• দেখব ঘুরে ইরান এবার: কেরমান একটি ঐতিহাসিক শহর

এই প্রদেশটি ঐতিহাসিক দিক থেকে যেমন ইরানের প্রাচীনতম শহরগুলোর একটি তেমনি স্বাভাবিকভাবেই এ এলাকায় রয়েছে প্রাচীন বহু নিদর্শন। বলা হয়ে থাকে ইরানের ঐতিহাসিক পাঁচটি শহরের মধ্যে একটি হলো কেরমান। আজকের আসরে বরং এই শহরের কিছু ঐতিহাসিক নিদর্শন এবং পর্যটক আকর্ষণীয় স্পট নিয়ে কথা বলা যাক।

ঐতিহাসিক এবং ভৌগোলিক তথ্যপঞ্জিতে দেখা গেছে কেরমানের বেশ কয়েকরকম নাম আছে। যেমন কারমানিয়া, কেরমানিয়া, যেরমানিয়া, কারিমন, কারমানি এবং কেরমানি ইত্যাদি। অবশ্য কোনো কোনো ভূগোলবিদ এই শহরের নাম উল্লেখ করতে গিয়ে গাভাশির (বার্দেশির)ও লিখেছেন। এই দুটি শব্দের ব্যুৎপত্তি সম্পর্কে বলতে গিয়ে কেউ কেউ শহরের নামকরণের কার্যকারণও উল্লেখ করেছেন। তারা বলেছেন গাভাশির  আসলে ছিল কুরে আর্দেশির অর্থাৎ আর্দেশির শহর। এই আর্দেশিরই কালের বিবর্তনে গাভাশির নাম ধারণ করেছে।

কেরমানের রয়েছে বহু চড়াই উৎরাইময় ইতিহাস। ঐতিহাসিক বহু ঘটনা দুর্ঘটনার নীরব সাক্ষী এই শহরটি। কেরমান কখনো ছিল রাজধানী শহর। আবার কখনো ছিল শত্রুদের লুটতরাজের টার্গেট। তার মানে বোঝাই যাচ্ছে যে ইরানের এই ভূখণ্ডের লোকজন যুগে যুগে কতোটা বিপদ সংকুল পরিস্থিতি সহ্য করেছে। কেরমান ইরানের মধ্যে কতোটা গুরুত্বপূর্ণ শহর ছিল তা উপলব্ধি করা যায় এই শহরকে রাজধানী হিসেবে নির্বাচন করা থেকে। ৬১৯ হিজরি থেকে ৭০৩ হিজরি পর্যন্ত কেরমান শহরে বাদশাহী করেছিল কারাখ্‌তায়িয়ান রাজবংশ। এ সময় কেবল কেরমান শহরটাই ছিল তাদের রাজধানী। তবে আলে বুইয়ে রাজবংশ, আলে মোজাফফর এবং যান্দিয়া শাসনামলে কেরমান আশেপাশের কয়েকটি শহরসহ রাজধানী হিসেবে মনোনীত হয়েছিল।

সাফাভি বাদশাহরা ৯১৫ হিজরিতে কেরমানকে তাদের দখলে নিয়ে যায় এবং ১০০৫ হিজরিতে শাহ আব্বাস সাফাভির পক্ষ থেকে গাঞ্জআলি খান কেরমানের শাসক নিযুক্ত হয়েছিলেন।  তাঁর কিছু পদক্ষেপের পরিপ্রেক্ষিতে শহরটিতে মোটামুটি শান্তি এবং স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। গাঞ্জআলি খানের সময় কেরমান শহরের অনেক উন্নতিও হয়েছিল। তবে সাফাভি শাসনামলের অবসানের সময় আফগানরা কেরমানে হামলা চালিয়ে জানমালের ব্যাপক ক্ষতি করে। ১১৬০ সালে নাদের শাহ আফশর যখন কেরমানে পৌঁছে তখন সে কেরমানের নিরীহ জনগণের ওপর গণহত্যা চালানোর নির্দেশ দেয়। এর কারণ ছিল তার ছেলে রেযা কুলি মির্যা হত্যার প্রতিশোধ নেওয়া।

খ্রিষ্টীয় আঠারো শতকের মাঝামাঝিতে অর্থাৎ কাজারি শাসনামলের শুরুর দিকেও কাজার রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা আগা মুহাম্মাদ খানের নির্মম প্রতিশোধের আগুনে পুড়ে ছারখার হয়ে যায় কেরমান। তার নির্মমতার শিকার হয়ে কেরমানের অন্তত বিশ হাজার মানুষ নিজেদের চোখগুলো হারায়। এ কারণে দীর্ঘ একটা সময় পর্যন্ত কেরমানে তেমন কোনো উন্নয়নমূলক কার্যক্রম হয় নি। সম্ভবত অন্য কোনো শহরেই এ ধরনের অত্যাচারের শিকার হয় নি কেউ। তবে নিঃসন্দেহে ইরানের বৃহৎ শহরগুলোর মধ্যে সবার শীর্ষে এখন এই কেরমান শহর। এখানকার অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রগুলোর সমৃদ্ধির কারণে সমগ্র ইরানের মধ্যে শহরটি আলাদা গুরুত্ব রয়েছে।

এই শহরে দেখার মতো কী কী নিদর্শন আছে, দর্শনীয় কী কী স্থাপনা বা প্রাকৃতিক দৃশ্য রয়েছে সেগুলো একবার দেখে নিই। কেরমান শহর ভ্রমণে নতুন কেউ গেলেই সবার আগে যে বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি আকৃষ্ট হবে তা হলো এখানকার ‘রাস্তা বাজার’। রাস্তাবাজার মানে হলো সারিবদ্ধভাবে দোকানের পর দোকানময় যে বাজার। ইরানের মধ্যে সবচেয়ে বড়ো রাস্তাবাজার হলো কেরমানের এই বাজারটি। কেরমান শহরের এই বাজারটির একেকটি বিভাগ এই শহরের একেকজন গভর্নরের সময় নির্মিত হয়েছে। বাজারটির কোনো কোনো বৈশিষ্ট্যের কারণে এটি সম্পূর্ণ আলাদা এবং স্বতন্ত্র মর্যাদা লাভ করেছে। সে কারণে বিশ্বব্যাপী বাজারটির খ্যাতি আছে।

বাজারটি তিন কিলোমিটারের মতো দীর্ঘ। এই বাজারের অসংখ্য বিভাগ ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বে নির্মিত হয়েছে। বাজারটির স্থাপত্য শৈলীগত মর্যাদাও ব্যাপক। ইরানের সাংস্কৃতিক ইতিহাস খুঁজে পাওয়া যাবে এই বাজারের বিভিন্ন স্থাপত্যকলায়। আয়নার কারুকাজটাও অসাধারণ এবং ঐতিহাসিক মূল্যবোধ সম্পন্ন। আর্গ স্কোয়ার থেকে শুরু হয়ে রাস্তাবাজারটি শেষ হয়েছে সেই মোশতাকিয়া স্কোয়ারে গিয়ে। বিশাল এই বাজারটি এখন ঐতিহাসিক কেন্দ্রগুলোর মধ্যে যেমন অন্যতম তেমনি কেরমানের বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবেও অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। কেরমান শহরের ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোর শতকরা অন্তত ষাট ভাগই এই বাজারে শোভা পাচ্ছে।

রাস্তাবাজার ছাড়াও এখানে রয়েছে কেরমান বাজারে বোযোর্গ,গাঞ্জআলি খান বাজার, এখতিয়রি বাজার, কায়সারিয়া যারগারি বাজার, মাসগারহা বাজার, কাফফশহা’ বাজার, কোলামালহা’ বাজার, অহাঙ্গারি বাজার, বাজারে আযিয, বাজারে আত্তরন, বাজারে মোজাফফারি, বাজারে কাদামগহ, বাজারে কেল্লে মাহমুদ, বাজারে কেল্লেসহ আরো অনেক বাজার আছে কেরমানে। বাজারগুলোর মাঝে বৈচিত্র্যও রয়েছে। নাম থেকেই ওই বৈচিত্র্যের বিষয়টি উপলব্ধি করা যায়। এইসব বাজারে মসজিদ এবং হাম্মামখানাসহ আরো অনেক স্থাপনা রয়েছে। সাফা আযাখানা, মাসজেদে ভাকিল, মাসজেদে গাঞ্জআলি খান, মাসজেদে চেহেল সুতুন ইত্যাদি মসজিদ স্বনামের বাজারগুলোর ভেতরেই গড়ে উঠেছে। সমকালীন স্থাপত্যরীতির বৈশিষ্ট্য নিয়ে গবেষণা করতে গেলে এইসব স্থাপনার প্রয়োজন পড়বে। এ কারণেই এগুলোর এতো ঐতিহাসিক গুরুত্ব।

কেরমান বাজারের পাশাপাশি এখানে রয়েছে গাঞ্জআলি খান কমপ্লেক্স। কেরমান শহরে ঐতিহাসিক এবং আকর্ষণীয় স্থাপনাগুলোর একটি হলো এই কমপ্লেক্সটি। এই কমপ্লেক্সের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল মাঠ বা ময়দান, ছিলো সরাইখানা, মসজিদ, পানির হাউজ, হাম্মামখানা, টাঁকশাল ইত্যাদি। সাফাভি শাসনামলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বিকাশের সময় অর্থাৎ হিজরি ১০০৭ থেকে ১০২৯ সালের মধ্যে এই উন্নয়ন ঘটেছিল। এই সময়সীমার মধ্যে গাঞ্জআলি খানের শাসনামলেই কেরমানে ওই কমপ্লেক্সটি নির্মাণ করা হয়েছিল। স্বয়ং গাঞ্জআলি খানের কমপ্লেক্সটি নির্মাণ করা হয়েছিল। সাফাভি শাসনামলের স্থাপত্যশৈলীর অন্যতম একটি নিদর্শন হিসেবে এই কমপ্লেক্স আজও তার প্রাচীন এবং ঐতিহাসিক মর্যাদা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। স্থাপনাটিতে বিখ্যাত স্থপতি সুলতান মুহাম্মাদ ইয়াযদি’র মতো শিল্পীর শিল্পকর্মের নমুনা যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে সমকালীন বিখ্যাত ক্যালিগ্রাফিস্ট আলি রেযা আব্বাসির শিল্পকর্মের নিদর্শনও।

কমপ্লেক্সটির মাঝখানে রয়েছে খোলা আঙ্গিনা। বিশাল এই ময়দানে অনুষ্ঠিত হয় বিচিত্র অনুষ্ঠান। কখনো শোকানুষ্ঠান আবার কখনো হয় উৎসব অনুষ্ঠান। উন্মুক্ত এই স্কোয়ারটির আয়তন পাঁচ শ বর্গমিটারের মতো। এর তিন দিকেই বাজার আর একদিকে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের বাণিজ্যিক চেম্বার। উত্তর দিকে টাঁকশাল। হাম্মামটি রয়েছে দক্ষিণ দিকে। আর সরাইখানা, মাদ্রাসা এবং মসজিদগুলো রয়েছে পূর্বদিকে। পানি জমিয়ে রাখার হাউজটি পড়েছে পশ্চিম দিকে। #

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/ ১২

খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন

ট্যাগ

২০১৮-০৯-১২ ১৭:৪৯ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য