২০১৮-১০-১২ ১৯:৫০ বাংলাদেশ সময়

আমরা গত আসরে বলেছিলাম বর্তমান পৃথিবীতে যত সমস্যা আর ভুল বুঝাবুঝি রয়েছে সেসবের উৎস হলো অসচেতনতা বা অজ্ঞতা। এই অজ্ঞতা বা অসচেতনতারও বেশিরভাগই এসেছে প্রশ্নহীনতা বা জানার অনাগ্রহ থেকে। প্রশ্ন করলে বা জেনে নেয়ার আগ্রহ থাকলে এই সমস্যা হতো না। সুতরাং জানার জন্য প্রশ্ন খুবই সহযোগী। না জানার কারণে আল্লাহ সম্পর্কে বহু মানুষ অনুমান নির্ভর মিথ্যা আরোপ করে বসে। তবুও অহংকারের বশবর্তী হয়ে প্রশ্ন করা থেকে বিরত থাকে।

নিজেকে নিখুঁত মনে না করার মধ্যেই কল্যাণ নিহিত রয়েছে। নিজের দুর্বলতা ও ভুল-ত্রুটিগুলো অকপটে স্বীকার করার মধ্যেই রয়েছে শেখা, জানা এবং উন্নতির উপায়। এই মানসিকতা পোষণ করলে যে বিষয়টি বা সত্যে আমরা উপনীত হবো তাহলো, অন্যদের মাঝে যদি কোনোরকম ভুলত্রুটি আমরা লক্ষ্য করি তাহলে ভাববো আমরাও সেই ভুল ত্রুটি থেকে মুক্ত নই। ভুলত্রুটি স্বীকার করে জানার আগ্রহ পোষণ করা এবং না জানলে জিজ্ঞাসা করা তাই খুবই কল্যাণময় একটি প্রবণতা। কিন্তু এই প্রশ্ন করার যেমন শিষ্টাচার রয়েছে তেমনি রয়েছে দিক-নির্দেশনা দেওয়া,আদেশ-নিষেধ করা এবং প্রতিবাদ বা দ্বিমত পোষণ করারও শিষ্টাচার। এসব নিয়ে আজকের আসরে আমরা কথা বলার চেষ্টা করবো।

কুরআন সংস্কৃতিতে মুমিনদের উপর সমাজের সকল লোকের ব্যাপারে একটা দায়িত্ব অর্পন করা হয়েছে। দায়িত্বটা হলো সমাজে যে- কোনোরকম নৈতিকতার অবক্ষয় দেখা দিলে নিষ্ক্রিয় বসে থাকা যাবে না। ঈমানের দাবি হলো পরস্পরের প্রতি খেয়াল রাখা, সচেতন থাকা। কারণ একটি পুত পবিত্র ও সুস্থ সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য পারস্পরিক এই দায়িত্বশীলতা খুবই জরুরি। ওই যে বললাম সকল কাজেরই একটা নিয়ম শৃঙ্ক্ষলা বা শিষ্টাচার রয়েছে। পারস্পরিক এই দায়িত্ব কিংবা আচার আচরণেরও একটা শালীন অবস্থা রয়েছে। কেননা সমাজের সকল মানুষের রুচিবোধ এক রকম নয়। একেকজন একেক রকম মানসিকতার অধিকারী। একেকজনের চিন্তাভাবনাও একেকরকমের। একই সমস্যার সমাধান তাই সবার কাছে একরকম নয়।

তেমনি সমাজে যদি কোনোরকম অসংলগ্নতা দেখা দেয় অনেকেই তখন ক্ষেপে ওঠে। ঝগড়াঝাটি বাধিয়ে দিতে চায়। আবার অন্যজন হয়তো চেষ্টা করে আদেশ এবং নিষেধের মাধ্যমে তার আচরণ কিংবা কথাবার্তাগুলোকে সংশোধন করতে। দূর থেকে দেখে মনে হতে পারে এই কাজটা খুবই সহজ। কিন্তু প্রকৃত বাস্তবতা হলো আদেশ দেওয়া কিংবা নিষেধ করার মতো কাজ মোটেই সহজ নয়। সত্যিই যদি আমরা চাই এই আদেশ নিষেধ কিংবা সমালোচনা কাজে লাগুক, একটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলুক, তাহলে কাজটি যথেষ্ট জটিল এবং এই জটিল বিষয়টি আয়ত্ত করার জন্য দরকার প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও সুনির্দিষ্ট কৌশল।

 

অপরের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও সুনির্দিষ্ট কৌশলের কথা বলছিলাম আমরা। ওই কৌশলগুলো আয়ত্ত করতে পারলে কাউকে কোনোরকম উত্তেজিত কিংবা বিরক্ত না করেই সুন্দরভাবে তার রাগ কমিয়ে দেওয়া যায়, ভুলগুলো ধরিয়ে দেওয়া যায়। এই কৌশল জানা না থাকলে উল্টো ফল হতে পারে। তাকে থামানোর জন্য কিংবা তার ভুল ধরিয়ে দেওয়ার জন্য যে কাজই আমরা করবো সে রেগে যাবে এবং আমাদের চেষ্টা প্রচেষ্টা কোনো কাজেই আসবে না, পুরোপুরি ভেস্তে যাবে। আমাদের কৌশলবিহীন কষ্ট-ক্লেশ কোনো প্রভাবই ফেলবে না তার আচরণের ওপর। সুতরাং প্রতিপক্ষ আবার রেগেমেগে না যায়-এই ভয়ের কথা চিন্তা করে আমরা হয়তো সৎ কাজের আদেশ আর অসৎ কাজের নিষেধ করার মতো গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দায়িত্বটি পালনে গড়িমসি করবো, কিংবা নাও করতে পারি।

যদিও একজন ব্যক্তির উন্নয়ন ও অগ্রগতি নির্ভর করে সমালোচিত হওয়া এবং সমালোচনা করার ওপর। সমাজের স্থিতিশীলতা, শান্তি ও নিরাপত্তার বিষয়টিও নির্ভর করে এই সৎ কাজের আদেশ আর অসৎ কাজের নিষেধ করার মতো গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দায়িত্বটি পালনে ভারসাম্য রক্ষা করার ওপর। কুরআনের পরিভাষাটি হলো 'আম্‌র বিল মারুফ' মানে সৎ কাজের আদেশ। এই মারুফ শব্দটির প্রকৃত অর্থ হলো 'পরিচিত' এমন কোনো বস্তু যার সঙ্গে মানুষের পবিত্র ফিতরাত বা স্বভাব-প্রকৃতি পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ। সেটাই সৎ, সেটাই কল্যাণময়, সেটাই পছন্দনীয়। এই সৎ, কল্যাণকর ও পছন্দনীয় কাজের প্রতি মানুষকে আহ্বান জানানোটাই কুরআনে বর্ণিত 'আম্‌র বিল মারুফ'। পক্ষান্তরে 'নিহি আনিল মুনকারে' ব্যবহৃত 'মুনকার' শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে 'এনকার' থেকে। এ নিয়ে মিউজিক বিরতির পর আরো কথা বলার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ।

মুনকার নিয়ে কথা বলছিলাম। এনকার থেকে শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে। এনকার বলতে বোঝায় অচেনা। এর অর্থ হলো এমন কোনো খারাপ জিনিস- মানুষের পবিত্র অন্তরাত্মা, নম্র প্রবৃত্তি ও স্বাভাবিক প্রকৃতি যার সঙ্গে খাপ খায় না। আমাদের স্বভাব, প্রকৃতি বা ফিতরত ওই মন্দ কাজকে চিনতেই পারে না। সুতরাং 'নিহি আনিল মুনকার' বলতে বোঝায় মানুষের পবিত্র অন্তরাত্মা, স্বভাব, প্রকৃতি যেসব মন্দ, অপছন্দনীয় ও অস্বাভাবিক  কাজ চিনতে পারে না, সেসব কাজ থেকে বিরত থাকা কিংবা বিরত রাখা। সৎ কাজের আদেশ দেওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে মানুষের জীবন সমাজবদ্ধ বা সামষ্টিক। কেউই একা নয় বা একাকি বসবাস করতে পারে না।

মনে রাখা প্রয়োজন যে একটি সমাজে মানুষের উন্নয়ন ও অগ্রগতি নির্ভর করে সেই সমাজের সুস্থ, পবিত্র ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর। এরকম পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে স্রষ্টার নির্দেশিত সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। আল্লাহ সেরকম সমাজব্যবস্থার রূপরেখা গ্রন্থাকারে এবং রাসূলের জীবন বাস্তবতার সুন্নাতের আদলে সমগ্র মানব জাতির জন্য দিয়ে দিয়েছেন। মানুষ যখনই ওই ঐশী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কথা ভুলে গিয়ে ভিন্ন কোনো ব্যবস্থার অধীন হয়ে পড়বে তখনই সমাজে দেখা দেবে বিচিত্র সামাজিক বিচ্যুতি ও  অবক্ষয়। আর একটি অবক্ষয়িত সমাজে কেউই নিরাপদ নয়। কেউ সুস্থ থাকতে পারে না। পুরো সমাজটাই তখন হুমকিগ্রস্ত হয়ে পড়ে-নীতি নৈতকতার হুমকি, চারিত্র্যিক অবক্ষয়ের হুমকি, বিচিত্র বিশৃঙ্ক্ষলার হুমকি। #

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো:আবুসাঈদ/ ১২

খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন

ট্যাগ

মন্তব্য