• দেখব ঘুরে ইরান এবার: কেরমান প্রদেশ

কেরমান প্রদেশটির আবহাওয়া বেশ বৈচিত্র্যময়। এখানকার সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, প্রাচীন শিল্প ঐতিহ্য সবই গুরুত্বপূর্ণ। এখানকার লোকজন বেশ কর্মক্ষম এবং কঠোর পরিশ্রমী, শান্ত এবং অতিথি পরায়ণ।

কেরমান প্রদেশের আরো একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো এখানকার আবহাওয়া। বেশ রহস্যময় আবহাওয়া বিরাজ করে এখানে। একই এলাকার বিশাল অংশ জুড়ে উষ্ণ বা গরম আবহাওয়া বিরাজ করে, আবার তার পাশেই আশ্চর্যজনকভাবে বিরাজ করে বেশ উপভোগ্য ঠাণ্ডা আবহাওয়া। একই এলাকায় একই সময়ে এরকম আবহাওয়াগত বৈচিত্র্য সত্যিই প্রকৃতির এক বিস্ময় বৈ তো নয়।

এ বর্ণনা থেকেই বোঝা যায় যে কেরমান প্রদেশের একেক এলাকার আবহাওয়া একেক রকম। তার মানে একই সময়ে কেরমানের কোনো একটি এলাকার আবহাওয়া যখন ঠাণ্ডা সে সময় অন্য একটি এলাকার আবহাওয়া ইরানের মধ্যে সবচেয়ে গরম। তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই কেরমান প্রদেশটিকে দুটি বিভাগে ভাগ করা যায়। একটি হলো ঠাণ্ডা আবহাওয়াময় অঞ্চল অপরটি উষ্ণ আবহাওয়াময়। আবহাওয়ার এই বৈচিত্র্যের কারণে একই সময়ে কেরমানে যেমন খুরমা খেজুর পাওয়া যায় তেমনি পাওয়া যায় লেবুও। একই সময়ে এগুলোর চাষও করা হয়। আবহাওয়াগত এই আনুকূল্যের কারণে কেরমানে পশুপালনেরও প্রচলন লক্ষ্য করা যায়। কেরমানের বিভিন্ন নকশার গালিচাও এখানকার আরেকটি পণ্য যে শিল্পটি এ এলাকার লোকজনই তৈরি করে থাকে।

কেরমান এলাকাটি বেশ প্রাচীন। এখানে জনবসতি গড়ে উঠেছিল খ্রিষ্টপূর্ব চার হাজার বছর আগে। মানব বসতির দিক থেকে তাই এই এলাকাটি নিশ্চয়ই ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে। যেহেতু ইরানের প্রাচীন এলাকাগুলোর একটি এই কেরমান, সে কারণে সামাজিক, ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ইত্যাদি সকল দিক থেকেই বেশ সমৃদ্ধ অঞ্চল এটি। যেখানে মানব বসতি ছিল সেখানে স্বাভাবিকভাবেই মানুষের জীবনযাপনের বিভিন্ন দিকের নানা বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠবে, ফুটে উঠবে সেখানকার শাসনব্যবস্থার ঐতিহাসিক দিক, নানা প্রতিষ্ঠানের ধ্বংসাবশেষ, পুনর্গঠনের নমুনাসহ আরো বহু দিক। কেরমানে এর সবই সুন্দরভাবে পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু কেরমান প্রদেশে ইস্পাহান কিংবা শিরাজ প্রদেশের মতো নিদর্শন বাহুল্যের স্বল্পতার কারণ হলো ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে এ অঞ্চলে সংঘটিত নানা বিপর্যয়, ঘটনা, দুর্ঘটনা। যেটুকু এখনো দেখতে পাওয়া যায় সেটা প্রমাণ করছে এ এলাকার মানুষের শক্তি সামর্থ্য ও আন্তরিক প্রচেষ্টা কতোটা ছিল।                                            

কেরমান প্রদেশের আয়তন সমগ্র ইরানের শতকরা এগারো ভাগের মতো। ভূ-ভাগের আয়তনের দিক থেকে ইরানের সবচেয়ে বড়ো প্রদেশ এটি। এই প্রদেশের আয়তন হলো এক লাখ বিরাশি হাজার বর্গকিলোমিটার। প্রদেশটির উত্তরদিকে রয়েছে খোরাসান এবং ইয়াযদ প্রদেশ, পূর্বদিকে সিস্তান এবং বেলুচিস্তান প্রদেশ, পশ্চিম দিকে রয়েছে ফার্স প্রদেশ আর দক্ষিণ দিকে রয়েছে হরমুযগান প্রদেশ। কেরমান প্রদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, দেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় সমুদ্র বন্দর হাতের কাছে থাকায় এবং ইরানের কেন্দ্র পর্যন্ত প্রদেশটির বিস্তৃতি থাকায় কেরমান প্রদেশটির গুরুত্ব ব্যাপক বেড়ে গেছে। বলাবাহুল্য কেরমান প্রদেশটা এইসব বৈশিষ্ট্যের কারণে একটা গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত হয়েছে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এই প্রদেশের গুরুত্বপূর্ণ দুটি এলাকার কথা উল্লেখ করা যায়। একটি হলো সিরজান আরেকটি হলো বাম।

কেরমান প্রদেশে রয়েছে বিচিত্র খনিজ সম্পদ। ধাতব এবং অধাতব উভয় ক্ষেত্রেই ব্যাপক খনিজ সম্পদের উৎস থাকায় ইরানের খনিজ সম্পদ সমৃদ্ধ অন্যতম একটি এলাকার মর্যাদা লাভ করেছে কেরমান প্রদেশ। এখানকার উল্লেখযোগ্য খনিজ পদার্থের মধ্যে রয়েছে তামা, কয়লা, আকরিক পাথর যা থেকে লোহা তৈরি হয়, ক্রোমাইট পাথর, সীসা, যিংক, টিটানিয়াম এবং ম্যাংগানিজ জাতীয় খনিজ পদার্থ। ইরানের প্রায় সকল প্রদেশেই পাহাড় রয়েছে। কেরমান প্রদেশটিও তা থেকে ব্যতিক্রম নয়। এখানে রয়েছে পাহাড়ের পর পাহাড়। যার ফলে কিছুটা উঁচুও বলা চলে প্রদেশটিকে। পাহাড় ছাড়াও এখানে আছে নদীর পর নদী, অসংখ্য ঝর্ণাধারা, প্রচুর ফোয়ারা আরো অনেক কিছু।

কেরমান প্রদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নদী হলো ‘হালিলরুদ’ নদী। বেশ কটি শাখানদীও এসে ভিড়েছে হালিলরুদের সাথে। এগুলো হলো যারদাশ্‌ত নদী, বফ্‌ত, রবার, তিল এবং এস্ফান্দাকেহ। এই নদী জিরুফ্‌ত এবং কাহনুয শহরের তৃষ্ণা মিটিয়ে হমুন জযমুরিয়ন শহরে প্রবেশ করেছে। যে যে এলাকা দিয়ে বয়ে গেছে এই নদী সেইসব এলাকা সবুজে শ্যামলে ভরে গেছে। বলেছিলাম এখানে বেশ উঁচু উঁচু পাহাড় রয়েছে। সেই পাহাড়গুলোর চয়ড়ায় সারাবছর ধরেই বরফ জমে থাকে। গরমের সময় এই বরফ গলা পানি নেমে আসে পাহাড়ের চূড়া থেকে। এভাবে সারাবছর ধরেই এ এলাকায় পানির কোনো অভাব হয় না। এ প্রদেশের অন্যান্য নদীর মধ্যে রয়েছে অবেবাখশা নদী, রভার, খাবার, তাঙ্গুয়ে বা পালাঙ্গি নদী, ইব্রাহিমাবাদ, আন্দুহজার্দ্‌, অবেবরিক, অবেশুরে এস্ফান্দাকে নদী। খনিজ পানির ঝর্নাও এখানকার একটি পর্যটক আকর্ষণীয় বিষয়। প্রাকৃতিক এই চমৎকার ঝর্না দেখার জন্যে এবং উপভোগ করার জন্যে বহু পর্যটক এখানে ভিড় জমান।

শুরুতেই বলেছি কেরমান হচ্ছে ইরানের সবচেয়ে উঁচু প্রদেশগুলোর একটি। এখানকার বফত শহরটির উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২২৫০ মিটার। এই প্রদেশে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ১২০ মিলিমিটারের মতো। পানির উৎসের পরিমাণ, আবহাওয়া, সামাজিক অবস্থান এবং কৃষিকাজের প্রক্রিয়ার দিক থেকে এই প্রদেশটিকে অন্তত তিনটি ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। একটা হলো মরু এবং শুষ্ক ও কৃষি এলাকা। এ এলাকার মধ্যে রয়েছে রাফসানজান, যারান্দ এবং সিরজান এলাকাসহ আরো কিছু অঞ্চল। পার্বত্য নাতিশীতোষ্ণ এলাকার মধ্যে পড়েছে বফ্‌ত, বার্দ্‌সির ইত্যাদি এবং উষ্ণ এলাকার মধ্যে পড়েছে বাম, জিরুফ্‌ত, কাহনুজসহ আরো কিছু এলাকা ইত্যাদি।

 গম, যব, আলু, পেস্তা বাদাম, মেহেদি, জিরা, তুলা, বিট ইত্যাদি প্রচুর পরিমাণে ফলে। ফলপাকড়ার মধ্যে রয়েছে আখরোট, বাদাম, নাশপাতি, এক ধরনের চেরি, চেরি, আপেল, মাল্টা, মিষ্টি লেবু, কমলা, গ্রিফ ফ্রুট, খুরমা ইত্যাদি। রাফসানজানের পেস্তা পৃথিবী বিখ্যাত।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/ ৯

খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন

ট্যাগ

২০১৮-০৯-০৯ ১৭:৩৭ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য