ইরানের জলে-স্থলে, ক্ষেত-খামারে, বাগ-বাগিচায়, কল-কারখানায় উৎপাদিত হয় বিচিত্র সামগ্রী। এর পাশাপাশি খনি থেকে উৎপন্ন বিভিন্ন সামগ্রী এবং ইরানি নরনারীদের মেধা ও মনন খাটিয়ে তৈরি করা হয় বিভিন্ন শিল্পপণ্য। তো এগুলোর সঙ্গে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য আমাদের সাপ্তাহিক আয়োজন "ইরানি পণ্য সামগ্রী"র আজকের পর্বে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। গত আসরে আমরা ইরানের গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পণ্য তামা নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করেছি। আজকের আসরে কথা বলার চেষ্টা করবো আকরিক লোহা নিয়ে।

ভৌগোলিক দিক থেকে পৃথিবীর ভূ-মণ্ডলের এমন একটি অঞ্চলে ইরান নামক দেশটির অবস্থান যে এলাকাটি অর্থনৈতিক উৎস বা খনিজ সম্পদের বিচিত্র মজুদের দিক থেকে খুবই সমৃদ্ধ। বিশেষ করে আকরিক লোহার বিশাল মজুদের দিক থেকে বিশ্বের দশটি দেশের মধ্যে অবস্থান করছে ইরান। আমরা আজকের আসরে এই আকরিক লোহা এবং সময় পেলে ইরানের ইস্পাত সামগ্রি নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করবো।

আমরা বলেছি যে ইরান ভূ-মণ্ডলের এমন একটি অঞ্চলে অবস্থান করছে যে এলাকায় খনিজ সম্পদের বিচিত্র মজুদ রয়েছে। ম্যাকানজি ইকোনোমিক অর্গানাইজেশনের বর্ণনা অনুযায়ী গ্যাসের মজুদের দিক থেকে সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে ইরান। আর মজুদের দিক থেকে চতুর্থ। তা সত্ত্বেও ইরানের অর্থনীতি  এই গ্যাস কিংবা তেলের ওপর নির্ভরশীল নয়। কেননা অর্থনীতির জোগানের আরও বিচিত্র খাত রয়েছে ইরানের। ইরানের সামনে খুচরা ব্যবসা, রিয়েল এস্টেট ব্যবসাসহ পেশাগত পরিষেবা দেওয়ার ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। খনিজ সম্পদের বিশাল মজুদ থাকায় এসব ক্ষেত্রেও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত। এ পর্যন্ত ইরানের খনিগুলোতে আটষট্টিরও বেশি রকমের খনিজ সম্পদ আবিষ্কৃত হয়েছে। এ পর্যন্ত পাওয়া খনিজ দ্রব্যগুলোর আনুমানিক মূল্য ধরা হয়েছে সত্তর হাজার কোটি ডলার। এসব খনিজ দ্রব্যের মধ্যে আকরিক লোহা অন্যতম। কেননা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ দুটি দেশের কাতারে ইরান মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এই আকরিক লোহার কারণে।

(نقشه پراکندگی معادن ایران)Mineral Distribution Map of Iran

আকরিক লোহা এমন এক খনিজ পাথর যা লৌহ ধাতু ধারণ করে। পৃথিবীর ভূ-পৃষ্ঠে থাকা উপাদানের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে আয়রন বা লোহা। ভূ-পৃষ্ঠের প্রায় পাঁচ শতাংশ অক্সাইডই এই আয়রনের। অক্সাইড হল এক প্রকারের রাসায়নিক যৌগ যাতে অক্সিজেন ও অপর কোন মৌলের অন্তত একটি করে পরমাণু থাকে। ভূ-ত্বক মূলত অক্সাইড দ্বারা গঠিত। মৌলসমূহ বাতাসের অক্সিজেন দ্বারা জারিত হয়ে অক্সাইডে পরিণত হয়। তো যে ধাতুর কথা বলছিলাম সেই ধাতু ইরানের 300 টির বেশি খনিতে পাওয়া যায়। এসব খনিতে পাওয়া আকরিক লোহাগুলো সাধারণত হেমাটাইট এবং ম্যাগনেটাইট প্রকৃতির। হেমাটাইটে লোহার পরিমাণ সত্তর শতাংশ আর ম্যাগনেটাইটে বাহাত্তর শতাংশ।

লোহা নামক ধাতুর সঙ্গে সেই বহু প্রাচীনকালে কী করে যে মানুষ পরিচিত হয়েছে সে ব্যাপারে বিচিত্র মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন যে মানুষেরা সেই প্রাচীনকালে আকরিক লোহা থেকে পাওয়া লোহাকে নির্দিষ্ট মাত্রায় তাপ দিয়ে দিয়ে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি বানাতো। আবার কেউ কেউ মনে করেন উল্কি থেকে পাওয়া লোহা ছিল অনেক বেশি খাঁটি। সেগুলো দিয়েই তারা তাদের সরঞ্জাম তৈরির কাজ চালাতো। তবে ঠিক কোন্‌ জাতি বা কোন্‌ গোত্র যে সর্বপ্রথম এই কাজে সফল হয়েছিলেন তা সুস্পষ্ট করে বলা কঠিন। তবে বিশ্বের প্রাচ্য অঞ্চলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা যেখানে মহান সভ্যতাগুলো গড়ে উঠেছে যেমন মেসোপটেমিয়া বা বর্তমান ইরাক সভ্যতা, এশিয়া মাইনর, মিশর এবং চীনা সভ্যতা-এসব এলাকায় লোহা ব্যবহার করার বহু নিদর্শন ও প্রমাণাদি দেখতে পাওয়া গেছে।

ইরানের কেন্দ্রিয় প্রদেশে অবস্থিত কাশানের সিয়াল্ক টিলায় পুরাতত্ত্ব গবেষকগণ যেসব খননকাজ পরিচালনা করেছেন সেখানে আবিষ্কার হয়েছে বেশ কিছু লোহার গুলি। এগুলো ছিল প্রাকৃতিক হেমাটাইট লোহার। গবেষকরা বলেছেন এইসব গুলি খ্রিষ্টপূর্ব পাঁচ হাজার বছর আগেকার। বিশুদ্ধ লোহা (উপাদান) ভূ-পৃষ্ঠে খুবই বিরল। কেননা অক্সিজেন এবং আর্দ্রতার কাছাকাছি তা সহজেই অক্সিডাইজ হয়ে যায় মানে অক্সিজেনের সঙ্গে রাসায়নিকভাবে যুক্ত বা জারিত হয়ে যায়। তাই বিশুদ্ধ লোহা পেতে হলে খনি থেকে উত্তোলিত আকরিক লোহাকে প্রক্রিয়াজাত করতে হয়। এর ফলে লোহার সঙ্গে লেগে থাকা অন্যান্য বস্তু ফেলে দিলে প্রকৃত লোহা পাওয়া যায়। প্রাচীন যেসব নিদর্শন পাওয়া গেছে সেগুলো পরীক্ষা নিরীক্ষা করার মাধ্যমে মনে হয় গলিত লোহা ব্যবহার শুরু হয়েছিল খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দির শেষের দিকে। তবে কালের পরিক্রমায় লোহার বিচিত্র সরঞ্জাম যেমন তৈরি হয়েছে তেমনি তৈরি হয়েছে অস্ত্রসহ আরও বহু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। এমনকি লোহা দিয়ে অলংকার তৈরি করা হয়েছিল বলেও বিশেষজ্ঞরা বলেছেন।                            

খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দের শুরুর দিকে ইরানে আর্যদের বিভিন্ন গোত্রের আবির্ভাবের পর এই অঞ্চলে লোহা ব্যবহারের মাত্রা বেড়ে গিয়েছিল। প্রাচীন ইরানিরা বিশেষ করে সমরাস্ত্র তৈরি করার ক্ষেত্রে লোহা ব্যবহার করতো। তলোয়ার,খঞ্জর এবং তীর ধনুক ইত্যাদি তৈরি করতো লোহা দিয়ে। ইরানের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলীয় পশ্চিম আজারবাইজানের হাসানলু এলাকায় পুরাতত্ত্ব গবেষকরা যে খননকাজ চালিয়েছিল সেখানে ব্যাপক যুদ্ধাস্ত্র উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছিল। ওইসব যুদ্ধাস্ত্র ছিল লোহার তৈরি এবং খ্রিষ্টপূর্ব নবম শতাব্দির সরঞ্জাম। পাসারগার্ড এবং তাখতে জামশিদের মতো স্থাপনাগুলোর পিলারের গোড়ায় সেই হাখামানেশিয় আমলেই লোহা ব্যবহারের নিদর্শন লক্ষ্য করা যায়। বিশাল বিশাল পাথর কেটে পিলারে ব্যবহার করা হয়েছে এবং পিলারের গোড়ায় লোহার সঙ্গে কাঠ সংযুক্ত করা হয়েছিল ওইসব স্থাপনায়।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/ মো:আবু সাঈদ/ ১১

 খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন

২০১৮-০৯-১১ ১৭:৩৫ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য