জীবনযাপনের ইসলামি পদ্ধতি ও দিক নির্দেশনা বিষয়ক ধারাবাহিক অনুষ্ঠান “আদর্শ জীবনযাপনের" আজকের আসরে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি।

আমরা গত আসরে বলেছিলাম যারা নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে সমাজের সাথে এমনকি নিজ পরিবারের সঙ্গেও তাদের সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। একইসঙ্গে আত্মীয় স্বজন বন্ধুবান্ধবের সাথেও ভালো সম্পর্ক থাকে না। শুধু যে সম্পর্ক থাকে না তাই নয় বরং তাদের মধ্যে এমন সব সমস্যা দেখা দেয় যার পরিণতি হয় খুবই ভয়াবহ। তো এ বিষয়ে আজকের আসরের শুরুতেই আলোচনা করবো বলে কথা দিয়েছিলাম আপনাদের।

সুদৃষ্টিবান হওয়ার অর্থ কিন্তু বাস্তবতা কিংবা প্রকৃত অবস্থা থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখা নয়। সুদৃষ্টি মানে হলো আল্লাহর সম্পর্কে সৎ ও ইতিবাচক চিন্তা করা, অন্যদের আচার ব্যবহার কাজকর্মের ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করা এবং বিশ্বের সকল ক্রিয়া প্রতিক্রিয়াকে নিখুঁত ও সৎভাবে দেখা। এই সুদৃষ্টি থেকেই সমাজে এবং জীবনে শান্তি, আশা-ভরসা ও উদ্যম উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়। এই সুদৃষ্টির অধিকারী হওয়ার উপায়গুলো শেখা এবং জীবনপথে চলার ক্ষেত্রে যেসব অপ্রত্যাশিত ঘটনা দুর্ঘটনা সামনে আসে সেগুলোকে কীভাবে মোকাবেলা করতে হয় সে সম্পর্কে জানা খুবই প্রয়োজন।

ধরা যাক সুন্দর একটি ফুল। ওই ফুলে মৌমাছি বসে। মধু নিয়ে সে মৌচাক বানায়। সেই মধু থেকে মানুষ বিচিত্রভাবে উপকৃত হয়। ওই ফুলেই আবার বোলতা বসে। সে একই ফুল থেকে নেয় বিষ। হুল ফুটিয়ে সেই বিষ মানুষের রক্তে প্রবেশ করিয়ে দিলে মানুষ বিষাক্রান্ত হয়। দৃষ্টি এই মৌমাছি আর বোলতার মতো। একটা কাঁচের গ্লাস ভেঙে গেলে সুদৃষ্টিবান ভাঙা কাঁচের শব্দ শুনে ভাবে আহা! কী চমৎকার ধ্বনি। আর কুদৃষ্টিবান যে সে ওই শব্দ শোনামাত্রই যে ভেঙেছে 'তার একদিন কি কাঁচের গ্লাসের মালিকের একদিন' করে ছাড়বে। সুদৃষ্টি আসলে একটি অমূল্য সম্পদ। এর ইতিবাচকতা বিচিত্র গুণে সমৃদ্ধ। পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের প্রফেসর আই পি স্লিগম্যান বলেছেন: 'গবেষণায় প্রমাণিত যে সুদৃষ্টি মানুষের দৈহিক সুরক্ষা দেয়ার পাশাপাশি দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করে'।

পক্ষান্তরে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণকারীর সঙ্গে পারিবারিক এবং সামাজিক একটা দূরত্ব সৃষ্টি হয়। ওই দূরত্বের কারণে বিচিত্র সমস্যা দেখা দেয়। পবিত্র কুরআনের সূরা নূরের ১২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: 'যখন তোমরা এটা শুনেছিলে তখনই কেন মু’মিন পুরুষ ও মু’মিন নারীরা নিজেদের সম্পর্কে সুধারণা করেনি এবং কেন বলে দাওনি এটা সুস্পষ্ট মিথ্যা দোষারোপ'? কুরআনে কারিম জীবনের উৎকণ্ঠাময় ঘটনা দুর্ঘটনার প্রতি যৌক্তিক দৃষ্টি দেয়।ইতিবাচক ও সুদৃষ্টির অধিকারী ব্যক্তি এইসব ঘটনার একটা অংশকে মনে করে তার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা।আর এই পরীক্ষার কারণ সে নিজেই। তার কোনো ভুল বা অসংলগ্ন আচরণই এর জন্য দায়ী। তাই ধৈর্যের সঙ্গে ঘটনা মোকাবেলা করার চেষ্টা করে এবং নিজেকে কুদৃষ্টি ও নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করে।

সুদৃষ্টির অধিকারী মানুষের ধৈর্যশীলতা ও যৌক্তিকভাবে সমস্যা মোকাবেলা করার কথা বলছিলাম। কিন্তু কুদৃষ্টি সম্পন্ন মানুষ যেহেতু সকল বিষয়ের প্রতি এমনকি তার আশেপাশের সমস্যাবলীর ব্যাপারেও নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করে তাদের ধৈর্য ধরার মতো মানসিক শক্তি থাকে না। অতি দ্রুতই তারা বিরক্ত হয়ে পড়ে। এ ধরনের মানুষ এমনকি যখন কোনো কাজ সুষ্ঠুভাবে অগ্রসর হতে থাকে তখনও সেই কাজের ফলাফল বা পরিণতি নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকে। এক ধরনের হতাশা বা আশাহীনতা তার জীবনে যেন বাসা বাঁধার সুযোগ পায় সেই অবকাশ দিয়ে দেয়। আর কারও জীবনে যদি হতাশা একবার বাসা বাঁধে অন্যান্য ক্ষেত্রেও তার কুপ্রভাব পড়ে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো যে-কেউ ইচ্ছে করলেই কিন্তু নিজের ভেতরে বিদ্যমান কুদৃষ্টির মতো বদগুণটি দূরীভূত করে ফেলতে পারে। সেইসঙ্গে সুদৃষ্টিবানও হয়ে উঠতে পারে যেন জীবনের গুণগতমান সবসময় উন্নত করে তোলা যায়।

যদি আপনি সুদৃষ্টিবান হয়ে ওঠার সৌভাগ্য অর্জন করেন এবং জীবনের সকল ঘটনা দুর্ঘটনাকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখেন তাহলে প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে জেগে উঠে প্রথমেই আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে বলুন: আলহামদু লিল্লাহ। আল্লাহ আপনাকে যে কতশত নিয়ামত বা অনুগ্রহ ধন্য করেছেন তার কোনো হিসেব নেই। এই শুকরিয়া সেই নিয়ামতের জন্য। এভাবে নিজের ভেতরে আনন্দ, উৎফুল্ল মনোভাব ও আশাবাদ সঞ্চার করুন।

 

প্রতিটি মানুষই কমবেশি প্রতিবেশীদের প্রভাবে প্রভাবিত হন। সুতরাং প্রতিবেশী নির্বাচনে সতর্কতা অবলম্বন করুন। চেষ্টা করবেন ইতিবাচক ও সুদৃষ্টিবান বন্ধু খোঁজার। এমন বন্ধু যে সবসময় আধা গ্লাস ভরা পানিই দেখে, আধা গ্লাস খালি দেখে না। বন্ধুদেরকে ইতিবাচক দৃষ্টির অধিকারীদের কাতারে নিয়ে আসার চেষ্টা করুন এবং ইতিবাচক মনোভাব প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে পরস্পরে আলাপ আলোচনা করুন। আপনি যখন ঘুমাতে যাবেন তখন যেসব বিষয় আপনাকে আনন্দিত করে সেসব নিয়ে ভাবুন। এমনকি ওইদিন কোনো ছোট্ট বিষয়ও যদি আপনাকে আনন্দ দিয়ে থাকে তা নিয়ে ভাবুন, আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করুন। ভুলে যাবেন না আল্লাহ আশাপূর্ণ একটি ভবিষ্যৎ আমাদের জন্য রেখে দিয়েছেন এবং কল্যাণময়, নিরাপদ ও সুখশান্তির সুসংবাদ দিয়েছেন।

সূরা নূরের ৫৫ নম্বর আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে পরিসমাপ্তি টানবো আজকের আসরের: আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন,তোমাদের মধ্য থেকে যারা ঈমান আনবে ও সৎ কাজ করবে তাদেরকে তিনি পৃথিবীতে ঠিক তেমনিভাবে খিলাফত দান করবেন যেমন তাদের পূর্বে অতিক্রান্ত লোকদেরকে দান করেছিলেন,তাদের জন্য তাদের দীনকে মজবুত ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করে দেবেন,যাকে আল্লাহ তাদের জন্য পছন্দ করেছেন এবং তাদের বর্তমান ভয়-ভীতির অবস্থাকে নিরাপত্তায় পরিবর্তিত করে দেবেন। তারা শুধু আমার বন্দেগী করুক এবং আমার সাথে কাউকে যেন শরীক না করে। আর যারা এরপর কুফরী করবে,তারাই ফাসেক।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো:আবুসাঈদ/  ৮

খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন 

২০১৮-০৯-০৮ ১৮:৩৯ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য