কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের আজকের পর্বে সূরা আল আহযাবের ৫৫ থেকে ৫৮ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। এই সূরার ৫৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন,

  لَا جُنَاحَ عَلَيْهِنَّ فِي آَبَائِهِنَّ وَلَا أَبْنَائِهِنَّ وَلَا إِخْوَانِهِنَّ وَلَا أَبْنَاءِ إِخْوَانِهِنَّ وَلَا أَبْنَاءِ أَخَوَاتِهِنَّ وَلَا نِسَائِهِنَّ وَلَا مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُنَّ وَاتَّقِينَ اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ شَهِيدًا (55)

"নারীদের জন্যে তাঁদের পিতা, পুত্র, ভাই, ভাইপো, ভাগ্নে, স্বধর্মী নারী এবং অধিকার ভুক্ত দাসীদের সামনে হিজাব বা পর্দা ছাড়াই যাওয়ার ব্যাপারে গোনাহ নেই। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ সববিষয়ে প্রত্যক্ষ সাক্ষী।" (৩৩:৫৫)

যাদের সামনে নারীর হিজাব মেনে চলা জরুরি  গত পর্বের আলোচনায় আমরা সে বিষয়ে খোদায়ি বিধান সম্পর্কে কথা বলেছি।

এরপর এই আয়াতে বলা হচ্ছে পরিবারের সদস্য যেমন বাবা, ভাই ও পুত্রের সামনে পর্দা মেনে চলা মুসলিম মাতা, কন্যা ও বোনের জন্য জরুরি নয়।  মুসলমান নারীর জন্য তাদের আপন ভাইপো, বোনপো বা ভাগ্নের সামনে পর্দা করা জরুরি নয়। এদের সামনেও পর্দার বিধান রাখা হলে পারিবারিক যোগাযোগ ও সম্পর্ক রাখা কঠিন হয়ে পড়তো। পুরুষদের জন্য তাদের আপন খালা ও নারীদের জন্য তাদের আপন চাচাও মাহরাম বা আপন-জন। অর্থাৎ এ দুই ক্ষেত্রেও নারীর জন্য হিজাব মেনে চলা জরুরি নয়।

বেগানা পুরুষ ছাড়াও মুসলিম নারীদেরকে কাফির নারী ও অন্যের চাকরানী বা দাসীর সামনেও পর্দা করতে বলা হয়েছে। কারণ কাফির নারী বা অন্যের দাসী অথবা চাকরাণী যা দেখে তা নিজ নিজ স্বামীর কাছে কিংবা অন্য পুরুষদের কাছে বর্ণনা করতে পারে।

পর্দার এ-সব বিধানেরই লক্ষ্য হল নারীকে চারিত্রিক দূষণ এবং অশালীনতা থেকে দূরে রাখা। নারী ও পুরষকে বাহ্যিক সুশীল আচরণ-বিধি আর পোশাকের শালীনতা বজায় রাখার পাশাপাশি অন্তরকেও সবসময় খোদা-প্রেমিক ও খোদাভীরু রাখতে হবে জোরালোভাবে যাতে কখনও পাপে জড়িয়ে যাওয়ার পরিবেশ সৃষ্টির বিন্দুমাত্র আশঙ্কাও না থাকে।

এই আয়াতের শিক্ষা হল:  ইসলামের বিধি-বিধান মানুষের জন্য কষ্ট বা দুর্ভোগ বয়ে আনে না। পরিবারের নারী ও পুরুষ সদস্যরা একে অপরের জন্য বেগানা নন। কেবল বেগানা বা পর-পুরুষদের সামনেই মুসলিম নারীর পর্দা করা ফরজ।

এ আয়াতের আরও একটি শিক্ষণীয় বিষয় হল পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে আপনজন ও আপন নয় এমন সবাইকেই খোদাভীতি আর আত্মিক পবিত্রতা এবং চারিত্রিক তথা নৈতিক সততাও বজায় রাখতে হবে সব সময় সব ক্ষেত্রে। আর এ জন্যই পর্দার বিধান দেয়া হয়েছে।

সুরা আহজাবের ৫৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا (56)

"আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতারা নবীর প্রতি দরুদ পাঠান। হে মুমিনরা! তোমরাও নবীর জন্যে দরুদ পাঠাও এবং তাঁর প্রতি সালাম পেশ কর ও তাঁর নির্দেশের অনুগত হও।" (৩৩:৫৬)

এই আয়াতে ও পরের দুই আয়াতে মহানবী (সা) এবং মু’মিনদের সম্মান রক্ষার ওপর জোর দেয়া হয়েছে। এখানে এ প্রসঙ্গে মহানবীর (সা) প্রতি দরুদ ও সালাম পাঠাতে এবং তাঁর নির্দেশাবলীর প্রতি অনুগত থাকতে বলা হয়েছে মু’মিনদেরকে। মহানবী (সা) হচ্ছেন মু’মিনদের জন্য হেদায়াত ও সৌভাগ্যের মাধ্যম। তাই তার নির্দেশাবলী পালন করা মুসলমানদের জন্য ফরজ। আল্লাহ এ ব্যাপারে কুরআনের নানা আয়াতে মুসলমানদের ও মুমিনদের নির্দেশ দিয়েছেন।  অবশ্য এখানে এই নির্দেশ দেয়ার আগে মহান আল্লাহ বলছেন যে স্বয়ং তিনি ও তাঁর ফেরেশতারা মুহাম্মাদ (সা)’র প্রতি দরুদ পাঠিয়ে থাকেন। খোদায়ী রেসালাতের নানা কঠিন দায়িত্ব পালন এবং ইসলামের প্রচার-প্রসারের জন্য নানা ত্যাগ ও কষ্ট স্বীকারের কারণে মহানবীর (সা) প্রতি কৃতজ্ঞতা হিসেবে এ দরুদ পাঠানো হয়।  

মহানবী (সা) মানুষকে সুপথ দেখানোর জন্য খুবই ব্যাকুল হয়ে থাকতেন। তিনি কোনো ধরনের প্রতিদানের আশা না করেই এ জন্য সব শ্রম ও শক্তি নিয়োগ করেছেন। তাই মুসলমানদের উচিত তাঁর নামের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানো এবং তাঁর নাম উচ্চারণের সময় তাঁর প্রতি দরুদ পেশ করা।

মহানবীর (সা) সঙ্গীরা তাঁর প্রতি দরুদ পাঠানোর পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তোমরা এভাবে আমার প্রতি দরুদ পাঠাবে যে, আল্লাহুম্মা সাল্লি আ’লা মুহাম্মাদ ও আ’লা আলি মুহাম্মাদ কামা সাল্লাইতা আলা ইব্রাহিম ইন্নাকা হামিদুমমাজিদ। আল্লাহুম্মা বারিক আলা মুহাম্মাদ ওয়া আলি মুহাম্মাদ কামা বারিকতা’লা ইব্রাহিম ওয়া আলি ইব্রাহিম ইন্নাকা হামিদুমমাজিদ।  

বিশ্বনবী (সা)’র নির্দেশিত এই দরুদের কথা এসেছে মুসলিম ও বোখারি শরিফের বর্ণনায়। এই দরুদের অর্থ: হে আল্লাহ! দরুদ বর্ষণ কর মুহাম্মাদ (সা) ও তাঁর পবিত্র বংশধরদের ওপর যেমন দরুদ আপনি বর্ষণ করেছেন হযরত ইব্রাহিম (আ)’র ওপর; নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসার যোগ্য ও গৌরবান্বিত। হে আল্লাহ! আপনি বরকত বর্ষণ করুন মুহাম্মাদ (সা) ও তাঁর পবিত্র বংশধরদের ওপর যেমন বরকত আপনি বর্ষণ করেছেন ইব্রাহিম (আ) ও তাঁর বংশধরদের ওপর। নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসার যোগ্য ও গৌরবান্বিত।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দু’টি বিষয় হল: প্রথমতঃ আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাকুল যখন বিশ্বনবী (সা)’র ত্যাগের প্রতিদানে তাঁর প্রতি দরুদ  পাঠান তখন এই মহান ব্যক্তির ত্যাগ-তিতিক্ষার গুরুত্ব আমাদেরও বোঝা উচিত। তাই আমাদের উচিত মহানবীর (সা) শানে মৌখিকভাবে দরুদ পাঠানো ও কার্যক্ষেত্রে তাঁর আনুগত্য করা এবং মুসলমান হিসেবে আমাদের দায়িত্বগুলো যথাযথভাবে পালন করা। দ্বিতীয়তঃ কেবল হৃদয়ের ভালবাসা ও শ্রদ্ধাই যথেষ্ট নয় সৎকর্মশীল ব্যক্তিত্ব ও মহাপুরুষদের প্রতি অনুরাগ সমাজের সবার সামনে প্রকাশ্যে ঘোষণা করতে হবে।

সুরা আহজাবের ৫৭ ও ৫৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন,

إِنَّ الَّذِينَ يُؤْذُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ لَعَنَهُمُ اللَّهُ فِي الدُّنْيَا وَالْآَخِرَةِ وَأَعَدَّ لَهُمْ عَذَابًا مُهِينًا (57) وَالَّذِينَ يُؤْذُونَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ بِغَيْرِ مَا اكْتَسَبُوا فَقَدِ احْتَمَلُوا بُهْتَانًا وَإِثْمًا مُبِينًا (58)

"যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলকে কষ্ট দেয়, আল্লাহ তাদের প্রতি ইহকালে ও পরকালে অভিশাপ দেন এবং তাদের জন্যে প্রস্তুত রেখেছেন অবমাননাকর শাস্তি।" (৩৩:৫৭)

"যারা বিনা অপরাধে মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে কষ্ট দেয়, তারা মিথ্যা অপবাদ ও প্রকাশ্য পাপের বোঝা বহন করে।" (৩৩:৫৮)

মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে কষ্ট দেয়া বলতে বোঝায় তাঁদের ইচ্ছা এবং সন্তুষ্টির বিপরীতে চলা যা মহান আল্লাহর ক্রোধ ও অভিশাপ তথা মহাশাস্তিকে অনিবার্য করে তোলে। ইসলামী বর্ণনায় বলা হয়েছে, আল্লাহর বান্দাহদের যে কোনো ধরনের যন্ত্রণা বা কষ্ট দেয়া হলে তা আল্লাহকেই কষ্ট দেয়ার শামিল ঠিক যেভাবে পবিত্র কুরআনে আল্লাহর বান্দাহদের সাহায্য করা ও তাদের ধার দেয়াকে আল্লাহর প্রতি ঋণ দেয়া বলে উল্লেখ করা হয়েছে। যারা মহানবীর (সা) বাণীকে নাকচ করে ও এই মহামানবকে অপবাদ দেয় এবং তাঁর সঙ্গে বেয়াদবি করে তারা একইসঙ্গে মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকেই কষ্ট দেয়।

বিশ্বনবী (সা)'র বাণীতে বলা হয়েছে, যারা তাঁর আহলে বাইতকে কষ্ট দেয় তারা যেন রাসুলকে এবং সে কারণে মহান আল্লাহকেও কষ্ট দেয়।

এ আয়াতের বক্তব্য অনুযায়ী কেবল বিশ্বনবী (সা)-কেই নয় একইসঙ্গে প্রত্যেক মু'মিন নারী-পুরুষের সম্মান রক্ষা করতে হবে। প্রমাণ ছাড়াই কেবল সন্দেহের বশে কারো সম্পর্কে অপবাদ দেয়া যাবে না। অপবাদ দেয়া খুবই বড় গোনাহ। 

এ দুই আয়াত থেকে আমাদের মনে রাখা দরকার: কথা ও আচরণের মাধ্যমে যেন আমরা অন্যদের কষ্ট না দেই। আমরা যদি তা করি তাহলে আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর দয়া ও করুণা থেকে বঞ্চিত করবেন। অন্যদের অপমান করা ও উপহাস করার আংশিক শান্তি এই দুনিয়াতেই হয়ে থাকে।#

 

২০১৮-০৯-০৯ ১৭:৫০ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য