• দেখব ঘুরে ইরান এবার:  কেশ্‌ম দ্বীপের আয়তন দেড় হাজার বর্গ কিলোমিটার

কেশ্‌ম দ্বীপের আয়তন দেড় হাজার বর্গ কিলোমিটার। পারস্য উপসাগরে অবস্থিত দ্বিতীয় বৃহত্তম দ্বীপ হলো বাহরাইন। আর বাহরাইনের তুলনায় কেশ্‌ম দ্বীপ আড়াই গুণ বড়ো। হরমুজ প্রণালীর প্রান্ত জুড়ে কেশ্‌ম দ্বীপটি বিস্তৃত।

উল্লেখ করা দরকার যে পঞ্চান্ন কিলোমিটার প্রস্থময় হরমুজ প্রণালীটি বিশ্বের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জলপথ। ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় পারস্য উপসাগরের উপকূলে প্রায় ৯০০ কিলোমিটার জলপথ জুড়ে সেই ওমান সমুদ্রের আন্তর্জাতিক পানিসীমা পর্যন্ত প্রণালীটি বিস্তৃত। কেশ্‌ম দ্বীপটি দৈর্ঘ্যে ১২০ কিলোমিটার আর প্রস্থে ১০ থেকে ৩৫ কিলোমিটার। দ্বীপের সবচেয়ে উঁচু জায়গাটির উচ্চতা সাড়ে তিন শ মিটার। দ্বীপের আবহাওয়া সবসময়ই আর্দ্র থাকে। বছরের কোনো কোনো সময় বা মাসে আর্দ্রতার মাত্রা শতকরা ৯৫ ভাগে অর্থাৎ সবোর্চ্চ পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছে।

বিচিত্র উদ্ভিদ আর গাছ গাছালিতে পূর্ণ কেশম দ্বীপ। হারা নামে একটি বন আছে এই দ্বীপে, ওই বনে বিরল প্রজাতির বহু উদ্ভিদ রয়েছে। রয়েছে আবিসিনিয়া ম্যারিনা নামে একটি উদ্ভিদও। ইরানের বিখ্যাত দার্শনিক ও মনীষী আবু আলি সিনার নামানুসারেই এই উদ্ভিদটির নামকরণ করা হয়েছে। হারা বনাঞ্চলটি কেশম দ্বীপের উত্তর পশ্চিমে পড়েছে। প্রায় পণর হাজার হেক্টর জায়গা জুড়ে এই বনাঞ্চলটি অনন্য সাধারণ একটি পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। তাকিয়ে থাকতেই শুধু মন চায়। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এই চমৎকার বনাঞ্চলটি এখন আন্তর্জাতিকভাবে সংরক্ষিত একটি এলাকা। স্থানীয় পাখপাখালি ছাড়াও বিচিত্র অতিথি পাখির সমাগমে মুখরিত থাকে এই এলাকাটি। কারণ সংরক্ষিত এলাকা হবার ফলে এখানে কেউ শিকার করতে পারে না। পাখিরাও তাই এই বনে একেবারেই নিশ্চিন্তে এবং নিরাপদে জীবন যাপন করে।

এখানে মাছের উৎপাদরও হয় প্রচুর। চিংড়িসহ  আরো বিভিন্ন জাতের মাছ এখানে প্রচুর পরিমাণে উৎপাদিত হয়। ফ্রি ট্রেড জোন কেশম দ্বীপে বেড়াতে গেলে যদি এই হারা বনাঞ্চলটিতে না যান তাহলে কেশম দ্বীপ সফর করাটাই অসমাপ্ত থেকে যাবে। পারস্য উপসাগরের নয়নাভিরাম নীল পানির বুকে দিনের কয়েকটি ঘণ্টা অতিবাহিত করে ওই নীল পানির আয়নায় সবুজ আর সবুজের সমারোহপূর্ণ বনটির প্রতিচ্ছায়া দেখতে কী যে অদ্ভুত সুন্দর লাগবে ভাবতেও অবাক লাগে।

কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে জোয়ার যখন আসে তখন উপসাগরের পানির স্তর উপরে উঠে যায়। সমুদ্রের মাঝখানে কিংবা উপকূল থেকে কিছুটা গভীর জলের বুকে থেকে বনের দিকে তাকালে তখন আর বনটির অস্তিত্বই টের পাওয়া যাবে না। কারণ পানির স্তরের নীচে চলে যায় বনটি। জোয়ার শেষে পানি স্তর নীচে নেমে এলে আবার ঠিক হয়ে যায়। ধীরে ধীরে যেন জেগে ওঠে সেই বন পানির নীচে থেকে। এই দৃশ্য না দেখলে বর্ণনা দিয়ে বোঝানো খুব সহজ ব্যাপার নয়। 

কেশম দ্বীপটি ১৯৮৯ সালে ইরানের দ্বিতীয় ফ্রি ট্রেড জোন বা মুক্ত বাণিজ্য বন্দর হিসেবে কার্যক্রম শুরু করেছে। ওমান সাগর এবং পারস্য উপসাগরে শিল্প ও বাণিজ্য অঞ্চল হিসেবে সবচেয়ে ব্যস্ত একটি এলাকা হলো কেশম দ্বীপ। আয়করের দিক থেকেও কেশমের অবস্থান কার্যক্রম শুরুর পরের বছর থেকেই চোখে পড়ার মতো পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। অবশ্য আয়করের কাজও শুরু হয়েছিল পরের বছর থেকে। কেশম বন্দরের কার্যক্রম শুরু হবার মধ্য দিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সমগ্র ইরানের বাণিজ্যিক কার্যক্রম ব্যাপকভাবে বিস্তৃতি লাভ করে। সাম্প্রতিক কয়েক বছরে এই দ্বীপে বিশাল বিশাল প্রকল্পে হাত দেওয়ার ফলে দ্বীপের চেহারাটাই পাল্টে গেছে।

বাণিজ্যিক কারণে কেশম দ্বীপে দেশী বিদেশী বহু লোকের বসবাস লক্ষ্য করা যায়। স্থানীয় অধিবাসী তো রয়েছেই। অ-স্থানীয় এবং অভিবাসী লোকজনের সংখ্যাও প্রচুর। এদের বেশিরভাগই ব্যবসা বাণিজ্যের সাথে জড়িত। ব্যবসা বাণিজ্যের কারণে এখানে গড়ে উঠেছে সরকারী বহু প্রতিষ্ঠানও। ব্যাংক বীমা তো রয়েছেই শিল্প ও খনিজসহ বাণিজ্যিক বহু প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠানও এখানে লক্ষ্য করা যাবে। সরকারী সেবা প্রদান মূলক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও এখানে কম নয়।

কেশমের লোকজনের মূল ভাষা ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলসহ অন্যান্য অঞ্চলের দ্বীপগুলোতে বসবাসকারী মানুষের মতোই ফার্সি। ইরানের দ্বীপাঞ্চলে যারা বসবাস করে, চাই সেটা দক্ষিণেই হোক কিংবা উত্তরে তাদের মধ্য থেকে যারা বিভিন্ন দ্বীপ ভ্রমণে যায় কেশমের ভাষা তাদের কাছে সহজবোধ্য। কেশমের শহরাঞ্চলের অধিবাসীদের ভাষার সাথে গ্রামাঞ্চলের লোকজনের ভাষার তেমন একটা পার্থক্য নেই, মোটামুটি একরকমই বলা যায়। অবশ্য কেশম এবং দারগাহন শহরের লোকজন পার্শ্ববর্তী এলাকা মিনাব, বন্দর আব্বাস, বন্দর লাঙ্গেসহ পার্শ্ববর্তী আরো অনেক বন্দরে যাওয়া আসা করে। এ কারণে কেশম এবং দারগাহন শহরের লোকজনের ওপর ওইসব এলাকার ভাষার কিছুটা ছাপ পড়ে থাকবে।

কেশমের বহু এলাকার মানুষ পারস্য উপসাগরীয় আরব দেশগুলোতে ব্যাপক যাওয়া আসা করে। একইভাবে ভারতেও যায়। এ কারণে কেশমের লোকজন হিন্দি এবং আরবি ভাষার সাথেও কমবেশি পরিচিত। অবশ্য বিপরীত ঘটনাটাও আছে অর্থাৎ ইরানের ফার্সি ভাষার প্রভাবও ভারতসহ পারস্য উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর ভাষায় পড়েছে। তো সব মিলিয়ে বলা চলে কেশম দ্বীপের লোকজনের ভাষা একটা মিশ্র ভাষা। বন্দরী ফার্সি ভাষার সাথে যেসব ভাষার সংমিশ্রণ ঘটেছে সেগুলো হলো হিন্দি, আরবি এবং ইংরেজি।

বহু ভালো দিক রয়েছে কেশমের, তবে একটা বিষয়ে খানিকটা ব্যতিক্রম। সেটা হলো কেশমে কৃষিকাজ তুলনামূলকভাবে কম হয়। এর কারণটা হলো কেশমের পানি হলো নোনা। মিষ্টি পানি এখানে সীমিত। বৃষ্টিপাতের পরিমাণও এখানে কম। তবে কেশমে এখন পশুপালন হচ্ছে মোটামুটি ভালোই। এখানে লঞ্চ তৈরির মতো শিল্পটির প্রচলনও বেশ লক্ষণীয়। কেশমে রয়েছে বহু প্রাচীন নিদর্শন। এসব নিদর্শন নিয়ে আজ আর কথা বলার সুযোগ নেই।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/ ২

খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন

ট্যাগ

২০১৮-০৯-০২ ১৭:৫৯ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য