রংধনু আসরের কাছের ও দূরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই জানো, ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে পবিত্র ১২ রবিউল আউয়াল মতান্তরে ১৭ রবিউল আউয়াল আরব দেশের মক্কানগরীতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন মানবতার মুক্তির দূত হযরত মুহাম্মদ (সা.)। তাঁর চেয়ে উত্তম কোনো সন্তান আজ পর্যন্ত পৃথিবীর কোনো মা জন্ম দিতে পারেননি, আর পারবেনও না কোনোদিন।

পূর্ণিমার চাঁদের আলোতে কলঙ্ক থাকলেও তাঁর চরিত্রে ছিল না বিন্দুমাত্র কলুষতার চিহ্ন। চাঁদ-সেতারাও তাঁর সৌন্দর্যের কাছে ছিল লজ্জিত। মাটির তৈরি মানুষ হয়ে নূরের তৈরি ফেরেশতাদের হাজার গুণ উপরে চলে গিয়েছিলেন তিনি। আকারে-আকৃতিতে জ্ঞানে-গুণে, স্বভাব-চরিত্রে তিনি অনন্য। তাঁর উত্তম চরিত্রের সার্টিফিকেট দিয়েছেন স্বয়ং মহান রাব্বুল আলামিন। তিনি পবিত্র কুরআনে বলেছেন, “তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।”  

বন্ধুরা, আদর্শ মহামানব হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর জন্মবার্ষিকী তথা পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে আমরা একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছি। এতে থাকবে ছোট্টবন্ধুদের কণ্ঠ নাতে রাসূল ও কবিতা। আমাদের আজকের অনুষ্ঠানটিও তৈরি করেছেন আশরাফুর রহমান।  

বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই জানো যে, মুহাম্মদ (সা.) আবির্ভাবের সময় আরবসহ সারা বিশ্ব যুদ্ধ, সংঘাত, মারামারি, অশ্লীলতা ইত্যাদিতে ভরপুর ছিল। এ অবস্থা থেকে বাঁচার জন্য মুক্তি পাগল মানুষরা এমন একজন মহামানবের অপেক্ষা করছিল, যিনি মানুষকে সত্য ও ন্যায়ের দিকে আহবান করবেন। অবশেষে মানুষের প্রতিক্ষার অবসান ঘটিয়ে যেদিন মা আমিনার কোল জুড়ে শিশু মুহাম্মদ আগমন করলেন, সেদিন সারা বিশ্বে আনন্দ ও খুশীর বার্তা ছড়িয়ে পড়ল। বিশ্বনবীর মাতা মা আমিনা (সা. আ.) এ সম্পর্কে বলেছেন:

আল্লাহর কসম, আমার পুত্র  জন্ম নিয়েই তাঁর হাতগুলোকে মাটিতে রেখে মাথা আকাশের দিকে তোলে এবং চারদিকে তাকায়। এরপর তাঁর থেকে একটি নূর বা আলো ছড়িয়ে পড়ে ও সে আলোয় সব কিছু দৃশ্যমান হয়। সেই আলোয় সিরিয়ায় রোমানদের প্রাসাদগুলো দেখলাম এবং সেই আলোর মধ্যে একটি শব্দ শুনলাম যে বলছিল: সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষকে জন্ম দিয়েছ, তাই তাঁর নাম রাখ ‘মুহাম্মাদ’। 

আমিরুল মু’মিনিনি আলী (আ.) বলেছেন,  সে রাতে তথা রাসূলে খোদার (সা.)’র জন্মের রাতে পুরো দুনিয়া আলোকিত হয়। প্রতিটি পাথর ও মাটির টুকরো এবং বৃক্ষ বা গাছ হেসেছে। আর আকাশ ও জমিনের সব কিছু আল্লাহর প্রশংসা করেছে। রাসূলেখোদার শুভ ক্ষণটির বর্ণনা দিতে গিয়ে কাজী নজরুল ইসলাম তার 'মরু ভাস্কর' গ্রন্থে লিখেছেন-

জেগে ওঠ! তুই রে ভোরের পাখি, নিশি প্রভাতের কবি
লোহিত সাগরে সিনান করিয়া উদিল আরব রবি।
ওরে ওঠ! তুই নতুন করিয়া বেঁধে তোল তোর বীণ
ঘন আঁধারের মিনারে ফুকারে আজান মুয়াজ্জিন।
কাঁপিয়া উঠিল সে ডাকের ঘোরে গ্রহ,রবি,শশী, ব্যোম
ঐ শোন শোন-'সালাতের' ধ্বনি ‘খায়রুম-মিনান্নৌম'।

ঈদে মিলাদুন্নবী (সা)-এর অনুষ্ঠানে কয়েকটি ইরানি শিশু

রাসূল (সা.) এই দুনিয়ায় আগমন করার পর কেবল আরবের নির্যাতিত মানুষরাই খুশী হয় নি। পাহাড়, পর্বত, মরুভূমি, গাছগাছালি সব কিছুই যেন খুশীতে আত্মহারা হয়েছিল। কবি নজরুলের ভাষায়-

বয়ে যায় ঢল, ধরে নাকো জল আজি জমজম কুপে
সাহারা আজিকে উথলিয়া ওঠে অতীত সাগর রূপে।
পুরাতন রবি উঠিল না আর সেদিন লজ্জা পেয়ে
নবীন রবির আলোকে সেদিন বিশ্ব উঠিল ছেয়ে।

শান্তি, মুক্তি ও নাজাতের বার্তা নিয়ে পৃথিবীতে এসেছিলেন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)। তাঁর আগমনের কারণে পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা হয়েছিল এবং আবারো যদি তার আদর্শকে বাস্তবায়ন করা যায়- তাহলে এ পৃথিবী আবারো শান্তিতে পরিপূর্ণ হবে। বন্ধুরা, তোমরা কি কখনো ভেবে দেখেছো,  মুহাম্মদ ( সা.) যদি এ পৃথিবীতে না আসতেন তাহলে জগতবাসীর কি অবস্থা হতো? বাংলাদেশের ইসলামী রেনেসাঁর কবি ফররুখ আহমদ এ সম্পর্কে লিখেছেন-

তুমি না আসিলে মধুভাণ্ডার ধরায় কখনো হত না লুট,
তুমি না আসিলে নার্গিস কভু খুলত না তার পর্ণপুট
বিচিত্র আশা-মুখর মাশুক খুলত না তার রুদ্ধ দিল
দিনের প্রহরী দিত না সরায়ে আবছা আঁধার কালো নিখিল।

বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই শুনেছো যে, মুহাম্মদ (সা.) সব সময় হাসিমুখে থাকতেন। কারো সঙ্গে দেখা হলে নিজেই আগে সালাম দিতেন এবং এমনকি শিশুদেরও সালাম দেয়ার সুযোগ না দিয়ে তিনি নিজেই তাদের আগে সালাম দিতেন। শিশুদের সঙ্গে তাদের মতো করে কোমল স্বরে কথা বলতেন এবং তাদের সঙ্গে তাদের পোষা পাখি ও খেলনার বিষয় নিয়েও কথা বলতেন।

বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই জেনেছো যে, রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে অনুসরণের মাধ্যমেই রয়েছে মানুষের মুক্তি। কারণ তাঁকে পাঠানো হয়েছিল বিশ্বমানবতার মুক্তির দূত হিসেবে। আমরা যদি তাঁর আদর্শের আলোকে জীবন গড়ি তাহলেই আমাদের জীবন স্বার্থক হবে। #

 

পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/২৪

 

 

 

ট্যাগ

২০১৮-১১-২৪ ১৮:৪৩ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য