জীবনযাপনের ইসলামি পদ্ধতি ও দিক নির্দেশনা বিষয়ক ধারাবাহিক অনুষ্ঠান “আদর্শ জীবনযাপনের" আজকের আসরে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি।

আমরা গত আসরে মানুষের চিন্তাশক্তি, সৃজনশীলতা এবং নতুন নতুন মতবাদ ও দর্শন সৃষ্টিতে মেধা ও সৃষ্টিশীলতার বিষয় নিয়ে কিছু কথা বলার চেষ্টা করেছি। বলেছি যে মানুষ জ্ঞান-গবেষণা, চিন্তা-ভাবনা, নতুন নতুন উদ্ভাবনী শক্তি ছাড়া একঘেঁয়ে হয়ে যায়। জীবনে তাদের কোনোরকম উন্নতি কিংবা পরিবর্তন আসে না। আর এই পরিস্থিতিতে অপরাপর সৃষ্টির সঙ্গে মানুষকে আলাদা ভাববার সুযোগ থাকে না। 

মানুষের সঙ্গে অন্যান্য সৃষ্টির পার্থক্য হলো বৈজ্ঞানিক চিন্তা-ভাবনা এবং উদ্ভাবনী শক্তির মধ্যে। মানুষ নতুন নতুন সৃষ্টি করতে পারঙ্গম। সেজন্যই তাদেরকে কেউ বলেন বোধ-বুদ্ধি ও বিবেক সম্পন্ন প্রাণী বলে মনে করেন, কেউ মনে করেন সৃজনশীল প্রাণী। সবার ভেতরেই এই সৃজনশীলতা রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো সেই সৃজনশীলতাকে নিজের মাঝে আবিষ্কার করা এবং তার বিকাশ ঘটানোর মাধ্যমে তাকে কাজে লাগানো। সমস্যার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার সবচেয়ে উত্তম হাতিয়ার হলো সৃজনশীল চিন্তা। মনে রাখতে হবে সমস্যা কেবল ঝামেলাই নয় বরং সমাধানের উপায় খুঁজে বের করার একটা সুযোগও বটে। এটা হলো ইতিবাচক দৃষ্টি। জীবনের সমস্যা সমাধানে এই ইতিবাচক দৃষ্টি বা সুদৃষ্টি খুবই জরুরি।

দৃষ্টি মানুষের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কেউ চাঁদের মাঝেও দাগ খুঁজে বেড়ায়। কেউ গোবরে পদ্মফুল খোঁজে। ধরা যাক সুন্দর একটি ফুল। ওই ফুলে মৌমাছি বসে। মধু নিয়ে সে মৌচাক বানায়। সেই মধু থেকে মানুষ বিচিত্রভাবে উপকৃত হয়। ওই ফুলেই আবার বোলতা বসে। সে একই ফুল থেকে নেয় বিষ। হুল ফুটিয়ে সেই বিষ মানুষের রক্তে প্রবেশ করিয়ে দিলে মানুষ বিষাক্রান্ত হয়। দৃষ্টি এই মৌমাছি আর বোলতার মতো। একটা কাঁচের গ্লাস ভেঙে গেলে সুদৃষ্টিবান ভাঙা কাঁচের শব্দ শুনে ভাবে আহা! কী চমৎকার ধ্বনি। আর কুদৃষ্টিবান যে সে ওই শব্দ শোনামাত্রই যে ভেঙেছে 'তার একদিন কি কাঁচের গ্লাসের মালিকের একদিন' করে ছাড়বে। সুদৃষ্টি আসলে একটি অমূল্য সম্পদ। এর ইতিবাচকতা বিচিত্র গুণে সমৃদ্ধ।

জীবন সম্যসা সমাধানের গুরুত্বপূর্ণ একটি উপায় হলো এই সুদৃষ্টি। সুদৃষ্টিময় সৌন্দর্যের গুণ এবং ফযিলত এমনই যে যার এই গুণটি আছে সে অমূল্য সম্পদে সমৃদ্ধ ও সুসজ্জিত। মনে রাখতে হবে সুদৃষ্টিবান হওয়ার অর্থ কিন্তু বাস্তবতা কিংবা প্রকৃত অবস্থা থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখা নয়। সুদৃষ্টি মানে হলো আল্লাহর সম্পর্কে সৎ ও ইতিবাচক চিন্তা করা, অন্যদের আচার ব্যবহার কাজকর্মের ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করা এবং বিশ্বের সকল ক্রিয়া প্রতিক্রিয়াকে নিঁখুত ও সৎভাবে দেখা। এই সুদৃষ্টি থেকেই সমাজে এবং জীবনে শান্তি, আশা-ভরসা ও উদ্যম উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়। এই সুদৃষ্টির অধিকারী হওয়ার উপায়গুলো শেখা এবং জীবনপথে চলার ক্ষেত্রে যেসব অপ্রত্যাশিত ঘটনা দুর্ঘটনা সামনে আসে সেগুলোকে কীভাবে মোকাবেলা করতে হয় সে সম্পর্কে জানা খুবই প্রয়োজন।

সুদৃষ্টির সুবিধা বা অর্জন হলো মানুষের মাঝে একটা ইতিবাচক পরিবেশ সৃষ্টি করা যায় এবং তার মাধ্যমে সমাজে বসবাসকারীদের সুস্থতা নিশ্চিত করা যায়। মনোবিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন সুদৃষ্টির মতো একটা মনোভাব কিংবা একটা সুন্দর ভবিষ্যতের ব্যাপারে অমোঘ বিশ্বাস মানুষকে জীবনের উদ্বেগ ও উৎণ্ঠাময় ঘটনার মোকাবেলা করতে সাহায্য করে। এ কারণেই সাম্প্রতিক দশকগুলোতে বেশিরভাগই মানুষের সক্ষমতা ও সামর্থ্যের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সেইসঙ্গে মানসিক ইতিবাচক দিকগুলোকে যেমন সুদৃষ্টিম উৎফুল্লতা, আত্মসচেতনতা, জ্ঞান ইত্যাদির উপরও ব্যাপক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিভিন্নভাবে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিকে কাজে লাগিয়ে মানুষের জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইতিবাচক দিকগুলোর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে।

মানুষের জীবনে চড়াই উৎরাই থাকবেই। এই বৈচিত্র্য মানব জীবনের নিত্য অনুষঙ্গী। যাদের দৃষ্টি ইতিবাচক তারা এসব প্রতিকূলতাকে সুন্দরভাবে মোকাবেলা করতে জানে। সুদৃষ্টিবান মানুষ কোনো বিপদে বা ব্যর্থতায় ভেঙে পড়ে না বরং অবশিষ্ট অবস্থা থেকে নতুন করে জীবনযাত্রার সূচনা করে। ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা থেকে সুদৃষ্টিবান মানুষ শিক্ষা নেয়। নতুন জীবনে সেই শিক্ষাকে তারা কাজে লাগায়। সুতরাং তারা জীবনে সফল এবং সুস্থ থাকে সবসময়। এমনকি সুদৃষ্টিবান মানুষের আয়ুও বেড়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে। পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের প্রফেসর আই পি স্লিগম্যান বলেছেন: 'গবেষণায় প্রমাণিত যে সুদৃষ্টি মানুষের দৈহিক সুরক্ষা দেয়ার পাশাপাশি দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করে'।

পবিত্র কুরআন তৌহিদে বিশ্বাসীদের সবসময় সুদৃষ্টিবান হবার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। মানবীয় উন্নয়ন ও উচ্চতায় পৌঁছার ক্ষেত্রে কুরআন সুদৃষ্টিকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে। বিভিন্ন আয়াতে কুরআন মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে তারা যেন আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতকে স্মরণ করে, সেগুলোর প্রতি মনোযোগী হয়, বিশ্বের সৌন্দর্য এবং বিস্ময়ের ব্যাপারে ভাবে। যেন তারা এইসব সৌন্দর্য আর নিয়ামতের উৎস ও সৃষ্টির মূল নিয়ে গবেষণা করার মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে এবং তারই ছায়ায় প্রকৃত নিরাপত্তা অনুভব করে। নেতিবাচক দৃষ্টির ব্যাপারে কুরআন নিষেধ করেছে। নেতিবাচক দৃষ্টির অধিকারী মানুষেরা সবকিছুর মধ্যেই হতাশা খুঁজে বেড়ায়। তারা ভীষণরকম খুঁতখুঁতে মনোভাবাপন্ন হয়। কুরআন এ ধরনের মানুষের ব্যাপারে বলেছে: 'হে ঈমানদাগণ,বেশী ধারণা ও অনুমান করা থেকে বিরত থাকো কারণ কোনো কোনো ধারণা ও অনুমান গোনাহ'।

যারা নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে সমাজের সাথে এমনকি নিজ পরিবারের সঙ্গেও তাদের সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। একইসঙ্গে আত্মীয় স্বজন বন্ধুবান্ধবের সাথেও ভালো সম্পর্ক থাকে না। শুধু যে সম্পর্ক থাকে না তাই নয় বরং তাদের মধ্যে এমন সব সমস্যা দেখা দেয় যার পরিণতি হয় খুবই ভয়াবহ।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো:আবুসাঈদ/  ১

খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন 

ট্যাগ

২০১৮-০৯-০১ ১৭:৫৬ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য