গত আসরে আমরা আমীরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ.)-এর জীবনী নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ইসলামের প্রচার ও প্রসার এবং কাফের ও মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে এই মহান ব্যক্তিত্বের অবদান নিয়ে কথা বলেছিলাম। আজকের আসরে আমরা ঐতিহাসিক গাদিরে খোমের ঘটনা বর্ণনা করব যেখানে তাঁকে আল্লাহর রাসূলের পর মুসলিম উম্মাহর অভিভাবক ও ইমাম ঘোষণা করা হয়।

দশম হিজরিতে মহানবী (সা.) হজ করার উদ্দেশ্যে মক্কা গমনের সিদ্ধান্ত নেন এবং এই খবর মুসলিম উম্মাহকে জানিয়ে দেন। আরব উপত্যকার সব মুসলমান এ খবর শোনার পর নবীজীর সঙ্গে হজব্রত পালনের সৌভাগ্য অর্জন এবং এই মহান শিক্ষকের কাছ থেকে হাতেকলমে হজের আনুষ্ঠানিকতা শেখার লক্ষ্যে দলে দলে মক্কা পানে ছুটতে থাকেন। হজ সমাপ্তির পর আল্লাহর রাসূল মুসলমানদের নিয়ে মদীনার পথে রওনা হন। বিশাল মুসলিম কাফেলা গাদিরে খোম নামক স্থানে পৌঁছায়। এদিকে রাসূলুল্লাহ (সা.) ওহীর মাধ্যমে জেনে গিয়েছিলেন এটিই তার জীবনের শেষ হজ। তাই তাঁর ওফাতের পর কে মুসলিম উম্মাহর নেতৃত্ব দেবে তা নিয়ে তিনি খানিকটা চিন্তিত হয়ে পড়েন। 

এ অবস্থায় সূরা মায়েদার ৬৭ নম্বর আয়াত অবতীর্ণ হয়। এই আয়াতে বলা হয়েছে: “হে রাসূল,আপনার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে আপনার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তা (মানুষের কাছে) পৌঁছে দিন।  আর যদি আপনি এরূপ না করেন,তবে আপনি তাঁর পয়গাম কিছুই পৌঁছালেন না। (আর আপনি যদি বিরুদ্ধবাদী ও মুনাফিকদের ভয় করেন তবে) আল্লাহ আপনাকে তাদের (ক্ষতি) থেকে রক্ষা করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ কাফেরদেরকে পথ প্রদর্শন করেন না।”

এই গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ পাওয়ার পর নবীজী সব মুসলমানকে সমবেত হওয়ার নির্দেশ দেন। নির্দেশ পেয়ে সবাই পরস্পরকে প্রশ্ন করতে থাকেন কি এমন হলো যে, সবাইকে থেমে যেতে হবে? এ প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য সবাই অপেক্ষা করতে থাকেন। এরপর দেখা গেল, কয়েকটি উটের উপর তৈরি অস্থায়ী মঞ্চে উঠে আল্লাহর রাসূল খুতবা শুরু করেছেন। তিনি আল্লাহ তায়ালার প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা জানানোর পর বলেন, হে লোকসকল! আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে তোমাদের কাছ থেকে আমার চলে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে। আমার ব্যাপারে তোমরা কি ধারণা পোষণ করো? এ প্রশ্নের উত্তরে সবাই সমম্বরে চিৎকার দিয়ে বলে ওঠেন, আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি আপনি আপনার রিসালাতের দায়িত্ব সর্বোত্তম উপায়ে পালন করেছেন। আল্লাহ তায়ালা আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন।

এরপর নবীজী আবার প্রশ্ন করেন: তোমরা কি এ সাক্ষ্য দিচ্ছো যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই এবং মুহাম্মাদ তার বান্দা ও রাসূল? এ ছাড়া, মৃত্যু পরবর্তী জীবনে ইহকালের ভালো ও মন্দ কাজের পরিণাম হিসেবে জান্নাত ও জাহান্নামের যে ব্যবস্থা রাখা হয়েছে তা কি তোমরা স্বীকার করো?সবাই আবার সমস্বরে বলে ওঠেন। জী আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি। এরপর বিশ্বনবী (সা.) বলেন, আমি দু’টি মূল্যবান বস্তু তোমাদের কাছে রেখে যাচ্ছি। এর একটি হচ্ছে আল্লাহর কিতাব কুরআন ও অপরটি হচ্ছে আমার আহলে বাইত। আল্লাহ তায়ালা আমাকে জানিয়েছেন, এই দু’টি বস্তু কখনো পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হবে না। কাজেই হে লোকসকল! কুরআন ও আহলে বাইতকে আকড়ে থেকো।

এ সময় আল্লাহর রাসূল হযরত আলী (আ.)-এর হাত তুলে ধরেন যাতে সবাই দেখতে পায়। এরপর নবীজী মুসলিম উম্মাহর ভবিষ্যত সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখেন। এটি গাদিরে খোমের খুতবা নামে বিখ্যাত।

এই খুতবায় রাসূলে আকরাম (সা.) বলেন, হে লোকসকল! জেনে রেখো, মহান আল্লাহ আলীকে তোমাদের অভিভাবক ও ইমাম নিযুক্ত করেছেন। তার নির্দেশ পালন করা মুহাজির ও আনসারসহ সকলের জন্য অবশ্যপালনীয় কর্তব্য।

খুতবার বাকি অংশ বলার আগে এ পর্যন্ত বর্ণিত খুতবার খানিকটা ব্যাখ্যা দেয়া প্রয়োজন। প্রথমত, আল্লাহ তায়ালার নির্দেশে হযরত আলী (আ.) এই মহান পদে অধিষ্টিত হয়েছেন এবং এই নিয়োগে আল্লাহর রাসূলের কোনো ভূমিকা ছিল না। দ্বিতীয়ত, আলী (আ.) ইমামত এবং অভিভাবকের দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছেন, কাজেই তার নির্দেশ পালন করা ফরজ। তৃতীয়ত, তিনি কোনো বিশেষ যুগের এবং বিশেষ সম্প্রদায়ের জন্য ইমাম নিযুক্ত হননি বরং সকল যুগের এবং সকল মানুষের জন্য তাঁর ইমামত প্রযোজ্য। এ কারণে রাসূলে আকরাম (সা.) গাদিরের খুতবার অন্য অংশে বলেন, আলীর পরে তার বংশধরদের কাছে ইমামতের দায়িত্ব পৌঁছাবে এবং তা কিয়ামত পর্যন্ত চলবে।

এরপর আল্লাহর এই নির্দেশের বিরোধিতা করার ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়ে বিশ্বনবী (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি আমার এই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে আলীর ইমামত মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানাবে তার ওপর আল্লাহ প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হবেন।

মহান আল্লাহ ঈমানদার ও নেক আমলকারী বান্দাদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন। আর যেসব বান্দা বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশের সুযোগ পাবেন তাদের অন্যতম হলেন আল্লাহর রাসূলের আহলে বাইতের প্রতি ভালোবাসা পোষণকারী ব্যক্তিবর্গ। আল্লাহ তায়ালা তাঁর রাসূলের নবুওয়াতের প্রতিদানস্বরূপ তাঁর আহলে বাইতের প্রতি ভালোবাসা পোষণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। সূরা আশ-শুরার ২৩ নম্বর আয়াতের একাংশে বলা হয়েছে: “বলুন, আমি আমার রিসালাতের জন্য তোমাদের কাছে আমার নিকটাত্মীয়দের প্রতি ভালোবাসা ছাড়া আর কিছু চাই না। ” এ ছাড়া, সূরা সাবা’র ৪৭ নম্বর  আয়াতে বলা হয়েছে, “বলুন, আমি তোমাদের কাছে যে পারিশ্রমিক চাই তা শুধু তোমাদেরই কাজে লাগবে। (বরং) আমার পুরস্কার তো আল্লাহর কাছে রয়েছে।”   

এ কারণে রাসূলুল্লাহ (সা.) গাদিরে খোমের ঐতিহাসিক খুতবার একাংশে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন: তোমরা জেনে রাখো, আমার আহলে বাইতের প্রতি ভালোবাসা পোষণকারীরা অত্যন্ত নিরাপত্তার সঙ্গে জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং ফেরেশতারা তাদেরকে স্বাগত জানিয়ে বলবে: আপনাদের প্রতি সালাম। আপনারা বিনা হিসাবে চিরশান্তির আবাস জান্নাতে প্রবেশ করুন।

কাজেই দেখা যাচ্ছে, আল্লাহর রাসূলের দেখিয়ে দেওয়া পথ অনুসরণ করতে হলে তাঁর আহলে বাইত আলাইহিমুস সালামের স্মরণাপন্ন হতে হবে, তাদেরকে মনেপ্রাণে ভালোবাসতে হবে।  মানুষ যাকে অন্তর দিয়ে ভালোবাসে তাকে অন্ধভাবে অনুসরণ করতেও দ্বিধা করে না। আর সে ভালোবাসা যদি আল্লাহর অনুগ্রহ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় হয় তাহলে মানুষ অবশ্যই পূর্ণতাপ্রাপ্ত হবে। আল্লাহ তায়ালা, তাঁর রাসূল এবং রাসূলের আহলে বাইতের প্রতি ভালোবাসা পোষণকারী ঈমানদার মানুষদেরকে ঠিক এ কারণেই বিনা হিসাবে জান্নাতপ্রাপ্তির সুসংবাদ দেয়া হয়েছে। #

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ/  ১

খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন

২০১৮-১২-০১ ২১:১১ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য