'কারবালার মহাবিপ্লব ও এর শাশ্বত শিক্ষা' শীর্ষক বিশেষ আলোচনার দ্বিতীয় পর্বে সবাইকে আমন্ত্রণ।

কুল মাখলুক কাঁদিয়ে ওই এলো মহররম
হায় হোসেন! হায় হোসেন! উঠলো রে মাতম

সারা জাহান কেঁদে বিভোর আসমান-জমিন

দজলা কাঁদে ফোরাত কাঁদে কাঁদে মুসলিমিন....

কাতরা পানি পায়নি  হায়রে পিয়াসে কাতর

তির খেয়ে যে মরলো কচি শিশু সে আসগর

মহররম ও কারবালার মহাবিপ্লবকে বুঝতে হলে সব কিছুর আগে ভালোভাবে জানতে হবে প্রকৃত মুহাম্মাদি ইসলামের মূল কাণ্ডারিদের প্রকৃত মর্যাদা এবং বিশেষভাবে হযরত ইমাম হুসাইন (আ)’র প্রকৃত পরিচয় ও মর্যাদার স্বরূপ। একইসঙ্গে বুঝতে হবে প্রকৃত মুহাম্মাদি ইসলামের বিপরীত পথে চলা পশু-শক্তির মূল কুচক্রী ও তাদের কারসাজিগুলোকেও।

চতুর্থ হিজরির ৩ শাবান মদীনা মুনাওয়ারায় বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর প্রাণপ্রিয় দুহিতা হযরত ফাতেমা (আ.)-এর কোলে জন্মগ্রহণ করে এক পুত্রসন্তান। যাঁর জন্ম কেবল বিস্ময়কর ও অসাধারণই ছিল না,তাঁর গোটা জীবনকাল ও গৌরবময় শাহাদাত ছিল অশেষ রহস্যে পরিপূর্ণ।

রাসূলুল্লাহ্ (সা.) ইমাম হুসাইনকে কাঁধে বসাতেন এবং বলতেন : ‘এ বালক ও তার ভাই দুনিয়ায় আমার দু’টি সুগন্ধি ফুল (রায়হান)।’ তিনি বারবার বলতেন : ‘হুসাইন আমা থেকে, আর আমি হুসাইন থেকে।’ আরও বলতেন : ‘এরা দু’ভাই আমার আহলে বাইতের মধ্যে আমার সবচেয়ে বেশি প্রিয়।’ রাসূলুল্লাহ্ (সা.) তাঁদের সম্পর্কে বলতেন : ‘হাসান ও হুসাইন বেহেশতের যুবকদের নেতা।’

ইমাম হুসাইন (আ.) ইসলামের বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থাৎ যে গৃহে জিবরীল (আ.) আয়াত নিয়ে অবতীর্ণ হতেন সেখানেই মহানবী (সা.)-এর পবিত্র কোলে এবং হযরত আলী ইবনে আবি তালিবের সান্নিধ্যে ও মা ফাতেমা যাহ্‌রার পবিত্র আঁচলের ছায়াতলে বড় হন। তাঁর শিক্ষার উচ্চ থেকে উচ্চতর স্তরে উত্তীর্ণ হন এ বিশ্ববিদ্যালয়েই। তাঁরই সহপাঠীবৃন্দ,যেমন হযরত সালমান ফারসি,হযরত মিকদাদ, হযরত আবু যার, হযরত ইবনে আব্বাস প্রমুখ তাঁর চেয়ে বয়সে বড় ছিলেন, কিন্তু মর্যাদার দিক থেকে তাঁর চেয়ে পিছিয়ে ছিলেন। যেমনটা আমরা জানি যে,ইবনে আব্বাস তাঁর নেতৃত্বে চলাকে নিজের জন্য গৌরবের কারণ বলে মনে করতেন এবং এ বিষয়টিকে নিজের জন্য সৌভাগ্য বলে ভাবতেন। 

মহানবীর (সা) সাহাবি আবু হুরায়রা ইমাম হুসাইনের পবিত্র পদধূলি নিজের জামা দিয়ে মুছেছেন এবং এ কাজের জন্য গর্বও করেছেন। তিনি বর্ণনা করেছেন : ‘আমি স্বচক্ষে দেখেছি যে, হুসাইন তার দু’ পা রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর বুকের ওপরে রেখেছিল। আর রাসূল তাঁর জিহ্বায় চুমু দিচ্ছিলেন ও বলছিলেন : (اللهماحبه فانی احبه) ‘হে আল্লাহ্‌! একে তুমি ভালোবাস। কেননা, আমিও একে ভালোবাসি।’ 

ইমাম হুসাইন (আ.) প্রথম খলিফা আবু বকরের খেলাফতকালে যদিও মাত্র দশ বছরের এক বালক ছিলেন, তদুপরি বুজুর্গ সাহাবীবৃন্দের ফতোয়া ও জ্ঞান শিক্ষার আসরে অংশগ্রহণ করতেন। সাহাবীরা তাঁকে নিজেদের জায়গায় এনে বসাতেন এবং তাঁর প্রতি এতটা শ্রদ্ধা প্রকাশ করতেন যা আবদুল্লাহ্ ইবনে ওমর কিম্বা আবদুর রহমান ইবনে আবু বকরের প্রতি করতেন না। ইমাম হুসাইন (আ.) এমন এক ঘরে বেড়ে ওঠেন যে ঘরের অধিবাসীরা তথা আহলে বাইত তাঁদের সর্বস্ব ধর্মের পথে উৎসর্গ করতেন এবং এ পথে তাঁদের কোন রকম কার্পণ্য বা ভণ্ডামি ছিল না।

ইমাম হুসাইন (আ.) পূর্ণতা ও পবিত্রতার এমন চরম শিখরে পৌঁছেছিলেন যে, মুবাহালার সেই অগ্নি পরীক্ষায় খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে তিনি দ্যুতিময় চেহারা নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন। বিশ্বের সব ঐতিহাসিকের অকপট স্বীকারোক্তি মোতাবেক ইমাম হুসাইন (আ.) জ্ঞান, সংযমশীলতা,  সত্যনিষ্ঠতা, সাহসিকতা,পরোপকার,দরিদ্রদের পাশে দাঁড়ানো ইত্যাদি বিষয়ে মুসলমানদের মাঝে ছিলেন হুজ্জাত বা আদর্শ। সবার আশ্রয়স্থলও ছিলেন তিনি। যেমনটা ‘আল হাসান ওয়াল হুসাইন’ গ্রন্থে লেখা হয়েছে : ‘সবদিক বিচারে তিনি তাঁর নানা রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর সাথে সবচেয়ে বেশি সদৃশ ছিলেন।’

ইমাম হুসাইন (আ.)-এর কাছ থেকে অনেক প্রসিদ্ধ দোয়া,অগণিত কারামাত ও অলৌকিক ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। ফলে তিনি অশেষ ও অফুরন্ত প্রশংসায় অবিস্মরণীয় হয়ে রয়েছেন। মনে হয় ইমাম হুসাইন (আ.) তাঁর নিজের পরিচয় তাঁর শাহাদাতের পূর্ব মুহূর্তে এ একটি বাক্যের মাধ্যমেই সবচেয়ে সুন্দরভাবে ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন : ‘হে আল্লাহ্‌! তুমি জান যে,এরপর জমিনের বুকে তোমার নবী-দুহিতার কোন পুত্রই আর রইল না।’

কারবালার মহাবিপ্লবের সময় ইমাম হুসাইনের তথা সত্যের শিবিরের প্রধান প্রতিপক্ষ ছিল ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়া। ইয়াজিদ ছিল বনি উমাইয়াদের মদদপুষ্ট। বনি উমাইয়া যে ইসলামের বারোটা বাজাবে তা মহানবী (সা) আগেই জানতে পেরেছিলেন।

ইসলামী বর্ণনায় এসেছে,কোনো এক সময় মহানবী (সা.) স্বপ্নে দেখেন যে, বনী উমাইয়্যা তাঁর মিম্বরে বানরের মত নাচানাচি করছে। এ স্বপ্ন দেখে তিনি এমনই শোকাহত হলেন যে,এরপর যতদিন বেঁচে ছিলেন তিনি আর হাসেননি। তাঁর এই স্বপ্ন দেখার পর পবিত্র কুরআনের সুরা বনি ইসরাইলের ৬০ নম্বর আয়াত নাজেল হয়েছিল। ওই আয়াতে বলা হয়েছে:  

“এবং (স্মরণ কর) যখন আমরা তোমাকে বলেছিলাম যে, নিশ্চয়ই তোমার প্রতিপালক মানুষকে পরিবেষ্টন করে আছেন এবং আমরা তোমাকে যে স্বপ্ন দেখিয়েছিলাম  তা কেবল মানুষের জন্য পরীক্ষার মাধ্যম ছিল এবং কুরআনে বর্ণিত অভিশপ্ত বৃক্ষটিও। আমরা মানুষকে ভীতি প্রদর্শন করতে থাকি,কিন্তু তা তাদের চরম ঔদ্ধত্যকেই কেবল বৃদ্ধি করে।”তাফসিরে তাবারিসহ কয়েকটি সুন্নি সূত্রমতে, কুরআনে উল্লিখিত ওই “অভিশপ্ত বৃক্ষ” বলতে আবু সুফিয়ানের বংশধর তথা উমাইয়াদের বোঝানো হয়েছে এবং রাসূল (সা.) স্বপ্নে তাঁর মিম্বরে বানরদের নাচানাচির যে ঘটনাটি দেখেছিলেন তার অর্থ উমাইয়াদের মাধ্যমে খেলাফত দখল করা হবে। পরবর্তীকালে উমাইয়া নেতা মুয়াবিয়া ছলে-বলে-কৌশলে হযরত আলীর শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয় এবং মুয়াবিয়ার গুপ্তচরদের সহায়তায় এক ধর্মান্ধ খারেজিকে দিয়ে হযরত আলীকে শহীদ করা হয়। এরপর ইমাম হাসান (আ)-কে বিষ প্রয়োগে শহীদ করে মুয়াবিয়া। এরপর শুরু হয় মুয়াবিয়ার রাজতন্ত্র।

কারবালার মহাবিপ্লবের পটভূমি সম্পর্কে আমরা আরও কথা বলব এ পর্বের আগামী আসরে। আশা করছি তখনও আপনাদের সঙ্গ পাব। এতক্ষণ যারা সঙ্গ দিলেন তাদের সবাইকে জানাচ্ছি ধন্যবাদ। #

পার্সটুডে/মু.আ.হুসাইন/মো.আবুসাঈদ/১২

খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন 

২০১৮-০৯-১২ ১৭:১১ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য