'কারবালার মহাবিপ্লব ও এর শাশ্বত শিক্ষা' শীর্ষক বিশেষ আলোচনার অষ্টম পর্বে সবাইকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। আজ আমরা মহান আশুরা ও কারবালা বিপ্লবের নানা দিক আর শিক্ষা নিয়ে কথা বলব।

মহান আল্লাহর প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা যে তিনি আমাদেরকে আবারও মহান আশুরা সম্পর্কে জানার ও এ বিষয়ে আলোচনা শোনার সুযোগ দিয়েছেন। কারবালার মহাবিপ্লব সম্পর্কিত আমাদের গত কয়েক পর্বের আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট যে এ মহাবিপ্লব তথা আশুরা-বিপ্লবের রয়েছে বহুমাত্রিকতা। আসলে ইমাম হুসাইনের নেতৃত্বে সংঘটিত এ মহাবিপ্লব ইসলামেরই পরিপূর্ণ চিত্রের প্রতিচ্ছবি।  কালের মহাপাখায় এ মহাবিপ্লব ইসলামেরই সব দিককে জানার এবং সবগুলো মহৎ গুণ চর্চার কেন্দ্র-বিন্দুতে পরিণত হয়েছে। কারবালা ও আশুরা একত্ববাদ বা আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা, ইসলামী নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য,সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ, খোদাপ্রেম ও ইসলামী আদর্শের জন্য চরম ত্যাগ-তিতিক্ষা, মানবতা, মহত্ত্ব, বীরত্ব,বিশ্বস্ততা,মহানুভবতা,মুক্তিকামীতা,সততা, আধ্যাত্মিকতা ও আত্মসংশোধনের নানা দিক শেখার এক মহান বিশ্ববিদ্যালয়।  কারবালা এটা প্রমাণ করে যে রক্ত তরবারির ওপর বিজয়ী হতে পারে। সত্যের পক্ষে মুষ্টিমেয় সেনানীও ভেঙ্গে দিতে পারে প্রবল পরাক্রান্ত তাগুতি শক্তির সিংহাসন।

কারবালার ঘটনা ত্যাগ ও তিতিক্ষার বহু অনন্য দৃষ্টান্তের সাক্ষ্য। ইমাম হুসাইনের (আ.) ভাই বীরশ্রেষ্ঠ হযরত আব্বাস ত্যাগ ও তিতিক্ষার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।

হযরত আব্বাস ইমাম পরিবারের তৃষ্ণার্ত শিশুদের জন্যে পানি আনার দৃঢ়সংকল্প নিয়ে চার হাজার শত্রু-সেনার ব্যূহ প্রাচীর ভেদ করে ফোরাতের পানিতে এসে পড়লেন। প্রথমে তিনি মশক ভরে পানি নিলেন। এবার তিনি হাত ভরে পানি তুলে মুখের কাছে আনলেন। হঠাৎ করে তিনি পানি ফেলে দিলেন এবং একফোটা পানিও পান করলেন না। হযরত আব্বাসের তৃষ্ণার্ত ভাইয়ের কথা মনে পড়লো। তিনি ভাবলেন, ইমাম (আ.) তাঁবুতে তৃষ্ণার্ত থাকবেন আর আমি পানি খাব এটা কিভাবে সম্ভব? ‘হযরত আব্বাস নিজের নফসকে বলেছিলেন: হে আব্বাস! তোমার ভাই তৃষ্ণার্ত আর তুমি স্বচ্ছ পানি পান করে বেঁচে থাকতে চাও? আল্লাহর শপথ করে বলছি-ভাইয়ের খেদমত,ইমাম হুসাইনের (আ.) খেদমত,সত্যের খেদমত, সেনাপতির বিশ্বস্ততা এভাবে সম্ভব নয়।’’ কারবালা ছিল সত্যের প্রতি বিশ্বস্ত থাকার বাস্তব পরীক্ষা কেন্দ্র । এর প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত বিশ্বস্ততায় ভরপুর।

হযরত আবুল ফজল আব্বাস (আ)  ইমাম শিবিরের জন্য পানি বয়ে আনতে গিয়ে একে-একে তাঁর দুই হারান শত্রুদের তরবারির আঘাতে। কিন্তু তবুও তিনি মুখে কামড়ে ধরে পানির মশক বয়ে আনছিলেন। অবশেষে  ইয়াজিদ বাহিনীর তীরের আঘাতে মশক ছিন্ন হয়ে গেলে তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন এবং নির্মমভাবে  শহীদ হন শত্রুর তীর-বৃষ্টি ও তরবারির অসংখ্য আঘাতে!

শহীদ সম্রাট ইমাম হুসাইন (আ)’র মত এক অত্যুজ্জ্বল নক্ষত্রের অনুগত ও ন্যায়নিষ্ঠ সঙ্গী হওয়ার মত গৌরবময় আলোক-স্পর্শ যারা পেয়েছিলেন তারাও ইসলাম এবং মানবতার ইতিহাসে উজ্জ্বল হীরক-খণ্ডের মতই অমর হয়ে আছেন। মুষ্টিমেয় সেইসব সঙ্গীদের মর্যাদা তুলে ধরতে গিয়ে স্বয়ং ইমাম বলেছিলেন সেই ঐতিহাসিক উক্তি:

 ‘‘আমি পৃথিবীতে তোমাদের চেয়ে বিশ্বস্ত ও উত্তম কোনো সহযোগীর সন্ধান পাইনি।’’ পবিত্র কুরআনে বলা হচ্ছেঃ ‘‘কত নবী যুদ্ধ করেছেন,তাদের সাথে বহু আল্লাহওয়ালা ছিল। আল্লাহর পথে তাদের যে বিপর্যয় ঘটেছিল তাতে তারা হীনবল হয়নি ও নতি স্বীকার করেনি। আল্লাহ ধৈর্যশীলদেরকে পছন্দ করেন।’’ (আল ইমরানঃ ১৪৬)

অথচ ইমাম হোসাইন (আ.) প্রকারান্তরে তার সহযোগীদেরকে আম্বিয়াকেরামের এ সকল সহযোগীদের চেয়েও মর্যাদাসম্পন্ন বলে ঘোষণা দিয়েছেন।

ইমামের সঙ্গে কয়েক মাস পর্যন্ত ছিল কয়েক হাজার সঙ্গী। তাদের অনেকেই খুব ভাল প্রকৃতির মানুষও ছিলেন। তবে এদের বেশিরভাগই শেষ মুহূর্তে তাদের ইমাম তথা নেতাকে পরিত্যাগ করেন যদিও এ সময় ইমামের প্রতি তাদের সাহায্য ছিল জরুরি। যারা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ইমামের পাশে থেকেছেন তারা কেন সুযোগ পেয়েও ইমামকে ত্যাগ করেননি?

আসলে এরা ছিলেন ঈমানের কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার যোগ্য ব্যক্তিত্ব। ইমামের প্রতি তাদের মধ্যে গভীর ভালবাসা ছিল কিংবা গভীর ইমাম-প্রেমের একটা পটভূমি তাদের হৃদয়ে তৈরি হয়েই ছিল। তাই মহান আল্লাহর পরিচালিত আত্মত্যাগের নানা কঠিন পরীক্ষায় তারা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অবিচল থাকেন। তারা দুর্বল ঈমানদারদের চিন্তার বিপরীতে  বিপদের কঠিন পাহাড় ও অনিবার্য মৃত্যু দেখেও একজন শ্রেষ্ঠ ও পরিপূর্ণ মানুষের পৌরুষোচিত সংগ্রামে অংশগ্রহণের গৌরব হাতছাড়া করতে চাননি। খোদাপ্রেমের ক্ষেত্রে একনিষ্ঠতাই তাদেরকে শেষ পর্যন্ত মহান সংগ্রামের পথে অবিচল রেখেছে। ইসলাম ও এর কর্ণধার ইমামের প্রতি তাদের ভালবাসা ছিল কিংবদন্তীতুল্য।

দৃষ্টান্ত হিসেবে ইমামের আহলে বাইত তথা নবী-পরিবারের সদস্যদের কথা বাদ দিয়েও স্মরণ করা যায় ইমামপ্রেমিক আমর ইবনে জুনাদে,হাবিব মাজাহের, সাইদ,আসলান এবং আবেস ও সওজাবদের কথা। নবীজির আহলে বাইতের প্রতি গভীর ভালবাসায় তাঁরা যেন ছিলেন আত্মহারা। তাই সে সময় শত্রুদেরকে হতভম্ব-করা তাদের অসীম সাহস,প্রজ্ঞা,বুদ্ধি ও মহাত্যাগের মনোভাব ইতিহাসে হয়ে আছে অমর। 

ইমাম-প্রেমিক আবেস ছিলেন একজন খ্যাতনামা পাহলোয়ান। শওজাব ছিলেন তার অতি ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ইমাম ও নিজের পরিবারের পর এতো ঘনিষ্ঠ আর কেউই ছিল না তাঁর। কে আগে ইমামের জন্য প্রাণ বিলিয়ে দিতে যাবে এ নিয়ে যখন ইমামের সঙ্গীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা তখন এমন বীর পাহলোয়ান  যুদ্ধে যাওয়ার ক্ষেত্রে আগে বন্ধু সওজাবকে  রনাঙ্গনে যেতে বললেন। সওজাব এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি জানান যে,আমি তোমার মৃত্যু আগে দেখতে চাই এ কারণে যে ইমাম তার অতি প্রিয়জনদের হারানোর সময় যে বেদনা অনুভব করেছেন সেই বেদনার খানিকটা আমিও অনুভব করতে চাই।

আমর ইবনে জুনাদ নামের আরেক ইমাম প্রেমিক অনুমতি চান যুদ্ধের জন্য। ইমাম হুসাইন (আ) বললেন, তোমার বাবা কিছুক্ষণ আগে শহীদ হয়েছেন। তাই তুমি যুদ্ধে যেও না, তোমার মায়ের সেবার জন্য বেঁচে থাক। অনুমতি পাওয়ার জন্য ব্যাকুল  জুনাদ কেঁদে কেদে বললেন, আমার মা-ই আমাকে পাঠিয়েছেন এবং তিনি চান যে আমি আপনার জন্য এখানেই শহীদ হই,তিনি কিছুতেই আমাকে ফিরতে দেবেন না। কেমন ইমাম-প্রেমিক ছিলেন এই মা? মল্ল যুদ্ধের সময় জুনাদ আবৃত্তি করছিল স্বরচিত সেই বিখ্যাত কবিতা: ‘আমার নেতা হুসাইন (আ), কতো উত্তম নেতা! হৃদয়ে আনন্দের মাধ্যম। তিনি পুরস্কারের সুসংবাদদাতা ও খোদায়ী শাস্তির ভীতি প্রদর্শনকারী। হযরত আলী (আ) ও ফাতিমা সালামুল্লাহি আলাইহা তাঁর বাবা ও মা। হুসাইনের সঙ্গে তুলনা করার মতো কেউ কি আছে? যেন মধ্যাহ্নের উজ্জ্বল সূর্যের মত তাঁর চেহারা ....’

আসলান নামের এক কৃষ্ণকায় ব্যক্তি ছিলেন ইমাম হুসাইনের সেবক। তিনি যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি আদায় করে ছাড়েন তাঁর  প্রাণপ্রিয় নেতার কাছ থেকে। বীরের মত লড়াইয়ের পর আসলান ইয়াজিদ বাহিনীর আঘাতে ধরাশায়ী হলে ইমাম হুসাইন নিজে এসে তাঁর গালে নিজের মুখ রাখেন স্লেহভরে। এ সময় শাহাদতের আগ মুহুর্তে আসলান বার বার বলছিলেন: আমার মত সৌভাগ্যবান কে আছে পৃথিবীতে? ফাতিমার ছেলে আমার মুখে মুখ রেখেছেন!

সাইদ নামের আরেক ইমাম প্রেমিক ১৩ টি তিরের আঘাত সহ্য করেন ইমামের জন্য। ইমাম যাতে নির্বিঘ্নে আশুরার দিনে যুদ্ধক্ষেত্রেই জোহরের নামাজ আদায় করতে পারেন সে জন্য সাইদ এতগুলো তীর বুকে পেতে নেন। সাধারণত মানুষ তিনটি বা বড় জোর ৫ টি  বিষাক্ত তিরের আঘাত সইতে পারে। কিন্তু সাইদ কঠিন বেদনা সয়ে একে একে ১৩টি তিরের আঘাত সহ্য করেন! ১৩তম তিরের আঘাতে যখন লুটিয়ে পড়েন সাইদ ততক্ষণে ইমামের নামাজ শেষ হয়েছে। এ সময়ও সাইদ হাসিমুখে বলছিলেন,ইমাম আপনি কী আমার প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন?

এই ছিল ইমামের ৭২ জন শহীদ সঙ্গীর এক-একজনের অবস্থা। ইয়াজিদ বাহিনীর প্রাথমিক হামলার মূল ধকলটা যেন ইমামের পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়দের ওপর না পড়ে সে জন্য সচেষ্ট ছিলেন ইমামের পরিবারের বাইরের সঙ্গীরা। তারা যেন ছিলেন ইমামের প্রতি ভালবাসায় কুরআনে বর্ণিত সিশা ঢালা প্রাচীর।

ইমামের নসিহত শুনে আশুরার দিনে ইয়াজিদ বাহিনীর আরও কয়েকজন দলত্যাগ করে ইমামের শিবিরে যোগ দিয়েছিলেন।

এবারে আমরা আশুরা সম্পর্কে ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক মুহাম্মাদ মুনীর হুসাইন খানের কিছু বক্তব্য শুনব: কারবালায় সমবেত ইয়াজিদ বাহিনীর লোকদের সুপথে আনার জন্য যুদ্ধ শুরুর আগে ইমাম হুসাইন (আ) কয়েকটি ভাষণ দিয়েছিলেন। তাঁর প্রথম ভাষণে তিনি বলেন:

আম্মা বা’আদ, বিবেচনা করো আমার পরিবার সম্পর্কে এবং গভীরভাবে ভাবো আমি কে, এরপর নিজেরদের তিরস্কার করো। তোমরা কি মনে করো যে আমাকে হত্যা করা এবং আমার পবিত্রতা ও সম্মান লুট করা তোমাদের জন্য বৈধ? আমি কি তোমাদের নবীর নাতি, তার ওয়াসী ও তার চাচাতো ভাইয়ের সন্তান নই, যিনি ছিলেন বিশ্বাস গ্রহণে সবার আগে এবং সাক্ষী ছিলেন সে সব কিছুর ওপরে যা নবী আল্লাহর কাছ থেকে এনেছেন? শহীদদের সর্দার হামযা কি আমার পিতার চাচা ছিলেন না? জাফর, যিনি বেহেশতে দুপাখা নিয়ে উড়েন, তিনি কি আমার চাচা নন? নবীর হাদীস কি তোমাদের কাছে পৌঁছে নি যেখানে তিনি আমার সম্পর্কে ও আমার ভাই সম্পর্কে বলেছেন আমরা দুজন জান্নাতের যুবকদের সর্দার? তাই যদি আমি যা বলছি তার সাথে একমত হও, এবং নিশ্চয়ই আমি যা বলেছি তা সত্য ছাড়া কিছু নয়, তাহলে তা উত্তম, কারণ আল্লাহর শপথ, যে সময় থেকে আমি বুঝেছি আল্লাহ মিথ্যাবাদীদের অপছন্দ করেন তখন থেকে আমি কখনোই কোন মিথ্যা বলিনি। আর যদি তোমরা আমি যা বলছি তা বিশ্বাস না করো, তাহলে তোমাদের মাঝে নবীর জীবিত সাহাবীগণ আছে, তাদের কাছে যাও এবং তাদেরকে জিজ্ঞেস করো এবং তারা আমার বক্তব্যের সত্যতার সাক্ষী দিবে। জাবির বিন আব্দুল্লাহ আনসারি, আবু সাঈদ খুদরি, সাহল বিন সাদ সা’য়েদি, যায়েদ বিন আরক্বাম এবং আনাস বিন মালিককে জিজ্ঞেস করো, তারা তোমাদের বলবে যে তারা আল্লাহর রাসূলের কাছ থেকে আমার ও আমার ভাই সম্পর্কে এই হাদীস শুনেছে। এটি কি তোমাদের জন্য আমার রক্ত ঝরানোর চাইতে যথেষ্ট নয়?”

তখন অভিশপ্ত শিমর বিন যিলজাওশান বললো,“আমি আল্লাহর ইবাদত করি ঠোঁট দিয়ে এবং তুমি যা বলছো তা আমি বুঝি না।”এ কথা শুনে হাবীব বিন মুযাহির বললেন, “আমি দেখছি তুমি আল্লাহর ইবাদত করো সত্তুর ধরনের সন্দেহ নিয়ে এবং আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে তুমি সত্য কথা বলেছো এবং তুমি বুঝতে পারো না ইমাম যা বলেন, কারণ আল্লাহ একটিতখা(মর্র ) মোহর তোমার হৃদয়ের ওপরে মেরে দিয়েছেন।”

ইমাম বললেন, “যদি তোমরা এতে সন্দেহ পোষণ করো, তোমরা কি এতেও সন্দেহ করো যে আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) এর নাতি? আল্লাহর শপথ, পূর্বে ও পশ্চিমে,আমি ছাড়া নবীর কোন নাতি নেই তোমাদের মধ্যে অথবা অন্যদের মধ্যে। দুর্ভোগ তোমাদের জন্য, আমি কি তোমাদের মধ্য থেকে কাউকে হত্যা করেছি যে তোমরা তার প্রতিশোধ নিতে চাও? অথবা আমি কি কারো সম্পদ বেদখল করেছি অথবা কাউকে আহত করেছি যার প্রতিশোধ তোমরা আমার উপর নিতে চাও?”

যখন কেউ তাকে উত্তর দিলো না,তিনি উচ্চ কণ্ঠে বললেন, “হে শাবাস বিন রাব’ঈ, হে হাজ্জার বিন আবজার, হে ক্বায়েস বিন আল আশআস, হে ইয়াযীদ বিন হুরেইস,তোমরা কি আমার কাছে চিঠি লিখো নি যে, ফল পেকেছে এবং আশপাশের ভূমিতে ফুল ফুটেছে এবং একটি বিশাল সেনাবাহিনীর কাছে আসুন, যা আমার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে?”

তারা উত্তর দিলো যে তারা এ ধরনের কোন চিঠি লিখে নি। ইমাম বললেন, “সুবহানাল্লাহ, আল্লাহর শপথ অবশ্যই তোমরা তা লিখেছিলে।”

এরপর তিনি বললেন, “হে জনতা, এখন যদি তোমরা আমার আগমনকে পছন্দ না করো তাহলে আমাকে ছেড়ে দাও যেন আমি কোন আশ্রয়ের জায়গায় চলে যেতে পারি।”

ক্বায়েস বিন আল আশআস বললো, “তুমি যা বলছো তা আমরা জানি না, আমার চাচাতো ভাইদের (বনি উমাইয়ার) কাছে আত্মসমর্পণ করো, তারা তোমার সাথে সেভাবে আচরণ করবে যেভাবে তুমি চাও।” ইমাম বললেন, “আল্লাহর শপথ, নিকৃষ্ট মানুষের মত আমি তোমাদের হাতে হাত দিবো না, না আমি পালিয়ে যাবো কোন দাসের মত।”

এরপর তিনি উচ্চকণ্ঠে বললেন, হে আল্লাহর দাসেরা,

)وَإِنِّي عُذْتُ بِرَبِّي وَرَبِّكُمْ أَنْ تَرْجُمُونِ(

নিশ্চয়ই আমি আমার ও তোমাদের রবের কাছে আশ্রয় নিচ্ছি, পাছে তোমরা আমাকে পাথর মারো (হত্যা করো)। [সূরা দুখান: ২০]

)إِنِّي عُذْتُ بِرَبِّي وَرَبِّكُمْ مِنْ كُلِّ مُتَكَبِّرٍ لَا يُؤْمِنُ بِيَوْمِ الْحِسَابِ(

আমি আশ্রয় নিই আমার ও তোমাদের রবের কাছে, প্রত্যেক দাম্ভিক থেকে, যে হিসাব দিনে বিশ্বাস করে না। [সূরা মু’মিন: ২৭]

এরপর ইমাম তার উট থেকে নেমে পড়লেন এবং উক্ববাহ বিন সাম’আনকে বললেন এর পাগুলো বাঁধতে।

আশুরার দিন নবী পরিবারের নুরানি সদস্যদের একে একে শাহাদত বরণও ছিল ইতিহাসের অনন্য দৃশ্য। ইমামের ৬ মাসের শিশুও রেহাই পায়নি ইয়াজিদ বাহিনীর বর্বরতা থেকে। হযরত আলী আকবর (আ) ছিলেন ইমামের বড় ছেলে। ১৯ বা ২১ বছর বয়সের এই তরুণ জোহরের নামাজের সময় কারবালায় আজান দিয়েছিলেন। তার আযানের কণ্ঠ শুনে চমকে যায় শত্রু  শিবিরের অনেকে। ঠিক যেন মহানবীর (সা) কণ্ঠস্বর! চেহারাও ছিল অবিকল মহানবীর যুব-বয়সের সেই চেহারা। চাল-চলনও ছিল অবিকল মহানবীর মত! তাকে যুদ্ধে পাঠাতে ইমামের কতই না কষ্ট হচ্ছিল। নবী-পরিবারের সদস্যরা  বলতেন, মহানবীর জন্য যখন প্রাণ কাঁদতো তখন মাঝে মধ্যে তাঁকে  স্মরণ করে আমরা আলী আকবরের  দিকে তাকাতাম!

১৩ বছরের তরুণ হযরত কাসেম  ইবনে হাসানের (আ) বীরত্বও ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। শত্রুর আঘাতে ধরাশায়ী হয়ে তিনি আর্তনাদ করে ওঠেন: চাচাজান! এ সময় ইমাম হুসাইন বিদ্যুতের গতিতে এগিয়ে আসেন। কিন্তু ভাতিজার জন্য কিছুই করতে না পেরে ইমামের হৃদয়টা যেন ভেঙ্গে চৌচির হয়ে যায়!

প্রিয় ভাই ও ভাইয়ের ছেলেদের মৃত্যুতে অশেষ শোকে বেদনার্ত হয়েছিলেন হযরত জাইনাব সালামুল্লাহি আলাইহা। কিন্তু জাইনাবের দুই শিশু পুত্রও যে বীরের মত লড়াই করে শহীদ হয়েছিলেন সেদিকে তাঁর যেন ভ্রক্ষেপও ছিল না। অশেষ ধৈর্যের প্রতীক হযরত জাইনাব বলেছিলেন, "কারবালায় যা কিছু দেখেছি (ইমাম শিবিরের দিক থেকে ও ইয়াজিদ শিবিরের মোকাবেলায়) তাতে সৌন্দর্য ছাড়া অন্য কিছু দেখিনি।"

কারবালার আরেকজন শ্রেষ্ঠ বীরের ঘটনা উল্লেখযোগ্য। আব্দুল্লাহ ইবনে উমাইর যখন কুফার বাইরে ছিলেন তখন শুনলেন যে, কী এক গণ্ডগোল হয়েছে এবং কুফাবাসীরা ইমাম হুসাইনের (আ.) বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে সৈন্য জোগাড় করছে। এ খবর শুনে তিনি বললেন,আল্লাহর শপথ! আমি ইসলামের জন্যে কাফেরদের বিরুদ্ধে অনেক যুদ্ধ করেছি। কিন্তু আজ রাসূলুল্লাহর (সা.) বংশধরকে রক্ষা করতে যুদ্ধে নামার মতো নজিরবিহীন গৌরব অর্জনের সুযোগ এসেছে। এ ভেবে তিনি বাড়ীতে ফিরে আসলেন এবং তার স্ত্রীর সাথে ঘটনা খুলে বললেন। স্ত্রী বললেন,‘সাবাস! খুব ভাল কথা চিন্তা করেছ,তবে আমার এক শর্ত রয়েছে। আব্দুল্লাহ বললেন,‘কী শর্ত!’ স্ত্রী বললো,‘আমাকেও সাথে করে নিয়ে যাবে।’ আব্দুল্লাহ যখন স্ত্রীকে সাথে নিতে রাজী হলেন তখন তার মা এসে বললো,‘আমাকেও সাথে করে নিতে হবে।’ কত বীরাঙ্গনা এ নারীরা! এসবই ছিল কারবালায় ইসলামের বাস্তব প্রতিচ্ছবির কিছু অংশ। ত্যাগ-তিতিক্ষা,সহানুভূতি,বিশ্বস্ততা,ঈমান,সাহস ও বীরত্বের অতুলনীয় ও বাস্তব মঞ্চ।

ইমাম হুসাইন (আ) নিজে এবং তাঁর পুত্র আলী আকবর ও ভাই আবুল ফজল আব্বাস শহীদ হওয়ার আগে বহু শত্রু সেনাকে নিধন করেছিলেন। তাদের হাতে কয়েক হাজার বা অন্তত এক হাজারেরও বেশি ইয়াজিদি সেনা নিহত হয়েছিলেন বলে বর্ণনা রয়েছে।

‌ইমাম হোসাইনের (আ.) ব্যক্তিত্বের কিছু মহান দিক হল পৌরুষত্ব, বীরত্ব, বিচক্ষণতা, মহত্ত্ব,  দৃঢ়তা, অটলতা এবং সত্য-প্রেম।  

ইমাম হোসাইন (আ.) বলেছেন, আমি নিজ কানে রাসূলুল্লাহর (সা.) মুখ থেকে যা শুনেছি তা হলোঃ

 ‘‘আল্লাহ বড় ও মহান কাজকে পছন্দ করেন এবং নীচ কাজকে তিনি ঘৃণা করেন।’’#

পার্সটুডে/মু.আ.হুসাইন/মো.আবুসাঈদ/ ২০

খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন 

২০১৮-০৯-২০ ১৫:১০ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য