বিশ্বব্যাপী আজ পরিবারের ভিত কেমন যেন নড়বড়ে হয়ে উঠেছে। আগের সেই মজবুত ভিতটা যেন নেই আর।

পরিবার বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন সামাজিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থা তো একটি পরিবারকে বাইরে থেকে চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দেয়ই, এর বাইরেও নৈতিক এবং আচরণগত সমস্যাও রয়েছে যা একটি পরিবারকে ভেতর থেকে ধীরে ধীরে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়।  

পরিবারের প্রতি ভালোবাসা কিংবা সম্পৃক্ততা ধীরে ধীরে কমে যায় এবং তার জায়গা দখল করে নেয় দু:খ, কষ্ট আর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। এর ফলে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে পারস্পরিক ভালোবাসা ও মমত্ববোধের পরিবর্তে বিচিত্র বিরক্তি ও কষ্ট জায়গা করে নেয়। যার পুরো প্রভাবটাই পড়ে পরবর্তী প্রজন্মের ওপর। কারণ সন্তানের সঙ্গে দূরত্ব বেড়ে যায় পরিবারে। তাছাড়া সোশ্যাল মিডিয়াসহ আধুনিক প্রযুক্তির সহজলভ্যতার ফলে আধুনিক প্রজন্ম আগের প্রজন্মের তুলনায় অনেক এগিয়ে। পারিবারিক ঐতিহ্য ও সামাজিক প্রথাগুলো এসবের প্রভাবে অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে। সৌখিনতা ও বিলাসিতা এখন সামাজিক আচার অনুষ্ঠানের ওপর প্রভাব ফেলছে এবং এমন সব নতুন নতুন প্রত্যাশার জন্ম দিচ্ছে যেগুলো নিয়ে আগে কেউ ভাবতোও না।

আধুনিক এই বিশ্বে চলছে পণ্য দাসত্ব। বাহারি বিজ্ঞাপনের ডামাডোলে মাল্টি-ন্যাশনাল কোম্পানিগুলো মানুষকে তাদের দাসে পরিণত করেছে। নতুন প্রজন্মের ছেলে মেয়েরা বিজ্ঞাপনে দেখা পণ্য না পেলে মন খারাপ করে বসে এবং ধীরে ধীরে প্রত্যাশা পূরণের অভাবে পরিবারের সঙ্গে এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হয় এবং তাদের আচরণে অযৌক্তিক অসামঞ্জস্য দেখা দেয়। অনেক সময় পিতামাতা বা অভিভাবক তাদের সন্তানদের সঙ্গে প্রজন্মগত দূরত্বের পার্থক্যের বিষয়টির প্রতি মনোযোগ দেয় না। এমনকি তাদের আধুনিক প্রজন্মের ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য সময়ের দাবী অনুযায়ী কোনোরকম প্রশিক্ষণ দেয়ারও চিন্তা করে না। তারা তাদের প্রাচীন চিন্তাধারা অনুযায়ীই নতুন প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাববার চেষ্টা করে থাকে। নতুন প্রজন্মকে তাদের মতোই গড়ে তোলার কথা ভাবে। বয়সের পার্থক্য ও প্রজন্মগত পার্থক্যের বিষয়টিও উপেক্ষা করা হয়।

প্রতিটি প্রজন্মই তাদের নিজস্ব সময়ে বসবাস করে। তবে পূর্বপ্রজন্মের অভিজ্ঞতা ও দিক-নির্দেশনা যে উত্তর প্রজন্মের প্রয়োজন নেই, তা কিন্তু নয়। নতুন প্রজন্ম যদি তাদের বাবা-মায়ের চিন্তা-চেতনা কিংবা কর্মজীবনের অভিজ্ঞতাকে কাজে না লাগায় তাহলে জীবন বাস্তবতার মোকাবেলায় নি:সঙ্গ ও অনভিজ্ঞতার কারণে পথ হারিয়ে বসার আশঙ্কা থেকে যায়। আবার পূর্বপ্রজন্ম মানে মুরব্বিদের মেনে নিতে হবে যে সমাজকে যুবক ও তরুণরাই পরিচালনা করবে, তাদের মতো করে সাজাবে।  এটাও মানতে হবে যে, একটি সমাজের উন্নয়ন ও সামাজিক সুস্থতার বিষয়টি নির্ভর করে সেই সমাজের তরুণ ও যুব সমাজের সক্রিয় ভূমিকা ও সাফল্যের ওপর। মনে রাখতে হবে জীবনের অভিজ্ঞতা তখনই মূল্যবান হয়ে উঠবে যখন সেই অভিজ্ঞতার নির্যাস উত্তর প্রজন্ম তথা নবীনদের মাঝে স্থানান্তরিত ও বিকশিত করা যাবে। যাতে তারা পূর্ব অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে নতুন কিছু গড়তে পারে।        

সমাজ পরিচালনায় তরুণদের অধিকার ও সক্রিয় ভূমিকার বিষয়টিকে বাবা-মা তথা অভিভাবকদের উপলব্ধি করতে হবে। সেইসাথে তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে অভিভাবকদের কথাবার্তা, আচার আচরণ সে অনুযায়ী সঠিক ও যৌক্তিক হতে হবে। বাবা-মা-কে তাদের উপযোগী সদয় আচরণ করার মধ্য দিয়ে তরুণদের বোঝাতে হবে যে তারা তাদের বিষয়টি উপলব্ধি করছে এবং সে অনুযায়ী তারা যৌক্তিক আচরণই করছে। মনে রাখতে হবে জেনারেশন গ্যাপ বা প্রজন্মের বৈসাদৃশ্য কিংবা প্রজন্মগত দূরত্ব তখনই সংকটে পরিণত হতে পারে যখন দুটি প্রজন্মের আচার-প্রথা, কৃষ্টি-কালচার পুরোপুরি আলাদা হয়ে যায় এবং এক প্রজন্মের সঙ্গে অন্য প্রজন্মের সম্পর্ক পরিপূর্ণভাবে ছিন্ন হয়ে যায়।                                     

সেই ক্ষেত্রে পরিবারগুলোকে বিশেষ করে বাবা-মাকে সমাজ ও সময়ের চারিত্র্য কিংবা পরিস্থিতিকে ভালোভাবে উপলব্ধি করতে হবে। একইভাবে নীতি-নৈতিকতা ও মানবীয় মৌলিক মূল্যবোধগুলোকে সুরক্ষার স্বার্থে নিজ নিজ সন্তান সন্ততিকে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাবার অনুমতি দিতে হবে। তবে এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে তাদের কর্মকাণ্ড যেন শরিয়তের বিধি-বিধান পরিপন্থী হয়ে না যায়। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি যদি গুরুত্ব ও মনোযোগ দেওয়া না হয় এবং কালক্রমে প্রয়োজনীয় ধর্মীয় শিক্ষাগুলো যদি তাদেরকে দেওয়া না হয় তাহলে তারা পরিবার তো বটেই সমাজেও সমস্যার সম্মুখীন হবে এমনকি সাংস্কৃতিক ভাঙনেরও সম্মুখীন হতে পারে।

অভিভাবকদের আরও একটি দায়িত্ব আছে। সেটা হলো নতুন নতুন প্রযুক্তি ও সর্বশেষ উন্নয়ন কী ঘটেছে সেগুলো সম্পর্কে সচেতন থাকা, খোঁজখবর রাখা। এতে করে তাঁরা সন্তানদেরও সাহায্য করতে পারে এবং সেইসঙ্গে নজরদারির ব্যাপারেও এগিয়ে থাকতে পারবে। আরও একটি লাভ হবে। তা হলো সন্তানদের প্রয়োজনীয়তাগুলো সম্পর্কে সচেতন থাকতে পারবে। পরিবারের সংহতি ও শৃঙ্খলা নষ্ট হবার একটা কারণ হলো ভার্চুয়াল ও স্যোশাল মিডিয়াগুলোর ভারসাম্যহীন ব্যবহার। স্যোশাল মিডিয়াগুলো এখন সামাজিক অনুভূতি ধ্বংস করে দিচ্ছে। ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির যোগাযোগই বেশি হচ্ছে। সামাজিক বন্ধন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এককথায় যোগাযোগটা এখন ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া কেন্দ্রিক হয়ে গেছে। সামাজিকতার সংস্কৃতি যেন দূরে সরে গেছে। সেই অনুভূতিই যেন নতুন প্রজন্মের মাঝে নেই।

মনে রাখতে হবে একটি সুস্থ ও আদর্শ পরিবার তাকেই বলবো যে পরিবারে বাবা-মা এবং তাদের সন্তানদের মধ্যে একটা সুসম্পর্ক রয়েছে। এই সম্পর্ক উভয় পক্ষেই হবে আন্তরিক, সহমর্মিতাপূর্ণ এবং মানসিকভাবে হৃদ্যতাপূর্ণ। গণমাধ্যমগুলো এব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে নতুন নতুন প্রযুক্তির আগমনে এবং জ্ঞান ও বিজ্ঞানের উন্নয়নের ফলে বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষা ও গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠানগুলো এ বিষয়ে মানে প্রজন্মগত বৈসাদৃশ্য যাকে ইংরেজিতে জেনারেশন গ্যাপ বলা হয়, তা দূর করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। #

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/   ১

খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন 

ট্যাগ

২০১৮-১২-০১ ২০:০৮ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য