কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের আজকের পর্বে সূরা আল আহযাবের ৫৯ থেকে ৬২ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। এই সূরার ৫৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন,

  يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُلْ لِأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِنْ جَلَابِيبِهِنَّ ذَلِكَ أَدْنَى أَنْ يُعْرَفْنَ فَلَا يُؤْذَيْنَ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَحِيمًا (59)

“হে নবী! আপনি আপনার পত্নীগণ ও কন্যাগণ এবং মুমিনদের স্ত্রীগণকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের উপর টেনে নেয়। এতে তাদেরকে চেনা সহজ হবে এবং তারা উপদ্রব ও নিপীড়নের শিকার হবে না। আল্লাহ ক্ষমাশীল পরম দয়ালু।” (৩৩:৫৯)

আগের আয়াতগুলোর ধারাবাহিকতায় এই আয়াতে পবিত্র কুরআনের দৃষ্টিতে নারীদের পর্দা বা হিজাবের বিধান বর্ণনা করা হয়েছে। বলা হচ্ছে, শুধুমাত্র লম্বা চাদর বা আবরণ যথেষ্ট নয় বরং মুমিন কন্যা ও নারীগণ এমন পোশাক পরিধান করবে যাতে চুলসহ তাদের সমস্ত শরীর ঢেকে থাকে। শরীর বা চুলের কোনো অংশ বাইরে বের করে রাখা যাবে না। আয়াতের পরবর্তী অংশে বলা হচ্ছে, এ ধরনের পোশাক পরিধান করলে তোমরা পবিত্র আত্মার নারী হিসেবে চিহ্নিত হবে এবং দুষ্ট লোকদের দ্বারা নিপীড়ন বা উত্যক্ত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পাবে। কোনো খারাপ লোক গোটা শরীর আবৃত কোনো নারীর সম্মানহানি করতে যাবে না।

এ আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে:

১. হিজাবের উদ্দেশ্য হচ্ছে কুদৃষ্টি, ইভটিজিং ও মর্যাদা হানিকর আচরণ থেকে নারীকে রক্ষা করা। কাজেই হিজাব নারীর জন্য কিছুটা সীমাবদ্ধতা তৈরি করলেও এটি তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।

২. আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রাসূলের নির্দেশ হচ্ছে  ইসলামি সমাজে সবার পবিত্রতা ও সম্মান রক্ষা করা। এই নির্দেশ পালনের জন্যই নারীকে ঘর থেকে বাইরে বের হলে উপযুক্ত পোশাক পরিধান করতে হবে।

৩. ইসলাম নারীকে ঘরের মধ্যে পুরোপুরি আটকে থাকতে বলেনি বরং হিজাব পরিধান করে তারা প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হতে এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারেন।

সূরা আহযাবের ৬০ থেকে ৬২ নম্বর পর্যন্ত আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

  لَئِنْ لَمْ يَنْتَهِ الْمُنَافِقُونَ وَالَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ مَرَضٌ وَالْمُرْجِفُونَ فِي الْمَدِينَةِ لَنُغْرِيَنَّكَ بِهِمْ ثُمَّ لَا يُجَاوِرُونَكَ فِيهَا إِلَّا قَلِيلًا (60) مَلْعُونِينَ أَيْنَمَا ثُقِفُوا أُخِذُوا وَقُتِّلُوا تَقْتِيلًا (61) سُنَّةَ اللَّهِ فِي الَّذِينَ خَلَوْا مِنْ قَبْلُ وَلَنْ تَجِدَ لِسُنَّةِ اللَّهِ تَبْدِيلًا (62)

“মুনাফিকরা ও যাদের অন্তরে রোগ আছে এবং মদীনায় গুজব রটনাকারীরা যদি (তাদের ঘৃণ্য কাজ থেকে) বিরত না হয়, তবে আমি অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে আপনাকে উত্তেজিত করব। অতঃপর এই শহরে তারা অল্প কিছুদিনের বেশি আপনার সঙ্গে বসবাস করতে পারবে না।”(৩৩:৬০)

“তারা অভিশপ্তদের অন্তর্ভূক্ত।  তাদেরকে যেখানেই পাওয়া যাবে ধরতে হবে এবং তাদের প্রাণ বধ করতে হবে।” (৩৩:৬১)     

“যারা পূর্বে অতীত হয়ে গেছে, তাদের ব্যাপারে এটাই ছিল আল্লাহর রীতি। আপনি আল্লাহর রীতিতে কখনও পরিবর্তন পাবেন না।” (৩৩:৬২)     

এই তিন আয়াতে যাদের কথা বলা হয়েছে তারা রাসূলের যুগে মদীনায় বসবাস করত এবং বিভিন্ন উপায়ে সমাজে নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি করত। এসব দুষ্ট লোক মদীনার নারীদের নানাভাবে উত্যক্ত করত। অন্যদিকে মুনাফিকরা নানা অজুহাতে ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যেতে চাইত না। তারা গুজব রটনা করে মানুষের মধ্যে ভয় ও আতঙ্ক তৈরি করত। তারা শত্রুর সামরিক শক্তি সম্পর্কে মুসলমানদের মধ্যে অতিরঞ্জিত কথাবার্তা প্রচার করত এবং মুমিন সেনাদল সম্পর্কে নানা দুর্বলতার কথা বলে বেড়াত।  এ কাজে তাদের উদ্দেশ্য ছিল মুসলিম বাহিনীর মনোবল ভেঙে দেয়া।

এদিকে যেকোনো সমাজে বসবাসকারী মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির চেয়েও তাদের নিরাপত্তা রক্ষার গুরুত্ব অনেক বেশি। এ কারণে আল্লাহ রব্বুল আলামিন এই তিন আয়াতে রাসূলে আকরাম (সা.)কে উদ্দেশ করে বলছেন, যেসব লোক মানুষের সামাজিক ও মানসিক নিরাপত্তা কেড়ে দেয় তাদের বিরুদ্ধে কঠোরতম ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। তাদের একদলকে মদীনা থেকে বের করে দিন এবং আরেকদলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করুন। এর ফলে নতুন করে আর কারো পক্ষে কোনো অজুহাতেই মদীনার নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার সাহস হবে না।

এই তিন আয়াতের শেষাংশে যুগে যুগে আল্লাহ তায়ালার রীতির অপরিবর্তনীয় অবস্থার কথা বর্ণনা করে বলা হয়েছে, সমাজ থেকে বিশৃঙ্খলা, গোলযোগ ও নিরাপত্তাহীনতার শেকড় উপড়ে ফেলা মহান আল্লাহর এমন একটি রীতি যা তিনি তাঁর রাসূলকে এবং পরবর্তীতে ইসলামি শাসনব্যবস্থাগুলোকে বাস্তবায়ন করতে বলেছেন।

এই তিন আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে-

১. সমাজে বিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে দুর্বলতা প্রকাশ করা যাবে না। কারণ, যেকোনো দুরারোগ্য ব্যধির মতো নিরাপত্তাহীনতা সমাজকে ধ্বংসের দিকে টেনে নিয়ে যায়।

২. যারা সমাজে নিরাপত্তাহীনতা ও গোলযোগ সৃষ্টি করে তাদেরকে কোথাও নিরাপদে থাকতে দেয়া যাবে না। এ ধরনের ব্যক্তিদের আটক করে ইসলামি শাসনব্যবস্থার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে হবে।

৩. ইসলামি সমাজে শত্রুর অনুপ্রবেশ করার অন্যতম পন্থা হচ্ছে গুজব রটনা। এ কারণে গুজব ছড়িয়ে পড়তে পারে এমন সব কর্মকাণ্ড থেকে সাবধান থাকতে হবে। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়োজিত ব্যক্তিদেরকে জনগণের সামনে যেকোনো বিষয় সম্পর্কে স্পষ্ট ধারনা দিতে হবে।  পাশাপাশি জনগণকেও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কথায় আস্থা রাখতে হবে এবং এর বাইরে কেউ কোনো কথা বললেই তা বিশ্বাস করা বা তা প্রচার করে বেড়ানো থেকে বিরত থাকতে হবে।

৪. সমাজে বিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ আল্লাহ তায়ালা নিজে দিয়েছেন। কাজেই এই নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে। কোনো অবস্থায়ই অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে আপোষ করা যাবে না। # 

 

 

ট্যাগ

২০১৮-০৯-১৬ ১৬:১৮ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য