২০১৮-০৯-২৯ ২০:৪১ বাংলাদেশ সময়

রংধনু আসরের কাছের ও দূরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই বাড়িতে বিড়াল পোষো। মানুষের সঙ্গে গভীর সখ্যতার কারণে বিড়াল সারাবিশ্বেই একটি জনপ্রিয় গৃহপালিত প্রাণী। বাসা-বাড়ির বিভিন্ন রকম পোকা-মাকড় ও ইঁদুরজাতীয় প্রাণী শিকারের জন্যও বিড়াল জনপ্রিয়।

বিড়াল খুবই আরামপ্রিয় প্রাণী। এরা দুধ, মাছ, ছোট পাখি, হাঁস মুরগির বাচ্চা, ইঁদুর ইত্যাদি খেয়ে জীবনধারণ করে থাকে। অনেকে ইঁদুর মারার জন্য বিড়াল পোষে।  

বন্ধুরা, আজকের আসরে আমরা ইঁদুর-বিড়াল নিয়ে দুটি গল্প শোনাব। এছাড়া থাকবে একটি গান। আমাদের আজকের অনুষ্ঠানটিও তৈরি করেছেন আশরাফুর রহমান।   

      'বিড়াল কেন ইঁদুর মারে'  

এক ছিল রাজা। তার ছিল একটি বিড়াল আর একটি ইঁদুর। এরা ছিল রাজার খুবই বিশ্বস্ত। বিড়াল রাজপ্রাসাদ দেখাশোনা করত আর ইঁদুর করত বাড়ির সব কাজ। রাজা ভীষণ একগুঁয়ে আর জেদি হলেও, বিড়ালকে তিনি খুব ভালোবাসতেন। কারণ, বিড়ালটি বহু বছর ধরে সততার সঙ্গে প্রাসাদের গুদামঘর পাহারা দিয়ে আসছে।

এদিকে, ইঁদুর ছিল খুব গরিব। রাজপ্রাসাদের ইঁদুরের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব হলো। তবে ইঁদুরের টাকাপয়সা না থাকায় তার বন্ধুকে কখনও কোনো উপহার দিতে পারেনি। কী করি, কী করি ভেবে একদিন তার রাজার গুদামঘরের কথা মনে হলো।

যেই ভাবা সেই কাজ। সবাই ঘুমিয়ে যাওয়ার পর রাতে গুদামঘরের ছাদ ফুটো করে ঢুকে পড়ল সে। সেখান থেকে ভুট্টা আর নাশপাতি চুরি করে উপহার দিল তার বন্ধুকে। যদিও বিড়ালের কড়া পাহারার মধ্যে কাজটি করতে তার বেশ বেগ পেতে হলো। তবুও বন্ধুকে খুশি করতে কাজটি সে যে করেই হোক করেছে।

এভাবে দিনের পর দিন ইঁদুর গুদামঘর থেকে খাবার-দাবার সরিয়ে ফেলতে শুরু করল। কিন্তু মাস শেষে বিড়াল যখন রাজাকে মজুদের হিসাব দিতে গেল, তখনই বাঁধলো গণ্ডগোল। রাজা দেখলেন, গুদামঘরে অনেক নাশপাতি আর ভুট্টা নেই। ভীষণ রেগে গেলেন তিনি।

রাজার রাগ দেখে বিড়াল ভয়ে চুপসে গেল। রাজা হাজারবার জিজ্ঞেস করার পরও বিড়াল কোনো উত্তরই দিতে পারল না। কী করে দেবে, সে তো ইঁদুরের কাণ্ড জানেই না!

একদিন বিড়ালের এক বন্ধু তাকে জানাল, আসলে ইঁদুরই প্রতিনিয়ত তার বন্ধুর জন্য গুদামঘর থেকে জিনিসপত্র সরাচ্ছে। বিড়াল কথাটা রাজার কানে দিল। রাজা সঙ্গে সঙ্গেই ইঁদুরের বন্ধুকে ডেকে প্রাসাদ থেকে তাড়িয়ে দিলেন। আর ইঁদুরের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে পাঠালেন বিড়ালের কাছে।

কিন্তু এতদিন একসঙ্গে এক ছাদের নিচে রয়েছে, বিড়াল তেমন কোনো কঠিন শাস্তি ইঁদুরকে দিতে পারল না। এতে রাজা বিরক্ত হয়ে দু’জনকেই বরখাস্ত করলেন। চাকরি যাওয়ায় বিড়াল গেল খুব রেগে। রেগেমেগ সে ইঁদুরকে খেয়ে ফেলল। 

এরপর থেকে বিড়াল যখনই ইঁদুর দেখে, তখনই প্রতিশোধ নিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বন্ধুরা, এ গল্প থেকে নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছো যে, বিড়াল কেন ইঁদুর মারে!

'ইঁদুর-বিড়ালের সমঝোতা'

এক মুদি দোকানে বাসা বেঁধেছিল দুষ্টু কিছু ইঁদুর। রাতের বেলা দোকানদার বাসায় চলে গেলে ইঁদুরদের নাচানাচি লাফালাফির উৎসব শুরু হয়ে যেত। একটা যেত তেলের বোতলে হামলা চালাতে আরেকটা লাফাতো চালের বস্তার ওপর আর অন্যরা এভাবে চিনির বস্তা আটার বস্তাসহ বিভিন্ন প্যাকেট আর বস্তা কাটার উৎসবে মেতে উঠত। যা-ই সংগ্রহ করতো সেগুলো নিয়ে জমাতো গর্তের ভেতর তাদের থাকার ঘরে। অন্য ইঁদুরেরা বাদাম আখরোট ইত্যাদি যে যা পেত খেয়ে পেট ভর্তি করে নিত। দোকানদার যতো ওষুধ আর বিষই সেখানে ছড়াত কোনো কাজই হতো না। দুই/একটা হয়তো মরতো কিন্তু চারটা নতুন জন্ম নিত।

যারা এ ধরনের সমস্যায় পড়েছিল তারা চমৎকার একটা বুদ্ধি দিল। তারা বলল: ‘ওষুধ- ফসুদে কোনো কাজ হবে না, এক কাজ করো, মোটা তাজা দেখে একটা বিড়াল এনে দোকানে রেখে দাও। দেখবে ইঁদুরের বংশ ধ্বংস হয়ে গেছে।’

দোকানদার অনেক ঘুরে ফিরে শেষ পর্যন্ত মোটাতাজা একটা বিড়াল পেল। বিড়ালটা দিনভর এটা সেটা খেয়ে দোকানের সামনেই ঝিমাত আর রাত হলেই দোকানের ভেতর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে এদিক ওদিক তাকাত। অপেক্ষায় থাকত কখন ইঁদুর বেরিয়ে আসে। ইঁদুর বের হলেই বিড়াল হামলা চালিয়ে কাজ সারা করে দিত। এভাবে বিড়ালের উপস্থিতিতে ইঁদুরেরা আর আগের মতো দোকানের বস্তা কাটার উৎসব পালন করতে পারত না।

দোকানদার পরিস্থিতির উন্নতি দেখে খুব খুশি। এখন আর ইঁদুরের দল তার দোকানের মালামাল নষ্ট করে না বা নিয়ে যায় না। বিড়ালও দোকানদারের ওপর খুব খুশি কেননা সে তাকে দিনভর খাবার দেয়, বিশ্রামের সুযোগ দেয়। বিড়ালও সতর্কতার সাথে পাহারা দিয়ে দোকানদারকে ক্ষতি থেকে রক্ষা করল। কিন্তু কোনো কোনো ইঁদুর বিড়ালের তন্দ্রার সুযোগ নিতে শুরু করল। বস্তা কেটে নিজের জন্য এবং অন্যদের জন্যও খাবার নিয়ে যেতে লাগল।

Image Caption

 

দোকানদার এই দুই একটা চোর ইঁদুরকেও কীভাবে পাকড়াও করা যায় ভাবল। ভেবেচিন্তে সে দিনের বেলা বিড়ালটাকে কম খেতে দিতে শুরু করল, যাতে রাতের বেলা বিড়ালের ক্ষিদে লাগে, আর ক্ষিদের কারণে রাতে বেশি বেশি ইঁদুর শিকার করে। দুই এক সপ্তাহ এই বুদ্ধিটা বেশ কাজে দিল।

মোটাতাজা বিড়ালটি পেট পুরে খাবার খেতে না পেয়ে ধীরে ধীরে শীর্ণ হয়ে যেতে লাগল। সেজন্য রাতে অনেক বেশি বিড়াল শিকার করতে লাগল। সে কারণে ইঁদুরগুলো আর দোকানের জিনিসপত্রের ওপর খুব একটা হামলা করতে সাহস পেল না। দোকানদারও বেশ খুশি।

কিন্তু বিড়াল খাবার না পাবার কারণে আগের মতো সন্তুষ্ট থাকতে পারল না। দোকানদারও তার দিকে আর নজর দিচ্ছে না। সে ও এখন ভাবতে শুরু করল দোকানের খাদ্য সামগ্রীর ওপর হামলা করবে। বিড়ালের মনোভাব আর দোকানদারের ব্যাপারটা ইঁদুরগুলো লক্ষ্য করছিল। তারা সবাই বৈঠকে বসল। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ইঁদুরগুলো বস্তা, প্যাকেট, এটাসেটার ফাঁকফোঁকরে একসাথে লুকিয়ে সাহসের সাথে মাথাটা বের করল।

সাহসী ইঁদুর যেটা সে বিড়ালের উদ্দেশ্যে বলল: ‘শোনো! আমার ওপর হামলা করার আগে এক মিনিটের জন্য আমার কথাটা শোনো। তুমি নিশ্চিত থাকো যে পালানোর পথ ঠিক করা আছে, তুমি আমার নাগাল পাবে না। তবে আমার কথাটা শুনলে তোমার উপকারও হতে পারে’।

বিড়াল চিন্তাভাবনা করে বলল: ঠিক আছে বলো!

ইঁদুর বলল: তুমি আসার পর থেকে আমাদের অবস্থা খারাপ হয়ে গেছে, না খেতে পেয়ে মরার মতো অবস্থা।

বিড়াল বলল: তাই তো হবার কথা.. তোমরা ভিন্ন কিছু আশা করছিলে...!

ইঁদুর বলল: না, তা না... তবে একটু ভেবে দেখুন.. দোকানদার হলো মানুষ আর আপনি এবং আমরা তো...

বিড়াল ভেবেছিল ইঁদুর তাকে ছোটো করার চেষ্টা করছে, তাই দ্রুত মাথা তুলতেই ইঁদুরটাও ঢুকে গেল বস্তার ফাঁকে। ঢুকেই বলল: তুমি আমার কথাটা শোনো..গত ২/৩ সপ্তা ধরে দোকানদার তোমাকে এতো কম খেতে দিচ্ছে যে কয়দিন পর হয়তো তোমার আর শিকার করার মতো শক্তিও থাকবে না..।

বিড়াল ভাবল ইঁদুর তো ঠিকই বলছে। সে একটু সংযত হলো। বলল: কী বলতে চাও তুমি...

ইঁদুর এবার একটু সামনে এসে বলল: ক্ষুধায় তোমারও তো নিশ্চয়ই ইচ্ছে করে দোকানের মজার মজার খাবারগুলোর বস্তায় বা প্যাকেটে আঁচড় বসাতে..করছে না? নৈলে আমরা যদি অন্য কোনো গর্তে গিয়ে আশ্রয় নেই, তুমি তো মরে যাবে না খেয়ে..তাই আমাদের প্রস্তাব হলো তুমি রাতের বেলা ঘণ্টাখানেক একটু রেস্ট নাও, আমরা এই ফাঁকে আমাদের কাজটা সেরে নেবো..বিনিময়ে তোমার জন্যও পর্যাপ্ত খাবার আমরা দোকানের এক কোণে জমিয়ে রাখবো.. তুমি তো আর তোমার ঐ ভোঁতা নখ দিয়ে বস্তা কাটতে পারবে না..তাই না?

বিড়াল মনে মনে সাতপাঁচ ভেবে ইঁদুরকে পরীক্ষা করার জন্য বলল: আমি আজ ভীষণ টায়ার্ড, ঘুমাবো.. তোদের যা খুশি কর, যাহ।

ইঁদুরেরা বুঝল বিড়াল তাদের প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেছে। গর্তে ফিরে গিয়ে সবাইকে নিয়ে রাতে হামলা চালালো যার যার পছন্দের খাবারের ওপর। ইচ্ছেমতো খেলো এবং নিয়েও গেল। আর কিছু খাবার রেখে গেল বিড়ালের জন্য। ইঁদুরেরা চলে যাবার পর বিড়াল খাবারগুলো পেট ভরে খেয়ে দু হাতের ওপর মাথাটা এলিয়ে দিয়ে ঘুমাল।

পরের কয়েক রাতেও ইঁদুর-বিড়াল পারস্পরিক সহযোগিতামূলক চুক্তি ও কর্মসূচি ঠিকঠাকভাবেই বাস্তবায়িত হলো। এখন ইঁদুরেরাও খুশি, বিড়ালও খুশি। কিন্তু বেচারা দোকানদার বুঝতেই পারেনি এভাবে ‘বেড়ায় ক্ষেত খেয়ে’ যাচ্ছে। এই ঘটনা জানাজানি হয়ে গেল নিমেষেই। তারপর থেকে যখনই দুই শত্রুর মাঝে সমঝোতা হয় কিংবা দুই শত্রুর পারস্পরিক মিল হবার কারণে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তারা এই প্রবাদটি উচ্চারণ করে:

ইঁদুর বিড়ালের সমঝোতা, দোকানদারের বারোটা’

পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/২৯

 

ট্যাগ

মন্তব্য