• দেখব ঘুরে ইরান এবার: হরমুযগান প্রদেশ

হরমুযগান প্রদেশের আয়তন আটাশি হাজার বর্গ কিলোমিটার। এই প্রদেশটির উত্তর এবং উত্তর পূর্বদিকে রয়েছে কেরমান প্রদেশ, পশ্চিম এবং উত্তর পশ্চিমে রয়েছে ফার্স এবং বুশেহর প্রদেশ।

হরমুযগান প্রদেশের পূর্বদিকের প্রতিবেশী হলো সিস্তান এবং বেলুচিস্তান প্রদেশ আর দক্ষিণে রয়েছে নীল পানির পারস্য উপসাগর এবং প্রায় ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূলময় ওমান সাগর। হরমুযগান প্রদেশের কেন্দ্রীয় শহর হলো বন্দর আব্বাস। এই প্রদেশের প্রধান প্রধান শহরগুলোর মধ্যে রয়েছে মিনাব, বন্দর জাস্ক, বন্দর লাঙ্গে, হাজি আবাদ, রুদান এবং তিনটি দ্বীপ-আবু মুসা, কেশ্‌ম এবং কীশ ইত্যাদি।

হরমুযগান প্রদেশের প্রধান কিছু বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রয়েছে এখানে ছোটো বড়ো মিলিয়ে চৌদ্দটি দ্বীপ রয়েছে। এসব দ্বীপে চমৎকার আবাসিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তাই এইসব দ্বীপ তথা সমগ্র হরমুযগান প্রদেশেরই গুরুত্ব অপরিসীম। এই দ্বীপগুলোর কোনো কোনোটির কৌশলগত গুরুত্ব বেশি আবার কোনোটির অর্থনৈতিক গুরুত্ব বেশি। উপকূলের সবচেয়ে কাছের দ্বীপটি হলো ‘হরমুজ’ আর সবচেয়ে বড়ো দ্বীপ হলো ‘কেশ্‌ম’। কেশ্‌ম দ্বীপ পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালির একেবারে মুখে পড়েছে। হরমুজ প্রণালি বিশ্বের জলপথগুলোর মধ্যে সবচেয়ে স্পর্শকাতর এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি ক্রসিং পয়েন্ট। হরমুযগান প্রণালীটি প্রদেশের রাজনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত।

শীতকালের দিনগুলোতে এই প্রদেশের আবহাওয়ায় উষ্ণতার পরিমাণ থাকে দশ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের মতো। শূন্যের নীচে এখানকার তাপমাত্রা কখনোই নামে না। ভরা শীতেও না। তবে প্রচণ্ড শীতের রাতে কখনো কখনো শূন্য পর্যন্ত নেমে আসে। সাধারণত  এই প্রদেশের আবহাওয়া মরু এলাকার আবহাওয়ার মতো। এখানে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ একেবারেই কম। বছরের নয় মাস মোটামুটি তেমন কোনো বৃষ্টিপাত হয় না বললেই চলে। পুরো বছরে বৃষ্টি যদি আসেও তাও এক দুইবারের বেশি নয়। পারস্য উপসাগর উপকূলীয় এলাকায় আর্দ্রতার পরিমাণ অনেক।

হরমুযগান প্রদেশের ইতিহাস পারস্য উপসাগরের ভৌগোলিক ইতিহাসের সাথে মিশে গেছে। পারস্য উপসাগর সম্পর্কে গ্রিক ইতিহাসবিদদের লেখার বিক্ষিপ্ত কিছু তথ্যপঞ্জি এখনো দেখতে পাওয়া যায়। এগুলোর সবই খ্রিষ্টপূর্ব চার শতক পর্যন্ত বিস্তৃত। এইসব তথ্যপঞ্জি অনুযায়ী সেই প্রাচীনকালে পারস্য উপসাগরের পশ্চিম উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় এবং ইরানের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলীয় মরু এলাকায় বহু কওম ও জাতির বসবাস ছিল। সেই প্রাচীনকালেও যে এই অঞ্চলে নৌচালনার ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন ঘটেছিল সে ব্যাপারে বহু তথ্য-প্রমাণ রয়েছে।  খ্রিষ্টপূর্ব সপ্তম শতকে পারস্য উপসাগরে ব্যবিলনীয়দের নৌচালনার কথা এক্ষেত্রে উল্লেখ করা যায়। সর্বপ্রথম যে প্রমাণটির কথা উল্লেখযোগ্য তা হলো নিয়ারকাস (nearchus) বা নিয়ার্কের প্রসঙ্গ যিনি এই পারস্য উপসাগরে নৌচালনার ইতিহাস গড়েছিলেন।

এই নিয়ারকাস ছিলেন বিশ্ববিখ্যাত সামরিক প্রধান অ্যালেক্সান্ডারের নৌ-সেনা প্রধান। তিনি অ্যালেক্সান্ডারের নির্দেশে সামুদ্রিক রণতরীগুলোকে নিয়ে পারস্য উপসাগরের দিকে যাত্রা করেছিলেন। নিয়ার্ক মাকরান উপকূল অতিক্রম করার পর হরমুজ বন্দর অর্থাৎ বর্তমান হরমুযগান প্রদেশের মিনাবে পৌঁছেন। নিয়ারকাস পারস্য উপসাগরের যে অঞ্চলে গিয়ে পৌঁছেছিলেন সেটা ছিল তখন জনবসতিশূন্য  একটি দ্বীপ। এই দ্বীপের নাম ছিল ‘বরকা’না’। মনে করা হয়ে থাকে এগটি ছিল বর্তমান হরমুজ অথবা লার্ক দ্বীপ।

নিয়ার্কের ভাষ্য অনুযায়ী তার সমুদ্র বিহারের দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় পারস্য উপসাগরের উপকূলীয় এলাকার মতো এতোটা আবাদি এবং উন্নত আর কোনো উপকূল তিনি দেখেন নি। হরমুজ বন্দরের লিখিত যে ইতিহাস রয়েছে সেখানে দেখা যায় এ এলাকার ইতিহাস শুরু হয়েছে সাসানী রাজবংশ এবং খ্রিষ্টীয় তৃতীয় শতকের আর্দেশির বাবকানের শাসনামল থেকে। সাসানী রাজবংশের পতনের পর এবং ইসলামের আবির্ভাবের পর এই এলাকাটি প্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ একটি বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

খ্রিষ্টীয় অষ্টম শতকের শেষ দিকে যখন আব্বাসীয় খেলাফতের বিকাশ ঘটছিল তখন এই বাণিজ্যিক লেনদেনের বিষয়টি আরো বেশি জাঁকজমকপূর্ণ হয়ে ওঠে। ঐতিহাসিকদের অনেকেরই মতে পারস্য উপসাগরের সমুদ্র পথ বিখ্যাত সিল্ক রোডের চেয়েও কিংবা তার তার কোনো শাখা পথের চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ইতালির বিখ্যাত ভুবন পর্যটক মার্কুপুলু খ্রিষ্টীয় ১২৭২ এবং ১২৯৩ সালে হরমুজ বন্দর ভ্রমণ করেছিলেন। এই বন্দরের তৎকালীন ঐশ্বর্যে বিস্মিত হয়েছিলেন তিনি। এক লেখায় মার্কুপুলু লিখেছিলেন ইরানের স্বর্ণালঙ্কার, ভারত এবং চীনের সিল্ক আর বাহরাইনের মুক্তা ইত্যাদি বেচাকেনা হয় ইরানের হরমুজ বন্দরের বাজারগুলোতে।

অবশ্য পশ্চিমা উপনিবেশবাদীরাও বাণিজ্যের পসরা নিয়ে সমুদ্রপথেই এই হরমুজ বন্দরে এসেছিল। এই সওদাগরি বাণিজ্য শুরু করেছিল পর্তুগিজরা। খ্রিষ্টীয় ১৪৯৭ সালে প্রথমবারের মতো ভাস্কো দা গামার নেতৃত্বে পারস্য উপসাগরীয় বন্দরগুলোতে নেমেছিল। তার দশ বছর পর দ্বিতীয় আগ্রাসী হিসেবে পরিচিত অলফোন্সো দো অলবুকোর্ক পর্তুগিজদের স্বার্থ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিশেষ করে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে অপরাপর দেশের ব্যবসায়ীদের মোকাবেলা করার জন্যে সাতটি রণতরী নিয়ে হরমুজ দ্বীপে এসে ভিড়েছিল এবং যথারীতি ঐ দ্বীপটিকে অবরুদ্ধ করে দখল করে নিয়েছিল।

সে সময় হরমুজ বন্দর পারস্য উপসাগরীয় এলাকায় বাণিজ্যের মূল কেন্দ্র হিসেবে পরিগণিত ছিল। তাই পারস্য উপসাগরের পতনের বিষয়টি ইরানের জন্যে সামরিক এবং বাণিজ্যিক উভয় দিক থেকেই ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। ইরান থেকে হরমুজ আলাদা হবার কারণে এবং হরমুজ প্রণালীর ওপর পর্তুগিজদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হবার ফলে জাহাজ চলাচলের জন্যে ট্যাক্স বা আয়করের ব্যাপারটিও ছিল আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এদিকে তৎকালীন শাহ ইসমায়িল সাফাভি ওসমানীয়দের সাথে যুদ্ধে জড়িত থাকার কারণে দখলদার পর্তুগিজদের বন্দর ছাড়া করতে পারেন নি। কিন্তু কিছু সময় পর শাহ আব্বাস সাফাভি ব্রিটিশদের সহযোগিতায় তাদের সরাতে সক্ষম হন। এভাবে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের ওপর থেকে পর্তুগিজদের দখলদারিত্বের অবসান ঘটে।

এভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চল এবং প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্যে যুগে যুগে ইউরোপীয় দেশসহ পশ্চিমা দেশগুলো বহুবার চেষ্টা চালিয়েছে। জাস্ক এবং কেশ্‌মে হল্যান্ডিরা একবার ব্রিটিশদের ওপর হামলা চালিয়ে তাদেরকে সরিয়ে দিয়েছিল। এরপর তারা সেখানে তাদের ঘাঁটিকে স্থায়ী করবার জন্যে দূর্গও নির্মাণ করেছিল। সেসবই এখন ইতিহাস।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/ ২৮

খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন

ট্যাগ

২০১৮-০৮-২৮ ২০:৪৪ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য