২০১৮-১১-১২ ২০:৩৪ বাংলাদেশ সময়

'ইসলাম ও শিশু অধিকার' শীর্ষক ধারাবাহিকের গত আসরে আমরা বলেছি, গোটা বিশ্বেই শিশু অধিকার ইস্যুতে সচেতনতা বেড়েছে।

তবে এ পর্যায়ে আসতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। ইতিহাস ঘাঁটলেই এর প্রমাণ পাওয়া যায়। আমেরিকার বিখ্যাত লেখক লুইড ডিমাস তার 'দ্য হিসটোরি অব দ্যা চাইল্ডহুড'শীর্ষক বইয়ে শিশুর সঙ্গে আচরণের ইতিহাসকে ছয় পর্বে ভাগ করেছেন। গত আসরে আমরা তিনটি পর্ব নিয়ে আলোচনা করেছি। এই তিনটি পর্ব হচ্ছে- 'শিশু হত্যা পর্ব', 'শিশুদের ওপর শারিরীক নির্যাতন ও অপমানের পর্ব' এবং 'শিশু সংক্রান্ত নেতিবাচক ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার পর্ব'। আজকের আসরে আমরা শিশুদের সঙ্গে আচরণের ইতিহাসের অন্য চারটি পর্ব নিয়ে আলোচনা করবো।

শিশুদের সঙ্গে আচরণের ইতিহাসের ছয়টি পর্বের চতুর্থ পর্বটি হচ্ছে,সহনশীলতার পর্ব। সতের ও আঠার শতক এ পর্বের অন্তর্ভুক্ত। এ পর্বে এসে শিশুদের সঙ্গে কঠোর আচরণ বন্ধ হতে থাকে। বাবা-মা এটা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে,শিশুরা জন্মগতভাবে শয়তানি বৈশিষ্ট্যের অধিকারী নয়। বড়রা চাইলেই কোমলমতি শিশুদের সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারে। নির্যাতন ও অপমানের পরিবর্তে ভালো আচরণের মাধ্যমে শিশুকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। চিন্তাগত ক্ষেত্রে এই বাবা-মা'র মধ্যে এই পরিবর্তন, শিশুর মৃত্যুহার কমানোর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা গেছে। ইতিহাসের এই পর্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, পরিবার ও সমাজে শিশু সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন। তবে এর অর্থ এই নয় যে,এই পর্বে সব মানুষ পুরোণো ধারণা থেকে সরে এসেছিল এবং সহিংসতা বন্ধ করে দিয়েছিল। কারণ বাস্তবতা হচ্ছে,বর্তমান আধুনিক যুগে শিশুর ওপর নির্যাতন পুরোপুরি বন্ধ হয় নি। ইতিহাসের এ পর্বটি হচ্ছে শিশুদের ওপর নির্যাতন বন্ধের সূচনাপর্ব।

শিশুদের সঙ্গে আচরণের ইতিহাসের পঞ্চম পর্বটি হচ্ছে শিক্ষা ব্যবস্থায় শিশু অধিকার ইস্যুর সংযোজন। ১৯ শতক থেকে বিংশ শতাব্দির মাঝামাঝি পর্যন্ত সময়কালটি এই পর্বের অন্তর্ভুক্ত। এই পর্বে এসে অনেকেই জোরালোভাবে বিশ্বাস করা শুরু করেন যে,নির্যাতন না করেই শিক্ষা-প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিশুদেরকে সঠিক পথে পরিচালনা করা সম্ভব। ওয়াটসন ও ফ্রয়েডসহ বিশ্বের অনেক মনোবিজ্ঞানী শিশু লালন-পালনের ক্ষেত্রে নির্যাতনের পরিবর্তে শিক্ষা-প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেন। উনিশ ও বিশ শতকের নানা পরিবর্তনের সঙ্গে মানবাধিকার ও শিশু অধিকার ইস্যুতেও সমাজ ও রাষ্ট্রে পরিবর্তন সাধিত হয় এই পর্বে। এই পর্যায়ে এসে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্রসহ বিভিন্ন সনদ পাস হয়। এসব সনদে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে,

শিশুদেরকে মায়া-মমতা দিয়ে শান্তিপূর্ণ পারিবারিক পরিবেশে মানুষ করতে হবে যাতে ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে সফল হতে পারে। এর ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আইনেও শিশু অধিকার গুরুত্ব পেতে শুরু করে।

শিশুদের সঙ্গে আচরণের ইতিহাসের ষষ্ঠ পর্ব বা পর্যায়টি হচ্ছে সহমর্মিতা ও সহযোগিতার পর্ব। এই পর্বটি শুরু হয়েছে বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ থেকে। ইতিহাসের এই পর্বটির প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে,শিশুর প্রতি অফুরন্ত ভালোবাসা এবং শিশু অধিকারের প্রতি স্বীকৃতি। বাবা-মা ও অভিভাবকরা শিশুর চাহিদা ও সক্ষমতা উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়। শিশুর কাছ থেকে তারা আর এমন কিছু প্রত্যাশা করে না যা তাদের মাধ্যমে সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। তবে গোটা বিশ্বেই এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে তা কিন্তু নয়। এখনও অনেক সমাজ ও দেশ শিশু অধিকার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে। সব মিলিয়ে শিশু অধিকার বাস্তবায়নের বিষয়টি এখনও প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায় নি।

শিশু অধিকার পুরোপুরি বাস্তবায়িত হওয়ার ক্ষেত্রে এখনও অনেক পথ বাকি রয়েছে। বার্থরাইটস বা জন্মাধিকার বইয়ের লেখক ও বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী রিচার্ড ফারসন শিশু অধিকার বাস্তবায়ন ইস্যুতে অনেক কাজ করেছেন। ২০১৭ সালে মৃত্যুর আগে শিশু অধিকার বাস্তবায়নের বিষয়ে তিনি এক ধরণের হতাশা ব্যক্ত করে গেছেন তার মতে, শিশু অধিকার পুরোপরি বাস্তবায়ন থেকে বিশ্ব এখনও অনেক দূরে রয়েছে। আসলে শিশুদের সঙ্গে সদাচারণ ও তাদের অধিকার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বর্তমানে যে অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে তা একদিনে সম্ভব হয় নি। পর্যায়ক্রমে এ অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে এবং এখনও তা পরিপূর্ণতা লাভের পর্যায়ে রয়েছে। ইতিহাসের এ পর্যায়ে এসে আন্তর্জাতিক সমাজ বাস্তবিক অর্থেই শিশু অধিকার বাস্তবায়নে অনেক বেশি সোচ্চার হয়েছে।

এরইমধ্যে শিশু অধিকার বাস্তবায়নকে গুরুত্ব দিয়ে বহু আন্তর্জাতিক সনদ পাস করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সনদগুলো দুই ধরণের। এর একটি হলো- সাধারণ সনদ-যেখানে সাধারণ মানবাধিকারের কথা বলার পাশাপাশি শিশু অধিকারের প্রসঙ্গও টানা হয়েছে। দ্বিতীয়টি হলো-বিশেষ সনদ যেখানে বিশেষভাবে কেবল শিশুদের অধিকারের কথা বলা হয়েছে। সাধারণ সনদগুলোর মধ্যে মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্র। এই ঘোষণাপত্রটি ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে পাস হয়। এই ঘোষণাপত্রের বিভিন্ন ধারায় সার্বজনীন মানবাধিকারের পাশাপাশি শিশু অধিকারের কথাও বলা হয়েছে। এই ঘোষণাপত্রের প্রথম ধারায় বলা হয়েছে,সব মানুষ স্বাধীনভাবে সমান মর্যাদা এবং অধিকার নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। তবে মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্রের ২৫তম ধারার দ্বিতীয় অংশে বিশেষভাবে শিশু অধিকার নিয়ে বক্তব্য এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, মাতৃত্ব এবং শৈশবাবস্থায় প্রতিটি নারী ও শিশুর বিশেষ যত্ন এবং সাহায্য লাভের অধিকার আছে। বিয়েবন্ধন-বহির্ভূত কিংবা বিবাহবন্ধনজাত সব শিশু অভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা ভোগ করবে।

আরও দু'টি সাধারণ সনদ হিসেবে ইন্টারন্যাশনাল কনভেনান্ট অন ইকোনমিক, সোশ্যাল অ্যান্ড কালচারাল রাইটস এবং ইন্টারন্যাশনাল কনভেনান্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটসের নাম উল্লেখ করা যায়। এ দু'টি সনদে অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি শিশু অধিকার ইস্যুতে বক্তব্য এসেছে। যেমন বলা হয়েছে, ১৮ বছরের কম বয়সীকে ফাঁসি দেওয়া যাবে না, অভিযুক্ত হলেও শিশুকে বড়দের কাছ থেকে আলাদা করা যাবে না। শিশুর বিচারের ক্ষেত্রে বিশেষ আদালতের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি এ ক্ষেত্রে সরকারকে সহযোগিতা করতে বলা হয়েছে এই দুই সনদে। এর বাইরেও আরও অনেক আন্তর্জাতিক সনদ ও ঘোষণায় সার্বিক মানবাধিকারের বিষয়াদির পাশাপাশি শিশু অধিকারের বিষয়টিও এসেছে। তবে শুধু শিশু অধিকার নিয়েও অনেক আন্তর্জাতিক সনদ রয়েছে। আর এ ধরণের সনদকেই বিশেষ সনদ বলা হয়। আজ সময় স্বল্পতার কারণে এ আসরে শিশু অধিকার বিষয়ক বিশেষ সনদ নিয়ে আলোচনা করা সম্ভব হলো না। আগামী আসরে আমরা এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব ইনশাল্লাহ। #

পার্সটুডে/সোহেল আহম্মেদ/মো.আবুসাঈদ/ ১২

খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন

ট্যাগ

মন্তব্য