সুরা তাহরিম পবিত্র কুরআনের ৬৬ নম্বর সুরা। মদিনায় নাজিল-হওয়া এ সুরায় রয়েছে ১২টি আয়াত। এ সুরার প্রথম আয়াতটি মহানবী (সা)'র কোনো কোনো স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্কিত।

এ সুরার অন্য কয়েকটি আলোচ্য বিষয় হল মু'মিনদের প্রতি গুরুত্ব দেয়া এবং পরিবারের সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেয়ার ব্যাপারে যত্নশীল হওয়া, গোনাহ হলে তওবা করা, মুনাফিক ও কাফিরদের সঙ্গে জিহাদ করা, দু'জন সৎ নারী ও দু'জন অসৎ নারীর অবস্থা বর্ণনা এবং এরই আলোকে মহানবী (সা)'র স্ত্রীদের প্রতি হুঁশিয়ারি।

সুরা তাহরিমের প্রথম আয়াতে জানানো হয়েছে যে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) একটি বৈধ কাজকে নিজের জন্য নিষিদ্ধ করেছিলেন ওই কাজের বিষয়ে তাঁর কয়েকজন স্ত্রীর অন্যায্য  প্রতিবাদের কারণে।

সুরা তাহরিমের শানে নুজুল থেকে জানা যায় মহানবীর কোনো কোনো স্ত্রী কোনো কোনো অন্যায্য কথা বলে তাঁকে অসন্তুষ্ট করতেন এবং এমনকি দাম্পত্য-জীবনের গোপনীয়তাও রক্ষা করতেন না। অথচ একজন বিশ্বস্ত স্ত্রীর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হল দাম্পত্য জীবনের গোপন বিষয়গুলোকে গোপন রাখা। মহানবী (সা) কোনো একটি বিষয় গোপন রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মহানবীর (সা) দু'জন স্ত্রী তা প্রকাশ করে দেন। তারা মহানবীর মোকাবেলায় কোনো একটি লক্ষ্য অর্জনের জন্য গোপনে নীল-নক্সা আঁটেন। আর এ বিষয়টি মহানবীর পবিত্র আত্মা ও মনকে আহত করে এবং এর প্রতিবাদে তিনি নিজের জন্য কোনো কোনো বৈধ আনন্দকে অবৈধ করেন।  সুরা তাহরিমের প্রথম আয়াতে মহানবীকে সমর্থন করা হয় এবং তাঁর ওই দুই স্ত্রীকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়: আল্লাহর রাসুলের স্ত্রী হওয়ার কারণেই তারা জাহান্নাম থেকে রক্ষা পাবেন ও বেহেশতে যেতে পারবেন-এমন ধারণা করা ঠিক হবে না। কারণ, হযরত নুহ নবীর স্ত্রী ও লুৎ নবীর স্ত্রী নিজ নিজ স্বামীর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করায় জাহান্নামবাসী হয়েছেন।

বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) বিশ্বজনীন আদর্শ ব্যক্তিত্ব। তাঁর পবিত্র অস্তিত্ব মুসলিম জাতি ও গোটা মানবজাতির জন্য মহান আল্লাহর সবচেয়ে বড় উপহার। তাই এমন মহাপুরুষের ঘরের বা সংসারের কেউ তাঁর বিরুদ্ধে কোনো চক্রান্ত করবে-তা যত ছোট ষড়যন্ত্রই হোক না কেন –এটা উপেক্ষা করা যায় না।

সুরা তাহরিমের প্রথম আয়াতে মহান আল্লাহ তাঁ প্রিয়তম নবী ও রাসুলের মর্যাদা রক্ষার উদ্দেশে বলছেন:

হে নবী,আল্লাহ আপনার জন্যে যা হালাল করছেন,আপনি আপনার স্ত্রীদেরকে খুশী করার জন্যে তা নিজের জন্যে হারাম করেছেন কেন? আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়াময়।

একই সুরায় স্মরণ করিয়ে দেয়া হচ্ছে যে মহান আল্লাহ যেসবকে হালাল করেছেন সেগুলোকে হারাম করার এবং তিনি যেসবকে হারাম করেছেন সেসবকে হালাল করার অধিকার কারো নেই। কারণ একমাত্র মহান আল্লাহই হচ্ছেন বিধানদাতা এবং এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার রয়েছে কেবলই সর্বশক্তিমান আল্লাহর।

সুরা তাহরিমের ৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ মহানবীর (সা) স্ত্রীদেরকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলছেন: তারা যেন এমন ধারণা না করেন যে যা-খুশি তা করা সত্ত্বেও মহানবী (সা) তাদেরকে কখনও তালাক দিবেন না এবং তালাক দিলে তিনি আরও ভালো স্ত্রী পাবেন না-এমন ভুল ধারণাও তাদের মাথা থেকে বের করে ফেলা উচিত। এই আয়াতে একজন মুসলিম সহধর্মীনীর কয়েকটি বৈশিষ্ট তুলে ধরে বলা হচ্ছে: তাদেরকে হতে হবে আত্মসমর্পিত বা আজ্ঞাবাহী, মুমিন বা বিশ্বাসী, বিনম্র, তওবাকারী, ইবাদতকারী ও হিজরতকারী।

একজন মু'মিন মুসলমান যখন বিয়ে করবেন তখন তার উচিত সম্ভাব্য স্ত্রীর মধ্যে এইসব বৈশিষ্ট রয়েছে কিনা তা আগেই যাচাই করে দেখা।

সুরা তাহরিমের ৬ নম্বর আয়াতে পরিবারের সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলা হচ্ছে সব মানুষেরই উচিত নিজের বংশধর ও পরিবারের বিষয়ে দায়িত্ব অনুভব করা। পরিবারের সদস্যদের চিন্তাগত, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক এবং সামাজিক উন্নতির জন্য যা যা করা দরকার তার সবই করা।

এই আয়াতে মহান আল্লাহ কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলছেন: 

'হে মুমিনরা,তোমরা রক্ষা কর নিজেদেরকে এবং  বাঁচাও তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই আগুন থেকে যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর,যাতে নিয়োজিত আছে পাষাণ হৃদয়, কঠোর-স্বভাব ফেরেশতারা। তারা আল্লাহ তা’আলা যা আদেশ করেন, তা অমান্য করে না এবং যা করতে আদেশ করা হয়,তাই করে।'

-সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করা বা বাধা দেয়া সব মুসলমানের দায়িত্ব এবং মুসলমানদের উচিত তারা যেন পরস্পরকে এ ব্যাপারে সতর্ক করেন। তবে এ আয়াত থেকে বোঝা যায় স্ত্রী ও সন্তানদের ক্ষেত্রে এ ব্যাপারে আরো বেশি দায়িত্বশীল হতে হবে। তাদেরকে শিক্ষা দেয়ার বিষয়ে যথাসাধ্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে এবং তাদেরকে বিরত রাখতে হবে গোনাহ থেকে ও সৎ কাজ করতে উৎসাহ দিতে হবে। কেবল তাদের বাহ্যিক খাদ্য যোগানোর কাজই যথেষ্ট নয়। মনে রাখা দরকার পরিবারগুলো হচ্ছে সমাজের এক একটি ইউনিট এবং পরিবারগুলোকে নিয়েই গড়ে ওঠে সমাজ বা জাতি।

পরিবারগুলোকে সংশোধন করা সম্ভব হলে গোটা সমাজকেই সংশোধন করা ও উন্নতির দিকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব।  আর পরিবারকে উন্নয়ন ও সংশোধনের দিকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে সবার আগে দায়িত্বশল হতে হবে পরিবারের প্রধান তথা বাবা ও মাকেই। আধুনিক যুগে দুর্নীতি ও অনাচার হয়ে পড়েছে অনেক বেশি শক্তিশালী ও বিপজ্জনক। তাই প্রত্যেক বাবা-মায়ের উচিত পরিবারের সদস্যদেরকে পাপ থেকে দূরে রাখার জন্য পরিকল্পিত ও প্রজ্ঞাময় পদক্ষেপ নেয়া। একই লক্ষে পরিবারের অভিভাবকদের উচিত নিজেদেরকে ইসলামী শিক্ষা ও নৈতিকতায় সুসজ্জিত করা। অভিভাবক হিসেবে নিজেদেরকে শুদ্ধ করার পাশাপাশি আপনজনদেরকেও সব ধরনের কলুষতা ও পাপ-পংকিলতা থেকে দূরে রাখার জন্য সক্রিয় হতে হবে। তাই তাদেরকেও নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষা দিতে হবে।

এই আয়াত তথা সুরা তাহরিমের ৬ নম্বর আয়াত নাজিল হওয়ার পর মহানবীর (সা) এক সাহাবি প্রশ্ন করেন: কিভাবে আমার পরিবারকে দোযখের আগুন থেকে রক্ষা করব? মহানবী বলেন: তাদেরকে সৎ কাজের আদেশ দাও ও অসৎ কাজে নিষেধ কর। তারা তোমার কথা শুনলে তুমি যেন তাদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচালে। আর তারা যদি তোমার কথা নাও শোনে তাহলে তোমার দিক থেকে দায়িত্ব আদায় হয়ে গেল। #

পার্সটুডে/আমির হুসাইন/আবু সাঈদ/ ২

খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন

ট্যাগ

২০১৮-১২-০২ ১৮:১৯ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য