কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের আজকের পর্বে সূরা আল আহযাবের ৫১ থেকে ৫৪ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। এই সূরার ৫১ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন,

  تُرْجِي مَنْ تَشَاءُ مِنْهُنَّ وَتُؤْوِي إِلَيْكَ مَنْ تَشَاءُ وَمَنِ ابْتَغَيْتَ مِمَّنْ عَزَلْتَ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْكَ ذَلِكَ أَدْنَى أَنْ تَقَرَّ أَعْيُنُهُنَّ وَلَا يَحْزَنَّ وَيَرْضَيْنَ بِمَا آَتَيْتَهُنَّ كُلُّهُنَّ وَاللَّهُ يَعْلَمُ مَا فِي قُلُوبِكُمْ وَكَانَ اللَّهُ عَلِيمًا حَلِيمًا (51)

“(হে রাসূল!) আপনি আপনার স্ত্রীদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা দূরে রাখতে পারেন এবং যাকে ইচ্ছা কাছে রাখতে পারেন। আপনি যাকে দূরে রেখেছেন, তাকে (আবার) কামনা করলে তাতে আপনার কোন ভয় নেই। এতে অধিক সম্ভাবনা আছে যে, তাদের চক্ষু শীতল থাকবে; তারা দুঃখ পাবে না এবং আপনি যা দেন, তাতে তারা সকলেই সন্তুষ্ট থাকবে। তোমাদের অন্তরে যা আছে, আল্লাহ জানেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সহনশীল।” (৩৩:৫১)

গত আসরে আমরা বলেছি, বিবি খাদিজা সালামুল্লাহি আলাইহার ওফাতের সময় আল্লাহর রাসূল (সা.)’র বয়স ছিল ৫৩ বছরের বেশি। ওই সময় তিনি কয়েকজন নারীকে বিয়ে করেন। এর মধ্যে কয়েকটি বিয়ে হয়েছিল কিছু গোত্রের অনুরোধে। এসব গোত্র রাসূলের সঙ্গে নিজেদের কোনো নারীর বিয়ে দিয়ে মহানবীকে জামাতা হিসেবে পাওয়ার সম্মান অর্জন করতে চেয়েছিল। আবার কোনো কোনো বিয়ে হয়েছিল বিধবা নারীদের আশ্রয় দেয়ার জন্য। এদের মধ্যে বিবি আয়েশা ছাড়া আর সব নারী বিধবা ছিলেন।

এসব বিয়ের বেশিরভাগেরই প্রস্তাবদাতা যেহেতু নারীপক্ষ ছিল তাই তারা মোহরানা ছাড়াই রাসূলুল্লাহর স্ত্রী হতে চেয়েছিলেন। তাদের একমাত্র কামনা ছিল বিশ্বনবীর স্ত্রীর মর্যাদা লাভ করা। এ কারণে আল্লাহ তায়ালা এই আয়াতে স্ত্রীদেরকে সময় দেয়ার বিষয়টিকে মহানবী (সা.)’র ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, স্ত্রীরা যেভাবে সন্তুষ্ট থাকে এবং আপনি যেভাবে ইচ্ছা করেন সেভাবে তাদেরকে সময় দিতে পারেন। অবশ্য এটা স্বাভাবিক যে, রিসালাতের গুরুদায়িত্ব পালনের পর সব স্ত্রীর ইচ্ছা অনুযায়ী তাদের সবাইকে সময় দেয়া আল্লাহর রাসূলের পক্ষে সম্ভব ছিল না। তবে মহানবীর দৃষ্টিতে যেটা ভালো এবং তাঁর পক্ষে যতটুকু সম্ভব তিনি ততটুকু স্ত্রীদের সন্তুষ্ট করেছেন।

এই আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে:

১. সামাজিক বা ধর্মীয় যতবড় দায়িত্বই একজন মানুষের কাঁধে থাকুক না কেন তার পাশাপাশি পারিবারিক দায়িত্ব পালন করতে ভুলে গেলে চলবে না।

২. পরিবারের অন্য সদস্যদের বিশেষ করে স্ত্রীর পক্ষ থেকে স্বামীর কঠিন সামাজিক দায়িত্বের কথা বিবেচনা করে তার পক্ষে যতটুকু সম্ভব ততটুকু আশা করতে হবে, তার বেশি নয়।

৩. স্ত্রীর জন্য এমন একটি শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করার পুরুষের কর্তব্য যেখানে স্ত্রী সন্তুষ্টচিত্তে জীবন যাপন করতে পারেন এবং কোনোকিছুতে কষ্ট না পান।

সূরা আহযাবের ৫২ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

لَا يَحِلُّ لَكَ النِّسَاءُ مِنْ بَعْدُ وَلَا أَنْ تَبَدَّلَ بِهِنَّ مِنْ أَزْوَاجٍ وَلَوْ أَعْجَبَكَ حُسْنُهُنَّ إِلَّا مَا مَلَكَتْ يَمِينُكَ وَكَانَ اللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ رَقِيبًا (52)

“(হে রাসূল!) এরপর আপনার জন্যে কোন নারী হালাল নয় এবং তাদের পরিবর্তে অন্য স্ত্রী গ্রহণ করাও হালাল নয় যদিও তাদের রূপলাবণ্য আপনাকে মুগ্ধ করে, তবে দাসীর ব্যাপার ভিন্ন। আল্লাহ সর্ব বিষয়ের উপর সজাগ নজর রাখেন।” (৩৩:৫২) 

এই আয়াতে রাসূলুল্লাহকে নারীদের পক্ষ থেকে নতুন করে আর কোনো বিয়ের আবেদনে সাড়া না দেয়ার নির্দেশ জারি করে আল্লাহ তায়ালা বলছেন: হে নবী! আপনি আর কোনো নারীর বিয়ের প্রস্তাবে ইতিবাচক সাড়া দেবেন না। তাদেরকে বলে দিন, আল্লাহ আমাকে আর কোনো স্ত্রী গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকতে বলেছেন। যদি এমন প্রস্তাব আসে যে, বর্তমান স্ত্রীদের কাউকে তালাক দিয়ে আমাকে বিয়ে করুন তবুও সে আবদার গ্রহণ করবেন না। এমনকি যদি কোনো নারী অল্পবয়সী এবং রূপবতীও হয় তারপরও তার আবেদন গ্রহণ করা যাবে না।

ঐতিহাসিক বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর কোনো স্ত্রীকে তালাক দিয়ে তার পরিবর্তে কোনো যুবতী নারীকে বিয়ে করেননি।

এই আয়াতের দু’টি শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে:

১. যারা রাসূলুল্লাহ (সা.)’র নবুওয়াতের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে তাদের জবাব দেয়ার জন্য এই ধরনের আয়াত তুলে ধরা যায়। যদি কুরআন মহানবীর নিজস্ব সৃষ্টি হতো তাহলে তিনি কখনো এভাবে নিজের জন্য সীমাবদ্ধতা আরোপ করতেন না।

২. কোনো সুন্দরী যুবতী নারীকে বিয়ে করার প্রলোভনে পড়ে বর্তমান স্ত্রীকে উপেক্ষা করা কিংবা তালাক দেয়াকে আল্লাহ তায়ালা নিষেধ করে দিয়েছেন।

এই সূরার ৫৩ ও ৫৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا لَا تَدْخُلُوا بُيُوتَ النَّبِيِّ إِلَّا أَنْ يُؤْذَنَ لَكُمْ إِلَى طَعَامٍ غَيْرَ نَاظِرِينَ إِنَاهُ وَلَكِنْ إِذَا دُعِيتُمْ فَادْخُلُوا فَإِذَا طَعِمْتُمْ فَانْتَشِرُوا وَلَا مُسْتَأْنِسِينَ لِحَدِيثٍ إِنَّ ذَلِكُمْ كَانَ يُؤْذِي النَّبِيَّ فَيَسْتَحْيِي مِنْكُمْ وَاللَّهُ لَا يَسْتَحْيِي مِنَ الْحَقِّ وَإِذَا سَأَلْتُمُوهُنَّ مَتَاعًا فَاسْأَلُوهُنَّ مِنْ وَرَاءِ حِجَابٍ ذَلِكُمْ أَطْهَرُ لِقُلُوبِكُمْ وَقُلُوبِهِنَّ وَمَا كَانَ لَكُمْ أَنْ تُؤْذُوا رَسُولَ اللَّهِ وَلَا أَنْ تَنْكِحُوا أَزْوَاجَهُ مِنْ بَعْدِهِ أَبَدًا إِنَّ ذَلِكُمْ كَانَ عِنْدَ اللَّهِ عَظِيمًا (53) إِنْ تُبْدُوا شَيْئًا أَوْ تُخْفُوهُ فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمًا (54)

“হে ঈমানদারগণ! খাবার খাওয়ার অনুমতি না দেয়া পর্যন্ত তোমরা রাসূলের ঘরে প্রবেশ করো না। (নির্ধারিত সময়ের আগে এসো না এবং) রান্না শেষ হওয়ার অপেক্ষায় থেকো না। তবে তোমাদেরকে আহ্বান করা হলে তোমরা প্রবেশ করো এবং অতঃপর খাওয়া শেষে আপনা আপনি চলে যেও, কথাবার্তায় মশগুল হয়ে যেও না। (খাওয়ার পরও অনর্থক কথাবার্তা বলা) রাসূলের জন্য পীড়াদায়ক। তিনি এ ব্যাপারে সংকোচবোধ করেন (এবং তোমাদেরকে কিছু বলেন না) কিন্তু আল্লাহ সত্য বলতে সংকোচবোধ করেন না। এবং যখনই রাসূলের স্ত্রীদের কাছে কোনো কিছু চাইলে পর্দার অন্তরালে থেকে চাইবে। এটা তোমাদের এবং তাদের অন্তরের জন্য অধিক পবিত্রতার কারণ। আল্লাহর রাসূলকে কষ্ট দেয়া এবং তাঁর ওফাতের পর তাঁর স্ত্রীদের বিয়ে করা তোমাদের জন্য বৈধ নয়। আল্লাহর কাছে এটা গুরুতর অপরাধ।” (৩৩:৫৩) 

“তোমরা খোলাখুলি কিছু বলো অথবা গোপন রাখ, আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সর্বজ্ঞ।” (৩৩:৫৪)

এই আয়াতে কিছু সামাজিক আদব-কায়দা সম্পর্কে দিক নির্দেশনা দিয়ে মুমিন ব্যক্তিদের উদ্দেশে বলা হচ্ছে:

ক. অনুমতি না নিয়ে কারো ঘরে প্রবেশ করবে না।

খ. কেউ তোমাদের দাওয়াত দিলে নির্ধারিত সময়ের আগে সেখানে উপস্থিত হবে না এবং খাওয়া শেষ হয়ে গেলে সে ঘর ত্যাগ করবে।

গ. যদি দাওয়াত ছাড়াই কারো বাড়িতে জরুরি কাজে যেতে হয় তাহলে দরজার বাইরে থেকে তোমাদের অভিপ্রায় বর্ণনা করবে এবং বাড়ির নারীদের পর্দা রক্ষা করবে। এমন কোনো কাজ করবে না যাতে প্রশ্ন সৃষ্টি হয় এবং তাকওয়ার ব্যাঘাত ঘটে।

আল্লাহ তায়ালার এ নির্দেশ তাঁর রাসূল ও পরিবারের সদস্যদের ক্ষেত্রে কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) কষ্ট পান এমন কাজ থেকে সর্বাবস্থায় বিরত থাকতে হবে। অবশ্য এখানে মেহমানদারি সম্পর্কে অল্প কয়েকটি নির্দেশনা এসেছে। পবিত্র কুরআনের অন্যত্র এ ব্যাপারে আরো বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

এই দুই আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে:

১. মুমিন ব্যক্তিদেরকে সামাজিক আচার ব্যবহারের ক্ষেত্রেও কুরআনের নির্দেশ পালন করতে হবে; শুধুমাত্র আল্লাহর ইবাদত যথেষ্ট নয়।

২. প্রতি ঘরেরই নির্ধারিত সীমা রয়েছে। মালিকের অনুমতি না নিয়ে সেই সীমা অতিক্রম করা যাবে না।

৩. মেহমানদারি করা ইসলামের একটি উত্তম কাজ। কিন্তু তাই বলে অতিথি যেন ঘরের মালিকের জন্য অসন্তোষের কারণ হয়ে না দাঁড়ান।

৪. পবিত্রতা রক্ষা ও ক্ষতিকর কার্যকলাপ রোধ করার জন্য ইসলামে নারী ও পুরুষের মধ্যে পর্দার বিধান করা হয়েছে। কাজেই কঠোরভাবে এ বিধান পালন করতে হবে।# 

 

 

২০১৮-০৯-০২ ১৮:১১ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য