'জ্ঞান ভিত্তিক অর্থনীতি' বিশ্বব্যাপী পরিচিত নতুন একটি পরিভাষা। সম্প্রতি এই পরিভাষাটির জন্ম হয়েছে। জ্ঞান নির্ভর উৎপাদন উপকরণের সাহায্যে যে অর্থনীতি গড়ে ওঠে তাকেই জ্ঞান ভিত্তিক অর্থনীতি বলে অভিহিত করা হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে ইরানে প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে ইস্ফাহানে গড়ে তোলা হয়েছে 'সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি টাউন' বা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উপশহর। ইস্ফাহান ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির তত্ত্বাবধানে 'জুব অহান' কোম্পানির মাধ্যমে ১৯৯২ সালে এই প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম শুরু হয়। পরবর্তীকালে ২০০৭ খ্রিষ্টাব্দে ইরানের সংসদ মজলিশে শুরায়ে ইসলামিতে জ্ঞান ভিত্তিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান বিষয়ে নীতিমালা গৃহীত হয়।

ইরানে এখন অসংখ্য 'বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি পার্ক' গড়ে উঠেছে। এসব পার্কে শত শত কোম্পানি, গবেষক, বিজ্ঞানী তাদের মেধা বিকাশে ব্যস্ত রয়েছে। জীববিজ্ঞান বিষয়ক প্রযুক্তি, ন্যানো টেকনোলজি, পলিমার, সিরামিক, কম্পোজিট এবং উন্নত ধাতব বস্তু, অপটিক, ফুটোনিক, কম্পিউটার হার্ডওয়্যার, বিদ্যুৎ শক্তি, ইলেক্ট্রনিক, টেলিকমিউনিকেশন ও নিয়ন্ত্রণ, তথ্য প্রযুক্তি ও যোগাযোগসহ কম্পিউটারের বিচিত্র সফটওয়্যার, ডেভেলপার সরঞ্জামাদি ইত্যাদি বিষয়ে গবেষণা ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এসবের বাইরেও উৎপাদন ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজও চলছে সমান গতিতে। বিশেষ করে ওষুধ শিল্পে অনেক অগ্রসর এইসব কোম্পানির তৎপরতা। এরা উন্নত মানের ওষুধ তৈরি করার পাশাপাশি ওষুধ তৈরির সরঞ্জামও বানাচ্ছে। বানাচ্ছে মহাকাশ জয়ের প্রয়োজনীয় সামগ্রী যেমন স্যাটেলাইট, ক্ষেপণাস্ত্র ইত্যাদিও। তেল-গ্যাস সংক্রান্ত যন্ত্রপাতি, পেট্রোকেমিক্যাল সামগ্রী পরিশোধনের যন্ত্রও তাদের কর্মপরিধির অন্তর্ভুক্ত।

জ্ঞানভিত্তিক অর্থনৈতিক কোম্পানিগুলোর কর্মতৎপরতার গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক হলো ওষুধ শিল্প উৎপাদন। গবেষণা প্রতিষ্ঠান 'ম্যাকেনযি ইনস্টিটিউট' তাদের এক গবেষণায় ইরানের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বিশেষ করে ওষুধ উৎপাদনে ইরানের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে লিখেছে: ইরানের বাজারের কয়েকটি শক্তিশালী দিক রয়েছে। বিশেষ করে ওষুধ সামগ্রী উৎপাদনের ক্ষেত্রটি বেশ সম্ভাবনাময়। ইরানের নিজস্ব শিল্প এগুলো। উন্নত বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা, বায়োটেকনোলজি এবং মূলকোষ গবেষণাসহ আরও বিভিন্ন ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাপক অগ্রসর। আরও নতুন নতুন বহু ওষুধ তৈরির পরিকল্পনা যে দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং পাবে-তাতে সন্দেহ নেই। ওষুধ সামগ্রী উৎপাদনের পরিমাণ ২০৩৫ সালের মধ্যে অন্তত সাত গুণ বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করি। সেই ২০১৪ সালেই এর পরিমাণ সাত শ কোটি মার্কিন ডলারে দাঁড়াবে বলে উল্লেখ করেছিল প্রতিষ্ঠানটি।

জীববিজ্ঞান সংক্রান্ত টেকনোলজি খাদ্য সামগ্রী, কৃষি ও চিকিৎসা ক্ষেত্রে বেশ উন্নত একটি বিভাগ। এই বিভাগটি ইরানে চোখে পড়ার মতো উন্নতি লাভ করেছে। সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে তৎপর কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী অন্তত পাঁচ'শ কোম্পানি বায়োটেকনোলজি নিয়ে কাজ করছে। বায়ো-টেকনোলজিতেই সবচেয়ে বেশি পরিকল্পনা ও প্রকল্প সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে। এসবের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রপ্তানি পণ্য হিসেবে স্থান করে নিয়েছে জৈবপ্রযুক্তির ওষুধ। জৈবপ্রযুক্তির ওষুধ রপ্তানির দিক থেকে ইরান সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে প্রথম স্থানের অধিকারী। মানব উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণ এবং গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বিভিন্নভাবে ও বিভিন্ন দিক থেকে পুঁজি বিনিয়োগ করা হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী এইসব গবেষণা কেন্দ্র থেকে গত পণর বছরে বিশটিরও বেশি নতুন নতুন ওষুধ এবং চল্লিশটি বিশেষ মেডিক্যাল কিট বাজারজাত করা হয়েছে। ডায়াবেটিক ক্ষত, পোড়া ক্ষতসহ আরও বিচিত্র ক্ষত নিরাময়ের মলমও তৈরি করেছে এইসব প্রতিষ্ঠান।

'হারসেপটিন' এবং 'ফ্যাক্টর-এইট' দুটি জেনেটিক ঔষধ জ্ঞান ভিত্তিক কোম্পানিগুলোর বায়োটেকনোলজিক্যাল বিভাগের অবদান। দুটি ওষুধই বাজারজাত করা হয়েছে। হারসেপটিন হলো কেমোথেরাপির ওষুধ যা চেস্ট ক্যান্সার নিরাময়কারী। দুটি কোম্পানির সমন্বিত প্রচেষ্টায় এই ওষুধটি তৈরি হয়েছে। 'ফ্যাক্টর-এইট' বংশগত রক্তক্ষরণরোগ 'হেমোফিলিয়া' নিরাময়ের ঔষধ। হেমোফিলিয়া একটি রক্তক্ষরণজনিত জন্মগত রোগ যা বংশানুক্রমে সাধারণত ছেলেদের হয়ে থাকে। এই রোগে আক্রান্তরা কখনো আহত হলে কিংবা শরীরের কোথাও কেটে গেলে সহজে রক্তক্ষরণ বন্ধ হয় না, বিলম্বিত হয়। মেয়েরা সাধারণত হেমোফিলিয়ার রোগী হয় না তবে রোগের বাহক হয়। হেমোফিলিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাইলে আপনার পরিচিত কোনো ডাক্তারের সহযোগিতা নিতে পারেন কিংবা ইন্টারনেটেও খুঁজে দেখতে পারেন।

বলেছিলাম ন্যানো প্রযুক্তির সুবিধা নিয়ে প্রচুর ওষুধ তৈরি করেছে ইরানের জ্ঞান ভিত্তিক অর্থনৈতিক কোম্পানিগুলো। ন্যানো-মেডিসিনে ইরান বেশ অগ্রসর এখন। 'সিলভোসেপ্ট' সেরকমই একটি ন্যানো-মেডিসিন। রোগ-জীবাণুর সংক্রমণ প্রতিরোধক একটি ওষুধ এই সিলভোসেপ্ট। সাধারণত আহত হলে ক্ষত স্থানে যাতে জীবাণু সংক্রমিত হতে না পারে সেজন্যই এই ওষুধটি ব্যবহার করা হয়। 'সিলভোসেপ্ট' ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ সকল পরীক্ষা-নিরীক্ষায় উত্তীর্ণ এবং অনুমোদিত একটি ওষুধ। বহু পুরস্কারও লাভ করেছে এই ওষুধ কোম্পানিটি। আরও একটি ওষুধের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। এটি হলো আর.পি.এ। হার্ট অ্যাটাক বা মায়োকার্ডিয়াল ইনফ্রাকশান সংক্ষেপে এম.আই জনিত সমস্যা নিরাময়ের জন্য এই ওষুধটি ব্যবহৃত হয়। একোবরেই স্থানীয় বা দেশীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে একটি কোম্পানি এই ওষুধটি তৈরি করে বাজারজাত করেছে।

এই কোম্পানিটি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। ওষুধটি 'ইন্টারফেরন বেটা-ওয়ান' গ্রুপের। 'জি-ফেরন' নামে ওষুধটি বাজারজাত করা হয়েছে। 'মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস' বা সংক্ষেপে এম.এস. হলো একধরনের ডি-মায়েলিনেটিং রোগ। এ রাগের ফলে মানব মস্তিষ্কে ও স্নায়ুরজ্জুতে বিদ্যমান স্নায়ুকোষগুলোকে আচ্ছাদনকারী আবরণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায়। জি-ফেরন এক্ষেত্রে চমকপ্রদ একটি নিরামক।

এরকম আরও বহু নতুন নতুন ওষুধ উৎপাদন করে যাচ্ছে জ্ঞান ভিত্তিক অর্থনৈতিক কোম্পানিগুলো। #

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/ মো:আবু সাঈদ/   ২৮

খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন

ট্যাগ

২০১৮-১১-২৮ ২০:৩৩ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য