২০১৮-১০-১৯ ১৭:৪১ বাংলাদেশ সময়

মসজিদ হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার ইবাদত করার ও ঈমানকে শক্তিশালী করার সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ স্থান।

মুসল্লিরা মসজিদে ইবাদত করে আত্মিক প্রশান্তি লাভ করেন। গবেষণায় দেখা গেছে, মানসিক অস্থিরতা, অবসাদ, দুঃখ-কষ্ট ও একাকীত্বের অনুভূতি দূর করার জন্য মসজিদের কোনো তুলনা হয় না। আল্লাহ তায়ালার কাছে মুনাজাত কবুল হওয়ার আশা, তাঁর ওপর নির্ভর করা, মুসল্লিদের পরস্পরের মধ্যে আন্তরিকতা সৃষ্টি হওয়া- এ সবই হচ্ছে মসজিদে উপস্থিতির কিছু ইতিবাচক দিক।

বর্তমান যুগে মানব জাতি যে বিষয়টির অভাব সবচেয়ে বেশি অনুভব করছে তা হচ্ছে মানসিক প্রশান্তি এবং উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও শঙ্কাহীন জীবন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালার স্মরণকে মানসিক প্রশান্তি অর্জনের সর্বোত্তম পন্থা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

সূরা রা’দের ২৮ নম্বর আয়াতে বলা হচ্ছে, “জেনে রেখো, আল্লাহর জিকির বা স্মরণের মাধ্যমে অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।”একইভাবে সূরা ফাতহের ৪ নম্বর আয়াতে বলা মহান আল্লাহ বলেছেন, “তিনি মুমিনদের অন্তরে প্রশান্তি নাযিল করেন, যাতে তাদের ঈমানের সাথে আরও ঈমান বেড়ে যায়। ” কাজেই দেখা যাচ্ছে, মানসিক প্রশান্তি অর্জনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায় হচ্ছে আল্লাহর স্মরণ। অর্থাৎ আমাদের দেহ ও মন যিনি সৃষ্টি করেছেন মানসিক প্রশান্তি পেতে চাইলে কেবল তারই কাছে ধর্না দিতে হবে। পার্থিব জীবনে সেই ধর্না দেয়ার সবচেয়ে উত্তম স্থান হচ্ছে মসজিদ।

আফগানিস্তানের মাজার শরিফ শহরের কাবুদ জামে মসজিদ

মুসল্লিরা মসজিদের আধ্যাত্মিক পরিবেশের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নেয়ার পাশাপাশি বাইরের পার্থিব জগতের সঙ্গে সাময়িকভাবে হলেও সম্পর্ক ছিন্ন করেন। হাদিস শরিফে মুসল্লিদের মসজিদ গমনের অনেক ফজিলতের কথা বর্ণিত হয়েছে। বলা হয়েছে, মসজিদ মানুষকে হতাশা ও অবসাদগ্রস্ত অবস্থা থেকে মুক্তি দিয়ে মানুষের অন্তরে জীবনের ব্যাপারে আশা জাগিয়ে তোলে। মসজিদে গেলে যে শুধু পার্থিব জীবনে মানসিক প্রশান্তি অর্জিত হয় তাই নয় বরং নিয়মিত মসজিদে যাতায়াতকারী ব্যক্তির জন্য পরকালে জান্নাতে উৎকৃষ্ট আবাসস্থলেরও সুসংবাদ দেয়া হয়েছে।  হাদিসে এসেছে, যারা আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে মসজিদে গমন করে কিয়ামতের দিন তাদের মুখমণ্ডল হবে উজ্জ্বল, তাদের আমলনামা থাকবে গুনাহমুক্ত, বারযাখের জীবনে তারা থাকবে ফেরেশতাদের সহগামী এবং তাদের মাগফেরাতের জন্য ফেরেশতারা দোয়া করতে থাকবে।

আফগানিস্তানের মাজার শরিফ শহরের কাবুদ জামে মসজিদ

আল্লাহর ইবাদত, জিকির ও তাসবিহ-তাহলিল করার জন্য মসজিদের চেয়ে উত্তম স্থান আর নেই। এ সম্পর্কে রাসূলে আকরাম (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি মসজিদকে নিজের ঘর বানিয়ে নেবে আল্লাহ তায়ালা অন্তরের রোগসমূহ থেকে মুক্তি দিয়ে তাকে অনাবিল প্রশান্তি দানের নিশ্চয়তা দিয়েছেন। বুজুর্গানে দ্বীন বলেছেন, মসজিদে মুমিনের উপস্থিতি পানির মধ্যে মাছের জীবনযাপনের সমতুল্য। মসজিদ থেকে বেরিয়ে এলে মুমিনের অন্তর কষ্ট পেতে থাকে এবং আবার কখন মসজিদে ফিরে যাবে সেই চিন্তায় মন আনচান করতে থাকে। পানি থেকে মাছ তুলে আনা হলে তার পরিণতি সহজেই অনুমেয়।

রাসূলুল্লাহ (সা.) এ সম্পর্কে অন্য এক হাদিসে বলেছেন: একদল মানুষ আল্লাহর ঘর মসজিদে কুরআন তেলাওয়াত ও কুরআন শিক্ষা করেন। তাদের জন্য আল্লাহ তায়ালা রহমত ও প্রশান্তি বর্ষণ করেন।

পার্থিব জীবনের ঘাত প্রতিঘাত মানুষের অন্তরে নানা রকমের রোগের জন্ম দেয়। দুনিয়ার জীবনের এই কোলাহল ও মানসিক অশান্তি মোকাবিলা করার উপায় সম্পর্কে ইমাম জাফর সাদেক (আ.) বলেন, “যখনই দুনিয়ার জীবনের দুঃখ-কষ্ট তোমাদের স্পর্শ করবে তখন তোমরা ওজু করে মসজিদে প্রবেশ করে দু’রাকাত নামাজ আদায় করবে। নামাজ শেষে দু’হাত তুলে আল্লাহকে ডাকবে। আল্লাহ তোমাদের বলেই দিয়েছেন, ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে তাঁর সাহায্য চাও।”

আফগানিস্তানের মাজার শরিফ শহরের কাবুদ জামে মসজিদ

আসরের এ পর্যায়ে আমরা আফগানিস্তানের মাজার শরিফ শহরে অবস্থিত কাবুদ জামে মসজিদকে আপনাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব। মাজার শরিফ শহরের অধিবাসীদের অনেকে বিশ্বাস করেন আমিরুল মু’মিনিন হযরত আলী (আ.)কে এই শহরে দাফন করা হয়েছে। যে স্থানে তাঁর মরদেহ দাফন করা হয়েছে বলে মনে করা হয় সেখানেই স্থাপিত হয়েছে কাবুদ জামে মসজিদ। আর হযরত আলী (আ.)’র মাজার রয়েছে বলে এই শহরের নাম মাজার শরিফ। কিন্তু নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক বর্ণনা মতে, হযরত আলী (আ.) বর্তমান ইরাকের নাজাফ শহরে শাহাদাত বরণ করেন এবং তাকে সেখানেই দাফন করা হয়। আফগানিস্তানের মাজার শরীফ শহরে যার কবর রয়েছে তিনি হয়ত হযরত আলী (আ.)’র কোনো বংশধর হবেন।

জনশ্রুতি রয়েছে, বলখের অধিবাসীরা সেখানকার বিখ্যাত ‘তাল আলী’ টিলার উপর রুপার তৈরি তালাসহ একটি লোহার সিন্দুক খুঁজে পায়। সিন্দুকের ভেতর পাওয়া যায় হরিণের চামড়ায় আবৃত একটি কুরআন শরিফ এবং পাথরের হাতলবিশিষ্ট একটি তলোয়ার। ওই পাথরের উপর লেখা ছিল “হাযা কাবরে ওলিউল্লাহ আলী আসাদুল্লাহ” অর্থাৎ “এখানেই রয়েছে আল্লাহর ওলি আলী আসাদুল্লাহর কবর।”খোরাসানের তৎকালীন শাসক সুলতান সিনজারের দরবারে এ খবর পৌঁছালে তিনি নিজে বলখ শহর পরিদর্শনে আসেন এবং স্থানীয় জনগণের মাঝে ৫০ হাজার দিনার বিলিয়ে দেন। তার নির্দেশে সিন্দুকটি যেখানে পাওয়া যায় সেখানেই এটিকে মাটিচাপা দিয়ে রোদে শুকানো ইট দিয়ে একটি ছোট মাজার নির্মিত হয়।  কিন্তু পরবর্তীতে চেঙ্গিস খানের আক্রমণে মাজারটি ধ্বংস হয়ে যায় এবং ওই স্থান তার আগের নাম অর্থাৎ ‘তাল আলী’ ধারণ করে।

আফগানিস্তানের মাজার শরিফ শহরের কাবুদ জামে মসজিদ

ফার্সি ৮৫৯ সালে তৎকালীন সুলতান হোসেইন বাইকারা এমন একটি দলিল খুঁজে পান যাতে আগের ঘটনাটি বর্ণিত রয়েছে। তদন্ত করে দেখা যায় তাল আলী এলাকার মাটির নীচে এরকম একটি সিন্দুক রয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সুলতানে নির্দেশে সেখানে একটি মাজার ও মসজিদ নির্মিত হয়। মাজারের চারপাশে বসতি ও বাজার গড়ে তোলা হয়। বিভিন্ন স্থান থেকে জনগণ এসে এখানে বসবাস করা শুরু করেন। ধীরে ধীরে শহরটি বিস্তৃতি লাভ করে এবং ‘মাজার শরিফ’ শহর হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে।

আফগানিস্তানের মাজার শরিফ শহরের কাবুদ জামে মসজিদ

শত শত বছর ধরে এই মসজিদকে নানা চড়াই-উৎরাই পেরুতে হয়েছে। বলখের শাসকরা ধীরে ধীরে এই মসজিদের আয়তন ও শ্রীবৃদ্ধি করেছেন। শেইবানি রাজবংশের এগারতম শাসক ‘আব্দুলমুমিন খান উজবেক’ মসজিদের উপর বিশাল একটি গম্বুজ নির্মণ করেন। পরবর্তীতে ‘জানি’ রাজবংশের দ্বিতীয় শাসক মোহাম্মাদ খান মসজিদটি পুনর্নির্মাণ করে এর আশপাশে নানারকমের ফলের বাগান নির্মাণ করেন।

কাবুদ মসজিদের বর্তমান ভবন নির্মিত হয় ফার্সি ১২৮৭ সালে আমির আলাম খানের শাসনামলে। সর্বশেষ ফার্সি ১৩১৯ সালে অর্থাৎ ১৯৪১ সালে সর্বশেষ আফগান বাদশাহ মোহাম্মাদ জহির শাহ মসজিদটির সংস্কার করেন। মাজার শরিফ শহরের কাবুদ মসজিদে প্রবেশের জন্য রয়েছে বিশাল চারটি ফটক। এসব ফটক দিয়ে মসজিদের চারপাশের চারটি এলাকায় প্রবেশ করা যায়। কাবুদ মসজিদের সঙ্গে রয়েছে একটি মাদ্রাসা যেখানে শত শত ছাত্র দ্বীনি শিক্ষা গ্রহণ করেন। এ ছাড়া, ফার্সি ১৩৬৫ সালে এই মসজিদে একটি কিতাবখানা বা লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠিত হয়। #

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ/ ১৯

খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন

ট্যাগ

মন্তব্য