কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের আজকের পর্বে সূরা সাবার ১০ থেকে ১৩ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা শুরু হবে। এই সূরার ১০ ও ১১ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন,

وَلَقَدْ آَتَيْنَا دَاوُودَ مِنَّا فَضْلًا يَا جِبَالُ أَوِّبِي مَعَهُ وَالطَّيْرَ وَأَلَنَّا لَهُ الْحَدِيدَ (10) أَنِ اعْمَلْ سَابِغَاتٍ وَقَدِّرْ فِي السَّرْدِ وَاعْمَلُوا صَالِحًا إِنِّي بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ (11)

“এবং আমি দাউদের প্রতি অনুগ্রহ করেছিলাম। (এবং বলেছিলাম:) হে পর্বতমালা, হে পক্ষী সকল, তোমরা (আমার পবিত্রতা ঘোষণায়) দাউদের সহযোগী হয়ে যাও। আমি তাঁর জন্য লৌহকে নরম করেছিলাম।” (৩৪:১০)

“(হে দাউদ!) প্রশস্ত বর্ম তৈরী কর, কড়াসমূহ যথাযথভাবে সংযুক্ত কর এবং সৎকর্ম সম্পাদন কর। তোমরা যা কিছু কর, আমি তা প্রত্যক্ষ করি।” (৩৪:১১)     

সূরা সাবার ৯ নম্বর আয়াতের শেষাংশে ‘আব্দে মুনিব’ অর্থাৎ ‘আল্লাহর তওবাকারী বান্দা’র কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সূরা সোয়াদের ২৪ নম্বর আয়াতে এ বিষয়টির প্রতি ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে, হযরত দাউদ (আ.) আল্লাহর দরবারে তওবা ও কান্নাকাটি করতেন। আর এই আয়াতে হযরত দাউদ ও তাঁর ছেলে হযরত সুলাইমানের জীবনীর কিছু অংশ বর্ণনা করা হয়েছে।

আয়াতের শুরুতেই বলা হয়েছে, আল্লাহ পাক হযরত দাউদকে বিশেষ অনুগ্রহ করেছিলেন। তাঁকে পার্থিব সম্পদের পাশাপাশি আধ্যাত্মিক দিক দিয়ে যে অতি উচ্চ মর্যাদা দান করা হয়েছিল সে সম্পর্কে সূরা নামলে কিছুটা ইঙ্গিত রয়েছে। পাহাড়ের মতো জড় বস্তু এবং বনের পাখিরা হযরত দাউদ (আ.)-এর সঙ্গে মুনাজাতে অংশ নিত। যখনই হযরত দাউদ আল্লাহর জিকিরে মশগুল হতেন তখন তাঁর সঙ্গে পাহাড়সমুহ ও পাখীদের জিকিরের সুললিত ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়ে উঠত। আমাদের প্রিয়নবী রাসূলে আকরাম (সা.)-এর হাতে থাকা পাথরকণাও সুমধুর কণ্ঠে আল্লাহর জিকির করেছে এবং সে ধ্বনি সাহাবীরা শুনতে পেয়েছেন বলে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। 

এরপর হযরত দাউদের আরেকটি যোগ্যতার কথা উল্লেখ করে বলা হচ্ছে, আমি লোহাকে তার জন্য এতটা নরম করে দিয়েছিলাম যাতে সে তা দিয়ে বর্ম তৈরি করতে পারত। এই বর্ম ব্যবহার করে হযরত দাউদ ও তার সঙ্গীরা শত্রুর আক্রমণ থেকে নিজেদের রক্ষা করতেন।  দৃশ্যত, হযরত দাউদের আগে শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য লোহার তৈরি যে ঢাল ব্যবহার করা হতো তা ছিল অত্যন্ত ভারী ও তা বহন করা ছিল কষ্টকর। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা হযরত দাউদকে এমন অনুগ্রহ করেন যার ফলে তিনি লোহাকে সুতার মতো নরম ও সরু করে ফেলতে পারতেন। এরপর সেই সুতা দিয়ে যোদ্ধাদের আপাদমস্তক আবৃত করার মতো পোশাক তৈরি হতো যা পরিধান করলে তলোয়ার বা বর্শার আঘাত থেকে বাঁচার জন্য আর ঢাল ব্যবহারের প্রয়োজন হতো না।  আয়াতের শেষাংশে হযরত দাউদ ও তাঁর জাতিকে উদ্দেশ করে বলা হয়েছে: আল্লাহর নির্দেশিত পথে এই বর্ম ব্যবহার করবে কারণ মহান আল্লাহ তোমাদের প্রতিটি কর্ম প্রত্যক্ষ করছেন।

এ দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. যারা আল্লাহর দরবারে তওবা ও কান্নাকাটি করে আল্লাহ তায়ালা তাদের প্রতি বিশেষ দয়া ও রহমত নাজিল করেন।

২. আমাদের চারপাশের জড় ও জীব সব বস্তু ও প্রাণীর উপলব্ধি ক্ষমতা রয়েছে এবং তারা প্রত্যেকে আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলে।

৩. ভূগর্ভ বা ভূপৃষ্ঠের প্রাকৃতিক সম্পদকে আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী মানবজাতির কল্যাণে কাজে লাগাতে হবে।

সূরা সাবার ১২ ও ১৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:

وَلِسُلَيْمَانَ الرِّيحَ غُدُوُّهَا شَهْرٌ وَرَوَاحُهَا شَهْرٌ وَأَسَلْنَا لَهُ عَيْنَ الْقِطْرِ وَمِنَ الْجِنِّ مَنْ يَعْمَلُ بَيْنَ يَدَيْهِ بِإِذْنِ رَبِّهِ وَمَنْ يَزِغْ مِنْهُمْ عَنْ أَمْرِنَا نُذِقْهُ مِنْ عَذَابِ السَّعِيرِ (12) يَعْمَلُونَ لَهُ مَا يَشَاءُ مِنْ مَحَارِيبَ وَتَمَاثِيلَ وَجِفَانٍ كَالْجَوَابِ وَقُدُورٍ رَاسِيَاتٍ اعْمَلُوا آَلَ دَاوُودَ شُكْرًا وَقَلِيلٌ مِنْ عِبَادِيَ الشَّكُورُ (13)

“আর আমি সুলায়মানের অধীন করেছিলাম বায়ুকে, যা সকালে এক মাসের পথ এবং বিকালে(ও) এক মাসের পথ অতিক্রম করত। আমি তার জন্যে (গলিত) তামার এক ঝরণা প্রবাহিত করেছিলাম। এক দল জিন তার পালনকর্তার আদেশে তার সামনে কাজ করত। তাদের যে কেউ আমার আদেশ অমান্য করত, তাকে আমি জ্বলন্ত অগ্নির-শাস্তি আস্বাদন করাতাম।” (৩৪:১২)

“তারা সুলায়মানের ইচ্ছানুযায়ী উপাসনালয় ও দুর্গ, ভাস্কর্য, হাউযসদৃশ বৃহদাকার পাত্র এবং চুল্লির উপর স্থাপিত বিশাল ডেগ নির্মাণ করত। হে দাউদ পরিবার! (এসব নেয়ামতের জন্য) কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো।  (যদিও) আমার বান্দাদের মধ্যে অল্পসংখ্যকই কৃতজ্ঞ।” (৩৪:১৩)

মহান আল্লাহ আগের আয়াতে হযরত দাউদ (আ.)-এর প্রতি নিজের অনুগ্রহ বর্ণনার পর এই আয়াতে তার সন্তান হযরত সুলায়মান (আ.)কে দেয়া তিনটি বিশেষ অনুগ্রহের কথা স্মরণ করেছেন। এগুলোর মধ্যে প্রথম অনুগ্রহ ছিল বায়ুচালিত বাহন। হযরত সুলায়মান এই বাহনে উঠলে তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী বাতাস তাকে একস্থান থেকে আরেক স্থানে নিয়ে যেত। সে যুগে সাধারণভাবে মানুষ একমাসে যে পথ অতিক্রম করতে পারত হযরত সুলায়মান এই বাহনে চড়ে তা মাত্র আধাবেলায় অতিক্রম করতেন এবং সেখান থেকে বিকেলে আবার নিজ প্রাসাদে ফিরে আসতে পারতেন।

হযরত সুলায়মানের প্রতি আল্লাহর দ্বিতীয় অনুগ্রহ ছিল এই যে, তিনি গলিত তামা হাতে পেয়েছিলেন। এই তামা দিয়ে ছোট-বড় নানা ধরনের পাত্র তৈরি করা সম্ভব হতো। পিতা হযরত দাউদ পেয়েছিলেন নরম লোহা এবং পুত্র সুলায়মান পেয়েছিলেন গলিত তামা।

হযরত সুলায়মানের প্রতি আল্লাহ তায়ালার তৃতীয় অনুগ্রহ ছিল এই যে, তাঁর সাম্রাজ্য পরিচালনার জন্য একদল জিনকে তাঁর আজ্ঞাবহ করে দেয়া হয়েছিল। হযরত সুলায়মানের নির্দেশে এসব জিন কষ্টসাধ্য কাজগুলো করে দিত। আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করলে এসব জিনকে কঠিন শাস্তি দেয়া হতো।

বর্তমান আধুনিক যুগে এসে মানুষ যদিও তামা গলিয়ে নানা ধরনের পাত্র তৈরির কৌশল আয়ত্ব করেছে কিন্তু হযরত সুলায়মানের প্রতি আল্লাহর প্রথম ও তৃতীয় যে অনুগ্রহ ছিল তা আজও মানুষের পক্ষে রপ্ত করা সম্ভব হয়নি। বস্তুবাদী মানুষেরা বায়ূচালিত বাহন কিংবা জিনকে আজ্ঞাবহ করার মতো বিষয়গুলি হয়ত বিশ্বাস করবে না। কিন্তু আল্লাহর প্রতি ঈমানদার মানুষেরা জানেন যে, আমরা চর্মচক্ষে দেখতে পাই না এমন অনেক বিষয় এই সৃষ্টিজগতে রয়েছে যেগুলোর কোনো কোনোটির খবর আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনের মাধ্যমে মানব জাতিকে জানিয়ে দিয়েছেন। নবী-রাসূল এবং আল্লাহর ওলীরা আল্লাহরই ইচ্ছায় সেই অদৃশ্য শক্তির কোনো কোনোটি কাজে লাগাতে সক্ষম হয়েছেন।

এই দুই আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে:

১. মানুষের পক্ষে জিনকে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। কিন্তু আল্লাহর নির্দেশিত সুনির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্র ছাড়া এই কাজ করতে নিষেধ করা হয়েছে।

২. খনিজ সম্পদ ও ধাতব পদার্থ দিয়ে নানা ধরনের শিল্পসামগ্রী তৈরির কৌশল আল্লাহ তায়ালাই তাঁর কোনো কোনো নবী-রাসূলকে শিক্ষা দিয়েছিলেন যাতে ধীরে ধীরে মানব সভ্যতা পূর্ণতা লাভ করতে পারে।

৩. তামা গলিয়ে নানা ধরনের পাত্র তৈরি একটি অতি প্রাচীন শিল্প যা শুরু হয়েছিল হযরত সুলায়মান (আ.)-এর যুগে।#

 

ট্যাগ

২০১৮-১১-২৪ ১৭:৩১ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য