আপনারা জানেন যে, ইরানের জলে-স্থলে, ক্ষেত-খামারে, বাগ-বাগিচায়, কল-কারখানায় উৎপাদিত হয় বিচিত্র সামগ্রী। এর পাশাপাশি খনি থেকে উৎপন্ন বিভিন্ন সামগ্রী এবং ইরানি নরনারীদের মেধা ও মনন খাটিয়ে তৈরি করা হয় বিভিন্ন শিল্পপণ্য। তো এগুলোর সঙ্গে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য " ইরানি পণ্য সামগ্রী" শীর্ষক সাপ্তাহিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছি আমরা। এ আসরের আজকের পর্বে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি.। গত আসরে আমরা ইরানের গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পণ্য নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করেছি।

গত আসরে আমরা বলেছিলাম যে তেল সম্পদের বাইরে আরও যেসব খনিজ শিল্প ইরানের অর্থনীতির ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে সেগুলোর মধ্যে স্টিল শিল্প, সিমেন্ট, আকরিক লোহা, তামা, জিংক ইত্যাদির কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। মাটির নীচে লুকিয়ে থাকা ইরানের এইসব মূল্যবান সম্পদ আহরণে পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে যাচ্ছে দেশের সুদক্ষ গবেষকগণ। প্রযুক্তি ও কারিগরি দিক থেকেও অগ্রসর হচ্ছে এইসব প্রকল্প। এই খাতে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতেও রয়েছে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। আজকের আসরে আমরা ইরানের মাটির গভীরে লুকিয়ে খনিজ লাল ধাতু তামা নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করবো।

 

বিশ্বের তামার বেল্টের ওপর অবস্থান করছে ইরান। এ পর্যন্ত যেসব গবেষণামূলক খননকাজ হয়েছে তা থেকে অনুমিত হয়েছে যে বিশ্বের তিন শতাংশ তামার মজুদ রয়েছে ইরানে। পুরাতত্ত্ব গবেষকদের বিশ্বাসমতে 'তামা' সর্বপ্রথম কোনো খনিজ ধাতু যা মানুষ আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছে। হাজার হাজার বছর আগে মানুষ প্রাথমিক সরঞ্জামাদি ব্যবহার করে শিখেছে কীভাবে শিল্প সরঞ্জাম তৈরি করা যায় তামা দিয়ে। মুদ্রা, তলোয়ার, ঢাল, অলঙ্কার বা সাজসজ্জার জিনিসপত্র ইত্যাদি বিচিত্র সরঞ্জাম কীভাবে তৈরি করতে হয় কিংবা কী করে সেসব ব্যবহার করতে হয়-তা মানুষ শিখেছে সেই প্রাচীনকালেই। বলাবাহুল্য তামা আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে মানবেতিহাসে একটি নতুন যুগের সূচনা হয়েছে। ঠিক কবে এবং কোথায় মানুষ প্রথম তামার ব্যবহার করেছে সে সম্পর্কে সুস্পষ্ট কোনো ঐতিহাসিক তথ্য প্রমাণ নেই।

তবে মিশরের পিরামিডের একটিতে পাইপ লাইন সিস্টেম আবিষ্কৃত হয়েছে। ওই পাইপগুলো ছিলো তামার। তা থেকে গবেষকরা বলছেন যে প্রাচীন মিশরীয়রা খ্রিষ্টপূর্ব হাজার হাজার বছর আগে এই তামা ধাতু সম্পর্কে জানতেন। মানব সভ্যতার ইতিহাসে সর্বপ্রথম আবাসিক এলাকা হিসেবে খ্যাত মেসোপটেমিয়ান এলাকা মানে আজকের ইরাক ভূখণ্ডে পুরাতত্ত্ব গবেষকরা যেসব খননকাজ চালিয়েছেন, সেগুলো প্রমাণ করছে যে এই এলাকায় খ্রিষ্টপূর্ব দশ হাজার বছর আগে তামার ব্যবহার ছিল। এটা আরও বেশি প্রামাণ্য হয়ে ওঠে দুর্লভ একটি তাম্রবস্তুর নিদর্শন দেখার পর। ইরাকের একটা এলাকায় তামার একটা ঝুলন্ত বস্তু পাওয়া গেছে যা খ্রিষ্টপূর্ব আট হাজার বছর আগের বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন। বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন তাম্রবস্তুর নিদর্শনের একটি এটি।

ইউরোপীয়রাও খ্রিষ্টপূর্ব চার হাজার বছর আগে তামার সঙ্গে পরিচিত হয়েছিল।  এ প্রসঙ্গে ইউরোপে আবিষ্কৃত প্রাকৃতিক মমির কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। সর্বপ্রাচীন প্রাকৃতিক এই মমিটির নাম দেয়া হয়েছে বরফ মানব। ১৯৯১ সালে অস্ট্রিয়া এবং ইতালির সীমান্তে আল্পস পর্বতের জমাট বরফের মাঝে পাওয়া গেছে ওই মমিটি।  বরফাচ্ছিত ওই লাশটি পাঁচ হাজার তিন শ বছরের পুরোনো বলে মনে করা হয়। এছাড়াও ল্যাটিন আমেরিকার কোনো কোনো সভ্যতা যেমন মায়া, অজতাক এবং ইঙ্কার লোকজন তাম্র ধাতুর পাশাপাশি স্বর্ণ এবং রৌপ্যও ব্যবহার করতো।  বিশ্বের তামার বেল্টের ওপর অবস্থান করছে ইরান। সে কারণে ইরানে তামা কিংবা তামার তৈরি বিভিন্ন তৈজসের ব্যবহার সুপ্রাচীনকাল থেকেই চলে আসছে। প্রাচীন অগ্নিকুণ্ড এবং তামাসহ বিভিন্ন ধাতুর বিচিত্র নিদর্শন থেকেই তা প্রমাণ হয়ে যায়।

কাজভিনের জগেহ টিলায় আবিষ্কৃত হয়েছে প্রচুর তামা এবং অগ্নিকুণ্ড। এগুলোর বয়স খ্রিষ্টপূর্ব পাঁচ হাজার বছর বলে মনে করা হয়। তামা গলিয়ে বিভিন্ন জিনিস তৈরি করার রেওয়াজ যে এ এলাকায় ছিল তা প্রমাণ করে সেখানে পাওয়া জিনিসপত্রগুলো। কাশানের সিয়ালক টিলাতেও পাওয়া গেছে সেরকম প্রাচীন অনেক তামার বস্তু। সেগুলোকে আরও পুরনো বলে মনে করা হয়। বলা হয়ে থাকে যে সেগুলোর বয়স ছয় হাজার বছরের চেয়েও প্রাচীন। এ অঞ্চলে বিচিত্র ধাতুর উপস্থিতি এবং সেইসব ধাতু দিয়ে তৈরি বিচিত্র বস্তুর আবিষ্কার এটাই প্রমাণ করে যে এ এলাকার মানুষ খনিজ ধাতু উত্তোলন করার পর সেগুলো দিয়ে বিভিন্ন জিনিস তৈরি করেছেন। তার মানে দাঁড়ায় সেই প্রাচীনকালেই তামা ঢালাইয়ের কারখানা ছিল এবং ঢালাইয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের জিনিসপত্র তৈরি করার মতো নিপুণ শিল্পীও ছিল। কীভাবে এসব জিনিস বা সরঞ্জাম তৈরি করতে হয় তা তারা শিখতে পেরেছিল। তামা দিয়ে তৈরি সেই প্রাচীন ইরানের বিভিন্ন যুগের বিচিত্র নিদর্শন এখন ইরানসহ বিশ্বের বিভিন্ন যাদুঘরে শোভা পাচ্ছে।

 

সেই প্রাচীনকালে তামার খণ্ডকে গলিয়ে তামার পাত তৈরি করার জন্য কারিগর বা শিল্পীরা বিশেষ ধরনের অগ্নিকুণ্ড ও পাত্র ব্যবহার করতো। ওই পাত্র থেকে গলিত ধাতু বিশেষ একটা পাত্র দিয়ে তুলে ছাঁচে ফেলা হতো। ওই ছাঁচ থেকে তুলে পিটিয়ে বিভিন্ন ডিজাইনের জিনিসপত্র তৈরি করা হতো। তামা শিল্পীর মূল কাজটাই হলো সলিড তামাকে গলানোর পর ছাঁচে ফেলা এবং তারপর তাকে ছাঁচ থেকে তুলে পিটিয়ে পাত বানানো। পাত বানাতে দুই একজন লোক গলিত তামাকে অনবরত হাতুড়ি দিয়ে পেটাতো।এভাবে পিটিয়ে পিটিয়ে তামার বিভিন্ন ধরন ও আকৃতির পণ্য তৈরি করা হতো।

কালের পরিক্রমায় মানুষের চিন্তা ও বুদ্ধির বিকাশ ঘটে এবং তামা দিয়ে তৈরি বিভিন্ন শিল্পপণ্য নির্মাণ পদ্ধতি ও কৌশলে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। আজকাল আর আগের মতো সেই চুল্লি করে হাতে পিটিয়ে তাম্রপণ্য তৈরি করতে হয় না। এখন সবকিছুই বৈদ্যুতিক মেশিনের সাহায্যে হচ্ছে। তাছাড়া বাজারে এখন এইসব পণ্যের চাহিদা বেড়েছে। কমেছে এই শিল্পপণ্যের দাম।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/ মো:আবু সাঈদ/ ২৯

 খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন

২০১৮-০৮-২৯ ১৭:১৯ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য