সাপ্তাহিক ধারাবাহিক অনুষ্ঠান- ঐশী দিশারীতে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। গত আসরগুলোতে আমরা বিশ্বনবী (সা.)-এর ঘটনাবহুল জীবন সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করেছি এবং তাঁর জন্ম, শৈশব ও যৌবনকালের ঘটনাপ্রবাহ অল্প কথায় বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছি।

একইসঙ্গে মহানবীর জীবনের সবচেয়ে স্পর্শকাতর সময় অর্থাৎ নবুওয়াতপ্রাপ্তি, হিজরত ও মদীনায় ইসলামি হুকুমত প্রতিষ্ঠা নিয়েও সংক্ষেপে কথা বলেছি। আজকের আসরে আমরা এই মহামানবের ৬৩ বছরের গোটা জীবনের উল্লেখযোগ্য কিছু দিক নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করব।

 

মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে নিজের জীবনে চলার জন্য এমন একটি আদর্শ বেছে নেয়া যার মাধ্যমে তার বিশ্বদর্শনের ভিত্তি গড়ে ওঠে এবং সে ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে একজন সফল মানুষ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। এই আদর্শ বাছাই করার কাজটি করার জন্য যথেষ্ট জ্ঞান ও প্রজ্ঞার প্রয়োজন হয়। যারা সবদিক বিচার বিবেচনা করে শ্রেষ্ঠ পথটি বেছে নিতে পারে তাদের জীবন আল্লাহর ইচ্ছায় সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে ভরপুর থাকে। পক্ষান্তরে যারা কোনো ধরনের চিন্তা ও গবেষণা ছাড়া অন্ধভাবে কোনো আদর্শকে বেছে নেয় তারা ভুল পথে পরিচালিত হয়।

উত্তম আদর্শ বাছাই করার পর আমাদের উচিত সেই আদর্শের মাপকাঠিতে নিজেদের ভেতর থাকা ইতিবাচক দিকগুলোকে শক্তিশালী করে দুর্বল ও খারাপ দিকগুলো জীবন থেকে ঝেড়ে ফেলা। যারা এ কাজটি সঠিকভাবে করতে পারেন তারা উন্নত চারিত্রিক গুণাবালী অর্জন করতে সক্ষম হন। পক্ষান্তরে যারা ভুল আদর্শ বাছাই করেন এবং কোনো চিন্তাভাবনা ছাড়াই গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দেন তারা নিজেদের জন্য ধ্বংস ডেকে আনেন এবং ইহকাল ও পরকালে চরম লাঞ্ছনা ও শাস্তির মুখোমুখি হন। মানুষ যাতে ক্ষণিকের এই ইহজীবনে ঋপুর তাড়নায় শয়তানের ধোঁকায় না পড়ে সেলক্ষ্যে মহান আল্লাহ মানুষের জন্য পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান পাঠিয়েছেন এবং এই বিধান মেনে চলার জন্য কিছু মহামানবকে আদর্শ হিসেবে অনুসরণ করার আহ্বান জানিয়েছেন।

 

আল্লাহর দেখিয়ে দেয়া প্রথম আদর্শ হলেন একত্ববাদের ঝাণ্ডাবাহী নবী হযরত ইব্রাহিম (আ.)। পবিত্র কুরআনে সূরা মুমতাহিনার ৪ নম্বর আয়াতের প্রথমেই এ সম্পর্কে বলা হয়েছে, “তোমাদের জন্যে ইব্রাহীম ও তাঁর সঙ্গীগণের মধ্যে চমৎকার আদর্শ রয়েছে।” আল্লাহ তায়ালা এর পর যাঁকে অনুসরণ করে ইহকালীন ও পারলৌকিক জীবনে সাফল্য ও সৌভাগ্য অর্জন করতে বলেছেন তিনি হলেন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)।  সূরা আহযাবের ২১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “নিঃসন্দেহে রাসূলুল্লাহ তোমাদের জন্য উত্তম আদর্শ। তিনি বিশেষ করে তাদের জন্য উত্তম আদর্শ যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে।”

 

অনেকে প্রশ্ন করেন, আমাদের মতো সাধারণ মানুষের পক্ষে কি আল্লাহর রাসূলকে পরিপূর্ণ আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা সম্ভব? এ প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে, যদি তা সম্ভব না হতো তাহলে মহাজ্ঞানী ও প্রজ্ঞাময় আল্লাহ কিয়ামতে বিশ্বাসী ব্যক্তিদেরকে একথা বলতেন না যে, তোমরা রাসূলুল্লাহ (সা.)কে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করো এবং তার কথা মেনে চলো। আল্লাহর রাসূলও এক হাদিসে বলেছেন, যারা আমাকে ভালোবাসার দাবি করে তারা যেন আমার জীবনাদর্শ অনুসরণ করার মাধ্যমে নিজেদের জীবনে এ ভালোবাসার প্রতিফলন ঘটায়। মহান আল্লাহ রাসূলুল্লাহ (সা.)কে জীবনের সকল ক্ষেত্রে মানুষের জন্য আদর্শ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এই মহামানবের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল আল্লাহর নির্দেশের সুস্পষ্ট বাস্তবায়ন।  এ সম্পর্কে সূরা আনআমের ৬২ নম্বর আয়াতে বলা হচ্ছে: “আপনি বলুনঃ  আমার নামায,আমার কোরবাণী এবং আমার জীবন ও মরন বিশ্ব-প্রতিপালক আল্লাহরই জন্যে। ”

ক্ষমা, বিনয়, সত্যবাদিতা ও আমানতদারী, প্রতিশ্রুতি পালন, ধৈর্য, নম্র আচরণ ও দয়া হচ্ছে আল্লাহর রাসূলের উন্নত চারিত্রিক গুণাবলীর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি দিক।  এ সম্পর্কে সূরা কলমের ৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন: “আপনি অবশ্যই মহান চরিত্রের অধিকারী।”

সামাজিক জীবনেও বিশ্বনবী ছিলেন অনুকরণীয় আদর্শ। সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ধনী-গরীব এবং ক্ষমতাধর ও দুর্বল ব্যক্তিরা তাঁর কাছে সমান অধিকার পেত। ক্ষমতার শীর্ষে থাকা অবস্থায়ও তিনি গরীব মানুষের সঙ্গে ওঠাবসা করেছেন এবং তাদের সঙ্গে একত্রে বসে খাবার খেয়েছেন। বিশ্বনবী (সা.)কে কেউ আগে সালাম দিতে পারেনি। বিশেষ করে তিনি শিশুদেরকে আগে সালাম দিতেন। তিনি কখনো নিজের দায়িত্ব অন্যের কাঁধে চাপিয়ে দেননি এবং দলবদ্ধ কাজের সময় বিভেদ সৃষ্টিকারী আচরণ কঠোর হাতে প্রতিহত করতেন।

মানুষের হেদায়েতের ব্যাপারে তিনি সারাক্ষণ চিন্তিত থাকতেন। মক্কার অজ্ঞতা, কুসংষ্কার ও শিরকে ভরা সমাজকে এক আল্লাহর ইবাদতকারী সমাজে পরিণত করার জন্য তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দাওয়াতের কাজে নেমে যান। কাফির ও মুশরিকরা ইসলামের একত্ববাদী আহ্বানে সাড়া না দিয়ে তার বিরোধিতা করায় তিনি মনে খুব কষ্ট পেতেন। এ সম্পর্কে সূরা শুয়ারার ৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন: “(মুশরিকরা) ঈমান আনছে না বলে মনোকষ্টে আপনি হয়তো নিজের জীবন শেষ করে দিতে চাইবেন।”

 

 

 

রাসূলুল্লাহ (সা.) মুসলিম সমাজের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতির বিষয়কেও সমান গুরুত্ব দিতেন। তিনি তৎকালীন আরবের প্রধান কৃষিপণ্য খেজুর চাষ করতে সবাইকে উৎসাহিত করতেন। পাশাপাশি তিনি সম্পদ ও অর্থের পাহাড় গড়ে তোলার বিরোধী ছিলেন। অর্থ উপার্জনকে জীবনের লক্ষ্য হিসেবে বেছে নিতে নিষেধ করেছেন প্রিয়নবী। তিনি বলেছেন, জীবন চলার একটি মাধ্যম হচ্ছে অর্থ উপার্জন। তিনি নিজের উপার্জিত অর্থ অকাতরে সমাজের বঞ্চিতদের মাঝে বিলিয়ে দিয়েছেন। বস্তুবাদী চিন্তাধারার বিরুদ্ধে জিহাদ করেছেন আল্লাহর রাসূল। তিনি উম্মতকে বিলাসী জীবন পরিহার করে সাধাসিধে জীবন যাপনে উৎসাহিত করেছেন।

সামরিক অঙ্গনে বিশ্বনবী (সা.) ছিলেন একজন দক্ষ কমান্ডার। তিনি শত্রুর অবস্থান সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে অভিজ্ঞ যোদ্ধাদের পাঠাতেন এবং শত্রুর গতিবিধি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন। জিহাদের ময়দানে আল্লাহর ওপর ভরসা করে বীরবিক্রমে যুদ্ধ করে গেছেন আল্লাহর রাসূল। এ সম্পর্কে শেরে খোদা আলী (আ.) বলেন, আমি যখনই যুদ্ধের ময়দানে বিপদ অনুভব করতাম তখন বিশ্বনবীর কাছে এসে আশ্রয় নিতাম। মহানবী (সা.) মক্কার মুশরিকদের চাপিয়ে দেয়া ২৭টি বড় যুদ্ধের সবগুলোতে কমান্ডারের ভূমিকা পালন করেন। সার্বিকভাবে বলা যায়, একজন ঈমানদার মুসলমান যদি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে একটি অনুকরণীয় ও অনুসরণীয় আদর্শ পেতে চায় তাহলে সে যেন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর আদর্শকে নিজের জীবনে বাস্তবায়নের চেষ্টা চালায়।#

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ/ ১

খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন

২০১৮-০৯-০১ ১৮:১৪ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য