২০১৮-১০-২৭ ১৮:৪৫ বাংলাদেশ সময়

সুস্থ থাকতে হলে প্রয়োজন বহু বিষয় জানা এবং মানা। বিশেষ করে একটি সুস্থ পরিবার কী করে গড়ে তোলা যায় কিংবা অন্যভাবে বলা চলে পারিবারিক সুস্থতার জন্য কী কী কাজ করা প্রয়োজন-সেসব বিষয় নিয়ে আমরা 'সুস্থ পরিবার' নামে নতুন এই ধারাবাহিকের আয়োজন করেছি।

বিগত দুই আসরে আমরা নিরাপদ খাবারের গুরুত্ব নিয়ে কথা বলেছি। আজকের আসরে আমরা কথা বলার চেষ্টা করবো পরিবারের সুস্থতা রক্ষায় শাক-সবজি ও ফলফলাদির প্রভাব নিয়ে।

ফল এবং সবজি হলো পুষ্টির সর্বোত্তম প্রাকৃতিক উপায়। সুতরাং পরিবারের দৈনন্দিন খাবারের টেবিলে অবশ্যই এই দুটি জিনিসের উপস্থিতি থাকা চাই। সবজি এবং ফলে বিচিত্র ভিটামিন থাকায়,অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকায়,ফাইবার থাকার পাশাপাশি কম ক্যালরি ও চর্বি কম থাকায় বেশ কিছু রোগ-ব্যাধি থেকে মানুষকে রক্ষা করে। যেমন বহু রকমের ক্যান্সার থেকে মুক্ত রাখে,হৃদরোগ থেকে সুরক্ষা দেয়,ডায়াবেটিস হওয়ার আশঙ্কা কমে যায়,মোটা হয়ে যাওয়া রোধ করে। শুধু তাই এইসব রোগ শরীরে আর বাড়তে দেয় না।কিন্তু কথা হলো দৈনিক কতটুকু ফল খাওয়া উচিত-সেটা জানা বেশ গুরুত্বপূর্ণ।বলা হয়ে থাকে যে বয়স্কদের পক্ষে দৈনিক দুই থেকে চার ইউনিট ফল খাওয়া যেতে পারে। তবে বিষয়টি নির্ভর করে ব্যক্তির বয়স,নারী এবং পুরুষভেদে তাদের শারীরিক পরিশ্রমের পরিমাণের ওপর।

এই যে ইউনিটের কথা বলা হলো সেই ইউনিট বলতে বোঝায় মাঝারি সাইজের একটি ফল কিংবা আধা গ্লাস আঙুর বা এ জাতীয় দানাদার ফলকে।আধা গ্লাস ফ্রেশ ফলের জুস কিংবা একটি গ্লাসের চার ভাগের এক ভাগ পরিমাণ শুকনো ফলও এক ইউনিট হিসেবে গণ্য।তবে মনে রাখতে হবে ফ্রেশ জুসেও তাজা ফলের তুলনায় ফাইবারের পরিমাণ কম থাকে। ফাইবারযুক্ত ফ্রেশ ফল বা সবজি খেলে অল্প খাবারেই চাহিদা মিটে যায়। সুতরাং যারা শরীরের ওজন কমাতে আগ্রহী তাদের উচিত জুসের পরিবর্তে ফ্রেশ ফল খাওয়া।মনে রাখতে হবে ফলও যদি শরীরের চাহিদার চেয়ে বেশি পরিমাণে খাওয়া হয় তাহলেও মোটা হয়ে যাবার আশংকা থেকে যায়।

শসা, লেটুস, টমেটো, বাঁধা কপি, গাঁজর,কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, বিচিত্র সবজি, কারাফস, রিভস, ভেন্ডি বা ঢেঁড়স, বেগুন এবং মাশরুমও সবজি গ্রুপেই পড়ে।রিভসকে বাংলায় রেউচিনি বলে। ইংরেজিতে এর প্রতিশব্দ হলো রুবার্ব। আর কারাফস হলো সেলারি। দুটোই আঁশযুক্ত দুটি সবজি। এইসব সবজি দৈনিক খাওয়া উচিত। বয়স্কদের উচিত দৈনিক অন্তত তিন থেকে পাঁচ ইউনিট সবজি খাওয়া। ফ্রেশ সবজি এক গ্লাসে এক ইউনিট। রান্না করা সবজি আধা গ্লাসে এক ইউনিট আর বিভিন্ন সবজির জুস আধা গ্লাসে এক ইউনিট। প্রয়োজনীয় পরিমাণ ফল ও সবজি না খেলে   ক্রনিক ও অসংক্রামক ব্যাধি দেখা দেওয়া আশংকা বেড়ে যায়। বলা বাহুল্য পর্যাপ্ত সবজি ও ফল না খাওয়ার কারণে বছরে বহু মানুষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে কিংবা শারীরিকভাবে অক্ষম হয়ে পড়ে।

ফল এবং শাকসবজিতে বিদ্যমান ফাইবার রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে আনে যার ফলে হার্ট অ্যাটাক কিংবা ব্রেইন স্ট্রোকের পরিমাণ কমে যায়। পেটের বিচিত্র রোগ প্রতিরোধের ক্ষেত্রেও ফাইবারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ফাইবারযুক্ত খাবার খেলে অল্প খাবারেই পেট ভর্তি হয়ে যাওয়ার মতো অনুভূতি হয়। ফলে কম ক্যালোরিতেই খাবারের চাহিদা মিটে যায়। ক্যালোরি কম নিতে হয় এবং ওজন কমাতে সাহায্য করে। সেইসঙ্গে খাবার গ্রহণের পর রক্তের গ্লুকোজ বৃদ্ধির পথে বাধার সৃষ্টি করে। এ কারণে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে কিংবা ডায়াবেটিস বৃদ্ধি রোধে ফাইবার চমৎকার কাজ করে। পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে ফাইবারের সঙ্গে যথেষ্ট পরিমাণ পানি কিংবা পানীয় দ্রব্য খেলে ফাইবারের প্রভাব ও কার্যক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পায়।

সবজি এবং ফলের ইতিবাচক দিক নিয়ে যা বললাম সেসবের বাইরেও জেনে রাখা ভালো যে, সবজি এবং ফলে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ পটাশিয়াম, ভিটামিন-সি এবং ফলিক অ্যাসিড। কলা, আলু বোখারা, পিস, খুবানি বা অ্যাপ্রিকট, মাল্টার জুস, আলু, বিট পাতা, সয়া, টমেটো এবং টমেটোর জুস, পালং শাক ও বরবটির মধ্যে প্রচুর পরিমাণ পটাশিয়াম রয়েছে। উচ্চরক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে এগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। আরও কিছু ফল ও সবজি রয়েছে যেগুলোতে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন-সি আছে। যেমন কাঁচামরিচ, ব্রোকোলি, সবুজ পাতার মতো বিভিন্ন সবজি, কিভি, বাঁধাকপি, তলেবি বা সবুজ বাঙ্গি, স্ট্রবেরি, পালং শাক ইত্যাদি। ভিটামিন-সি আমাদের দেহের অন্যতম মৌলিক একটি অ্যান্টি অক্সিডেন্ট। শরীরের বৃদ্ধি এবং দৈহিক গঠনে এই ভিটামিন-সি'র ভূমিকা খুবই প্রভাবশালী।

ভিটামিন-সি আমাদের দেহের ক্ষত কিংবা কাটাছেঁড়া উপশমে যেমন কার্যকর তেমনি দাঁতের সুরক্ষা ও মাড়ির সুস্থতার ক্ষেত্রেও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। শাকসবজিতে যে ফলিক অ্যাসিড রয়েছে সেগুলোও আমাদের দেহে বহমান রক্তের লাল কণিকা বা সেল গঠনে সাহায্য করে। সন্তান সম্ভবা মহিলাদের জন্য ফলিক অ্যাসিড খুবই জরুরি। সবজি এবং ফল-ফলাদি খাওয়ার উপকারী দিক নিয়ে তো বললাম। তবে খেয়াল রাখতে হবে এগুলো খাওয়ার আগে অবশ্যই ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে। কারণ হলো ফল বা সবজিতে সার এবং কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। সেসবের অস্তিত্ব যদি থেকে যায় তাহলে সেগুলো খাওয়ার ফলে অন্ত্রনালীর বিভিন্ন রোগ যেমন দেখা দিতে পারে তেমনি ক্যানসার হবার আশংকাও বেড়ে যায়।

জীবাণু থেকে যাওয়ার পরিণতি সম্পর্কে বলছিলাম। সুতরাং খাওয়ার আগে ফল বা সবজি ভালো করে ধুয়ে নিতে যেন ভুল না হয়। ধোয়ার ক্ষেত্রেও খেয়াল রাখতে হবে বহমান পানিতে যেন ধোয়া হয়। কোনোভাবেই সাবান বা ডিজারজেন্ট কিংবা রাসায়নিক কোনো পদার্থ যেন ব্যবহার করা না হয়। কেননা তাতে রাসায়নিক প্রভাব অবশিষ্ট থেকে যায়। ব্যাকটেরিয়ার জীবাণু দূর করার জন্য ফল বা শাকসবজিকে ভালো করে ধোয়ার পর জীবাণু নাশক তরল জলে ফেলা ভালো। দশ লিটারের একটি পাত্রে এক চা চামচ পেরকোলোরিন মিশিয়ে সবজিগুলোকে অন্তত পাঁচ ৭ মিনিট ভিজিয়ে রাখলে জীবাণু নষ্ট হয়ে যাবে। #

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/২৭

খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন

ট্যাগ

মন্তব্য