• দেখব ঘুরে ইরান এবার: অসাধারণ একটি দ্বীপের নাম ‘আবু মূসা’ দ্বীপ

আবু মূসা শহরটির আয়তন ৭০ বর্গকিলোমিটার। এই শহরটিতে আরো কয়েকটি ছোটো ছোটো দ্বীপাঞ্চলও রয়েছে। এগুলো হলো তোম্বে বোযোর্গ দ্বীপ, তোম্বে কুচাক দ্বীপ, সীরি, ফরভারে বোযোর্গ এবং ফরভারে কুচাক।

তবে আবু মূসা দ্বীপ হলো এই শহরের মূল কেন্দ্র। আবু মূসা দ্বীপটির আয়তন প্রায় ১৩ বর্গকিলোমিটার। আয়তনের দিক থেকে তৃতীয় বৃহত্তম দ্বীপাঞ্চলীয় শহর এটি। ফরভারে বোযোর্গ দ্বীপ এবং সীরি আবু মূসা শহরের কাছেই অবস্থিত। আবু মূসা দ্বীপের চেয়েও বড়ো এই এলাকাটি। হরমুযগান প্রদেশের কেন্দ্রীয় শহর বন্দরআব্বাস থেকে ২২২ কিলোমিটার দূরত্বে আবু মূসা দ্বীপ অবস্থিত। তোম্বে বোযোর্গ ও তোম্বে কুচাক দ্বীপের সাথে আবু মূসা দ্বীপের দূরত্ব যেটুকুই হোক না কেন পানির গভীরতার কারণে এই জলপথে শুধু তেলের বড়ো বড়ো জাহাজই চলে। ইতিহাসে আবু মূসা দ্বীপের আরো কয়েকটি নামও পাওয়া যায়, সে সব নামের অর্থ দাঁড়ায় সবুজ শ্যামল ভূমি।

আবু মূসা দ্বীপের আবহাওয়া গরম এবং আর্দ্র। যেহেতু এলাকাটি বিষুবরেখার কাছাকাছি পড়েছে সে কারণে পারস্য উপসাগরের অপরাপর দ্বীপের আবহাওয়ার তুলনায় এই দ্বীপটির আবহাওয়া একটু বেশি গরম। এখানে বেশিরভাগ বৃষ্টিপাত হয় শীতের শেষে এবং বসন্ত ঋতুর শুরুতে। এখানকার বৃষ্টিপাত একটু ব্যতিক্রম। বাংলাদেশের উপভোগ্য বৃষ্টির মতো নয় বরং শিলাবৃষ্টি যেরকম গুলতি দিয়ে ঢিল মারার মতো বর্ষিত হয় আবু মূসা দ্বীপের বৃষ্টিপাত অনেকটা সে রকম। সুতরাং বৃষ্টিবিলাসী বাংলাদেশিরা এখানকার বৃষ্টি উপভোগ করার আগে শিলাবৃষ্টির বিষয়টি বিবেচনায় রাখবেন। তবে সুখের বিষয় হলো এখানকার শিলাবৃষ্টি একটানা হয় না, পশলা পশলা হয়।

আবু মূসা দ্বীপে কোনো নদী নেই। কেবল তার উত্তরে কয়েকটা মওসুমি নদী আছে যাকে মরা নদী বলাই ভালো। এখানকার জনগণের খাবারের পানি কূপ থেকে কিংবা বৃষ্টির পানি থেকে সংগ্রহ করা হয়। আবার অনেক সময় বন্দর আব্বাস কিংবা বন্দর লাঙ্গে থেকেও নৌকা বা লঞ্চের মাধ্যমে এই দ্বীপে আনা হয়। এই দ্বীপের চার রকমের বায়ু প্রবাহিত হয়। উত্তুরে বায়ু অর্থাৎ পারস্য উপসাগরের উত্তর দিক দিয়ে এই বাতাস সমান্তরালে বয়ে যায়। আবার শীতকালে এখানকার বায়ু প্রবাহ থাকে পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে। এ কারণে শীতকালে এ এলাকায় প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। সোহায়লি বায়ু নামে আরেকটি বায়ুপ্রবাহ এখানে ঘটে গরমের সময়। দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে এই বায়ু উত্তর পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়। খুরমা গাছের খেজুর পাকার জন্যে এই বায়ু খুবই জরুরি। নাশি নামে আরেকটি বায়ু প্রবাহিত হয় এই দ্বীপে। এই বায়ু উত্তর পূর্ব দিক থেকে দক্ষিণ পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়। এই বায়ু পুরো দ্বীপে ঠাণ্ডা এবং তুফান বয়ে নিয়ে আসে।

আবু মূসা দ্বীপে খুরমা বাগান আছে প্রচুর। খেজুর বাগানের বাইরেও এখানে আরো বিচিত্র রকমের গাছ গাছালি দেখতে পাওয়া যায়। আবু মূসা দ্বীপে তেলের খনি যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে আয়রন রেড অক্সাইডেরও খনি। এখানে যে তেলের খনি আবিষ্কৃত হয়েছে গুণমানের দিক থেকে তা পারস্য উপসাগরীয় এলাকায় পাওয়া অন্যান্য তেলের খনির মধ্যে সবচেয়ে উন্নত।

সমগ্র পারস্য উপসাগরের পানিই বেশ স্বচ্ছ এবং নীল। আবু মূসা দ্বীপের পানিও তেমনি, তবে অনেকেই বলেন স্বচ্ছতম পানির নমুনাগুলোর একটি হলো এখানকার পানি। দ্বীপের উপকূলে বিচিত্র সামুদ্রিক প্রাণী দেখতে পাওয়া যায়।

এই উপসাগরের মাছ খুব সুস্বাদু এবং বিভিন্ন প্রকারের রঙ বেরঙের মাছ পাওয়া যায় এখানে। তবে এই দ্বীপে কৃষিকাজ করার উপযোগী জমিও নেই পানিও নেই। সে জন্যে চাষাবাদের পরিমাণ এখানে একেবারেই কম। এই দ্বীপের লোকজনের প্রধান পেশাই হলো মাছ ধরা। মাছ শিকারের পাশাপাশি আরেকটি কাজও এখানে করে থাকে স্থানীয় অধিবাসীরা, তবে ততোটা ব্যাপকহারে নয়। সেটা হলো মুক্তা সংগ্রহের কাজ।

শরতের শেষ এবং বসন্তের মাঝামাঝি সময়ে এই দ্বীপের আবহাওয়া থাকে বেশ প্রশান্ত এবং উপভোগ্য। দ্বীপের অসমতল মাটি ধীরে ধীরে বেড়ে গেছে ক্রমশ উত্তর দিকে। যেতে যেতে পৌঁছে গেছে দ্বীপের একেবারে উঁচু অঞ্চলে। যার নাম হচ্ছে ‘হালওয়া’ পাহাড়। এই পাহাড়ের উচ্চতা ১১০ মিটারের মতো।

এখানে সময়ের ব্যবধানে গড়ে উঠেছে অনেক প্রতিষ্ঠানও। এর মাঝে রয়েছে জেটি, রয়েছে সামরিক এবং জেলেদের ছোটো ছোটো জাহাজ রাখার ব্যবস্থা। আরো আছে বিমান বন্দর, মিষ্টি পানি তৈরির কারখানাসহ নাগরিক অন্যান্য সুবিধাও।

রয়েছে মসজিদ, মাদ্রাসা, টেলিফোন সংস্থা, সিনেমাসহ আরো বহু প্রতিষ্ঠান। এখানে যারা বসবাস করে তাদের জন্যে কোল্ড স্টোরেজেরও ব্যবস্থা রয়েছে। এই দ্বীপের অধিবাসীরা আর্যবংশোদ্ভুত ইরানী। এই ইরানীদের মাঝেই আবার কয়েকটি পরিবার আছে আরবি ভাষাভাষী। আবু মূসা দ্বীপের লোকেরা কঠোর পরিশ্রমী। আবার দেশপ্রেমিক এবং অতিথি পরায়নতার দিক থেকেও তাদের খ্যাতি রয়েছে।

তোম্বে বোযোর্গ এবং তোম্বে কুচাক দ্বীপসহ এই আবু মূসা দ্বীপের ইতিহাসে অনেক চড়াই উৎরাই রয়েছে। বহু উপনিবেশিক শক্তির নজর পড়েছে এই দ্বীপাঞ্চলের ওপর। ১৯৭১ সালে ইরান ব্রিটেন সমঝোতার পর এবং ব্রিটিশ সেনারা এ অঞ্চল ছেড়ে যাবার আগে কিংবা বলা চলে সংযুক্ত আরব আমিরাত দেশ গঠিত হবার আগে অন্তত ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ব্রিটিশ আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে ইরানের অব্যাহত অভিযোগের পর শেষ পর্যন্ত এই দ্বীপগুলো ইরানকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। মজার ব্যাপার হলো সংযুক্ত আরব আমিরাত একটা নবগঠিত দেশ হয়েও এই দ্বীপাঞ্চলের ওপর নিজেদের মালিকানা দাবি করে আসছে। এ কারণে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে এই দ্বীপগুলো নিয়ে ইরানের সম্পর্কটা কিছুটা অম্লমধুর।

সংযুক্ত আরব আমিরাত জাল দলিলপত্র বানিয়ে কোনো কোনো পশ্চিমা দেশকে বোঝানোর চেষ্টা করছে যে এই দিনটি দ্বীপ তাদের। কিন্তু ঐতিহাসিক অসংখ্য দলিল প্রমাণ এবং অপরিবর্তনীয় বহু ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে যে এই দ্বীপগুলো ইরানেরই মালিকানাধীন। #

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/ ৭

খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন

২০১৮-০৯-০৭ ১৬:১৭ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য