২০১৮-১১-০৩ ১৮:০৬ বাংলাদেশ সময়

বিগত আসরগুলোতে আমরা নিরাপদ খাবারের গুরুত্ব এবং পরিবারের সুস্থতা রক্ষায় শাক-সব্জি ও ফলফলাদির প্রভাব নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করেছি। আশা করি আপনাদের উপকারে এসে থাকবে। আজকের আসরে আমরা কথা বলার চেষ্টা করবো পরিবারের সুস্থতার ক্ষেত্রে দুগ্ধজাত পণ্য ব্যবহারের প্রভাব ও গুরুত্ব সম্পর্কে।

আমরা আসলে দৈনিক যত খাবার গ্রহণ করি সেসবের মধ্যে দুধ কিংবা দুধ দিয়ে তৈরি বিভিন্ন খাবারের আলাদা এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে। দুগ্ধ পণ্য ব্যবহারের কারণে আমাদের শরীর বিচিত্র রোগ-ব্যাধি থেকে দূরে থাকে। পুষ্টিবিজ্ঞানীদের পরামর্শ হলো নিজ নিজ পরিবারের জন্য সবসময় প্রয়োজনীয় নিরাপদ খাবারের পাশাপাশি অবশ্যই ফল-ফলাদি, শাক-সব্জি এবং দুধ ও দুধ দিয়ে তৈরি বিভিন্ন খাবার খাওয়া উচিত। দুধ অন্যতম আদর্শ একটি খাবার আমাদের জন্য। কেননা এই দুধে বিচিত্র প্রোটিনের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রকার চর্বি, আমোদের শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন ধরনের লবন সেইসঙ্গে ফসফরাস ও ক্যালিসিয়াম, বিচিত্র ভিটামিন এবং শরীর যেসব অ্যামিনো অ্যাসিড তৈরি করতে সক্ষম নয় সেইসব প্রকার অ্যামিনো অ্যাসিড রয়েছে।

দুগ্ধজাত খাদ্য সামগ্রি বিশেষ করে দুধ ক্যালয়িামের একটি সমৃদ্ধ উৎস। আর ক্যালসিয়াম আমাদের হাড় এবং দাঁতের গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ক্যালসিয়ামের উপকারিতা নিয়ে সর্বসাম্প্রতিক যে গবেষণা হয়েছে তাতে আমাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ক্যালসিয়ামের বিশেষ গুরুত্বের কথা বলা হয়েছে। ইতোপূর্বে ক্যালসিয়ামের এতো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা এতোটা স্পষ্ট করে আর বলা হয় নি। এই গবেষণায় প্রমাণ হয়েছে,দুধের ক্যালসিয়াম অ্যানার্জি মেটাবোলিজমের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং মোটা বা স্থূলতা হ্রাস করে। আমেরিকায় এ নিয়ে একটি নিরীক্ষামূলক গবেষণা হয়েছে। মোটা বা স্থূলতায় আক্রান্তদের মধ্যে যারা ডায়েট করে তাদেরকে দৈনিক চার শ থেকে এক হাজার মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম বেশি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তাদের ক্যালোরি কমানো হয় নি। এভাবে এক বছর পর দেখা গেছে তাদের শরীরের চর্বি শতকরা ৯ দশমিক ৪ ভাগ কমে গেছে।

ক্যালসিয়াম যদিও অন্যান্য খাবার থেকেও আসে তবে শরীরের প্রয়োজনীয় ক্যালসিয়ামের সবচেয়ে উত্তম উৎস হলো দুধ। আমেরিকার শিশু স্বাস্থ্য বিষয়ক জাতীয় সংস্থার পরিচালক আলেক্সান্দার দুয়ানের গবেষণা অনুযায়ী দৈনিক খাবারে দুধের উপস্থিতি ছাড়া মানব দেহের প্রয়োজনীয় ক্যালসিয়ামর পরিমাণ নিশ্চিত প্রায় অসম্ভব। বিশেষ করে শিশুদের হাড়ের সুস্থতায় দুধের ভূমিকা অপরিসীম।একইসঙ্গে ব্রেইনের সুস্থতায় দুধ ও দুধের তৈরি পণ্য সামগ্রি এবং ফসফরাস,ক্যালসিয়াম, আয়রন, সেলেনিউম বা দস্তা, ম্যাঙ্গানিজসহ আরও বহু উপাদান কমে যাওয়া রোধ করার ক্ষেত্রে দুধের ভূমিকা অনন্য। ব্রেইনের কার্যক্ষমতা নষ্ট হওয়া রোধ করতে এবং মানসিক বিচিত্র সমস্যা রোধ করার ক্ষেত্রেও দুধের ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে।

পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে চার থেকে আট বছরের শিশুদের দৈনিক আট শ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম প্রয়োজন। তেরো থেকে আঠারো বছরের শিশুদের জন্য প্রয়োজন দৈনিক তেরো শ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম। উনিশ থেকে পঞ্চাশ বছরের তরুণদের প্রয়োজন দৈনিক এক হাজার মিলিগ্রাম আর একান্ন থেকে বেশি বয়সী মানুষের দৈনিক তেরো শ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম প্রয়োজন। মহিলাদের ক্ষেত্রে হাড় ক্ষয় জুনত সমস্যা একটু বেশি দেখা দেয় বলে তাদের দুধ বা দুধের তৈরি খাবার দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় রাখার ব্যাপারে খুবই সচেতন থাকতে হবে।দীর্ঘ সময় ধরে দুধ বা দুগ্ধজাত খাবার দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় না রাখা হলে ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স বা ল্যাকটোজ সহ্য করতে না পারা সংক্রান্ত সমস্যা দেখা দিতে পারে।

এই সমস্যা যাদের রয়েছে তাদের দেহে ল্যাকটোজ এনজাইমের ঘাটতি কিংবা অভাব থাকায় দুধের মধ্যে যে গ্লুকোজ রয়েছে তা সহ্য করতে পারে না। সে কারণে দুধ খেলেই তাদের ডায়রিয়া দেখা দেয়,হার্টের সমস্যা দেখা দেয় কিংবা পেটে গ্যাস হয়ে ফাঁপা সমস্যা দেখা দিতে পারে। এ কারণে তাদের ক্যালসিয়াম নেয়ার সর্বোত্তম উপায় হলো দুধ দিয়ে ল্যাকটোজ অ্যানজাইম ট্যাবলেট খাওয়া কিংবা ল্যাকটোজশূন্য দুধ খাওয়া।দুধে যেহেতু শরীরের জন্য ভারসাম্য রক্ষাকারী প্রায় সকল উপাদানই রয়েছে,সেজন্য দুধে রয়েছে দেহের সর্বপ্রকার দূষণ কিংবা ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে লড়বার মতো বিচিত্র মাইক্রোঅর্গানিজমের সক্রিয় হবার উপাদান।

এতোক্ষণ আমরা যে দুধের গুণাগুণ নিয়ে কথা বললাম,সেই দুধ অবশ্যই হতে হবে দূষণমুক্ত।কীভাবে দুধকে দূষণমুক্ত রাখা যাবে? দুটি উপায় রয়েছে। প্রথম উপায়টি হলো পাস্তুরিত করে সংরক্ষণ করা। এজন্য দুধকে ষাট ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় ত্রিশ মিনিটের মতো রাখা হয়। এরফলে সকল প্রকার ব্যাকটেরিয়া নষ্ট হয়ে যায়। তবে ব্যাকটেরিয়ার জীবাণুগুলো থেকে যায়। সেজন্য পাস্তুরিত দুধকে কমপক্ষে তিন থেকে চার দিন ফ্রিজে রাখা দরকার। এর বেশি রাখলে আবার দুধ নষ্ট হয়ে যেতে পারে।দ্বিতীয় উপায়টি হলো স্টেরিলাইজেশনের মাধ্যমে দুধকে জীবাণুমুক্ত করা।এই পদ্ধতিতে ১৩০ সেন্ট্রিগ্রেড তাপমাত্রায় দুধকে জ্বাল দেওয়ার কারণে দুধের সকল জীবাণুমুক্ত করা যায়।

এই পদ্ধতিতে দুধ পাস্তুরিত করার পর প্যাকিং করা হলে আর কোনো প্রিজারভেটিভের প্রয়োজন পড়ে না।ফলে প্যাকেটের মুখ খোলা না হলে তাকে ফ্রিজে রাখার দরকার পড়ে না। তবে মুখ খোলা হলে অবশ্যই বাহাত্তর ঘণ্টার মধ্যে ওই দুধ খেয়ে ফেলতে হবে।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/ ৩

খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন 

ট্যাগ

মন্তব্য