• দেখব ঘুরে ইরান এবার:  কীশ দ্বীপ সুন্দরতম প্রবাল দ্বীপ হিসেবে পৃথিবীব্যাপী সমাদৃত

বিশ্বে যতোগুলো সুন্দর প্রবালদ্বীপ আছে, সেগুলোর মাঝে কীশ সুন্দরতম প্রবাল দ্বীপ হিসেবে পৃথিবীব্যাপী সমাদৃত। ৯০ বর্গকিলোমিটারের চেয়ে বেশি আয়তন বিশিষ্ট কীশ দ্বীপটি ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে প্রায় ১৮ কিলোমিটার উপকূল জুড়ে বিস্তৃত। কীশ শহর থেকে হরমুযগান প্রদেশের কেন্দ্রিয় শহর বন্দর আব্বাসের দূরত্ব ৩০০ কিলোমিটার। অবশ্য এই দূরত্ব সমুদ্র পথের।

আর আকাশপথে কীশ থেকে তেহরানের দূরত্ব এক হাজার বায়ান্ন কিলোমিটার। কীশ দ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এক কথায় অনন্য সাধারণ। প্রশান্ত উপকূলে বালির চরাচর। বিশাল সমুদ্রের নীল বুকে পানির অবিরাম দোলা আর  ফেনায়িত তরঙ্গের তীরে এসে মিশে যাওয়া-সব মিলিয়ে অসাধারণ এক পরিবেশ। এতো স্বচ্ছ এখানকার পানি যে পানির নীচের রেণুগুলো পর্যন্ত কাঁচের টুকরার মতো ঝলসে ওঠে।

এর বাইরে প্রাকৃতিক সবুজ পরিবেশ তো রয়েছেই। বছরের প্রায় সাত মাস সবুজ শ্যামল এই নয়নাভিরাম প্রকৃতির সৌন্দর্য বিরাজ করে এখানে।

প্রকৃতিপ্রেমী আর সমুদ্রবিলাসী দশ লক্ষাধিক পর্যটক এই কীশ দ্বীপে বেড়াতে আসে প্রতি বছর। কীশ দ্বীপটির উপকূল দীর্ঘতম সমুদ্র উপকূলগুলোর একটি। পৃথিবীর অপরাপর সমুদ্র উপকূলগুলোর মধ্যে খুব কমই পাওয়া যাবে যার বিস্তৃত এলাকাই ব্যবহারযোগ্য। সুন্দর সুন্দর মাছ যেগুলোকে অ্যাকুরিয়াম সাজানোর জন্যে ব্যবহার করা হয় কীশ দ্বীপের প্রান্ত জুড়ে সেইসব মাছ লক্ষ্য করা যায় অনায়াসেই।

মজার ব্যাপার হলো মাছগুলো নিজেদের একদম লুকিয়ে রাখে না, দর্শনার্থীদেরকে তারা তাদের অস্তিত্বের ঘোষণা দেয় নির্ভীকভাবে। এই অ্যাকুরিয়ামের মাছ কীশ দ্বীপের অন্যতম আকর্ষণ। অপরাপর দ্বীপের সাথে কীশ দ্বীপের স্বাতন্ত্র্য এখানে। সুন্দর এই মাছগুলো ছাড়াও মানুষ যেসব মাছ খায় সেসব মাছও পাওয়া যায় এই কীশ দ্বীপে প্রচুর পরিমাণে। স্বাভাবিকভাবেই এখানে জেলেরা মাছ শিকারের জন্যে ব্যতিব্যস্ত থাকে। নিশ্চিন্তে জেলেরা এখানে মাছ শিকার করতে পারে।

এর কারণটা হলো কীশ দ্বীপের উপকূলীয় অঞ্চলই বোধ হয় সবচেয়ে কম ভীতিকর একটি উপকূল যেখানে হাঙরের উপদ্রব খুব কম। মাঝে মাঝে এসব হাঙর দ্বীপের উপকূলের কাছাকাছি আসে ছোটো মাছ শিকার করার জন্যে। সাঁতার কাটে যারা কিংবা যারা সৈকতে অবকাশ যাপন করে তাদের জন্যে এসব হাঙর মোটেই ভীতিকর নয়। বরং পানির ভেতর হাঙরের আসা যাওয়াটাও বাড়তি একটি বিনোদন।              

কীশের অসংখ্য দর্শনীয় বিষয়ের মাঝে অন্যতম হলো মাটির নীচের কৃত্রিম শহর ‘করিয’। সম্পূর্ণ ভিন্ন স্বাদের চমৎকৃতি আর সৌন্দর্যের বৈচিত্র্যের জন্যে এই শহরটি দর্শনার্থীদের কাছে বেশ গুরুত্ববহ। এই শহরটি মূলত কীশের একটা প্রাচীন এবং শিল খাল। এর বয়স আড়াই হাজার বছরেরও বেশি। এই খালের পানি মিষ্টি অর্থাৎ সুপেয়। দ্বীপে যারা বসবাস করে তাদের খাবারের পানির সংকুলান করার ব্যবস্থা দীর্ঘদিন থেকে হয়ে এসেছে এই পানি দিয়েই। প্রাচীন এই খালটিই এখন মাটির নীচে বিস্ময়কর একটি শহরে রূপান্তরিত হয়েছে।

শহরটির আয়তন বা বিস্তৃতি দশ হাজার বর্গমিটারের উপরে। করিয শব্দটির অর্থই হলো খাল। যেহেতু খাল থেকেই শহরটির সৃষ্টি সেজন্যে এরকম নামকরণ। মাটি থেকে ১৬ মিটার নীচে শহরটি গড়ে তোলা হয়েছে। ইদানীং মাটির নীচের এই শহরে ইরানের নিজস্ব এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের হস্তশিল্প সামগ্রীর দোকান যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে ঐতিহ্যবাহী এবং আধুনিক রেস্টুরেন্ট, রয়েছে মিউজিয়াম, এম.পি.থিয়েটার, সম্মেলন কক্ষ এবং বিচিত্র শিল্প গ্যালারি।

কীশ দ্বীপের পশ্চিমাঞ্চলীয় সৌন্দর্যপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো বিশাল একটি জাহাজের ধ্বংসাবশেষ। এটি কীশের নীল উপকূলে নিজের স্থান করে নিয়েছে। গ্রিক জাহাজ হিসেবে এই প্রাচীন বস্তুটি ব্যাপকভাবে খ্যাতিমান। জাহাজটির ওজন সাত হাজার একষট্টি টন। দৈর্ঘ্য হলো ১৩৬ মিটার। ১৯৬৬ সালে গ্রিস ভ্রমণ করার সময় দ্বীপের দক্ষিণ উপকূলীয় কাদাপানিতে আটকে গিয়েছিল জাহাজটি।

বিশ্বরোড বা মহাসড়ক এখানকার আরেকটি পর্যটক আকর্ষণীয় এবং দর্শনীয় বিষয়। রিংরোডের মতো বৃত্তায়িত এবং বেশ প্রশস্ত এই সড়কটি সমগ্র কীশ দ্বীপকে ঘিরে রেখেছে। এই রোডের সাথে ইরানের বহু প্রদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। যার ফলে বিভিন্ন প্রদেশের শিল্প সামগ্রী এই কীশে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা হয়েছে সহজেই। যেহেতু এই দ্বীপে বিশ্বের বহু দেশের পর্যটক আসেন সেজন্যে শিল্প পণ্যের সুবাদে সাংস্কৃতিক যোগাযোগও গড়ে উঠেছে বিশ্বের সাথে।

রাতের বেলা আকাশপথে যারা এই দ্বীপে যাওয়া আসা করেন উপর থেকে বৃত্তাকার আলোর ঝলকানি যে কী চমৎকার দৃশ্যের অবতারণা করে তা একবার চোখ বুজেই ভাবা যায়। ক্রিস্টাল স্টোনের চেইনের মাঝে ঝকঝকে একটি মুক্তা বসালে যেমন লাগবে পুরো দ্বীপটাকেই মনে হবে সেরকম একটা বিশাল আংটি।

যারা প্রকৃতি প্রেমী তাদের জন্যেও এই কীশ দ্বীপ অত্যন্ত আকর্ষণীয়। ‘বগু’ নামে একটি এলাকা আছে এই কীশে। এলাকাটি বেশ উর্বর। যারা পশুপালন করে তাদের কয়েকটি পরিবার এই বগু এলাকায় বসবাস করে। এখানে রয়েছে প্রচুর গাছ গাছালি। এগুলো দ্বীপের পরিবেশের সৌন্দর্য আরো বৃদ্ধি করেছে। প্রাচীন কিছু গাছ আছে এখানে একেবারেই বিরল। এগুলোর নাম হলো ‘লুর’।

দ্বীপের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলেও রয়েছে একটি বন। এই বনটি প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠে নি কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হয়েছে। ১৯৯২ সালে এখানে পরিকল্পিতভাবে গাছগুলো রোপন করা হয়েছে। প্রায় ৬০০ হেক্টর জমি জুড়ে এই বাগানটি গড়ে তোলা হয়েছে। ইউক্যালিপটাস গাছ, মিশরীয় সিল্ক গাছ, তেঁতুল গাছ, খুরমা খেজুর গাছসহ আরো বিচিত্র গাছ গাছালি এখানে রয়েছে। আরো বহু দর্শনীয় স্থাপনা রয়েছে কীশে। হেলিকপ্টারের সাহায্যে পুরো দ্বীপটি উপর থেকে দেখা যায় সুন্দরভাবে। সময় সুযোগ পেলে যাবেন দেখতে এই প্রত্যাশা রইলো।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/ ৩০

খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন

ট্যাগ

২০১৮-০৮-৩০ ২০:০৬ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য