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু।” (৩৩:৫০)

এই আয়াতে আল্লাহর রাসূল ও যেসব নারীর সঙ্গে বিবাহ হালাল তাদের প্রসঙ্গে দিক-নির্দেশনা এসেছে। এগুলোর মধ্যে আল্লাহর রাসূলের জন্য বিশেষভাবে নির্ধারিত একটি ক্ষেত্র ছাড়া বাকি সবগুলো ক্ষেত্রে রাসূল ও অন্য মুমিনদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। আত্মীয়দের মধ্যে চাচাতো, মামাতো, খালাতো ও ফুফাতো বোনকে এবং অনাত্মীয়দের মধ্যে যেকোনো মুমিন নারীকে বিয়ে করার অনুমতি ইসলামে রয়েছে। তবে বিয়ের অলঙ্ঘনীয় শর্ত হচ্ছে মোহরানা নির্ধারণ করতে হবে।

দাসীদের ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা এই যে, ইসলাম দাসপ্রথা তৈরি করেনি।  ইসলাম আবির্ভাবের সময়ে সারাবিশ্বে দাসপ্রথা প্রচলিত ছিল এবং যুদ্ধে গণিমত হিসেবে যেসব নারী বিজয়ী বাহিনীর হস্তগত হতো তাদেরকে দাসী হিসেবে ব্যবহার করা হতো। ইসলামের পক্ষে একতরফাভাবে যুদ্ধের এই আইন বাতিল করা সম্ভব ছিল না। কিন্তু তারপরও ইসলাম কিছু আইনকানুন ও রীতিনীতি প্রয়োগ করে দাসপ্রথা বিলুপ্ত করার চেষ্টা করেছে। ইসলাম মুসলমানদেরকে নানাভাবে দাস/দাসী মুক্ত করে দেয়ার জন্য উৎসাহিত করেছে। কিছু কিছু গোনাহ’র কাফফরা হিসেবে দাস/দাসী মুক্ত করে দেয়াকে অত্যন্ত সওয়াবের কাজ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ কারণে মুসলমানদেরকে দলে দলে ক্রীতদাস কিনে মুক্ত করে দিতে কিংবা দাসীদের বিয়ে করে তাদেরকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার সুযোগ দিতে দেখা গেছে।

এই আয়াতে রাসূলকে যে বিশেষ অধিকার দেয়া হয়েছে তা হলো কোনো নারী মোহরানা নিতে না চাইলে তার চাওয়া অক্ষুণ্ন রেখে আল্লাহর রাসূলকে বিয়ে করার অনুমতি দেয়া হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে আল্লাহর রাসূল কেন বহু বিবাহ করেছিলেন সে সম্পর্কে শত্রুদের কিছু অপবাদ এবং যারা না বুঝে এ সম্পর্কে প্রশ্ন করেন তাদের প্রশ্নের জবাব দেয়া প্রয়োজন।  ইতিহাসে এসেছে, আল্লাহর রাসূল (সা.) ২৫ বছর বয়সে নিজের চেয়ে বেশি বয়সি নারী হযরত খাদিজাকে বিয়ে করেছিলেন। এরপর বিবি খাদিজা যতদিন জীবিত ছিলেন ততদিন রাসূলে খোদা আর কাউকে বিয়ে করেননি। অথচ সে সময় আরব সমাজের সংস্কৃতিতে প্রথম স্ত্রী থাকা অবস্থায় আরো স্ত্রী গ্রহণের প্রচলন ছিল এবং এখনো আছে।

বিবি খাদিজার ইন্তেকালের সময় আল্লাহর রাসূলের বয়স ছিল ৫৩ বছর। এর অর্থ হচ্ছে, তিনি ২৫ বছর বয়স থেকে ৫৩ বছর বয়স পর্যন্ত যৌবনের শ্রেষ্ঠ সময়ে এক স্ত্রী নিয়ে সংসার করেছেন। বাকি বিয়েগুলো হয়েছে বিবি খাদিজার ওফাতের পর। বিশ্বনবী যদি নারীলিপ্সু হতেন (নাউজুবিল্লাহ) তাহলে তিনি যুব বয়সে বিবি খাদিজার উপস্থিতিতেই আরো অনেক বিয়ে করতে পারতেন।

দ্বিতীয়ত, বিবি খাদিজার মৃত্যুর পর তিনি যাদেরকে বিয়ে করেছেন তাদের মধ্যে বিবি আয়েশা ছাড়া আর সবাই বিধবা ছিলেন। এখান থেকে বোঝা যায়, আল্লাহর রাসূল যুবতী কিংবা কুমারী নারীর সন্ধান করেননি বরং তার লক্ষ্য ছিল বিধবা নারীদের ভরণপোষণের দায়িত্ব গ্রহণ করা। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, এখানে একটি বিয়েও জবরদস্তিমূলক হয়নি বরং মুমিন নারীরাই তাঁর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার জন্য প্রচণ্ড আগ্রহী ছিলেন।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় বিষয়গুলো হলো:

১. বিয়ে করার ক্ষেত্রে হালাল-হারামের প্রশ্ন সর্বাগ্রে। বর ও কনের রাজি থাকা যথেষ্ট নয়।

২. প্রতিটি মানুষের বিয়ে করার অধিকার আছে এবং এই অধিকার থেকে যুদ্ধবন্দীকে পর্যন্ত বঞ্চিত রাখার অনুমতি ইসলাম দেয়নি।

৩. ইসলামে নারীকে মোহরানা দিতে বলা হয়েছে যাতে তাদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।#

 

 

ট্যাগ

২০১৮-০৮-২৮ ১৮:৩৬ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য