২০১৮-১০-২৩ ২০:০৩ বাংলাদেশ সময়

যে মসজিদ মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি শক্তিশালী করতে যত বেশি ভূমিকা রাখতে পারে সে মসজিদ আল্লাহর তত বেশি প্রিয়।

একই মসজিদের জামায়াতে বিভিন্ন মাজহাবের মুসল্লিদের অংশগ্রহণ প্রমাণ করে, মাজহাবগত মতপার্থক্য মুসলমানদের মধ্যকার ঐক্য ও সংহতিতে ফাটল ধরাতে পারেনি। আজকের আসরের প্রথমাংশে মুসলমানদের মধ্যকার এই ঐক্যের গুরুত্ব তুলে ধরব।

গত প্রায় দেড় বছর ধরে প্রচারিত এ অনুষ্ঠানে আমরা বলেছি, ইবাদত বন্দেগির মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের স্থান মসজিদে এক সময় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়ার পাশাপাশি সামরিক অভিযান সম্পর্কেও সলাপরামর্শ করা হতো। মসজিদ ছিল মুসলিম সমাজের সকল কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র। বর্তমানে নামাজ আদায় ও ওয়াজমাহফিল ছাড়া মসজিদ তার অবশিষ্ট ভূমিকাগুলো পালন করতে পারছে না। অবশ্য মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি ধরে রাখার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে মসজিদের ভূমিকা এখনো অপরিসীম। একটি সমাজ ও রাষ্ট্রের টিকে থাকার জন্য এই ঐক্য ও সংহতির কোনো বিকল্প নেই। সমাজের নানা শ্রেণি ও পেশার এবং সব রকম বয়সের মানুষ একত্রিত হয় আল্লাহর ইবাদত করার উদ্দেশ্যে। তারা সব ভেদাভেদ ভুলে পরস্পরের কাঁধে কাঁধ রেখে এক কাতারে সারিবদ্ধভাবে নামাজে দাঁড়িয়ে যায়।

ইসলামে মুসলমানদের মধ্যে ঐক্যের ওপর এত বেশি জোর দেয়া হয়েছে যে, আল্লাহ তায়ালা তাঁর রাসূলকে সেই মসজিদে যেতে নিষেধ করেছেন যে মসজিদ মুসলমানদের মধ্যকার ঐক্যের ব্যাঘাত ঘটায়। এ কারণে মহানবী (সা.) যখন বুঝতে পারলেন মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য বিনষ্ট করার উদ্দেশ্যে ‘যেরার’ মসজিদ তৈরি করা হয়েছে তখন তিনি এটি আগুন জ্বালিয়ে ধ্বংস করে দেয়ার নির্দেশ দেন। বর্তমান যুগেও শিয়া-সুন্নি নির্বিশেষে সব মুসলিম মাজহাবের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ হচ্ছে। আয়াতুল্লাহ মুসা সাদরের জীবনে এ বাস্তবতা খুঁজে পাওয়া যায়। ১৯৮৭ সালে এই শ্রদ্ধেয় আলেমকে অপহরণ করা হয় এবং আজ পর্যন্ত তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। তিনি শুধু মুসলমানদের মধ্যে নয় সেইসঙ্গে সব ইব্রাহিমি ধর্মের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন।  

এক কাতারে শিয়া-সুন্নির জামায়াতের নামাজ

ইসলামি বিপ্লব বিজয়ের পর ইরানের যেসব শহরে শিয়া ও সুন্নি মুসলমান বসবাস করেন সেসব শহরে ঐক্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অভূতপূর্ব উদ্যোগ নেয়া হয়। দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় যাহেদান শহরের মুসলমানরা এক শুক্রবার একজন শিয়া আলেমের ইমামতিতে জুমার নামাজ আদায় করতেন এবং পরবর্তী শুক্রবার একজন সুন্নি আলেমের ইমামতিতে এই সাপ্তাহিক নামাজ আদায় করতেন। প্রথমদিকে এই নামাজের ইমামতি করেছেন মরহুম আয়াতুল্লাহ কাফআমি ও মরহুম মৌলভি আব্দুলআজিজ। শিয়া ও সুন্নি মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সেটি ছিল একটি চমৎকার উদ্যোগ। পরস্পরের মসজিদে এবং ইমামতিতে নামাজ আদায় করার সময় তারা ফিকাহ সংক্রান্ত মতপার্থক্য নিয়ে মাথা ঘামাতেন না।

এক সাথে শিয়া-সুন্নির জামায়াতের নামাজ

এ সম্পর্কে ইমাম সাদেক (আ.) তার সব অনুসারীকে বলেছেন: “যে ব্যক্তি সুন্নি ভাইদের সঙ্গে জামায়াতের প্রথম কাতারে নামাজ আদায় করতে দাঁড়াল সে যেন আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করার উদ্দেশ্যে খাপ থেকে নিজের তরবারি বের করল।” ইমাম সাদেকের এই বক্তব্যের অর্থ পরিষ্কার। মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার মর্যাদা শত্রুর বিরুদ্ধে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।

ইরানের ‘খাশ’ জামে মসজিদ

ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় নগরী মাশহাদে সুন্নি মুসলমানদের চারটি বৃহৎ জুমার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। এরমধ্যে সবচেয়ে বড় জামায়াতটি হয় ‘ওয়াহদাত’ মহল্লায় অবস্থিত আল-ফারুক মসজিদে। এই মহল্লায় রয়েছে দু’টি সুন্নি মসজিদ ও একটি শিয়া মসজিদ। সুন্নি মসজিদ দু’টির নাম আল-ফারুক ও আলী ইবনে আবিতালেব মসজিদ। আর শিয়া মসজিদের নাম আবুলফাজলি। বিভিন্ন ধর্মীয় উপলক্ষে এই মহল্লার মুসলমানরা পরস্পরের নামাজের জামায়াতে শরীক হন। এর ফলে যেসব উগ্রবাদী লোক শিয়া ও সুন্নি মুসলমানদের মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি করতে চায় তাদের চক্রান্ত নস্যাত হয়ে যায়।

ইরানের ‘খাশ’ জামে মসজিদ

যদি এক মাজহাবের অনুসারী মুসলমানরা অন্য মাজহাবের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ না করেন তাহলে তারা অন্যান্য মাজহাবের চিন্তাধারার সঙ্গে পরিচিত হতে পারবেন না। ফলে পরস্পরের মাজহাব সম্পর্কে ভুল ধারণা ও অবিশ্বাস তৈরি হবে যার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হবে মতবিরোধ ও সংঘর্ষ। কিন্তু শিয়া ও সুন্নি মুসলমানদের মধ্যে পরস্পরের মসজিদে নামাজ আদায়ের এই সংস্কৃতি তাদের মধ্যকার সব দূরত্বকে ম্লান করে দেয়।

ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের রাজধানী তেহরানে সুন্নি মুসলমানদের অন্তত ১০০টি মসজিদ রয়েছে। এসব মসজিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে সাদেকিয়ে মসজিদ, আন-নাবী মসজিদ এবং তেহরানপার্স মসজিদ। এসব মসজিদে শত শত সুন্নি মুসলমান জুমা ও ঈদের নামাজ আদায় করেন। 

সুন্নি মুসলমানদের সাদেকিয়ে মসজিদের ইমাম মামুস্তা আজিজ বাবায়ি শিয়া-সুন্নি ঐক্য সম্পর্কে বলেন: “আমি ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় আরদাবিল প্রদেশের খালখাল এলাকার একটি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছি। আমার গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ সুন্নি হওয়া সত্ত্বেও শিয়াদের সঙ্গে আমাদের কোনো শত্রুতা ছিল না বরং সব সময় আমাদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ পরিবেশ বজায় ছিল। কিন্তু এখন ইসলামের শত্রুরা শিয়া ও সুন্নি মুসলমানদের মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টির জন্য উঠেপড়ে লেগেছে।”

মামুস্তা আজিজ বাবায়ি তেহরানের সুন্নি মসজিদ এবং এমনকি অনেক শিয়া মসজিদেও প্রায় দুই হাজার বার খুতবা দিয়েছেন। ইরানের অন্যতম ধর্মীয় নগরী কোমের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও ছয় বছর ধরে ছাত্র পড়িয়েছেন তিনি। 

ইরানের ‘খাশ’ জামে মসজিদের মিনার

শিয়া ও সুন্নি মুসলমানদের মধ্যে পরস্পরের ধর্মীয় বিশ্বাস সম্পর্কে যেসব গুজব রয়েছে সে সম্পর্কে এই আলেমে দ্বীন বলেন: “আমাকে সৌদি আরবের হাম্বলি ফেকাহর অনুসারী আলেমরা বহুবার জিজ্ঞাসা করেছেন, ইরানে নাকি শিয়াদের আলাদা কুরআন শরিফ রয়েছে? এ র প্রশ্নের উত্তরে আমি তাদের বহুবার বলেছি, তোমাদের মক্কা ও মদীনায় যে কুরআন ছাপা হয় ইরানে ঠিক একই কুরআন রয়েছে। কিন্তু আমার মুখ থেকে শুনেও তারা এই সত্যটি বিশ্বাস করতে চান না। এখান থেকে বোঝা যায়, ইসলামের বিভিন্ন মাজহাবের ব্যাপারে শত্রুরা কি পরিমাণ অপপ্রচার চালাচ্ছে।

আসরের এ পর্যায়ে আমরা ইরানের সিস্তান ও বালুচিস্তান প্রদেশের ‘খাশ’ মসজিদকে আপনাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব।  প্রদেশের খাশ শহরে অবস্থিত এই মসজিদ শিয়া ও সুন্নি মুসলমানদের মধ্যে ঐক্যের প্রতীক হিসেবে পরিচিত। শহরের বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তিরা বলেন, এখানে শুরু থেকেই দুই মাজহাবের মুসল্লিরা একত্রে নামাজ আদায় করতেন। খাশ শহরের জুমার নামাজের খতিব হুজ্জাতুল ইসলাম মোহাম্মাদ হোসেইন মিরি বলেছেন, মসজিদটিতে এখনো শিয়া ও সুন্নি মুসলমানরা একসঙ্গে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন।

ফার্সি ১৩০৭ সালে ২৪৭ বর্গমিটার জমির ওপর খাশ মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। মসজিদটিতে রয়েছে নামাজ আদায়ের জন্য আয়তাকার বিশাল একটি হল। চারদিকের দেয়াল বাদ দিয়ে এর ভেতরে রয়েছে ১৬টি বিশাল স্তম্ভ।  খাশ মসজিদে রয়েছে একটি সুদর্শন মিনার। মিনারের বহিরাবরণ টাইলস দিয়ে আবৃত এবং এর উপরে সুন্দর কারুকাজ করে কালিমার বাণী- লাইলাহা ইল্লাহল্লাহ লেখা রয়েছে। 

তো,বন্ধুরা! এরইসঙ্গে শেষ করছি ধরণীর বেহেশত মসজিদ শীর্ষক আলোচনার শেষ পর্ব। এতদিন এ আসরে যারা সঙ্গ দিয়েছেন তাদের সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। অনুষ্ঠানটি আপনাদের কেমন লেগেছে তা লিখে জানাতে ভুলবেন না।#

 

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ/ ২৩

খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন

মন্তব্য