আপনারা জানেন যে, ইরানের জলে-স্থলে, ক্ষেত-খামারে, বাগ-বাগিচায়, কল-কারখানায় উৎপাদিত হয় বিচিত্র সামগ্রী। এর পাশাপাশি খনি থেকে উৎপন্ন বিভিন্ন সামগ্রী এবং ইরানি নরনারীদের মেধা ও মনন খাটিয়ে তৈরি করা হয় বিভিন্ন শিল্পপণ্য। তো এগুলোর সঙ্গে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য আমাদের সাপ্তাহিক আয়োজন " ইরানি পণ্য সামগ্রী"র আজকের পর্বে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। গত আসরে আমরা ইরানের গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পণ্য তামা নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করেছি।

গত আসরে আমরা বলেছিলাম একটা সময়ে তামাকে গলিয়ে বিভিন্ন সরঞ্জাম তৈরি করা বেশ কঠিন একটা কাজ ছিল। তবে কালের পরিক্রমায় মানুষের চিন্তা ও বুদ্ধির বিকাশ ঘটে এবং তামা দিয়ে তৈরি বিভিন্ন শিল্পপণ্য নির্মাণ পদ্ধতি ও কৌশলে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। আজকাল আর আগের মতো সেই চুল্লি করে হাতে পিটিয়ে তাম্রপণ্য তৈরি করতে হয় না। এখন সবকিছুই বৈদ্যুতিক মেশিনের সাহায্যে হচ্ছে। তাছাড়া বাজারে এখন এইসব পণ্যের চাহিদা বেড়েছে। কমেছে এই শিল্পপণ্যের দাম। প্রযুক্তির কল্যাণে নির্মাণ পদ্ধতিগত পরিবর্তন এলেও সেই প্রাচীনকালের শিল্পসুষমায় পরিবর্তন আসে নি। এখনকার তামাশিল্পে আগেকার ডিজাইনগুলো এখনও দেখতে পাওয়া যায়। যাই হোক তাম্রশিল্প নিয়ে আজকের আসরেও আমরা কিছু কথা বলার চেষ্টা করবো।

ইরানের কেরমান প্রদেশ, ইয়াযদ প্রদেশ, ইস্ফাহান, কোম, কাশানসহ আরও অনেক প্রদেশের প্রাচীন বাজারগুলোতে বেড়াতে গেলে একটা শব্দের ঝংকার আপনার কানে ভেসে আসবে। এই শব্দটির একটা ছন্দ আছে। অভিজ্ঞ তামা শিল্পীরা হাতুড়ি দিয়ে তামার পাতে পিটিয়ে বিভিন্ন ডিজাইন করেন, সেই শব্দের একটা অনুরণন তৈরি হয়। কী যে অদ্ভুত সব নকশা বা ডিজাইন তারা তৈরি করেন সামান্য হাতুড়ির মতো হাতিয়ার দিয়ে তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস হবার কথা নয়। এ পর্যন্ত যেসব গবেষণা হয়েছে তা থেকে একটি তথ্য উঠে এসেছে। সেটা হলো সমগ্র বিশ্বে তামার মজুদের তিন শতাংশ ইরানে রয়েছে। ইরানের এইসব তামার খনি ও মজুদ দেশের উত্তর পশ্চিমাঞ্চল থেকে শুরু করে দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলীয় বিভিন্ন এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে বিস্তৃত।

ইরানের ঐতিহাসিক কেরমান প্রদেশও তামার খনির জন্য সমৃদ্ধ এলাকাগুলোর অন্তর্ভুক্ত। অনেকেই কেরমানকে ইরানের 'খনির বেহেশত' নামে অভিহিত করার পক্ষপাতী। এই প্রদেশটি ইরানের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত। ইরানের সবচেয়ে বড় প্রদেশ এই কেরমান। কেরমান এলাকার ভূতাত্ত্বিক কাঠামো এমন যে,একেক এলাকায় একেক রকমের খনিজ সম্পদের সমৃদ্ধ মজুদ রয়েছে। ধাতব, অধাতব যেমন তামা, আকরিক লোহা, জিংক, সীসা, দস্তা, ক্রোমাইট,সোনা, ফসফেট, চুন, প্লাস্টার, কোয়ার্টজ,মার্বেল,গ্রানাইট, কয়লা ইত্যাদি বিচিত্র  ধাতব ও অধাতব খনিজ সম্পদ এই প্রদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। কেরমান প্রদেশটি বিশেষ করে তামার খনির জন্য বিশ্বব্যাপী বিখ্যাত। খনিজ এই ধাতব তামা ও তামা শিল্প নিয়ে আমরা আরও কিছু কথা বলবো খানিক মিউজিক বিরতির পর।

তামার খনি

কেরমান প্রদেশের তামার খনি সমগ্র বিশ্বের বৃহত্তম খনিগুলোর একটি আর মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে সবচেয়ে বড়। জাগরোস পর্বতমালার পাদদেশে এই খনিটি অবস্থিত। তামা ছাড়াও এখানে রয়েছে মোলিবডেনাম এবং সোনার মতো মূল্যবান ধাতব উপাদান। গবেষণায় দেখা গেছে এ পর্যন্ত ইরানে তামার যত জিনিসপত্র উৎপাদন করা হয়েছে তার অর্ধেকই হয়েছে এই কেরমানের তামা খনির তামা দিয়ে। সারচেশমে তামা কমপ্লেক্স বিশ্বের বৃহত্তম খনিজ-শিল্প কমপ্লেক্সগুলোর একটি। খনিজ তামা গলানো, রিফাইনারি, ছাঁচে ঢালাইয়ের কাজসহ আরও বিচিত্র কাজ চলে এই কমপ্লেক্সে। একটি জিও-ট্যুরিজম কমপ্লেক্স হিসেবেও এই কমপ্লেক্স দর্শনীয় স্পটে পরিণত হয়েছে।

ইরানের পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশের সুনগুন তামার খনিটিও বেশ সমৃদ্ধ। এই খনিতে রয়েছে মূল্যবান বহু ধাতব যার কারণে এটিকে দেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্থ বিনিয়োগযোগ্য বলে মনে করা হয়। তামা বিশেষজ্ঞদের মতে সুনগুনের তামার খনি পৃথিবীর বৃহত্তম তামার খনিগুলোর একটি। বিশেষজ্ঞদের হিসেব অনুযায়ী পুরো ইরানে যত তামা এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়েছে তার চল্লিশ শতাংশই রয়েছে এই সুনগুন খনিতে। বৈশিষ্ট্যগত কারণে বিশ্বে ব্যবহৃত যত ধাতব রয়েছে তার মধ্যে তামা গুরুত্বপূর্ণ। এই তামায় জং ধরে না। এর কোনো বায়োলজিক্যাল পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই মানে তামা কোনোরকম পরিবেশ দূষণ করে না। আরও অনেক ইতিবাচক বৈশিষ্ট্য রয়েছে তামার। তামা এখন ইলেক্ট্রিক শিল্প, বিদ্যুৎ সরবরাহ, টেলিকমিউনিকেশনে, পাইপ লাইন ও বিল্ডিং কনস্ট্রাকশনে, গাড়িতে, গৃহসামগ্রি নির্মাণে এমনকি সামরিক শিল্পেও ব্যবহৃত হচ্ছে। সুতরাং তামা শিল্প এখন মানুষের জীবনের নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে।

সুনগুন তামার খনি

তামার চাহিদা ও ব্যবহার বেড়ে যাবার ফলে এই শিল্পের প্রযুক্তিতে ব্যাপক অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। অর্থনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ এই শিল্পের সঙ্গে যারা জড়িত রয়েছেন তারাও এ ব্যাপারে মনোযোগী হয়েছেন। ইরানের বিভিন্ন প্রান্তে তামা উত্তোলনসহ তামা থেকে বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনের ব্যাপারে ব্যাপক তৎপরতা চলছে। তামার পাত্রে সূক্ষ্ম কারুকাজ করে যেসব শো-পিস বানানো হচ্ছে বিশ্বব্যাপী সেগুলোর ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। খুব গরমেও তামা গলে যায় না সহজে। সেজন্য ক্যাবল বা তার তৈরির ক্ষেত্রে তামার ব্যবহার হচ্ছে প্রচুর। তামার তৈরি জিনিসপত্র এখন ইরানের অভ্যন্তরে তো বটেই ইরানের বাইরেও বিশেষ করে চীণ, ভারত, তাইওয়ান, ওমান, তুরস্ক এবং আরব আমিরাতসহ আরও বহু দেশে রপ্তানি করা হচ্ছে।

বন্ধুরা! বাংলাপিডিয়ায় এসেছে: "ধাতু একটি রাসায়নিক উপাদান এবং শিল্প হল একটি পেশাভিত্তিক কাজ যার জন্য প্রয়োজন নির্দিষ্ট ধরনের কাজের ওপর দক্ষতা। ঐতিহাসিকভাবে, বিশেষ করে মধ্যযুগ বা তারও পুর্বে এ শব্দটি ব্যবহূত হতো নির্দিষ্ট একটি জনগোষ্ঠির ক্ষেত্রে যারা ধাতু দ্বারা বিভিন্ন ব্যবহারযোগ্য দ্রব্য হাতে তৈরি করত। ধাতুর ওপর খোদাই করে দ্রব্য তৈরির শিল্প প্রাচীনকাল থেকেই প্রচলিত হয়ে আসছে"। আর প্রাচীনকাল থেকেই এই শিল্পের অগ্রবর্তী অবস্থানে রয়েছে ইরান। যাই হোক হাতে আজ আর সময় নেই।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/ মো:আবু সাঈদ/ ৪

 খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন

২০১৮-০৯-০৪ ২০:২৮ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য